
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই দেশটির বিশাল তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এবার সেই পরিকল্পনাই বাস্তব রূপ পেল এক বিশাল তেল চুক্তির মধ্য দিয়ে।
কারাকাসে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সই হওয়া চুক্তিতে ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রে ১০০ বছরের জন্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন একটি কোম্পানিকে বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রের মজুত ধরা হয়েছে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল, যা ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত মোট তেলসম্পদের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।
ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজও একে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ও ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি কর রাজস্ব আসতে পারে।
তবে এ চুক্তি নিয়ে তীব্র সমালোচনা এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা এ চুক্তিকে খুব একটা বোধগম্য ভাবতে পারছেন না। চুক্তির শর্তগুলো ধাঁধায় ফেলে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তাদের কেউ কেউ।
অন্যদিকে বিরোধী রাজনীতিক থেকে শুরু করে ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক শিবিরের একাংশ ও সাধারণ নাগরিকরা এই চুক্তিকে দেখছেন দেশের সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তি হিসেবে। তাদের কাছে এ চুক্তি ভেনেজুয়েলায় মার্কিনিদের ‘নব্য ঔপনিবেশিকতা’র নামান্তর।
গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার সঙ্গে এই চুক্তির ঘোষণা দিয়েছিলেন। বুধবার কারাকাসে সই হয় চুক্তিটি। চুক্তির কাঠামো নিয়ে হোয়াইট হাউজ মঙ্গলবার একটি তথ্যপত্র প্রকাশ করেছে।
এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার একটি বেসরকারি তেল কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি প্যারেন্টসের (নাবেপ) সঙ্গে কাজ করবে। ভেনেজুয়েলায় বেসরকারি তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে শেভরনের পরেই অবস্থান নাবেপের।
তবে চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক কোম্পানিটির ওপর মার্কিন সরকারের অস্বাভাবিক প্রভাব। ওয়াশিংটনের তথ্যপত্র অনুযায়ী, নাবেপের পরিচালনা পর্ষদের যেকোনো সদস্য নিয়োগে মার্কিন সরকারের ভেটো ক্ষমতা থাকবে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকে মার্কিন নাগরিক হতে হবে।
অর্থাৎ চুক্তিটি শুধু তেল উত্তোলন বা বিনিয়োগের অংশীদারত্ব নয়, ভেনেজুয়েলার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সম্পদের ব্যবস্থাপনায় মার্কিন সরকারের সরাসরি প্রভাবও নিশ্চিত করছে।
এ কারণেই সাবেক মার্কিন বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট অ্যাব্রামস এ চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি ভয়াবহ একটি চুক্তি। রদ্রিগেজ কোনো বিনিময় ছাড়াই দেশের জাতীয় সম্পদের ২০ শতাংশ দিয়ে দিয়েছেন।’ রদ্রিগেজ প্রকৃত অর্থে ওয়াশিংটনের দাবির কাছে নতি স্বীকার করছেন বলে মনে করছেন তিনি।
চুক্তিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সময়কাল। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বার্গাম বলেছেন, চুক্তিটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ‘ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র’ মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ ‘চোক পয়েন্ট’ থেকে পশ্চিম গোলার্ধের দিকে সরিয়ে দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে হিসাবটি পরিষ্কার— মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পশ্চিম গোলার্ধের তেলসম্পদকে কাজে লাগানো। তবে তেলের উৎপাদন এত দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তি থেকে দুই বা তিন বছরের মধ্যেই লাভ আসতে শুরু করবে। কিন্তু জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই সময়সীমা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছেন।
দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের ঘাটতি, অবকাঠামোর দুরবস্থা এবং উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে কার্যত নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।
হিউস্টনের রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ লুইস পাচেকোর মতে, ৩০ বছর আগের উৎপাদন পর্যায়ে ফিরতে ভেনেজুয়েলাকে প্রায় আট বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের দুই-তিন বছরের বিপরীতে বাস্তবসম্মত সময়সীমা হতে পারে প্রায় এক দশক।
প্রশ্ন উঠেছে— এই বিপুল অর্থের ব্যবস্থাপনা করবে কারা?
