রুশ হামলায় নিহত বেড়ে ১৮, কিয়েভে শুক্রবার শোক দিবস ঘোষণা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
রাশিয়ার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কিয়েভের আবাসিক এলাকার একটি ভবন। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবনের পাশেই তৈরি হয়েছে বড় একটি গর্ত। ছবি: বিবিসি
রাশিয়ার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কিয়েভের আবাসিক এলাকার একটি ভবন। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবনের পাশেই তৈরি হয়েছে বড় একটি গর্ত। ছবি: বিবিসি

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন প্রায় ৯০ জন, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। শহরের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো এটিকে কিয়েভের ওপর চালানো ‘সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা’ বলে বর্ণনা করেছেন।

হামলার পর শুক্রবারকে কিয়েভে শোক দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। উদ্ধার কর্মীরা একটি বহুতল ভবনের ধ্বংসাবশেষে আটকে পড়া ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী ও তার পরিবারের সদস্যদের খুঁজছেন।

এদিকে হামলার পর নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ক্রেমলিন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ‘আমাদের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য কিয়েভ সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়ানো অব্যাহত থাকবে।’

১১ ঘণ্টার হামলায় কেঁপে ওঠে কিয়েভ

স্থানীয় সময় বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ১১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কয়েক দফায় হামলা চালায় রাশিয়া।

হামলার পর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন দমকলকর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত
হামলার পর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন দমকলকর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত

প্রথমে ড্রোন হামলায় কিয়েভের ঐতিহাসিক এলাকায় আঘাত হানা হয়, যাতে শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি হোটেলে আগুন লাগে। রাত ১টার দিকে কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এরপর রাত ৩টার দিকে আবারও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ভোর পর্যন্ত ড্রোনের ঝাঁক রাজধানীকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।

বিবিসির সাংবাদিকরা রাতভর একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় আগুনের ঘটনা ঘটে। দিনের আলো ফুটলে বিস্ফোরণে সৃষ্ট বিশাল গর্ত, পুড়ে যাওয়া গাড়ি, ধ্বংস হওয়া ভবন এবং বিধ্বস্ত অবকাঠামোর চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আবাসিক ভবন, অ্যাম্বুলেন্স স্টেশন ও হোটেলে আঘাত

হামলায় কিয়েভের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি বহুতল আবাসিক ভবনের বড় অংশ উড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একটি অ্যাম্বুলেন্স স্টেশনও, যেখানে অন্তত একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

রাশিয়ার হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল কিয়েভের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আবাসিক এলাকাও। ছবি: সংগৃহীত
রাশিয়ার হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল কিয়েভের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আবাসিক এলাকাও। ছবি: সংগৃহীত

শহরের কেন্দ্রীয় একটি সড়কে অবস্থিত একটি হোটেলে ভয়াবহ আগুন লাগে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একযোগে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

কিয়েভ সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর তকাচেঙ্কো বলেন, নিহত ও আহতদের মধ্যে শিশু রয়েছে। তার অভিযোগ, ‘শত্রুপক্ষ আবারও ইচ্ছাকৃতভাবে আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়ে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে।’

৭৪ ক্ষেপণাস্ত্র, প্রায় ৫০০ ড্রোন

ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া রাতভর ৭৪টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪৯৬টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, যার মূল লক্ষ্য ছিল কিয়েভ।

বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও ২৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১২টি ড্রোন রাজধানীসহ ৩৩টি স্থানে আঘাত হানে।

হামলার সতর্ক সংকেত বেজে উঠলে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের একটি মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি: সংগৃহীত
হামলার সতর্ক সংকেত বেজে উঠলে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের একটি মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেনের সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এটি দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে কঠিন হামলাগুলোর একটি।

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ বোহদান দোলিন্তসেভ বলেন, একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে ধাপে ধাপে হামলা চালিয়ে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে রাশিয়া, যা প্রতিরোধকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।

জেলেনস্কির নতুন আহ্বান

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন ইউক্রেনের জন্য ‘অত্যন্ত জরুরি ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত’।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা মিত্র দেশগুলোর প্রতি আরও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইউক্রেনের এখন শুধু নিন্দা নয়, রাশিয়ার হামলা বন্ধে ‘বাস্তব পদক্ষেপ’ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও দাবি জানান।

রাশিয়ার দাবি, সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা

অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা ইউক্রেনের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সামরিক ঘাঁটি, প্রতিরক্ষা শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।

মস্কোর দাবি, রাশিয়ার বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ইউক্রেনের সাম্প্রতিক দূরপাল্লার হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।

সম্প্রতি ইউক্রেন মস্কো থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিভিন্ন রুশ বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। এতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিরলভাবে স্বীকার করেন যে দেশটি জ্বালানি সংকটে পড়েছে।

তবে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিবিহা বলেন, ‘এই যুদ্ধে একজন আগ্রাসী এবং একজন আত্মরক্ষাকারী রয়েছে। তাই ইউক্রেনের হামলাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে বেসামরিক মানুষের ওপর রুশ হামলার নৈতিক কোনো ভিত্তি নেই।’

আগাম সতর্ক করেছিলেন জেলেনস্কি

হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই নতুন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আয়ারল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরেন জেলেনস্কি। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, রাশিয়া বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং সবাইকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।

জেলেনস্কির দাবি, প্রেসিডেন্ট পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই এই ব্যাপক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

পালটাপালটি স্থলযুদ্ধ

এদিকে পূর্ব ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর কোস্তিয়ানতিনিভকায় সম্প্রতি অগ্রসর হয়েছে রুশ বাহিনী। শহরটি পুরো ডনবাস অঞ্চলে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত।

তবে ইউক্রেনের সামরিক কমান্ডারদের দাবি, চলতি বছরে তারা যতটা ভূখণ্ড হারিয়েছে, তার চেয়ে বেশি এলাকা পুনর্দখল করেছে এবং রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ লাইনেও বিঘ্ন ঘটিয়েছে।

যদিও কয়েক মাস ধরে স্থলযুদ্ধ কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড, যার বেশির ভাগই ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরুর দিকে দখল করা হয়েছিল।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement