এশিয়া থেকে ‘হাত গোটাচ্ছে না’ যুক্তরাষ্ট্র, মিত্রদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর তাগিদ

বিবিসি
শনিবার সিঙ্গাপুরে ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’ প্রতিরক্ষা সম্মেলনে যোগ দেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধসহ অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটেও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মিত্রদের থেকে যুক্তরাষ্ট্র ‘হাত গুটিয়ে নিচ্ছে না’ বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। সিঙ্গাপুরে আয়োজিত একটি শীর্ষ আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি মিত্রদের এমন আশ্বাসের পাশাপাশি তাদের নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেট আরও বাড়ানোর তাগিদ দেন।

এদিকে তাইওয়ানের জন্য নির্ধারিত একটি সামরিক প্যাকেজ স্থগিত করার পর তৈরি হওয়া ‘উদ্বেগ’কে উড়িয়ে দিয়ে হেগসেথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে করা অন্যান্য অস্ত্র চুক্তি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শনিবার (৩০ মে) বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর এশিয়ার এ নিরাপত্তা মঞ্চে ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থান কেমন হবে, তা নিয়ে নানামুখী জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এ বক্তব্য সামনে এলো।

হেগসেথ এ অঞ্চলে চীনের সামরিক শক্তির ব্যাপক উত্থানের বিষয়টি উল্লেখ করলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় সংঘাত’ এড়াতে চায়।

শনিবার সিঙ্গাপুরে ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’ নামক প্রতিরক্ষা সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন হেগসেথ। এ শীর্ষ সম্মেলনে জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছা ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কিছু দেশ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের এ অঞ্চলের প্রতি দায়বদ্ধতাকে খাটো করে দেখতে পারে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার মিত্রদের দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা করতে পারে।

জাপানি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এ উদ্বেগের জবাবে হেগসেথ বলেন, মার্কিন জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের অন্যতম মূল লক্ষ্যই হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ‘শক্তির জানান দেওয়া’ এবং মিত্রদের সঙ্গে একযোগে কাজ করা। তিনি বলেন, ‘মানুষ প্রায়ই গুলিয়ে ফেলে যে আমাদের অন্যান্য বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতির অর্থ হলো এই অঞ্চল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। আসলে বিষয়টি মোটেও তেমন নয়।’

যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে দেশটির এই প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমরা একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে পারি। ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র হাতে না পায়, তা নিশ্চিত করার মতো বৈশ্বিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আমরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।’

সম্মেলনের একপর্যায়ে একজন প্রতিনিধি তাইওয়ানের ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ স্থগিত রাখার বিষয়টি সামনে আনেন। ইরান যুদ্ধের জন্য সামরিক গোলাবারুদ ও অস্ত্র মজুত রাখার স্বার্থে তাইওয়ানের এই প্যাকেজটি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে মিত্রদের কাছে অস্ত্র সরবরাহে মার্কিন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এর জবাবে হেগসেথ এই দুটি বিষয়কে পুরোপুরি আলাদা হিসেবে দেখার আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, সামগ্রিক সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র মজুতের দিক থেকে এবং প্রয়োজনে আরও বেশি উৎপাদনের ক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বক্তৃতায় হেগসেথ এ অঞ্চলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘শক্তিশালী, শান্ত অথচ স্পষ্ট’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা হলো— ‘বড় লাঠি হাতে রাখা, কিন্তু নরম সুরে কথা বলা।’

এ কৌশলের মূল ভিত্তি যে ‘ফাঁপা আন্তর্জাতিক আইনি বুলি’ নয়, বরং অস্ত্র ও সামরিক শক্তি— সে কথা স্পষ্ট জানিয়ে হেগসেথ বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন খুবই ভালো জিনিস। কিন্তু আপনার যদি সেই নিয়ম কার্যকর করার মতো সামরিক শক্তি না থাকে, তবে কাগজের সেই নিয়মের কোনো মূল্য নেই।

শাংরি-লা ডায়ালগের মতো আলোচনার চেয়ে মাঠপর্যায়ের শক্তি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে হেগসেথ বলেন, আমাদের আরও বেশি সম্মেলনের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন যুদ্ধক্ষেত্রের শক্তি। কম শাংরি-লা ডায়ালগ, আর বেশি করে যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন দরকার।

হেগসেথের এমন বক্তব্যের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট তো লাম সম্মেলনের মূল বক্তব্যে এই অঞ্চলের উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

গত বছরের মতো এবারও হেগসেথ এশিয়ার মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জোরালো তাগিদ দেন। দেশগুলোর জিডিপির অন্তত ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ করার লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেন তিনি।

