মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের সামরিক স্থাপনা, পালটা জবাব তেহরানের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মার্কিন যুদ্ধবিমান। ফাইল ছবি

তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধ অবসানে যখন দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই আবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ও পালটাপালটি হামলায় জড়িয়ে পড়েছে মার্কিন ও ইরানি বাহিনী। সপ্তাহের শেষভাগে ইরানের বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর, এর পালটা জবাব হিসেবে একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।

সোমবার (১ জুন) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই এই দুই চিরবৈরী দেশের নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও পালটাপালটি হামলা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনাকে নতুন করে সংকটের মুখে ফেলেছে।

পারস্য উপসাগরের উপকূলে মার্কিন বোমাবর্ষণ

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছে, তারা ইরানের গোরুক শহর ও কেশম দ্বীপে দেশটির রাডারসহ ড্রোন সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে। মার্কিন সামরিক প্রশাসনের দাবি, আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় টহলরত একটি মার্কিন ‘এমকিউ-১’ ড্রোন ইরানি বাহিনী গুলি করে ভূপাতিত করার পর এই পালটা হামলা চালানো হয়।

সেন্টকম তাদের বিবৃতিতে জানায়, ‘আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য স্পষ্ট হুমকি হয়ে ওঠা ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এবং দুটি আত্মঘাতী ড্রোন মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ক্ষিপ্রতার সঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।’

একই সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, চলমান যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম, সম্পদ ও স্বার্থ সুরক্ষায় ওয়াশিংটন যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত রাখবে।

পালটা জবাবে কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পালটা প্রতিরোধের ঘোষণা দেয় তেহরান। সোমবার আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানায়, দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলার কাজে ব্যবহৃত একটি বিমান ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে তারা সফল হামলা চালিয়েছে। তবে কৌশলগত কারণে ইরান নির্দিষ্ট করে কোনো ঘাঁটির নাম উল্লেখ করেনি।

এদিকে কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘কুনা’ এক জরুরি বুলেটিনে জানিয়েছে, সোমবার কুয়েত জুড়ে একযোগে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বা সাইরেন বেজে ওঠে। কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশাল সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত। সেখানে ইরানের নিক্ষেপ করা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রুখে দিতে কুয়েতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে এবং বেশ কিছু ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তবে হামলায় ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কোনো বিবরণ কুয়েতি প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেনি।

চুক্তি বাস্তবায়নে বড় বাধা অবরুদ্ধ সম্পদ ও লেবানন যুদ্ধ

এই পালটাপালটি সামরিক সংঘাত এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দুই দেশ যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে। তবে আলোচনার টেবিলে দুই পক্ষের মধ্যে এখনও বেশ কিছু বিপরীতমুখী শর্ত ও গভীর মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

তেহরানের প্রধান দাবি হলো— ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোতে অবরুদ্ধ থাকা ইরানের হাজার কোটি ডলারের তেলের রাজস্ব অবমুক্ত করতে হবে। তবে এসব বিষয়ে ওয়াশিংটন এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

এর পাশাপাশি, লেবাননে ইরানের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সাথে ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এই শান্তি প্রক্রিয়ার অন্যতম বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত রোববার এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই আরও জোরদার করতে তিনি ইসরায়েলি সেনাদের লেবাননের আরও গভীরে প্রবেশের নির্দেশ দিয়েছেন।

এই আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইতোমধ্যে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে জরুরি কূটনৈতিক বৈঠক করেছেন। একটি মার্কিন সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সংঘাত ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে একটি ‘ধাপভিত্তিক উত্তেজনা হ্রাস’ পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর এই নতুন করে পালটাপালটি হামলা এবং লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত— এই দুই ফ্রন্টের কূটনৈতিক আলোচনাকেই দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতার ঝুঁকিতে ফেলছে। চুক্তির শর্ত নিয়ে টেবিলে দরকষাকষির পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই সামরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শনের নীতি মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়াকে আরও বেশি ধোঁয়াশাপূর্ণ করে তুলল।

রাজনীতি/আইআর

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

শর্ত-প্রতিশর্তে আলোচনায় দীর্ঘসূত্রতা— কোন পথে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা?

এখন প্রশ্ন একটাই— পারস্পরিক অবিশ্বাস ও শর্তের দেয়াল ভেঙে দুই দেশ কি সত্যিই একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে, নাকি সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর ফের নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে মধ্যপ্রাচ্যে?

১ দিন আগে

ইরাক-ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপকে ‘বোকামি’ বলে স্বীকার করলেন ট্রাম্প

তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ না থাকলে ইরান ইতোমধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে ফেলতো। তার ভাষায়, “আমরা যদি নয় মাস আগে বি-২ বোমারু বিমান দিয়ে তাদের ওপর হামলা না করতাম, তাহলে তারা এখনই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতো এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো।”

১ দিন আগে

ভারতে উচ্চ মাধ্যমিকের ফল নিয়ে বিতর্ক, ১১ লাখ উত্তরপত্র দেখতে চেয়ে আবেদন

গত ১৩ মে ফল প্রকাশের পর থেকে ৪ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী মোট ১১ লাখ উত্তরপত্র দেখতে চেয়ে শিক্ষা বোর্ডের কাছে আবেদন করেছে, যা দেশটির ইতিহাসে নজিরবিহীন। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষায় এ বছর প্রায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল।

১ দিন আগে

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নতুন বিধিনিষেধ ইরানের

হরমুজ প্রণালি এলাকায় অবস্থানরত বিদেশি সামরিক বাহিনীগুলোকেও সতর্ক করেছে তেহরান। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সামুদ্রিক চলাচল বা প্রণালির ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা হলে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।

১ দিন আগে