ট্রাম্পের ‘স্বার্থে’ ঐতিহাসিক ভবন সরানোর উদ্যোগ, প্রশ্নের মুখে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
বেলগ্রেডে অবস্থিত ঐতিহাসিক ভবন ‘জেনারেল স্টাফ বিল্ডিং’। (বাঁ পাশে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং (ডান পাশে) সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
বেলগ্রেডে অবস্থিত ঐতিহাসিক ভবন ‘জেনারেল স্টাফ বিল্ডিং’। (বাঁ পাশে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং (ডান পাশে) সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে ‘জেনারেল স্টাফ বিল্ডিং’ নামে একটি ঐতিহাসিক ভবনের সংরক্ষিত মর্যাদা বাতিল করে সেখানে বিলাসবহুল হোটেল ও আবাসিক টাওয়ার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবার। প্রায় ৫০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন ট্রাম্পের জামাতা ও সাবেক হোয়াইট হাউজ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার। প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে ভবনটির আইনি সুরক্ষা তুলে দেওয়ার জন্য সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ নিজেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর চাপ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভুচিচ তার কার্যালয়ে ঐতিহ্য সংরক্ষণ কর্মকর্তাদের ডেকে ভবনটির সংরক্ষিত মর্যাদা বাতিল করতে বলেন। পরে একই দাবিতে চাপ দেন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও অর্থমন্ত্রী সিনিশা মালি। নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। শেষ পর্যন্ত ভবনটির সুরক্ষিত মর্যাদা বাতিল করা হলেও প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া ঘিরে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ও নথি জালিয়াতির অভিযোগে সরকারের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

তবে এ ঘটনায় ভুচিচের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এখন পর্যন্ত তাকে মামলায় অভিযুক্ত করা হয়নি। তদন্তকারীদের কাছে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে বলে জানা গেলেও অভিযোগপত্রে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বৈঠকের উল্লেখ নেই। কেন এমনটি করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ। ফাইল ছবি: রয়টার্স
সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

আলেকসান্ডার ভুচিচ গত ২৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেন। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সার্বিয়ায় সরকারি দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে জনঅসন্তোষ বাড়ছিল। ২০১৪ সাল থেকে কখনো প্রধানমন্ত্রী, আবার কখনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশটির রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে আসছিলেন ভুচিচ।

সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির এই নেত নিজের দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগপত্র জমা দেন। তবে পদত্যাগ করলেও এখনই রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন না তিনি। আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে তার দলের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ভুচিচ।

ঐতিহাসিক ভবন ঘিরে পরিকল্পনা

বেলগ্রেডের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘জেনারেল স্টাফ’ ভবনটি একসময় সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্মারক হিসেবে ভবনটি বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করে। ১৯৯৯ সালে কসোভো যুদ্ধের সময় ন্যাটোর বোমাবর্ষণে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সার্বিয়ার মানুষের কাছে ভবনটির প্রতীকী গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

বেলগ্রেডে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘জেনারেল স্টাফ’ ভবন। ছবি: সংগৃহীত
বেলগ্রেডে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘জেনারেল স্টাফ’ ভবন। ছবি: সংগৃহীত

২০১৬ সালে ভুচিচ নিজেই ভবনটির আইনগতভাবে সংরক্ষিত মর্যাদা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু আট বছর পর ২০২৪ সালে সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যিক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে একটি বৈঠকে অংশ নেন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণবিষয়ক বিশেষজ্ঞ দুব্রাভকা দুকানোভিচ। তিনি কয়েক বছর ধরে দেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন।

ওই বৈঠকে সার্বিয়ার তৎকালীন প্রসিডেন্ট ভুচিচ তাকে জেনারেল স্টাফ ভবনের সংরক্ষিত মর্যাদা প্রত্যাহার করতে বলেন। বৈঠক সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের যুক্তি ছিল, কোনো এক ‘বিদেশি বিনিয়োগকারী’ ওই জায়গাটি চায়।

কিন্তু সার্বিয়ার আইন অনুযায়ী, কোনো স্থাপনার সংরক্ষিত মর্যাদা বাতিল করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন প্রয়োজন। সেখানে দেখাতে হয়, কেন স্থাপনাটি আর সংরক্ষণের যোগ্য নয়। ফলে প্রেসিডেন্টের নির্দেশেই সরাসরি আইনি সুরক্ষা তুলে দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

