চীনের হয়ে ‘গোপন তথ্য’ সংগ্রহ, মার্কিন সাংবাদিকের ২ বছরের কারাদণ্ড

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মার্কিন সাংবাদিক দ্বিতীয় থমাস ওয়্যার পাউকেন। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে চীনা সরকারের হয়ে ‘গোপন তথ্য’ সংগ্রহে সহায়তার কথা স্বীকার করা মার্কিন সাংবাদিক দ্বিতীয় থমাস পাউকেনকে (৫০) দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধন না করে চীনের ‘এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করার দায়ে মঙ্গলবার (স্থানীয় সময়) তাকে এ সাজা দেওয়া হয়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর খবরে বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনের একটি হোটেল থেকে পাউকেনকে গ্রেপ্তার করে এফবিআই। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তাকে চীনে থাকা এক নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে উৎসাহিত করেছিলেন। পাউকেন ওই নারীকে চীনা গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট বলে মনে করতেন।

বেইজিংয়ে বসবাস করা পাউকেন বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থায় সম্পাদক ও ভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেছেন। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের হয়ে নিবন্ধন না করে এজেন্ট হিসেবে কাজ করার অভিযোগে তিনি দোষ স্বীকার করেন।

মার্কিন জেলা আদালতে সাজা ঘোষণার শুনানিতে সরকারি কৌঁসুলি এলি রস বলেন, সাত বছর ধরে চীনা সরকারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে পাউকেনকে ১ লাখ ডলার দেওয়া হয়েছিল। আদালতের নথি অনুযায়ী, তার চীনা নিয়ন্ত্রক তাকে মিথ্যা শনাক্তকরণ পরীক্ষায় বসিয়েছিলেন। তাকে আরও জানানো হয়েছিল, পাউকেনের প্রতিবেদন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ দেশটির শীর্ষ নেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

কৌঁসুলি রস বলেন, পাউকেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে তার চীনা নিয়ন্ত্রকের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের ওই কর্মকর্তাও ছিলেন, যার সঙ্গে গ্রেপ্তারের কিছুদিন আগে পাউকেন দেখা করেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, ‘চীনা গোয়েন্দাদের সঙ্গে একটি সমঝোতার অংশ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এসব সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। তিনি অর্থের জন্য এটি করেছেন। তিনি অনেক অর্থ উপার্জন করেছেন।’

রস আরও জানান, এফবিআই পাউকেনকে পালটা গোয়েন্দা হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিল, তবে তা সফল হয়নি। একপর্যায়ে পাউকেন এফবিআইকে চীনের হয়ে তার কাজের বিষয়ে জানান। কিন্তু ওই বৈঠকের পর এফবিআইয়ের দেওয়া ‘নির্দেশনা’ তিনি অনুসরণ করেননি। তখনও চীনা নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে তার যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।

তবে সরকারি কৌঁসুলি ও পাউকেনের আইনজীবী চার্লস বার্নহ্যাম উভয়েই একমত যে, তিনি চীনের কাছে কোনো শ্রেণিবদ্ধ বা গোপন সরকারি তথ্য সরবরাহ করেননি। নিজের কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব অবশ্য আদালতেই স্বীকার করেন পাউকেন।

বিচারক লিওনি ব্রিংকেমার সামনে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক গোপন তথ্য জেনেছিলাম এবং এসব গোপন তথ্যের কথা চীনাদের জানিয়েছিলাম।‘ নিজের কর্মকাণ্ডকে ‘ভুল’, ‘আশ্চর্যজনক’ ও ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেন তিনি। তবে পাউকেনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক উন্নত করার আন্তরিক ইচ্ছা থেকেই তিনি এসব করেছিলেন।

আদালতে গাঢ় সবুজ রঙের কারাগারের পোশাক পরে পাউকেন বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, আমি সাহায্য করছি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, এর মাধ্যমে আমি আরও বড় ক্ষতি করতে পারতাম, এমনকি যুদ্ধও হতে পারত।’

বিচারক ব্রিংকেমাপাউকেনের অপরাধকে ‘অত্যন্ত গুরুতর’ বলে উল্লেখ করেন। বলেন, পাউকেন নিজে কোনো শ্রেণিবদ্ধ তথ্য চীনের কাছে দেননি ঠিকই, কিন্তু তিনি জানতেন তার চীনা নিয়ন্ত্রক এ ধরনের তথ্য পেতে চাইছেন। এরপরও তিনি ওই নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তার যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

আইনজীবী বার্নহ্যামকে উদ্দেশ করে বিচারক বলেন, ‘এখানে যা ঘটেছে, সেটিকে ছোট করে দেখবেন না।’ সাত বছরে ১ লাখ ডলার পাওয়া ‘জীবন বদলে দেওয়ার মতো অর্থ নয়’— পাউকেনের আইনজীবীর এমন যুক্তিও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। বিচারক বলেন, ‘চীনে ১ লাখ ডলার বেশ ভালোই কাজে লাগে।’