পাচেকোরও প্রশ্ন, ‘কে এই সম্পদ পরিচালনা করবে এবং কী উদ্দেশ্যে?’ তিনি অতীতের কথা মনে করিয়ে দিয়ে জানতে চান, শতাব্দীর সবচেয়ে বড় তেলবুমের সম্পদ যারা অপচয় করেছে, তাদেরই কি আবার অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হবে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে সই হওয়া এ চুক্তির রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। ডেলসি রদ্রিগেজ ছিলেন মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট। অথচ মাদুরো সরকারকে ট্রাম্প প্রশাসন একসময় দুর্নীতিগ্রস্ত ‘মাদক কার্টেল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে সামরিক উপস্থিতিও বাড়িয়েছিল।
মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর একই প্রশাসন এখন তার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গেই সরাসরি কাজ করছে। এই দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তন ভেনেজুয়েলার বিরোধীদের ক্ষুব্ধ করেছে।
বিরোধী নেত্রী ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো অবশ্য ট্রাম্পের সমালোচনা করতে সতর্ক থাকতে পারেন। কারণ ক্ষমতায় ফিরতে চাইলে মার্কিন সমর্থন প্রয়োজন হবে তার। তবে অন্যরা সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিবিদ রিকার্দো হাউজমান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে উদ্দেশ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে মুক্ত করার বদলে তাদের ‘নিপীড়কদের সঙ্গে জোট’ বেছে নিয়েছে। তার অভিযোগ, ওয়াশিংটন সাংবিধানিক শাসন ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আগে একটি ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘অবৈধ’ সরকারের সঙ্গে সম্পদ হস্তান্তরের চুক্তি করেছে।
বিরোধীদের আরেকটি বড় ক্ষোভ— ভেনেজুয়েলায় দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।
চুক্তির বিরোধিতা শুধু মাদুরোবিরোধী শিবিরে সীমাবদ্ধ নেই। ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দল পিএসইউভি রদ্রিগেজকে সমর্থন করলেও দলের আদর্শিক ঘরানার অনেকেই চুক্তিটিকে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছেন।
প্রায় তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করা ভেনেজুয়েলার সমাজতন্ত্রীদের কাছে তেল ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক। সেই সম্পদই এখন ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে— এটাই তাদের ক্ষোভের মূল কারণ। তারা একে ‘নব্য ঔপনিবেশিকতা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
সাবেক তেলমন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর সাবেক প্রধান রাফায়েল রামিরেজের ভাষায়, এই চুক্তি ‘তেল হস্তান্তর করে যুক্তরাষ্ট্রের নব্য ঔপনিবেশিকতার দরজা খুলে দিচ্ছে’।
চুক্তিটির সবচেয়ে নাটকীয় দিকটি বোঝা যায় ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের বক্তব্যের সঙ্গে তুলনা করলে। ২০০৮ সালের শুরুতে চাভেজ তার জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান আলো প্রেসিডেন্টে করেছিলেন অরিনোকো নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের সাবেক এক্সন মোবিল তেলক্ষেত্র থেকে। এর আগে মার্কিন কোম্পানিটির কিছু সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
সেদিন শ্যাভেজ বলেছিলেন, তেলক্ষেত্রগুলোর মালিকানা এখন রাষ্ট্রীয় কোম্পানির হাতে এবং ‘লাগাম আমাদের হাতে, আমরা আর কখনো তা ছেড়ে দেবো না’।
তার অভিযোগ ছিল, অতীতের ওয়াশিংটনঘনিষ্ঠ সরকারগুলো ভেনেজুয়েলাকে কার্যত ‘গ্রিংগোদের জাতি’ বানিয়ে ফেলেছিল। বলিভারিয়ান বিপ্লব সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়েছে— এমন দাবিও করেছিলেন তিনি।
কিন্তু প্রায় দুই দশক পর সেই শ্যাভেজেরই এক রাজনৈতিক উত্তরসূরি ওয়াশিংটনের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করেছেন, যার মাধ্যমে দেশের বিপুল তেলসম্পদের ওপর মার্কিন প্রভাব দীর্ঘ এক শতাব্দীর জন্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
