নেতানিয়াহুকে হটাতে বিরোধী শিবিরের সঙ্গে ঐক্যের ইঙ্গিত আরব জোটের

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে দেশটির বিরোধী জোট ‘চেঞ্জ ব্লক’-এর সঙ্গে ঐক্যের ইঙ্গিত দিয়েছেন আরব ইসরায়েলি নেতা আহমাদ তিবি। তিনি ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের সদস্য এবং আরব দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট লিস্ট পার্লামেন্টারি ব্লকের প্রধান।
তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট মনিটর এ তথ্য জানিয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুকে নির্বাচনে পরাজিত করে নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘চেঞ্জ ব্লক’। এতে রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি, ইয়ার লাপিদের ইয়েশ আতিদ, ইয়ার গোলানের ডেমোক্র্যাটস, নাফতালি বেনেটের বেয়াখাদ এবং আভিগদোর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতিনু।
আনাদোলুর হাতে আসা এক লিখিত বিবৃতিতে আহমাদ তিবি বলেন, “আরব নাগরিকদের বিপুল অংশগ্রহণ জয়েন্ট লিস্টের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন। জনসাধারণের ঐক্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে জয়েন্ট লিস্ট প্রমাণ করেছে, তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তাদের ছাড়া কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, “নেতানিয়াহু ও বেন-গভির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আমরা ‘চেঞ্জ ব্লক’-এর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি। এই প্রক্রিয়া শুরু হবে নেসেটের স্পিকার আমির ওহানাকে সরানোর মধ্য দিয়ে।”
তিবির কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বুধবার ভোরে ইসরায়েলের তাইব শহরে এক সমাবেশে জয়েন্ট লিস্টের সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি। তিবির দাবি, ভোটকেন্দ্রে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া এবং ভোটদানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের কণ্ঠস্বরই ছিল ‘সবচেয়ে জোরালো’।
বেন-গভিরকে উদ্দেশ করে তিবি বলেন, “উগ্র ইহুদিবাদী ও সন্ত্রাসী বেন-গভির আর পুলিশমন্ত্রী থাকবেন না। তার সময় শেষ হয়ে এসেছে।”
সরকার গঠনে পিছিয়ে নেতানিয়াহুর জোট
ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনার পর নেতানিয়াহুর জোট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে ৫৩টি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের চেয়ে আটটি কম আসন পাচ্ছে এ জোট।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্যের বরাতে টাইমস অব ইসরায়েলের খবরে বলা হয়েছে, গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেতে পারে ৪৮টি আসন। অন্যদিকে, প্রধানত আরবদের নিয়ে গঠিত দলগুলো পেতে পারে ১৯টি আসন।
আরব দলগুলোর মধ্যে জয়েন্ট লিস্ট ১২টি এবং ইউনাইটেড আরব লিস্ট (রা’আম) সাতটি আসন পেতে পারে। আগামী ৪ নভেম্বর ভোটের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করা হবে।
ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের ভোট কেন গুরুত্বপূর্ণ
নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের বেশির ভাগই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যেও তারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যাননি। তাদের বংশধরেরাই এখন দেশটির আরব জনগোষ্ঠীর বড় অংশ।
বর্তমানে এই জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ ইহুদি ইসরায়েলিদের থেকে আলাদা শহরে বসবাস করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা সহিংসতা ও আবাসনসংক্রান্ত বৈষম্যের শিকার হন।
ইসরায়েলের ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আরব নাগরিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এসব কারণে কয়েক দশক ধরে অনেক আরব ভোটার নির্বাচনে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।
এবারের নির্বাচনের আগে পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি নেতানিয়াহু সরকারের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেক আরব ভোটার। ইসরায়েলের ভেতরেও ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখা হয় বলে মনে করেন তারা। এ জন্য সরকারের বিভিন্ন নীতিকে দায়ী করেন অনেকে।
নির্বাচনি প্রচারে নেতানিয়াহু আরববিদ্বেষী মনোভাব কাজে লাগিয়ে ভোট চেয়েছেন। তবে দীর্ঘদিন ভোটদানে অনাগ্রহী থাকা আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে এবার ব্যাপক সাড়া দেখা গেছে। মঙ্গলবারের নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক আরব ভোটারের অংশগ্রহণ আরব দলগুলোর সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকট কে
ইসরায়েলের এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিরোধী জোটের অন্যতম প্রধান নেতা সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। তার দলের নাম ইয়াশার পার্টি।
আইজেনকট মিজরাহি-মরোক্কান বংশোদ্ভূত। ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ইহুদি এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা ইহুদিদের মধ্যে বৈষম্যের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে মিজরাহি ভোটারদের অনেকেই নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে সমর্থন দিয়ে আসছেন।
মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী পরিবারের সন্তান ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকট নেতানিয়াহুর শাসনামলেই ইসরায়েলের সেনাপ্রধান হয়েছিলেন। তার বেড়ে ওঠা তিবেরিয়াস ও ইলাত অঞ্চলে, যা ইসরায়েলের রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্রের বাইরে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু জেরুজালেমের অভিজাত পরিবেশ ও ক্ষমতাবানদের বলয়ে বেড়ে উঠেছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন আইজেনকট। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সুস্পষ্ট কৌশল না থাকার কথা উল্লেখ করে ২০২৪ সালের জুনে তিনি ওই মন্ত্রিসভা ছাড়েন।
গাজা যুদ্ধ আইজেনকটের পরিবারেও গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। যুদ্ধ শুরুর দুই মাস পর, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় লড়াইয়ের সময় তার ২৫ বছর বয়সী ছোট ছেলে গাল নিহত হন। যুদ্ধে তার দুই ভাতিজাও প্রাণ হারান।
ছেলে ও স্বজনদের হারানোর অভিজ্ঞতা আইজেনকটের সক্রিয় রাজনীতিতে আসার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ইদিয়োথ আহরোনথ পত্রিকায় আইজেনকট লেখেন, “গালের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শপথ করেছিলাম, সে ও তার বন্ধুরা যে মূল্য দিয়েছে, তা বৃথা যেতে দেবো না।”



-408fb5.jpg)












-3d5440-256x144.webp)
-96f609-256x144.webp)