গার্ডিয়ানের সূত্রগুলোর দাবি, বৈঠকে ভুচিচ দুকানোভিচ ও উপস্থিত আরেক ঐতিহ্য সংরক্ষণ কর্মকর্তাকে অলস ও অযোগ্য বলে আক্রমণ করেন। তাদের সামনে নির্দেশ মেনে কাজ করা অথবা পদত্যাগ করার বিকল্প রাখা হয়। তবে দুকানোভিচ নির্দেশ মানতে রাজি হননি।

৯৯ বছরের বিনা মূল্যের ইজারার পরিকল্পনা

ওই বৈঠকের কয়েক সপ্তাহ পর, ২০২৪ সালের মার্চে সার্বিয়া সরকার ও কুশনারের রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মধ্যে একটি চুক্তির তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এতে জেনারেল স্টাফ ভবনের জায়গাটি কুশনারের কোম্পানিকে ৯৯ বছরের জন্য বিনা মূল্যে ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানা যায়।

২০২৪ সালের ১৩ মে তারিখের আরেকটি চুক্তি গার্ডিয়ানের হাতে এসেছে। এতে সার্বিয়া সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ভবনটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত মর্যাদা কুশনারের কোম্পানির সন্তুষ্টি অনুযায়ী প্রত্যাহার করা হবে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে বেলগ্রেডে একটি বিক্ষোভে সার্বিয়ার শিক্ষার্থীরা ও শহরের বাসিন্দারা ‘আমরা জেনারেল স্টাফ ভবন হাতছাড়া হতে দেবো না’ লেখা একটি ব্যানার ধরে রেখেছেন। ফাইল ছবি: দ্য গার্ডিয়ান/এএফপি/গেটি ইমেজেস
২০২৫ সালের নভেম্বরে বেলগ্রেডে একটি বিক্ষোভে সার্বিয়ার শিক্ষার্থীরা ও শহরের বাসিন্দারা ‘আমরা জেনারেল স্টাফ ভবন হাতছাড়া হতে দেবো না’ লেখা একটি ব্যানার ধরে রেখেছেন। ফাইল ছবি: দ্য গার্ডিয়ান/এএফপি/গেটি ইমেজেস

এবার বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী সিনিশা মালি। সেখানে ভুচিচ উপস্থিত ছিলেন না। অভিযোগপত্রে উদ্ধৃত সাক্ষ্য অনুযায়ী, মালি দুকানোভিচ এবং বেলগ্রেডের শীর্ষ ঐতিহ্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা অলিভেরা ভুকচোভিচকে ভবনটির সুরক্ষা বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে বলেন।

দুই কর্মকর্তা এতে অস্বীকৃতি জানান। তাদের বক্তব্য ছিল, এ জন্য প্রয়োজনীয় আইনি শর্ত পূরণ হয়নি। এরপর তাদের আবারও কাজটি করা অথবা পদত্যাগের বিকল্প দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত দুজনই পদত্যাগ করেন।

দুকানোভিচের পদত্যাগপত্র গার্ডিয়ান দেখেছে। এতে তিনি লেখেন, এমন কোনো ‘অনুপযুক্ত হস্তক্ষেপে’ তিনি সম্মতি দিতে পারেন না, যা ভবনটির ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত মূল্য স্থায়ীভাবে ধ্বংস করবে। ভবনটিকে তিনি সার্বিয়ার আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম সেরা নিদর্শন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ও জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

দুকানোভিচ ও ভুকচোভিচ দুজনই গার্ডিয়ানকে ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা সঠিক বলে নিশ্চিত করেছেন। তবে চলমান আদালত কার্যক্রমের কারণে দুকানোভিচ বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি।

নন

ট্রাম্প যেভাবে যুক্ত হলেন প্রকল্পে

কুশনার ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্পের স্বামী এবং তার প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউজের প্রভাবশালী উপদেষ্টা ছিলেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে ট্রাম্প পরাজিত হওয়ার পর কুশনার বিনিয়োগ ব্যবসায় মনোযোগ দেন। তার মুখপাত্র গার্ডিয়ানকে জানান, ২০২১ সাল থেকেই তিনি বেলগ্রেডের প্রকল্পটি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন।

২০২৪ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ১০ দিন পর সার্বিয়া সরকার জেনারেল স্টাফ ভবনের সংরক্ষিত মর্যাদা বাতিলের ঘোষণা দেয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের অভিষেকের চার দিন পর তার ছেলে এরিক ট্রাম্প প্রকল্পটি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন। ট্রাম্প ও কুশনার পরিবারের যৌথ উদ্যোগে ভবনটির জায়গায় ‘ট্রাম্প টাওয়ার বেলগ্রেড’ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। প্রকল্পটিতে একটি বিলাসবহুল হোটেল ও আবাসিক টাওয়ার নির্মাণের কথা ছিল।

ডোনাল্ড জে ট্রাম্প ইনস্টিটিউট অব পিসে আয়োজিত বোর্ড অব পিসের উদ্বোধনী বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং জ্যারেড কুশনার। ফাইল ছবি: দ্য গার্ডিয়ান/গেটি ইমেজেস
ডোনাল্ড জে ট্রাম্প ইনস্টিটিউট অব পিসে আয়োজিত বোর্ড অব পিসের উদ্বোধনী বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং জ্যারেড কুশনার। ফাইল ছবি: দ্য গার্ডিয়ান/গেটি ইমেজেস

এরিক বলেন, পরিবারকে একসঙ্গে কাজ করতে দেখে ভালো লাগবে। কুশনারও বেলগ্রেডে গিয়ে ভুচিচের সঙ্গে বৈঠক করেন। সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট সেই বৈঠককে ‘অনুপ্রেরণাদায়ক’ বলে বর্ণনা করেন। কুশনারের বক্তব্য ছিল, তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, সার্বিয়ার বাজারের জন্য ট্রাম্প ব্র্যান্ডই সবচেয়ে উপযুক্ত।

এদিকে প্রকল্পটি নিয়ে সার্বিয়ার ভেতরে আপত্তি বাড়তে থাকে। পরিবেশকর্মী ও বিরোধী কণ্ঠ আলেকসান্দার জোভানোভিচ চুতা চুক্তিটি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি বলেন, সার্বিয়া কোনো ‘বাফে’ নয় এবং ভুচিচ তার ওয়েটার নন। তার বক্তব্যের মূল কথা ছিল, রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক সম্পদ প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় যে তিনি ইচ্ছামতো কাউকে দিয়ে দেবেন।

‘পে-টু-প্লে’ বিতর্ক

ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বেলগ্রেডের প্রকল্পটি। সমালোচকরা এ ধরনের সম্পর্ককে ‘পে-টু-প্লে’ ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে কেউ রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন।

তবে ট্রাম্প পরিবার ও কুশনার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের এক মুখপাত্র বলেছেন, বেলগ্রেডে তাদের এখন কোনো প্রকল্প করার পরিকল্পনা নেই। তারা কখনো সেখানে জমি কেনা বা অধিগ্রহণ নিয়ে আলোচনা কিংবা দর-কষাকষিতে জড়িত ছিলেন না। কথিত অভিযোগ সম্পর্কে তাদের কোনো জ্ঞান বা সংশ্লিষ্টতাও ছিল না বলে দাবি করা হয়েছে।

সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে জ্যারেড কুশনার এবং সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান/ইনস্টাগ্রাম/আলেকসান্দার ভুচিচ
সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে জ্যারেড কুশনার এবং সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান/ইনস্টাগ্রাম/আলেকসান্দার ভুচিচ

কুশনারের মুখপাত্রের বক্তব্য, তিনি প্রকল্পটি কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা ‘পে-টু-প্লে’ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নেননি। বরং এটি ছিল এমন একটি বিনিয়োগের সুযোগ, যার মাধ্যমে সার্বিয়ার ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত স্থানকে পুনর্গঠন করে নিরাময় ও পুনর্মিলনের প্রতীকে পরিণত করা যেত। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাও ছিল বলে তার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। জায়গাটির ঐতিহ্যগত মর্যাদা নিয়ে সার্বিয়া সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় কুশনারের কোনো ভূমিকা ছিল না বলেও দাবি করা হয়েছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে ট্রাম্প পরিবারের অন্যান্য আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সম্পর্কও তুলে ধরা হয়েছে। ভিয়েতনামে এরিক ট্রাম্পের ১৫০ কোটি পাউন্ডের একটি গলফ রিসোর্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পটির অনুমোদন অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল বলে সমালোচনা রয়েছে। পরে ট্রাম্প ভিয়েতনামের ওপর আরোপিত শুল্ক অর্ধেক করে দেন।

গার্ডিয়ান লিখেছে, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে কুশনারের বিনিয়োগ তহবিলে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পর জেদ্দায় ট্রাম্প প্লাজার পরিকল্পনাও সামনে আসে। পরে ট্রাম্প সৌদি আরবকে নতুন মার্কিন যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দেন।