সম্প্রতি যেসব দেশ সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে, তাদের ভূয়সী প্রশংসা করেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইনসহ বেশ কয়েকটি মিত্র দেশের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

তবে সামরিক খাতে খরচ না করা দেশগুলোকে ‘ফ্রি-লোডার’ বা সুবিধাভোগী বলে সমালোচনা করেন তিনি। পরে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি নিউজিল্যান্ডকে এ তালিকায় ফেলেন এবং সতর্ক করে বলেন, ‘ইউরোপ ও ন্যাটো জোটকে এখন কিছু বড় ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

ট্রাম্প-জিনপিং শীর্ষ বৈঠকের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে শি জিনপিং সতর্ক করেছিলেন যে তাইওয়ান ইস্যুটি দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংবেদনশীল জায়গা। সম্ভবত সে কারণেই এবার চীনের প্রতি হেগসেথের সুর কিছুটা নরম ছিল। এমনকি সরাসরি প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া ছাড়া নিজের মূল বক্তব্যে তিনি তাইওয়ানের নামও নেননি।

গত বছরের সম্মেলনে হেগসেথের বক্তব্যের সঙ্গে এবারের বক্তব্যের পার্থক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। গত বছর তিনি বেইজিংকে তাইওয়ানের জন্য এক ‘আসন্ন হুমকি’ হিসেবে সরাসরি অভিযুক্ত করেছিলেন। তবে এবার হেগসেথ বলেন, চীনের নজিরবিহীন সামরিক উত্থান নিয়ে উদ্বেগ থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এটাও বোঝে, এশিয়ায় তাদের মিত্ররা ক্রমাগত উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। তারা এমন একটি শক্তির ভারসাম্য চায় যেখানে চীনসহ কোনো রাষ্ট্রই একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না।

হেগসেথ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রকৃত স্থিতিশীল সাম্যাবস্থা চায় এবং এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের শান্তি ও সমৃদ্ধিকে টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর। আমরা কোনো অনর্থক সংঘাতের মাধ্যমে এ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি না, বরং সুপরিকল্পিত ও পরিমিত শক্তির অবস্থান থেকে এগোচ্ছি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) আয়োজিত এই শাংরি-লা ডায়ালগ ঐতিহ্যগতভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উপস্থিতিতে মুখরিত থাকে। পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা আলোচনার জন্য এশীয় দেশগুলোর কাছে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।

তবে এ নিয়ে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো চীন এই সম্মেলনে তাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে না পাঠিয়ে তুলনামূলক নিম্নস্তরের একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে। অনেকে একে এই ফোরামের প্রতি চীনের অনীহা হিসেবে দেখছেন। আবার অনেকের মতে, এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের লড়াই চললেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে জড়ানো এড়াতেই চীন এমন কৌশল অবলম্বন করেছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

তৃতীয় কোনো দেশে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর নয়: ইরান

শুক্রবার (২৯ মে) রুশ সংবাদমাধ্যম আরআইএ নভোস্তিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আজিজি বলেন, ‘ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো তৃতীয় দেশের কাছে হস্তান্তর করতে চায় না।’

২১ ঘণ্টা আগে

গাজার ৭০% দখলের নির্দেশ নেতানিয়াহুর, যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে পড়ার শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইসরায়েলি বাহিনী গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখে একটি নির্ধারিত সীমারেখায় অবস্থান নেয়। তবে এরপর থেকেই ধীরে ধীরে তারা পশ্চিমমুখী অগ্রসর হয়ে হামাস-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর দিকে নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করে আসছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী বিস্ত

১ দিন আগে

মিত্রদের সঙ্গে ইরান শান্তিচুক্তির খসড়া ভাগাভাগি ট্রাম্পের, সমঝোতা আটকে পারমাণবিক ইস্যুতে

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য বলছে, ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির যে খসড়া, তাতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও এ প্রণালি থেকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের আটকে থাকা ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের প্রস্তাব রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বিবদমান এসব ইস্যুতে সমঝোতা হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। তবে এখনো চূড়ান

১ দিন আগে

ইবোলা মহামারি ঠেকাতে একগুচ্ছ চিকিৎসা ও টিকা পরীক্ষার সুপারিশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

এক ঘোষণায় ডব্লিউএইচও জানায়, সম্ভাব্য চিকিৎসাগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা হবে। সংস্থাটি এরই মধ্যে বাইরের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মিলে সম্ভাব্য ওষুধ ও টিকার তালিকা চূড়ান্ত করতে কাজ করছে।

১ দিন আগে