এ কারণেই চুক্তিটি শুধু একটি তেল বিনিয়োগ চুক্তি নয়। এটি ভেনেজুয়েলার রাজনীতির এক নাটকীয় বাঁকও।
ট্রাম্পের কাছে এটি পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক আধিপত্য পুনর্প্রতিষ্ঠার সুযোগ। রদ্রিগেজের কাছে এটি ভেনেজুয়েলার ভঙ্গুর তেলশিল্প পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল বিনিয়োগ আনার পথ। কিন্তু বিরোধীদের কাছে এটি গণতন্ত্রের বদলে ক্ষমতার সমঝোতা, আর সমাজতন্ত্রীদের কাছে কয়েক দশকের মার্কিনবিরোধী রাজনীতির আত্মসমর্পণ।
ফলে ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের এই চুক্তির আসল প্রশ্ন শুধু কে কত তেল পাবে তা নয়, বরং আসল প্রশ্ন হলো— ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ আগামী এক শতাব্দীতে আসলে কার হাতে থাকবে।
বিবিসি অবলম্বনে

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই দেশটির বিশাল তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এবার সেই পরিকল্পনাই বাস্তব রূপ পেল এক বিশাল তেল চুক্তির মধ্য দিয়ে।
কারাকাসে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সই হওয়া চুক্তিতে ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রে ১০০ বছরের জন্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন একটি কোম্পানিকে বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রের মজুত ধরা হয়েছে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল, যা ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত মোট তেলসম্পদের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।
ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজও একে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ও ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি কর রাজস্ব আসতে পারে।
তবে এ চুক্তি নিয়ে তীব্র সমালোচনা এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা এ চুক্তিকে খুব একটা বোধগম্য ভাবতে পারছেন না। চুক্তির শর্তগুলো ধাঁধায় ফেলে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তাদের কেউ কেউ।
অন্যদিকে বিরোধী রাজনীতিক থেকে শুরু করে ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক শিবিরের একাংশ ও সাধারণ নাগরিকরা এই চুক্তিকে দেখছেন দেশের সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তি হিসেবে। তাদের কাছে এ চুক্তি ভেনেজুয়েলায় মার্কিনিদের ‘নব্য ঔপনিবেশিকতা’র নামান্তর।
গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার সঙ্গে এই চুক্তির ঘোষণা দিয়েছিলেন। বুধবার কারাকাসে সই হয় চুক্তিটি। চুক্তির কাঠামো নিয়ে হোয়াইট হাউজ মঙ্গলবার একটি তথ্যপত্র প্রকাশ করেছে।
এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার একটি বেসরকারি তেল কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি প্যারেন্টসের (নাবেপ) সঙ্গে কাজ করবে। ভেনেজুয়েলায় বেসরকারি তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে শেভরনের পরেই অবস্থান নাবেপের।
তবে চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক কোম্পানিটির ওপর মার্কিন সরকারের অস্বাভাবিক প্রভাব। ওয়াশিংটনের তথ্যপত্র অনুযায়ী, নাবেপের পরিচালনা পর্ষদের যেকোনো সদস্য নিয়োগে মার্কিন সরকারের ভেটো ক্ষমতা থাকবে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকে মার্কিন নাগরিক হতে হবে।
অর্থাৎ চুক্তিটি শুধু তেল উত্তোলন বা বিনিয়োগের অংশীদারত্ব নয়, ভেনেজুয়েলার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সম্পদের ব্যবস্থাপনায় মার্কিন সরকারের সরাসরি প্রভাবও নিশ্চিত করছে।
এ কারণেই সাবেক মার্কিন বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট অ্যাব্রামস এ চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি ভয়াবহ একটি চুক্তি। রদ্রিগেজ কোনো বিনিময় ছাড়াই দেশের জাতীয় সম্পদের ২০ শতাংশ দিয়ে দিয়েছেন।’ রদ্রিগেজ প্রকৃত অর্থে ওয়াশিংটনের দাবির কাছে নতি স্বীকার করছেন বলে মনে করছেন তিনি।
