ভোটে অচলাবস্থা, নেতৃত্ব নিয়ে পালটাপালটি দাবি নেতানিয়াহু ও আইনকোটের

ইসরায়েলের নির্বাচনে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশটির নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইনকোট। নেতানিয়াহু ডানপন্থি জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে আইনকোটের দাবি, ভোটাররা নেতানিয়াহুকে আর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান না। তবে বুথফেরত জরিপে দুই পক্ষের আসনসংখ্যা কাছাকাছি থাকায় কোনো জোটই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জাতীয়তাবাদী-ধর্মীয় জোট প্রত্যাশিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে থাকতে পারে। তবে এই অচলাবস্থার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে সরকার গঠনের আলোচনা চলতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
এদিকে ইসরায়েলের কান ১১ ও চ্যানেল ১৩-এর বুথফেরত জরিপে দুই জোটের আসনসংখ্যা ৫১টি করে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে চ্যানেল ১২-এর জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ৫২টি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ ৪৯টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দেশটির ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন।

তবে নির্বাচনে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। নেতানিয়াহু ও আইনকোট— কেউই নিজেদের বিজয়ীও ঘোষণা করেননি। তবে ভোট গণনা চলার মধ্যেই দুই পক্ষ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম নির্বাচন। ওই হামলার পর গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে একাধিক যুদ্ধ ও সংঘাত শুরু হয়।
ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি ধর্মীয় দল দুটি নেতানিয়াহুর জোটে মোট ১৩টি আসন পেতে পারে বলে বুথফেরত জরিপে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের আসনসংখ্যায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

