প্যারিসে সংঘর্ষ, ফ্রান্স জুড়ে বিক্ষোভে গ্রেপ্তার ১৩৫

ফ্রান্সে শিক্ষা খাতে অর্থায়ন বাড়ানো, বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নত করা এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় কমানোর দাবিতে শনিবার দেশ জুড়ে বিক্ষোভ করেছেন চার লাখের বেশি মানুষ। রাজধানী প্যারিসে মিছিলের শেষ দিকে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। গত সপ্তাহের ভাঙচুর ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদার করে কর্তৃপক্ষ। বিক্ষোভ ঘিরে শনিবার দুপুর পর্যন্ত দেশ জুড়ে ১৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কানাডীয় সংবাদমাধ্যম সিটিভি নিউজের খবরে বলা হয়, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে শনিবার দেশ জুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসে ছিলেন ১ লাখ ১০ হাজার। গত সপ্তাহের সহিংসতা ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। তাদের সহায়তায় হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়।
প্যারিসে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ৬৪
প্যারিসে শুরুতে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল চললেও শেষ দিকে পোর্ত দ্য ভঁসেন এলাকায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে ও জলকামান ব্যবহার করে। গত সপ্তাহে যেসব এলাকায় ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছিল, সেসব এলাকা এড়িয়ে রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে মিছিলের পথ নির্ধারণ করে কর্তৃপক্ষ।
প্রথমে বাস্তিল স্কয়ার থেকে নাসিওঁ স্কয়ার পর্যন্ত মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবরের বিক্ষোভে যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছিল, সেসব এলাকার আশপাশে জনসমাগমের কারণে বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি রয়েছে বলে জানায় পুলিশ। পরে মিছিলের পথ পরিবর্তন করে পোর্ত দ্য ভঁসেন থেকে পোর্ত দ্য ইতালি পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় সীমাবদ্ধ করা হয়। দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ওই পথে মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আয়োজকদের করা শেষ মুহূর্তের আইনি আবেদনও ব্যর্থ হয়।

প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর জানিয়েছে, শনিবারের বিক্ষোভের ঘটনায় রাজধানীতে ৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০ জনকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহ এবং সহিংসতা বা সম্পদের ক্ষতিসাধনের প্রস্তুতি নেওয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বেশির ভাগ গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে, দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, শনিবার দুপুর পর্যন্ত ফ্রান্স জুড়ে ১৩৫ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। বিক্ষোভের আগে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ আতশবাজি ও ধাতব বলসহ এমন কিছু জিনিস জব্দ করে, যেগুলো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
প্যারিসের বাইরেও বিক্ষোভ, কয়েকটি শহরে উত্তেজনা
রাজধানীর বাইরে মার্সেই, লিওঁ, তুলুজ, লিল, বোর্দো ও নিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। শিক্ষার্থী ও শ্রমিক সংগঠনের সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন। কোথাও শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল হলেও কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের উত্তেজনা দেখা দেয়।
সিটিভি নিউজের খবরে বলা হয়, লিওঁ, ক্লেরমঁ-ফেরাঁ ও স্ত্রাসবুর্গে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। নিস ও নঁতে শহরে জলকামান ব্যবহার করা হয়। মার্সেইয়ে মিছিলের শেষ দিকে কয়েক ডজন মানুষের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সেখানে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে পুলিশ।