চুক্তিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সময়কাল। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বার্গাম বলেছেন, চুক্তিটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ‘ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র’ মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ ‘চোক পয়েন্ট’ থেকে পশ্চিম গোলার্ধের দিকে সরিয়ে দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে হিসাবটি পরিষ্কার— মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পশ্চিম গোলার্ধের তেলসম্পদকে কাজে লাগানো। তবে তেলের উৎপাদন এত দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তি থেকে দুই বা তিন বছরের মধ্যেই লাভ আসতে শুরু করবে। কিন্তু জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই সময়সীমা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছেন।
দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের ঘাটতি, অবকাঠামোর দুরবস্থা এবং উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে কার্যত নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।
হিউস্টনের রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ লুইস পাচেকোর মতে, ৩০ বছর আগের উৎপাদন পর্যায়ে ফিরতে ভেনেজুয়েলাকে প্রায় আট বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের দুই-তিন বছরের বিপরীতে বাস্তবসম্মত সময়সীমা হতে পারে প্রায় এক দশক।
প্রশ্ন উঠেছে— এই বিপুল অর্থের ব্যবস্থাপনা করবে কারা?
পাচেকোরও প্রশ্ন, ‘কে এই সম্পদ পরিচালনা করবে এবং কী উদ্দেশ্যে?’ তিনি অতীতের কথা মনে করিয়ে দিয়ে জানতে চান, শতাব্দীর সবচেয়ে বড় তেলবুমের সম্পদ যারা অপচয় করেছে, তাদেরই কি আবার অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হবে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে সই হওয়া এ চুক্তির রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। ডেলসি রদ্রিগেজ ছিলেন মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট। অথচ মাদুরো সরকারকে ট্রাম্প প্রশাসন একসময় দুর্নীতিগ্রস্ত ‘মাদক কার্টেল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে সামরিক উপস্থিতিও বাড়িয়েছিল।
মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর একই প্রশাসন এখন তার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গেই সরাসরি কাজ করছে। এই দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তন ভেনেজুয়েলার বিরোধীদের ক্ষুব্ধ করেছে।
বিরোধী নেত্রী ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো অবশ্য ট্রাম্পের সমালোচনা করতে সতর্ক থাকতে পারেন। কারণ ক্ষমতায় ফিরতে চাইলে মার্কিন সমর্থন প্রয়োজন হবে তার। তবে অন্যরা সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিবিদ রিকার্দো হাউজমান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে উদ্দেশ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে মুক্ত করার বদলে তাদের ‘নিপীড়কদের সঙ্গে জোট’ বেছে নিয়েছে। তার অভিযোগ, ওয়াশিংটন সাংবিধানিক শাসন ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আগে একটি ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘অবৈধ’ সরকারের সঙ্গে সম্পদ হস্তান্তরের চুক্তি করেছে।
বিরোধীদের আরেকটি বড় ক্ষোভ— ভেনেজুয়েলায় দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।
চুক্তির বিরোধিতা শুধু মাদুরোবিরোধী শিবিরে সীমাবদ্ধ নেই। ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দল পিএসইউভি রদ্রিগেজকে সমর্থন করলেও দলের আদর্শিক ঘরানার অনেকেই চুক্তিটিকে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছেন।
প্রায় তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করা ভেনেজুয়েলার সমাজতন্ত্রীদের কাছে তেল ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক। সেই সম্পদই এখন ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে— এটাই তাদের ক্ষোভের মূল কারণ। তারা একে ‘নব্য ঔপনিবেশিকতা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
