
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

দক্ষিণ ইরানের ছোট শহর কুহেস্তাকে বিয়ের অনুষ্ঠানে ভয়াবহ বিস্ফোরণে চারজন নিহত ও অন্তত ৬৮ জন আহত হওয়ার ঘটনায় মার্কিন বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তিনজন সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ বলেছেন, বিস্ফোরণটি অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে ছিটকে আসা গোলার কারণে নয়, বরং বিয়ের অনুষ্ঠান চলা বাড়িটির ছাদে সরাসরি কোনো মার্কিন অস্ত্র আঘাত হেনেছিল বলেই ক্ষয়ক্ষতির ধরন থেকে মনে হচ্ছে।
রয়টার্সের যাচাই করা ছবি ও ভিডিও পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞরা এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র তদন্ত করে দেখবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ঘটনাটি এমন একসময়ে সামনে এলো, যখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় মাসের যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ১৭৫ জনের বেশি শিশু ও শিক্ষক নিহত হওয়ার ঘটনা ছিল এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা।
গত ১ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে হরমুজগান প্রদেশের সিরিক কাউন্টির কুহেস্তাকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই সময় একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। সেখানে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক ডজন মানুষ।
হঠাৎ বিস্ফোরণে বাড়িটি ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রক্তাক্ত জুতা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিয়ের সাজসজ্জা এবং মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ঘটনার কয়েক মুহূর্ত পর স্থানীয় এক বাসিন্দা রয়টার্সকে পাঠানো ভয়েস মেসেজে বলেন, ‘কুহেস্তাক ধ্বংস হয়ে গেছে। চার, পাঁচ, দশটি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। অনেক মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছে। ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন।’ স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি।
বিস্ফোরণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটির খবর ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে হামলার বিষয়ে কথা না বলতে প্রত্যক্ষদর্শীদের ওপর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ চাপ দিয়েছিল। রয়টার্সও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কথা বলেছে।
ঘটনার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বলা হয়েছে— বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল থেকে মাত্র প্রায় ১৩৫ মিটার দূরে একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ছিল। দুই মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ১ সেপ্টেম্বর কুহেস্তাক এলাকায় মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছিল এবং তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল ওই টেলিযোগাযোগ টাওয়ার।
ইরানের সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে টাওয়ারটি হামলার শিকার হয়। ইরানের হরমুজগান প্রদেশের টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না; আশপাশের সিরিক কাউন্টির বাসিন্দাদের মোবাইল, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত একটি বেসামরিক স্থাপনা ছিল।
মার্কিন কর্মকর্তাদের একজন বলেছেন, বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের কারণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন হামলায় হতাহতের সম্ভাবনা, কোনো ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ছিটকে এসে আঘাত করা অথবা কোনো ইন্টারসেপ্টর ভুল পথে গিয়ে বাড়িটিতে আঘাত করা।
তবে অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ সেই সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে প্রথমটিকেই বেশি জোরালো করে তুলেছে।

রয়টার্স ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও চারজন সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়েছে। তাদের তিনজন বলেছেন, ক্ষয়ক্ষতির ধরন কোনো অস্ত্রের সরাসরি আঘাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাবেক মার্কিন সেনা ও বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ বিশেষজ্ঞ এবং আর্মামেন্ট রিসার্চ সার্ভিসেসের অস্ত্রবিষয়ক বিশ্লেষক ট্রেভর বল বলেন, দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি দেখে মনে হচ্ছে কোনো অস্ত্র ছাদে আঘাত করে বিস্ফোরিত হয়েছে অথবা ছাদের ঠিক ওপরেই বিস্ফোরণ ঘটেছে। এটি একটি সরাসরি আঘাত বলে মনে হচ্ছে।
বল আরও বলেন, কাছাকাছি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে চালানো হামলা থেকে ছিটকে আসা ধাতব টুকরা বা বিস্ফোরণের খণ্ডাংশ দিয়ে বাড়িটিতে দেখা ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার গ্যারেথ কোলেটও একই মত দিয়েছেন। বিস্ফোরক প্রকৌশলে ডক্টরেটধারী এই বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রমাণের ভার ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে একটি মার্কিন ৫০০ পাউন্ড ওজনের আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমার দিকেই বেশি ঝুঁকছে। তার মতে, উন্নত নির্দেশনাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় কখনো কখনো অস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে পারে।
নরওয়ের পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোর গবেষণা অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান শুটও ছবি ও ভিডিও পরীক্ষা করেছেন। তিনিও বলেছেন, বাড়িটির ছাদে যে গর্ত তৈরি হয়েছে, তা টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে আঘাত করা কোনো অস্ত্র ছিটকে এসে আঘাত করার ফল বলে মনে হয় না।
শুটের মতে, আঘাতের কোণও ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোলেটও বলেন, বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড বিস্ফোরিত হলে যে ধরনের খণ্ডাংশ বা ফ্র্যাগমেন্টেশন থাকার কথা, ঘটনাস্থলের দৃশ্যমান আলামতে তার প্রমাণ নেই।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বিভিন্ন অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের ছবি দেখানো হয়েছে। বল এসবের মধ্যে কিছু ধাতব অংশকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত জয়েন্ট স্ট্যান্ডঅফ উইপন হিসেবে শনাক্ত করেছেন, যেগুলো মূলত এক ধরনের গ্লাইড বোমার অংশ।
তবে এসব ধ্বংসাবশেষ যে কুহেস্তাকে বিয়ের বাড়িতে হামলার সঙ্গেই সম্পর্কিত, তা রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এদিকে বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ঘটনাটি তদন্ত করছে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা এটি তদন্ত করছি, কারণ অবশ্যই আমরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা জানতে চাই কী ঘটেছে।’
মার্কিন সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, তারা হামলা ও হতাহতের খবর সম্পর্কে অবগত এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ইরানের জাতিসংঘ মিশন অবশ্য রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বালুচেস্তান হিউম্যান রাইটস ডকুমেন্টেশন নেটওয়ার্ক ও হালভাশের হিসাবে হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৬৮ জন। নিহত তিনজন ছিলেন বিয়ের অনুষ্ঠানের অতিথি— ৪৩ বছর বয়সী কোলসুম মোল্লাহী নাজহানদানিয়া, ৫০ বছর বয়সী জারখাতুন তাহেরি ও মাত্র চার বছর বয়সী আমির মোহাম্মদ কারিমি।
নিহত আরেকজন ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ মল্লাহী। তিনি বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিলেন না, টেলিযোগাযোগ টাওয়ারের কাছে মোটরসাইকেল চালানোর সময় নিহত হন। ইরানের সংবাদমাধ্যমেও নিহতদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে।

কুহেস্তাকের ঘটনা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শুরুতে মিনাবের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাকে আবারও সামনে এনেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান যুদ্ধ শুরু করার কয়েক ঘণ্টা পর মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস হয়। ইরানি কর্মকর্তাদের হিসাবে সেখানে ১৭৫ জনের বেশি শিশু ও শিক্ষক নিহত হন।
ওই হামলা ছিল কয়েক দশকের মধ্যে মার্কিন বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা। তবে পেন্টাগন এখনো সেই হামলার তদন্তের ফল প্রকাশ করেনি।
রয়টার্স ৫ মার্চ প্রথম জানিয়েছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে যুদ্ধের প্রথম দিন মিনাবের স্কুলে হামলার জন্য মার্কিন বাহিনীই সম্ভবত দায়ী বলে উঠে এসেছিল।
কুহেস্তাকের হামলা সেই প্রশ্নকে আবারও সামনে এনেছে— ইরানের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে পরিচালিত মার্কিন অভিযানে বেসামরিক মানুষের ঝুঁকি কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে?
কুহেস্তাকের টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলাটিকে আলাদা কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। ছয় মাসের যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের রাডার ও যোগাযোগ অবকাঠামোতে বারবার হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এর উদ্দেশ্য হলো কৌশলগত এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর ইরানের সামরিক হুমকি ঠেকানো।
হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত করার সক্ষমতা ইরান ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রশাসনের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে।
বৃহস্পতিবার কুহেস্তাকে নিহতদের জানাজা ও দাফন উপলক্ষে শোকের মিছিল বের হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ সেই মিছিলে অংশ নেন। কেউ কফিন বহন করছিলেন, কেউ হাতে নিহতদের ছবি ও পোস্টার ধরে ছিলেন।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হয় চার বছরের আমির মোহাম্মদ কারিমির ছোট কফিন ঘিরে। দক্ষিণ ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী উজ্জ্বল লাল মুখোশের সঙ্গে কালো পুরো শরীর ঢাকা পোশাক পরা নারীরা তার কফিনের ওপর ফুল ছুড়ে দেন। এক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায়, ‘সিরিকের পরিস্থিতি খুবই দুঃখজনক ও শোকাবহ। মানুষ এখনো হতবাক।’
কুহেস্তাকের ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকা বিয়ের সাজসজ্জা, রক্তাক্ত জুতা আর চার বছরের শিশুর ছোট কফিন— ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কৌশলগত লক্ষ্য ও সামরিক হিসাবের আড়ালে বেসামরিক মানুষের যে ভয়াবহ মূল্য দিতে হচ্ছে, তারই এক মর্মান্তিক ছবি হয়ে উঠেছে।

দক্ষিণ ইরানের ছোট শহর কুহেস্তাকে বিয়ের অনুষ্ঠানে ভয়াবহ বিস্ফোরণে চারজন নিহত ও অন্তত ৬৮ জন আহত হওয়ার ঘটনায় মার্কিন বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তিনজন সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ বলেছেন, বিস্ফোরণটি অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে ছিটকে আসা গোলার কারণে নয়, বরং বিয়ের অনুষ্ঠান চলা বাড়িটির ছাদে সরাসরি কোনো মার্কিন অস্ত্র আঘাত হেনেছিল বলেই ক্ষয়ক্ষতির ধরন থেকে মনে হচ্ছে।
রয়টার্সের যাচাই করা ছবি ও ভিডিও পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞরা এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র তদন্ত করে দেখবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ঘটনাটি এমন একসময়ে সামনে এলো, যখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় মাসের যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ১৭৫ জনের বেশি শিশু ও শিক্ষক নিহত হওয়ার ঘটনা ছিল এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা।
গত ১ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে হরমুজগান প্রদেশের সিরিক কাউন্টির কুহেস্তাকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই সময় একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। সেখানে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক ডজন মানুষ।
হঠাৎ বিস্ফোরণে বাড়িটি ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রক্তাক্ত জুতা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিয়ের সাজসজ্জা এবং মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ঘটনার কয়েক মুহূর্ত পর স্থানীয় এক বাসিন্দা রয়টার্সকে পাঠানো ভয়েস মেসেজে বলেন, ‘কুহেস্তাক ধ্বংস হয়ে গেছে। চার, পাঁচ, দশটি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। অনেক মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছে। ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন।’ স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি।
বিস্ফোরণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটির খবর ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে হামলার বিষয়ে কথা না বলতে প্রত্যক্ষদর্শীদের ওপর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ চাপ দিয়েছিল। রয়টার্সও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কথা বলেছে।
ঘটনার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বলা হয়েছে— বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল থেকে মাত্র প্রায় ১৩৫ মিটার দূরে একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ছিল। দুই মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ১ সেপ্টেম্বর কুহেস্তাক এলাকায় মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছিল এবং তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল ওই টেলিযোগাযোগ টাওয়ার।
ইরানের সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে টাওয়ারটি হামলার শিকার হয়। ইরানের হরমুজগান প্রদেশের টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না; আশপাশের সিরিক কাউন্টির বাসিন্দাদের মোবাইল, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত একটি বেসামরিক স্থাপনা ছিল।
মার্কিন কর্মকর্তাদের একজন বলেছেন, বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের কারণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন হামলায় হতাহতের সম্ভাবনা, কোনো ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ছিটকে এসে আঘাত করা অথবা কোনো ইন্টারসেপ্টর ভুল পথে গিয়ে বাড়িটিতে আঘাত করা।
তবে অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ সেই সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে প্রথমটিকেই বেশি জোরালো করে তুলেছে।

রয়টার্স ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও চারজন সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়েছে। তাদের তিনজন বলেছেন, ক্ষয়ক্ষতির ধরন কোনো অস্ত্রের সরাসরি আঘাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাবেক মার্কিন সেনা ও বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ বিশেষজ্ঞ এবং আর্মামেন্ট রিসার্চ সার্ভিসেসের অস্ত্রবিষয়ক বিশ্লেষক ট্রেভর বল বলেন, দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি দেখে মনে হচ্ছে কোনো অস্ত্র ছাদে আঘাত করে বিস্ফোরিত হয়েছে অথবা ছাদের ঠিক ওপরেই বিস্ফোরণ ঘটেছে। এটি একটি সরাসরি আঘাত বলে মনে হচ্ছে।
বল আরও বলেন, কাছাকাছি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে চালানো হামলা থেকে ছিটকে আসা ধাতব টুকরা বা বিস্ফোরণের খণ্ডাংশ দিয়ে বাড়িটিতে দেখা ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার গ্যারেথ কোলেটও একই মত দিয়েছেন। বিস্ফোরক প্রকৌশলে ডক্টরেটধারী এই বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রমাণের ভার ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে একটি মার্কিন ৫০০ পাউন্ড ওজনের আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমার দিকেই বেশি ঝুঁকছে। তার মতে, উন্নত নির্দেশনাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় কখনো কখনো অস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে পারে।
নরওয়ের পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোর গবেষণা অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান শুটও ছবি ও ভিডিও পরীক্ষা করেছেন। তিনিও বলেছেন, বাড়িটির ছাদে যে গর্ত তৈরি হয়েছে, তা টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে আঘাত করা কোনো অস্ত্র ছিটকে এসে আঘাত করার ফল বলে মনে হয় না।
শুটের মতে, আঘাতের কোণও ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোলেটও বলেন, বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড বিস্ফোরিত হলে যে ধরনের খণ্ডাংশ বা ফ্র্যাগমেন্টেশন থাকার কথা, ঘটনাস্থলের দৃশ্যমান আলামতে তার প্রমাণ নেই।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বিভিন্ন অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের ছবি দেখানো হয়েছে। বল এসবের মধ্যে কিছু ধাতব অংশকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত জয়েন্ট স্ট্যান্ডঅফ উইপন হিসেবে শনাক্ত করেছেন, যেগুলো মূলত এক ধরনের গ্লাইড বোমার অংশ।
তবে এসব ধ্বংসাবশেষ যে কুহেস্তাকে বিয়ের বাড়িতে হামলার সঙ্গেই সম্পর্কিত, তা রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এদিকে বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ঘটনাটি তদন্ত করছে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা এটি তদন্ত করছি, কারণ অবশ্যই আমরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা জানতে চাই কী ঘটেছে।’
মার্কিন সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, তারা হামলা ও হতাহতের খবর সম্পর্কে অবগত এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ইরানের জাতিসংঘ মিশন অবশ্য রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বালুচেস্তান হিউম্যান রাইটস ডকুমেন্টেশন নেটওয়ার্ক ও হালভাশের হিসাবে হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৬৮ জন। নিহত তিনজন ছিলেন বিয়ের অনুষ্ঠানের অতিথি— ৪৩ বছর বয়সী কোলসুম মোল্লাহী নাজহানদানিয়া, ৫০ বছর বয়সী জারখাতুন তাহেরি ও মাত্র চার বছর বয়সী আমির মোহাম্মদ কারিমি।
নিহত আরেকজন ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ মল্লাহী। তিনি বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিলেন না, টেলিযোগাযোগ টাওয়ারের কাছে মোটরসাইকেল চালানোর সময় নিহত হন। ইরানের সংবাদমাধ্যমেও নিহতদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে।

কুহেস্তাকের ঘটনা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শুরুতে মিনাবের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাকে আবারও সামনে এনেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান যুদ্ধ শুরু করার কয়েক ঘণ্টা পর মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস হয়। ইরানি কর্মকর্তাদের হিসাবে সেখানে ১৭৫ জনের বেশি শিশু ও শিক্ষক নিহত হন।
ওই হামলা ছিল কয়েক দশকের মধ্যে মার্কিন বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা। তবে পেন্টাগন এখনো সেই হামলার তদন্তের ফল প্রকাশ করেনি।
রয়টার্স ৫ মার্চ প্রথম জানিয়েছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে যুদ্ধের প্রথম দিন মিনাবের স্কুলে হামলার জন্য মার্কিন বাহিনীই সম্ভবত দায়ী বলে উঠে এসেছিল।
কুহেস্তাকের হামলা সেই প্রশ্নকে আবারও সামনে এনেছে— ইরানের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে পরিচালিত মার্কিন অভিযানে বেসামরিক মানুষের ঝুঁকি কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে?
কুহেস্তাকের টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলাটিকে আলাদা কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। ছয় মাসের যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের রাডার ও যোগাযোগ অবকাঠামোতে বারবার হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এর উদ্দেশ্য হলো কৌশলগত এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর ইরানের সামরিক হুমকি ঠেকানো।
হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত করার সক্ষমতা ইরান ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রশাসনের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে।
বৃহস্পতিবার কুহেস্তাকে নিহতদের জানাজা ও দাফন উপলক্ষে শোকের মিছিল বের হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ সেই মিছিলে অংশ নেন। কেউ কফিন বহন করছিলেন, কেউ হাতে নিহতদের ছবি ও পোস্টার ধরে ছিলেন।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হয় চার বছরের আমির মোহাম্মদ কারিমির ছোট কফিন ঘিরে। দক্ষিণ ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী উজ্জ্বল লাল মুখোশের সঙ্গে কালো পুরো শরীর ঢাকা পোশাক পরা নারীরা তার কফিনের ওপর ফুল ছুড়ে দেন। এক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায়, ‘সিরিকের পরিস্থিতি খুবই দুঃখজনক ও শোকাবহ। মানুষ এখনো হতবাক।’
কুহেস্তাকের ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকা বিয়ের সাজসজ্জা, রক্তাক্ত জুতা আর চার বছরের শিশুর ছোট কফিন— ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কৌশলগত লক্ষ্য ও সামরিক হিসাবের আড়ালে বেসামরিক মানুষের যে ভয়াবহ মূল্য দিতে হচ্ছে, তারই এক মর্মান্তিক ছবি হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার ৩১টি দেশের নাগরিকদের জন্য মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা সুবিধা সীমিত করেছে মালয়েশিয়া। নতুন নিয়মে এসব দেশের সাধারণ পর্যটকদের জন্য এক বছরের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসার পরিবর্তে মূলত সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা প্রযোজ্য হবে।
৬ ঘণ্টা আগে
স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত ছবিতে দেখা যায়, প্রথম উদ্ধার হওয়া সঞ্জয় সাহ কাদামাটিতে পুরোপুরি ঢেকে আছেন। একজন উদ্ধারকারী তাকে কাঁধে করে টানেল থেকে বের করে আনছেন। পরে তাকে ত্রিশূলীতে নেপাল সেনাবাহিনীর ব্যারাকে নেওয়া হয়। এরপর দ্বিতীয় শ্রমিক কবির মহার্জনকেও জীবিত বের করে আনা হয়।
৭ ঘণ্টা আগে
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইরানে বেসামরিক মানুষের হতাহতের খবরে ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’ বলে জানিয়েছেন। বিশেষ করে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার খবর তাকে উদ্বিগ্ন করেছে। তার মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক এ কথা জানান। তিনি সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
১ দিন আগে
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কেবল নেপাল অংশেই ১ হাজার ২০৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২১৬ জন। দেশটির সীমান্তবর্তী রসুয়া ও নুয়াকোট জেলাতেই প্রায় ১৬ লাখ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। একই সঙ্গে ভোতেকোশি নদী
১ দিন আগে