আরেক ঘটনায়, কয়েকজন শীর্ষ আমিরাতি ব্যবসায়ী ও ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংশ্লিষ্ট একটি কোম্পানি ট্রাম্প পরিবারের ডিজিটাল মুদ্রা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের সঙ্গে বড় ধরনের লেনদেনে যুক্ত হন। এরপর ট্রাম্প সংশ্লিষ্ট এক ক্রিপ্টো ব্যবসায়ীকে ক্ষমা করেন এবং আমিরাতি পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত চিপ পাওয়ার সুযোগ পায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গার্ডিয়ান লিখেছে, এসব সম্পর্কের বিষয়ে কুশনারের অবস্থান হলো, সমালোচকরা যাকে স্বার্থের সংঘাত বলেন, তিনি সেটিকে বিশ্ব জুড়ে গড়ে ওঠা ‘অভিজ্ঞতা ও বিশ্বস্ত সম্পর্ক’ হিসেবে দেখেন।

ভুচিচের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ

ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে বেলগ্রেড প্রকল্পের সময় সার্বিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও উত্তপ্ত ছিল। জেনারেল স্টাফ ভবনের সংরক্ষিত মর্যাদা বাতিলের কয়েক দিন আগে নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন।

এ ঘটনায় দেশ জুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, সরকারি দুর্নীতি, নিম্নমানের কাজ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এমন বিপর্যয় ঘটেছে। ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনের স্লোগান হয়ে ওঠে— ‘সার্বিয়া নাকি মাফিয়া।’

বেলগ্রেডে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় ছেলে ট্রাম্প জুনিয়র এবং আলেকসান্দার ভুচিচ। ছবি:  দ্য গার্ডিয়ান/ফেসবুক/আলেকসান্দার ভুচিচ
বেলগ্রেডে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় ছেলে ট্রাম্প জুনিয়র এবং আলেকসান্দার ভুচিচ। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান/ফেসবুক/আলেকসান্দার ভুচিচ

এ সময় ডন জুনিয়র বেলগ্রেড সফর করেন এবং পরে ভুচিচকে তার ‘Triggered’ পডকাস্টে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে তিনি ভুচিচের বিরোধীদের বিরুদ্ধে নোভি সাদের দুর্ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ তোলেন। বিষয়টিকে ২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচনের পর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্যাপিটল দাঙ্গাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করেন তিনি।

তবে এতে সার্বিয়ার বিক্ষোভ থামেনি। বরং ট্রাম্প টাওয়ার প্রকল্পের বিরুদ্ধেও আন্দোলন শুরু হয়।

সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা

২০২৫ সালের মে মাসে ভুচিচ যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করার আশা করেছিলেন। কিন্তু তাদের সাক্ষাৎ হয়নি। তিনি ট্রাম্পের সাবেক আইনজীবী ও নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র রুডি জুলিয়ানির সঙ্গে দেখা করেন। সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, অসুস্থ হয়ে পড়ায় ভুচিচের পক্ষে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়নি।

সার্বিয়ায় ফিরে আসার পরপরই পুলিশ গোরান ভাসিচকে গ্রেপ্তার করে। দুকানোভিচ পদত্যাগ করার পর তাকে ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান করা হয়েছিল। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, জেনারেল স্টাফ ভবনের সংরক্ষিত মর্যাদা বাতিলের পক্ষে বিশেষজ্ঞ মতামত তৈরি করতে ভাসিচ একটি নথি জাল করেছিলেন।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভুচিচ সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী নিকোলা সেলাকোভিচের বিরুদ্ধেও সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়। এর কয়েক দিনের মধ্যেই কুশনারের কোম্পানি জানায়, প্রকল্পটি আপাতত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে না।

ভুচিচ মামলাটিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং তার সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পক্ষেও প্রকাশ্যে অবস্থান নেন তিনি।

অন্যদিকে প্রশ্ন উঠেছে, তদন্তকারীরা প্রেসিডেন্টের ভূমিকা সম্পর্কে জানার পরও তাকে কেন অভিযুক্ত করেননি। গার্ডিয়ানের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সম্পর্কে প্রসিকিউটররা অবগত।

