কপিরাইটের টেবিল থেকে এআইয়ের ভবিষ্যৎ, ফ্রাঙ্কফুর্টে ব্যস্ত বাংলাদেশের প্রকাশকরা

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার প্রথম দিনটি যেন শুধু বই দেখার নয়, বরং বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনারও দিন। বিশাল মেলা প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই প্রকাশকদের স্টলে ব্যস্ততা। কোথাও কপিরাইট বিক্রি ও কেনার আলোচনা, কোথাও অনুবাদ অধিকার, আবার কোথাও আন্তর্জাতিক বাজারে বই পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা। একের পর এক বৈঠকে টেবিল বদলাচ্ছেন প্রকাশক, সাহিত্য এজেন্ট ও বই ব্যবসায়ীরা। প্রদর্শনীর আড়ালে মূলত চলছে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকাশকদের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে অংশ নেওয়া প্রকাশকদেরও ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কামরুল হাসান শায়েকের দিন কেটেছে একের পর এক বৈঠক ও মতবিনিময়ে। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা বাজারে বাংলাদেশের বইয়ের সম্ভাবনা, কপিরাইট, অনুবাদ এবং নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার ব্যবসায়িক দিনের অন্যতম প্রধান বিষয় কপিরাইট। একটি বই এক দেশের পাঠকের কাছে পৌঁছানোর পর সেটি অন্য ভাষায়, অন্য দেশে কিংবা অন্য মাধ্যমে প্রকাশের অধিকার কীভাবে হস্তান্তর হবে, তার নানা হিসাব-নিকাশ চলে এখানে। এ কারণে অনেক স্টলেই সাধারণ দর্শনার্থীর চেয়ে বৈঠকে ব্যস্ত প্রকাশক ও এজেন্টদের উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ে। টেবিলে বইয়ের প্রচ্ছদ ও নতুন প্রকাশনার পাশাপাশি থাকে চুক্তির খসড়া, ক্যাটালগ এবং কপিরাইট-সংক্রান্ত নথি।
এবার এসব আলোচনার সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন কীভাবে বই লেখা, সম্পাদনা, অনুবাদ, বিপণন এবং পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতিকে বদলে দিচ্ছে, তা নিয়ে মেলাজুড়ে চলছে আলোচনা।
এই প্রেক্ষাপটে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার ‘AI GYM ২০২৬’ কর্মসূচিকে ঘিরে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের প্রকাশক কামরুল হাসান শায়েকের সঙ্গে IRCAI/UNESCO-এর উপপরিচালক মিতজা জেরমলের মতবিনিময় গুরুত্ব পেয়েছে। আলোচনায় প্রকাশনা, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, এর সম্ভাবনা এবং ঝুঁকির বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর শুধু ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়; প্রকাশনা শিল্পেও এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা, অনুবাদ, বইয়ের প্রচার, পাঠকের আগ্রহ বিশ্লেষণ, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি এবং শিক্ষাসামগ্রী প্রস্তুতে এআই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় বিপুল পরিমাণ মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী তৈরিতে এ প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা প্রশ্ন। এআই তৈরি করা তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই করবে কে? কোনো লেখকের লেখা এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হলে তার অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্টের মালিকানা কার হবে? লেখক ও প্রকাশকের কপিরাইট কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে? প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে এসব প্রশ্নও এখন আন্তর্জাতিক প্রকাশনা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
কামরুল হাসান শায়েকের সঙ্গে মিতজা জেরমলের আলোচনাতেও এসব বিষয় উঠে আসে। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা সম্পর্কে কামরুল হাসান শায়েক বলেন, পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা থেকে শুরু করে অনুবাদ, বইয়ের প্রচার এবং পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকাশকদের সহায়ক শক্তি হতে পারে। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় মানসম্মত ডিজিটাল কনটেন্ট ও শিক্ষাসহায়ক উপকরণ তৈরিতে এর বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে প্রযুক্তি ব্যবহারে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। তার মতে, লেখকের স্বত্ব ও সম্মতি, তথ্যের নির্ভুলতা এবং বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য যথাযথভাবে উপস্থাপনের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি। প্রযুক্তি যেন লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশকের সৃজনশীল ভূমিকার বিকল্প না হয়ে ওঠে, বরং তাদের কাজকে আরও শক্তিশালী করে— এমন ব্যবহারের পক্ষেই তিনি মত দেন।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার AI GYM ২০২৬ কর্মসূচি ৭ থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শিক্ষা ও এআই-সাক্ষরতা, প্রকাশনা শিল্পে প্রযুক্তির পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভুল তথ্য মোকাবিলা, মেধাস্বত্ব এবং মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয় এতে আলোচিত হচ্ছে। ফলে এবারের মেলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু প্রযুক্তি বিভাগের একটি বিষয় নয়; প্রকাশনা শিল্পের ভবিষ্যৎ কাঠামোর সঙ্গেও তা সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্যও কম নয়। দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, বাংলা ভাষার পাঠক এবং ডিজিটাল কনটেন্টের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার প্রকাশকদের সামনে নতুন বাজার তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বাংলা ভাষার নিজস্বতা ও বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এআই সহায়ক হতে পারে।
তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি— মানসম্মত তথ্য, মানবসম্পাদনা, কপিরাইটের সুরক্ষা এবং বাংলা ভাষার প্রতি প্রযুক্তিগত সংবেদনশীলতা। দ্রুত কনটেন্ট তৈরি করা গেলেই ভালো প্রকাশনা নিশ্চিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন তথ্যের সত্যতা, ভাষার সৌন্দর্য, সম্পাদনার দক্ষতা এবং সৃজনশীলতার নিজস্বতা।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার প্রথম দিনের ব্যস্ততা তাই শুধু একটি বইমেলার দৃশ্য নয়, বদলে যাওয়া প্রকাশনা বিশ্বেরও প্রতিচ্ছবি। একদিকে কপিরাইট নিয়ে প্রকাশকদের টানা বৈঠক, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভবিষ্যতের প্রকাশনা শিল্পের হিসাব-নিকাশ। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে বাংলাদেশের প্রকাশকদের জন্যও নতুন এক চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট— বিশ্ববাজারে প্রবেশের পাশাপাশি প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলা বই ও প্রকাশনাকে আরও শক্তিশালী করা।
ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রথম দিনেই যেন সেই বার্তাটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে— আগামী দিনের বই শুধু কাগজে ছাপা একটি পণ্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কপিরাইট, প্রযুক্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিশ্ববাজারের জটিল সমীকরণ। সেই সমীকরণে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প কতটা দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

