সরকারি কৌঁসুলিরা পাউকেনের জন্য ৩৩ মাসের কারাদণ্ড চেয়েছিলেন। গ্রেপ্তারের পর থেকেই তিনি হেফাজতে রয়েছেন। অন্যদিকে, তার আইনজীবীরা প্রবেশন অথবা এমন কোনো সাজা চেয়েছিলেন, যা হাফওয়ে হাউসে থেকে ভোগ করা সম্ভব।

‘পারসন ১’ কে, জানেন না বিচারকও

পাউকেন যাকে নিয়োগের জন্য যোগাযোগ করেছিলেন, সেই ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তার পরিচয় সম্পর্কে আদালতের শুনানি ও নথিতে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি। কৌঁসুলি ও প্রতিরক্ষাপক্ষ উভয়েই তাকে ‘পারসন ১’ নামে উল্লেখ করেছে। আদালতের এক নথিতে এফবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ওই ব্যক্তি আরও উচ্চপদে চাকরি পাওয়ার আশা করছিলেন।

বিচারক ব্রিংকেমা বলেন, এই ঘটনার কারণে ওই ব্যক্তির কর্মজীবনে সম্ভবত ‘প্রভাব’ পড়তে পারে। তবে বিষয়টির বিস্তারিত সম্পর্কে তিনিও অন্ধকারে রয়েছেন বলে জানান। বিচারক বলেন, ‘পারসন ১ কে, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই।’

পরিবারও যুক্ত রিপাবলিকান রাজনীতিতে

বন্ধুদের ভাষ্য, চীনে পাউকেনের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। সেখানে কোনোভাবে জীবন চালানোর পাশাপাশি তিনি মানসিক স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গেও লড়ছিলেন। পরিচিতজনরা জানান, চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইচ্যাটে তিনি ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা এমএজিএমুখী একটি গ্রুপ পরিচালনা করতেন। প্রবাসী মার্কিনিদের মধ্যে ট্রাম্পপন্থী কণ্ঠস্বর খুব বেশি না থাকায় তিনি কিছুটা পরিচিতিও পেয়েছিলেন।

পাউকেনের পরিবার টেক্সাসের রিপাবলিকান পার্টির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তার বাবা থমাস পাউকেন সিনিয়র ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনীর সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রশাসনে কাজ করেন।

১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত পাউকেন সিনিয়র টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০০৮ সালে সাবেক টেক্সাস গভর্নর রিক পেরি তাকে অঙ্গরাজ্যটির ওয়ার্কফোর্স কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০১৪ সালে তিনি নিজেও টেক্সাসের গভর্নর পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন।

মঙ্গলবার ছেলের সাজা ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন পাউকেন সিনিয়র। তবে তিনি আদালতে কোনো বক্তব্য দেননি। বর্তমানে ৮২ বছর বয়সী সাবেক এই কর্মকর্তা আদালত থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যান।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইরানে বিয়েবাড়িতে মার্কিন হামলা: প্রাণ গেল শিশুসহ ৫ জনের, আহত ৬৩

হামলার বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এবং সিরিক কাউন্টির গভর্নর রেজা শহীদিয়ান জানান, বিয়েবাড়িতে হামলায় গুরুতর আহত ৫০ জন নারী ও শিশুকে মিনাব শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী এক শিশুর ভাষ্যমতে, অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর পরপরই এক বিকট বিস্ফোরণে চারপাশ ধ্বংসস

৭ ঘণ্টা আগে

জার্মান মাটিতে রুশ ‘হাইব্রিড হামলা’, কনস্যুলেট বন্ধের পথে বার্লিন

মঙ্গলবার জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডব্রিন্ট বলেন, পুলিশি তদন্ত, হামলার ধরন ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে সরকার এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে ড্রোনটি নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিরা রুশ রাষ্ট্রীয় সংস্থার পক্ষে কাজ করছিলেন। ফলে ঘটনাটিকে জার্মান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রুশ হাইব্রিড হামলা’ হিসেবে চিহ্নিত করে

৮ ঘণ্টা আগে

কুয়েত জর্ডান ইরাক ও বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন-মিসাইল হামলা

আইআরজিসি-র বিবৃতিতে দাবি করা হয়, জর্ডানের ‘প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটি’তে অবস্থিত মার্কিন ড্রোন হ্যাঙ্গারগুলো লক্ষ্য করে একটি ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মারা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় বেশ কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি কয়েকজন মার্কিন সেনা ও কারিগরি কর্মী নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে জর্

৮ ঘণ্টা আগে

নতুন হামলায় উদ্বেগ, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করল যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে আছে এবং ‘অপ্রত্যাশিতভাবে পরিস্থিতির অবনতি’ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

১৬ ঘণ্টা আগে
Advertisement