রিয়াদ বিমানবন্দরে ফের হামলা, হুতিদের হুঁশিয়ারি অব্যাহত

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৪ লক্ষ্য করে একটি অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু আঘাত হানলে সেখানে আগুন ধরে যায়। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, একই সময়ে বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকায় সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ হামলা ঘটে। হামলায় বিমানবন্দরে আগুন লাগলেও হতাহতের কোনো তথ্য নেই। এর আগে শনিবার একই বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী শনিবারের হামলায় দায় স্বীকার করলেও রোববারের নতুন হামলার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কেউ দায় স্বীকার করেনি।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার না করতে উড়োজাহাজ সংস্থা, কর্মী ও যাত্রীদের সতর্ক থাকার বার্তাও অব্যাহত রেখেছে। সৌদি আরব ইয়েমেনে সামরিক অভিযান বন্ধ না করলে আরও বড় পালটা পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক সপ্তাহের মধ্যে রিয়াদ বিমানবন্দরে এটি তৃতীয় হামলা। আগের প্রথম হামলায় চারজন নিহত হয়েছিলেন। শনিবারের হামলায় নিহত হয়েছেন ১২ জন, যাদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। আহত ৩০৯ জনের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম শনিবারের হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এর বাইরেও চারজন গুরুতর আহত অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যয় সরকার বহন করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সৌদি-হুতি সংঘাতের নতুন বিস্তার
রিয়াদ বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার পেছনে রয়েছে ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা সংঘাত। সৌদি আরব কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। অন্যদিকে দেশটির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণে থাকা হুতিরা ইরানের সমর্থন পেয়ে আসছে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার পর থেকে দুপক্ষের সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তার অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও গত জুলাইয়ে সেই স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়ে। হুতিদের অভিযোগ, ইরান থেকে আসা একটি উড়োজাহাজ সানার বিমানবন্দরে অবতরণের চেষ্টা করার সময় সৌদি বাহিনী সেখানে হামলা চালায়। এরপর দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অবরোধ ও সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে হুতিরা।
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত এলাকাগুলো দখলে নেয় হুতিরা। এর পর সৌদি আরব বিমান হামলা বাড়িয়েছে এবং ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর পালটা অভিযানকে সমর্থন দিচ্ছে। হুতিদের অবস্থান দুর্বল করার এই প্রচেষ্টার জবাবে তারা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে।
রোববার হুতিদের পরিচালিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযান ও হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। হুতিদের পরিচালিত আল-মাসিরা টেলিভিশনে প্রচারিত বিবৃতিতে বলা হয়, সৌদি আরব হামলা অব্যাহত রাখলে আরও খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
হুতিদের নতুন সতর্কবার্তায় মক্কা ও মদিনার বিমানবন্দরকে হামলার আওতামুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে সৌদি আরবের অন্য বিমানবন্দর ও আকাশসীমাকে তারা সামরিক অভিযানের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে। এর ফলে শুধু বিমান চলাচল নয়, দেশটির বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
যুদ্ধে যোগ দেবে যুক্তরাষ্ট্র?
রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর সৌদি আরবের পাশে সরাসরি সামরিকভাবে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দিতে পারে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিলে ইয়েমেন সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হুতিরা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কাজ করছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন মার্কিন অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তায়।
ইয়েমেনের দক্ষিণে বাব এল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুয়েজ খালমুখী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বাড়লে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান সংকটের মধ্যে বাব এল-মান্দেবেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। তেল পরিবহনে বিলম্ব, জাহাজের বিমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করার কারণে পরিবহন খরচ বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামেও পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে রিয়াদকে পিছু হটতে বাধ্য করার হুতিদের কৌশল উলটো ফল দিতে পারে। তার মতে, এ ধরনের হামলা সৌদি আরবকে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে উৎসাহিত করতে পারে।
নিরাপত্তা সংকটের মধ্যেও চলছে জ্বালানি সম্মেলন
টানা হামলায় রিয়াদের বিমানবন্দর বন্ধ থাকলেও সৌদি কর্তৃপক্ষ রাজধানীতে পূর্বনির্ধারিত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাঁচ দিনব্যাপী ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কাউন্সিলের (ডব্লিউপিসি) জ্বালানি কংগ্রেসে ৭০টির বেশি দেশের মন্ত্রী, ৩০০টি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ও ২৫টির বেশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের একটি সম্মেলনকেন্দ্রে অনুষ্ঠানটি হচ্ছে। তবে অংশগ্রহণকারীদের সবাই সরাসরি উপস্থিত থাকবেন, নাকি কেউ কেউ ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি ফোরামের একটি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সৌদি কর্তৃপক্ষ রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সশরীর ক্লাস বন্ধ রেখে অনলাইনে পাঠদানের নির্দেশ দিয়েছে।
ধারাবাহিক হামলার কারণে সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল, জননিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দেশটির অর্থনীতি ও পর্যটন খাতকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য আরও উন্মুক্ত করার পরিকল্পনার মধ্যেই বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
রিয়াদে হামলা অব্যাহত থাকলে সৌদি আরবের সামরিক প্রতিক্রিয়া আরও জোরালো হতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে যোগ দিলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের পাশাপাশি হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব— দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তাও বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ হয়ে উঠতে পারে।





