সাবেক তেলমন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর সাবেক প্রধান রাফায়েল রামিরেজের ভাষায়, এই চুক্তি ‘তেল হস্তান্তর করে যুক্তরাষ্ট্রের নব্য ঔপনিবেশিকতার দরজা খুলে দিচ্ছে’।
চুক্তিটির সবচেয়ে নাটকীয় দিকটি বোঝা যায় ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের বক্তব্যের সঙ্গে তুলনা করলে। ২০০৮ সালের শুরুতে চাভেজ তার জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান আলো প্রেসিডেন্টে করেছিলেন অরিনোকো নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের সাবেক এক্সন মোবিল তেলক্ষেত্র থেকে। এর আগে মার্কিন কোম্পানিটির কিছু সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
সেদিন শ্যাভেজ বলেছিলেন, তেলক্ষেত্রগুলোর মালিকানা এখন রাষ্ট্রীয় কোম্পানির হাতে এবং ‘লাগাম আমাদের হাতে, আমরা আর কখনো তা ছেড়ে দেবো না’।
তার অভিযোগ ছিল, অতীতের ওয়াশিংটনঘনিষ্ঠ সরকারগুলো ভেনেজুয়েলাকে কার্যত ‘গ্রিংগোদের জাতি’ বানিয়ে ফেলেছিল। বলিভারিয়ান বিপ্লব সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়েছে— এমন দাবিও করেছিলেন তিনি।
কিন্তু প্রায় দুই দশক পর সেই শ্যাভেজেরই এক রাজনৈতিক উত্তরসূরি ওয়াশিংটনের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করেছেন, যার মাধ্যমে দেশের বিপুল তেলসম্পদের ওপর মার্কিন প্রভাব দীর্ঘ এক শতাব্দীর জন্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
এ কারণেই চুক্তিটি শুধু একটি তেল বিনিয়োগ চুক্তি নয়। এটি ভেনেজুয়েলার রাজনীতির এক নাটকীয় বাঁকও।
ট্রাম্পের কাছে এটি পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক আধিপত্য পুনর্প্রতিষ্ঠার সুযোগ। রদ্রিগেজের কাছে এটি ভেনেজুয়েলার ভঙ্গুর তেলশিল্প পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল বিনিয়োগ আনার পথ। কিন্তু বিরোধীদের কাছে এটি গণতন্ত্রের বদলে ক্ষমতার সমঝোতা, আর সমাজতন্ত্রীদের কাছে কয়েক দশকের মার্কিনবিরোধী রাজনীতির আত্মসমর্পণ।
ফলে ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের এই চুক্তির আসল প্রশ্ন শুধু কে কত তেল পাবে তা নয়, বরং আসল প্রশ্ন হলো— ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ আগামী এক শতাব্দীতে আসলে কার হাতে থাকবে।
বিবিসি অবলম্বনে

হামলার বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এবং সিরিক কাউন্টির গভর্নর রেজা শহীদিয়ান জানান, বিয়েবাড়িতে হামলায় গুরুতর আহত ৫০ জন নারী ও শিশুকে মিনাব শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী এক শিশুর ভাষ্যমতে, অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর পরপরই এক বিকট বিস্ফোরণে চারপাশ ধ্বংসস
৮ ঘণ্টা আগে
মঙ্গলবার জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডব্রিন্ট বলেন, পুলিশি তদন্ত, হামলার ধরন ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে সরকার এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে ড্রোনটি নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিরা রুশ রাষ্ট্রীয় সংস্থার পক্ষে কাজ করছিলেন। ফলে ঘটনাটিকে জার্মান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রুশ হাইব্রিড হামলা’ হিসেবে চিহ্নিত করে
৯ ঘণ্টা আগে
আইআরজিসি-র বিবৃতিতে দাবি করা হয়, জর্ডানের ‘প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটি’তে অবস্থিত মার্কিন ড্রোন হ্যাঙ্গারগুলো লক্ষ্য করে একটি ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মারা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় বেশ কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি কয়েকজন মার্কিন সেনা ও কারিগরি কর্মী নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে জর্
৯ ঘণ্টা আগে
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে আছে এবং ‘অপ্রত্যাশিতভাবে পরিস্থিতির অবনতি’ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
১৭ ঘণ্টা আগে