সংগঠিত অপরাধবিষয়ক প্রসিকিউটরদের বিশেষ ইউনিট জানিয়েছে, ভুচিচের ওই বৈঠক সম্পর্কে তাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে। ইতোমধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাইরে অন্যদের সম্ভাব্য অপরাধমূলক দায় নিয়েও প্রাক-বিচার তদন্ত চলছে। তবে ভুচিচ ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী অর্থমন্ত্রী সিনিশা মালিকে এখনো অভিযুক্ত করা হয়নি। দুজনই কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তদন্ত নিয়ে নতুন প্রশ্ন

সার্বিয়ার সংগঠিত অপরাধবিষয়ক প্রসিকিউটরদের বিশেষ ইউনিটের জন্য মামলাটি নজিরবিহীন। এর আগে দায়িত্বে থাকা কোনো সার্বীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এভাবে অভিযোগ আনা হয়নি। সংস্কৃতিমন্ত্রী সেলাকোভিচের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভুচিচের দাবি, তদন্তকারীরা ‘অভ্যুত্থান’ ঘটানোর চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, সরকারের আরও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তদন্তকারীরা ভয় পাচ্ছেন।

সেলাকোভিচ আদালতে বলেন, পুলিশ তার মন্ত্রণালয়ে অভিযান চালানোর সময় তিনি নিজের অফিসে বসে সংগঠিত অপরাধবিষয়ক প্রসিকিউটর ইউনিটের প্রধান ম্লাদেন নেনাদিচের সঙ্গে প্লাম ব্র্যান্ডি পান করছিলেন এবং সিগারেট খাচ্ছিলেন। তবে প্রসিকিউটর ইউনিট জানিয়েছে, মামলার গতিপথ নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি।

ভুচিচ পদত্যাগের আগে শেষ মুহূর্তের এক আদেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ঘটনায় দণ্ডিত ২৩ জনসহ মোট ৪৯ জনে ক্ষমা করেছেন। তবে তাদের সবার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। জেনারেল স্টাফ ভবন-সংক্রান্ত মামলার কোনো আসামি এই তালিকায় রয়েছেন কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়। এরই মধ্যে আগাম নির্বাচনের সিদ্ধান্তের কারণে ভুচিচের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সাক্ষীদের গুরুত্বপূর্ণ শুনানি ২৫ অক্টোবরের ভোটের পর পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে।

গার্ডিয়ান লিখেছে, জেনারেল স্টাফ ভবনকে ঘিরে এই ঘটনা এখন শুধু একটি রিয়েল এস্টেট প্রকল্পের অনিয়মের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের আইন, সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর রাজনৈতিক চাপ, তদন্তের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্কের প্রশ্ন।

একদিকে সার্বিয়া সরকারের যুক্তি, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটিকে নতুনভাবে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করা যেত। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, একটি রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার আইনি সুরক্ষা কি বিদেশি বিনিয়োগকারীর চাহিদা অনুযায়ী তুলে দেওয়া যায়?

গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে আসা নথি ও সাক্ষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি সামনে আসার আগেই ভুচিচ ঐতিহ্য সংরক্ষণ কর্মকর্তাদের ডেকে ভবনটির সুরক্ষা সরানোর দাবি জানিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে অর্থমন্ত্রীও একই উদ্যোগ নেন। কর্মকর্তারা অস্বীকৃতি জানালে তারা পদত্যাগ করেন। নতুন দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংরক্ষিত মর্যাদা বাতিলের পক্ষে জাল বিশেষজ্ঞ মতামত তৈরির অভিযোগ ওঠে। এরপর ভবনটির সুরক্ষিত মর্যাদা বাতিল করা হয় এবং প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়।

তবে ট্রাম্প পরিবার ও কুশনার রাজনৈতিক বিনিময়ের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, প্রকল্পটি ছিল ব্যবসায়িক বিনিয়োগের সুযোগ এবং সার্বিয়া সরকারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র ছিল না।

ট্রাম্প টাওয়ার বেলগ্রেড প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা অনিশ্চিত। কিন্তু ভবনটিকে ঘিরে ঘটনাপ্রবাহ সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের প্রশ্ন সামনে এনেছে। একই সঙ্গে উঠেছে আরেকটি প্রশ্ন— মার্কিন প্রেসিডেন্টের পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ কি বিদেশি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে?

একসময় ন্যাটোর বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত জেনারেল স্টাফ ভবনটি এখন সার্বিয়ার ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ভুচিচ সরকারের ক্ষমতা এবং ট্রাম্প পরিবারের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে। আর এসব অভিযোগের তদন্ত চললেও সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ এখনো মামলার আসামি নন।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement