এপস্টেইন ঝড়েই ক্ষমতা হারাতে পারেন স্টারমার

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৪৬
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। ছবি: সংগৃহীত

জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক না থাকলেও ভয়ংকর এই কেলেঙ্কারির ঢেউ এখন আছড়ে পড়েছে তার ওপর।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এপস্টেইন ঝড়েই ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন তিনি। ডাউনিং স্ট্রিটে একের পর এক সংকটে এখন সুতোয় ঝুলছে স্টারমারের প্রধানমন্ত্রীত্ব।

আটলান্টিকের পূর্ব পারে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা ঘনীভূত হচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টেইনের ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের দাবিতে ওয়াশিংটনের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এই বৈপরীত্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তি আর স্টারমারের সম্ভাব্য অস্তিত্বগত দুর্বলতার পার্থক্য।

বিশ্লেষকদের মতে যুক্তরাজ্যে জবাবদিহি ও তদন্তের জন্য নিবেদিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে সক্রিয়। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিচার বিভাগে নিয়ন্ত্রণ এবং রিপাবলিকান কংগ্রেসের ওপর তার দৃঢ় প্রভাব তাকে কঠোর নজরদারি থেকে অনেকটাই রক্ষা করছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো এপস্টেইন নথির বৈশ্বিক বিস্তার। নরওয়ে পোল্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে গেছে এই কেলেঙ্কারির ছায়া। এতে প্রমাণ মিলছে, এই কাহিনির প্রভাব কতটা গভীর ও বিস্তৃত। শুধু স্টারমার নন, আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই উত্তাপে পুড়ছেন।

যুক্তরাজ্যে জনরোষ এতটাই তীব্র যে রাজা তৃতীয় চার্লস নিজের ভাই সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু, এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কে রাজকীয় উপাধি থেকে বঞ্চিত করেছেন এবং উইন্ডসর ক্যাসেলের একটি বাসভবন থেকেও সরিয়ে দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে তদন্তকারীরা জানিয়েছে, ২০১৯ সালে কারাগারে বিচার শুরুর আগেই এপস্টেইনের মৃত্যু আত্মহত্যা ছিল। তবে সেখানে এমন কোনো দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি যে, এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কেউ বড় রাজনৈতিক মূল্য দিয়েছেন।

এপস্টেইনের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে বড় প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন সাবেক মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি ল্যারি সামার্স। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই প্রেসিডেন্ট গত বছর জনসম্মুখের কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ান। কারণ এপস্টেইনের সঙ্গে তার ইমেইল প্রকাশ পায়, যেখানে নারীবিদ্বেষী মন্তব্য এবং প্রেমসংক্রান্ত পরামর্শের বিষয় উঠে আসে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় তিনি গভীরভাবে লজ্জিত।

অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিতর্ক পেছনে ফেলতে মরিয়া। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, আর কোনো নতুন মামলা হবে না। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ নেই এবং নতুন নথিতে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ গঠন করা হয়নি। যদিও নথিতে ট্রাম্পের কিছু উল্লেখ নিরীহ, তবু সেখানে যাচাই না হওয়া যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এবং এপস্টেইনের ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতার বিবরণ রয়েছে। ট্রাম্প সিএনএনকে বলেন, দেশের এখন অন্য কিছুর দিকে এগোনোর সময় এসেছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছেন কিয়ার স্টারমার। বৃহস্পতিবার সকালে তার প্রধানমন্ত্রীত্ব কার্যত নড়বড়ে হয়ে পড়ে। লেবার পার্টির এমপিদের বিদ্রোহ ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে।

সংসদের উত্তপ্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে স্টারমার স্বীকার করেন, সাবেক মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসন, জেফরি এপস্টেইনের বন্ধুত্বের কথা তিনি জানতেন, তবু তাকে ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

গত বছর প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় যৌন অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পরও ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনের পাশে ছিলেন। পরে স্টারমার তাকে বরখাস্ত করেন। তবে নতুন নথিতে ইঙ্গিত মিলেছে, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় ম্যান্ডেলসন হয়তো গোপন তথ্য এপস্টেইনের কাছে পাচার করেছিলেন। এই তথ্য এপস্টেইন ও তার ওয়াল স্ট্রিট সহযোগীদের জন্য অমূল্য হতো। বর্তমানে ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত চলছে। তিনি হাউস অব লর্ডস ও লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন।

স্টারমার সংসদে বলেন, ম্যান্ডেলসন আমাদের দেশ, আমাদের সংসদ এবং আমার দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।

গত মাসে বিবিসিকে পাঠানো বিবৃতিতে পিটার ম্যান্ডেলসন, জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য ক্ষমা চান। তিনি বলেন, দণ্ডিত হওয়ার পরও তাকে বিশ্বাস করা ছিল বড় ভুল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও কিশোরীদের কাছে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পরে জানান, দলকে আরও বিব্রত হওয়া থেকে বাঁচাতেই তিনি লেবার পার্টি ছাড়ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে ব্রিটেনে যে ঝড় বইছে, তা শুধু এপস্টেইনের যৌন পাচার ও নির্যাতনের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন এক কেলেঙ্কারি, যা ব্রিটিশ রাজনীতি, গণমাধ্যম ও জনজীবনের আগে থেকেই চলমান তিনটি বড় নাটককে আরও উসকে দিচ্ছে।

এটি এমন এক প্রধানমন্ত্রীর গল্প, যিনি ভূমিধস জয় দিয়ে ক্ষমতায় এলেও দুই বছরের কম সময়েই রাজনৈতিকভাবে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। সংসদে তার সাম্প্রতিক বিব্রতকর উপস্থিতি তাকে দুর্বল নেতার প্রতীকে পরিণত করেছে এবং লেবার পার্টির ভেতরে নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের গুঞ্জন জোরালো করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টরা নির্দিষ্ট মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলেও ব্রিটেনে নতুন প্রধানমন্ত্রী ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় তিনি কতদিন টিকবেন সেই হিসাব। গত ১১ বছরে যুক্তরাজ্য পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী বদলেছে, যা একসময় স্থিতিশীলতার প্রতীক দেশটিকে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঠেলে দিয়েছে।

এপস্টেইন কাহিনি আরও যুক্ত হয়েছে পিটার ম্যান্ডেলসনের দীর্ঘ রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির সঙ্গে। প্রিন্স অব ডার্কনেস নামে পরিচিত এই দক্ষ কিন্তু দুর্ভাগা রাজনীতিবিদ বারবার নিজের পতনের জন্য নিজেই দায়ী হয়েছেন। ধনী, প্রভাবশালী ও খ্যাতিমান মহলে মিশতে তার প্রবল আকাঙ্ক্ষাই তাকে কেলেঙ্কারির পথে ঠেলে দেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি এপস্টেইনের সঙ্গে বন্ধুত্ব।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

পরমাণু চুক্তির আশায় ‘গুঁড়ে বালি’, ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি হরমুজের দরজায়?

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরমাণু চুক্তি ছাড়াই সংঘাত শেষ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়াকে যুদ্ধের বিজয় হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনা নিয়েও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন তিনি। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিনিময়ে

১ দিন আগে

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার নতুন মহাসচিব মোহসেন রেজায়ি

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এসএনএসসি) মহাসচিব পদে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার মোহসেন রেজায়িকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেশটির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি সমন্বয়কারী গুরুত্বপূর্ণ এ পরিষদে মোহাম্মদ বাঘের জোলগদরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ৭১ বছর বয়সী রেজায়ি।

১ দিন আগে

সৌদির অগ্নিকাণ্ডে ১৬ প্রাণহানি, চুল কাটাতে গিয়ে বাঁচলেন হাবিবুর

সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস জানিয়েছে, ওই দুর্ঘটনায় নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

১ দিন আগে

১৫ দিন ধরে মালয়েশিয়ার মর্গে বাংলাদেশির মরদেহ, স্বজনের খোঁজ নেই

কুয়ালালামপুরে তিনি যে বাংলাদেশি মালিকের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, তারাও হন্যে হয়ে চেষ্টা করছেন কুয়ালালামপুর কিংবা বাংলাদেশের কোথাও তার কোনো স্বজনকে খুঁজে পাওয়া যায় কি না। তাতেও লাভ হয়নি। ফলে মৃত্যুর ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালের হিমঘর থেকে মুক্তি মিলছে না দীন মোহাম্মদের।

২ দিন আগে