প্রধান দুই জোটের বাইরে থাকা আরব দলগুলো সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ইয়াশার পার্টির নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান আইনকোট এসব দলের সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা প্রায় নাকচ করে দিয়েছেন। এতে তার সরকার গঠনের পথ জটিল হয়ে পড়েছে।
নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক লড়াই তীব্র
বুধবার স্থানীয় সময় রাত ৩টার পর জেরুজালেমে লিকুদ পার্টির নির্বাচনি কার্যালয়ে দলীয় সমর্থকদের সামনে বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। তিনি ‘শক্তিশালী ডানপন্থি জাতীয় সরকার’ গঠনের আহ্বান জানান।
বক্তব্যে ইসরায়েলের সামরিক সাফল্য তুলে ধরার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেন তিনি।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইরানের অস্তিত্বগত হুমকি চিরতরে দূর করতে আমাদের অংশীদার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইসরায়েলের সামনে এক অনন্য ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। তবে অন্য কোনো স্বার্থ যেন আমাদের এই পবিত্র লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।’
অন্যদিকে আইনকোট বলেন, জনগণ নেতানিয়াহুকে আর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চান না। তিনি নেতানিয়াহুকে রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্বার্থে দেশের নিরাপত্তাকে ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক করেন।
আইনকোট আরও বলেন, ‘নেতানিয়াহু এখন একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী। তার কোনো ম্যান্ডেট নেই, জনগণের আস্থাও নেই।’ রাজনৈতিক স্বার্থকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার ওপরে স্থান দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি। ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটের হার প্রায় ৭ শতাংশ বেশি।
বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার চূড়ান্ত ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। ইসরায়েলের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তির কারণে সরকার গঠনের আলোচনায় ছোট দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অতীতের নির্বাচনগুলোর পর এমন আলোচনা কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত চলেছে। কোনো পক্ষ সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে ভোটারদের উচ্চ উপস্থিতির পর আবার নির্বাচন আয়োজনের বিরোধিতা করেছেন আইনকোট।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ইয়োহানান প্লেসনার বুথফেরত জরিপের ফলকে নেতানিয়াহুর জোটের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তার মতে, আইনকোটও এখন পর্যন্ত স্পষ্ট বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হননি। ভোট গণনা শেষ হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।
নির্বাচনের অনিশ্চিত ফলের প্রভাবে ইসরায়েলের মুদ্রা শেকেলের দর কিছুটা কমেছে।
নেতানিয়াহুর জোটে আসন কমার ইঙ্গিত
বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাস সত্যি হলে একসময় ৬৮টি আসন পাওয়া নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট এবার সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন থেকে অনেক পিছিয়ে থাকবে। ফলে নতুন সরকার গঠনে তাকে ছোট দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করতে হতে পারে।
৬৬ বছর বয়সী আইনকোট গাজা যুদ্ধে নিজের এক ছেলে ও দুই ভাতিজাকে হারিয়েছেন। সামরিক অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মধ্যপন্থি অবস্থান নিয়ে তিনি নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
চার বছর আগে রাজনীতিতে আসেন আইনকোট। ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন তিনি। তবে আট মাস পর প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের সমালোচনা করে পদত্যাগ করেন।
নেতানিয়াহু ও তার কট্টর ডানপন্থি মিত্রদের তুলনায় আইনকোটের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন হলেও নিরাপত্তানীতিতে তার দৃষ্টিভঙ্গি কঠোর। ২০২৩ সালের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতিতে আরও কঠোর অবস্থান জোরালো হয়েছে। আইনকোট ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী। তার মতে, হামাসের সামরিক শাখাকে ধ্বংস করতে হবে অথবা ভেঙে দিতে হবে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আইনকোটের মতে, হামাস এখনো গাজার নিয়ন্ত্রণে থাকায় ইসরায়েলের যুদ্ধ ব্যর্থ হয়েছে।
এদিকে বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর কয়েকটি আরব দলের জোট জয়েন্ট লিস্টের সদর দপ্তরে উল্লাস ও করতালি দেখা যায়। ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে উচ্চ ভোটার উপস্থিতির কারণে জোটটির সমর্থকদের মধ্যে এ উচ্ছ্বাস তৈরি হয়।
নাজারেথে জোটটির সদর দপ্তরে দেওয়া বক্তব্যে জয়েন্ট লিস্টের প্রার্থী ফাতেন গাত্তাস বলেন, ‘আমরা দখলদারত্ব ও বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করি। আমরা এখানেই থাকব।’
নেতানিয়াহুর জোটকে আবারও ক্ষমতায় ফেরা থেকে ঠেকাতে আরব দলগুলোর প্রার্থীরা উচ্চ ভোটার উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাদের আশা, আরব ভোটারদের অংশগ্রহণ সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলবে।
যুদ্ধের মূল্যায়নেই ভোটারদের রায়
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং এরপর গাজা, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ও ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করেছে। ওই হামলায় হামাস ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়। ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রাণহানির দিক থেকে দিনটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।
দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য সমালোচনার মুখে পড়েছেন নেতানিয়াহু। তবে তার দাবি, হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে তিনি ইসরায়েল ও বিশ্বকে আরও নিরাপদ করেছেন।
নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোটের নীতি ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বিভাজন বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটিকে আরও বিচ্ছিন্ন করেছে। তবে নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েলের শত্রুদের মোকাবিলা করতে সক্ষম নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
গত ৩০ বছরের মধ্যে প্রায় ১৯ বছর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন নেতানিয়াহু। রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও একাধিকবার ক্ষমতায় টিকে গেছেন তিনি। ২০০৯ সালের পর বিরোধীরা মাত্র একবার তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরাতে পেরেছিল। দুই বছরের মধ্যে চারটি অনির্ণায়ক নির্বাচনের পর তিনি ক্ষমতা হারান। তবে ১৮ মাসের মধ্যেই আবার প্রধানমন্ত্রীর পদে ফিরে আসেন।
এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অভিযোগের মুখেও ছিলেন নেতানিয়াহু। এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। এ ছাড়া গোয়েন্দা ব্যর্থতার কারণে হামাসের নেতৃত্বাধীন যোদ্ধারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা চালাতে পেরেছিল— এমন অভিযোগেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।





-e7700f.jpg)
-408fb5.jpg)