মার্সেইয়ে পুলিশের হিসাবে বিক্ষোভে অংশ নেন ১৭ হাজার মানুষ। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজিটির দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল এক লাখ। বিক্ষোভ ঘিরে শহরটিতে গণপরিবহন বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হলেও জনসাধারণের প্রতিবাদের মুখে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে কর্তৃপক্ষ। তুলুজে বিক্ষোভে যোগ দেন ২৬ হাজার ৫০০ জন।
বোর্দো শহরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা এবং ট্রাম চলাচল বন্ধ থাকার পরও প্লাস দ্য লা বুর্স চত্বরে মানুষ জড়ো হন। গিরোঁদ অঞ্চলের সিজিটি-কমার্স অ্যান্ড সার্ভিসেস ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ব্রিজিত কুদার লে মোঁদকে বলেন, “বিক্ষোভ নিষিদ্ধ হোক বা না হোক, আমরা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সমর্থন করব এবং তাদের ছেড়ে যাব না। আমরা অভিভাবক, আমরাও একসময় তরুণ ছিলাম, আর আমরাও শ্রমিক।”
নিস শহরের প্লাস মাসেনা চত্বরে কয়েক শ মানুষ জড়ো হলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ হওয়ার নির্দেশ দেয়। লিওঁ শহরেও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ থাকলেও আন্দোলনকারীরা মিছিল চালিয়ে যান। এ সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
অন্যদিকে, অর্লেয়াঁ শহরে কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি দলের সম্মেলনের বিরুদ্ধে হাজারো মানুষ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করেন। দলটির দুই দিনের সম্মেলন ঘিরে সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সমালোচনা
গত সপ্তাহের সহিংসতা ও লুটপাটের পর ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে কর্তৃপক্ষ। তবে এসব সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী ও নাগরিক অধিকারকর্মীরা। তাদের বক্তব্য, সহিংসতার আশঙ্কায় নির্বিচারে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হলে মানুষের সমাবেশ ও প্রতিবাদের অধিকার সংকুচিত হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ বৃহস্পতিবার ঘোষণা দেন, যেসব বিক্ষোভের আয়োজকদের বৈধ কর্তৃত্ব নেই বলে মনে করা হবে, সেগুলো নিষিদ্ধ করা হতে পারে। শ্রমিক ইউনিয়ন ও স্বীকৃত সংগঠনগুলোর কর্মসূচি আইন অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে। তবে প্রয়োজনে মিছিলের পথ পরিবর্তন করা হতে পারে।

লিওঁ, নিস ও তুলোঁসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়। গ্রেনোবল, রুয়াঁ, ল্য আভ্র ও তুলোঁতেও কয়েকটি কর্মসূচি বন্ধ করা হয়। প্যারিসে কেন্দ্রীয় এলাকার পরিবর্তে শহরের পূর্বাংশে মিছিলের পথ নির্ধারণ করা হয়। এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কয়েকটি সংগঠন আদালতের দ্বারস্থ হয়। প্যারিসে শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভের ওপর পুলিশের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞাও আদালতের হস্তক্ষেপে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
ফ্রান্সের মানবাধিকার সংগঠন লিগ অব হিউম্যান রাইটসের প্রধান নাথালি তেহিও বিক্ষোভের ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, প্রতিবাদ করার অধিকার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। অন্যদিকে, আইনজীবী পাত্রিস স্পিনোসি বলেন, আগের সপ্তাহের সহিংসতার গুরুত্ব অস্বীকার না করেও বলা যায়, সব বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর গুরুতর হস্তক্ষেপ।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর বক্তব্য, সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তার অজুহাতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বন্ধ করা উচিত নয়। সরকার অবশ্য বলেছে, জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনা রক্ষা করা জরুরি। গত সপ্তাহের ভাঙচুর ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই নিরাপত্তা জোরদার এবং বিক্ষোভের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশ জুড়ে
গত মাসে প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ক্রেতেই শহরের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে কর্মীসংকট ও জরাজীর্ণ ভবনের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরে তা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো সংস্কার, শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনলাইন ব্যবস্থা ‘পারকুরসুপ’ বাতিলের দাবি জানাচ্ছেন। ২০১৮ সালে চালু হওয়া এই ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী বাছাইয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে যোগ দিয়েছেন শ্রমিক সংগঠনগুলোর সদস্যরাও। তারা বেশি মজুরি ও পেনশন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়ার মতো পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন। প্যারিসের মিছিলে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সদস্যরা সামনে ছিলেন। তাদের পেছনে বৃষ্টির মধ্যে রেইনকোট পরা বিক্ষোভকারীরা পতাকা ও হাতে তৈরি প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাঁটেন।
২৭ বছর বয়সী ক্যামিল শেনিয়ে বলেন, প্রকৌশলে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকার পরও তিনি কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “আমার মতো একই পরিস্থিতিতে থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষ আছেন, যারা সুবিধাপ্রাপ্ত নন এবং রাস্তায় ও পরিত্যক্ত ভবনে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। সত্যি বলতে, পরিস্থিতি খুব কঠিন।”
ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় ১ কোটি ৫৪ লাখ ঘণ্টার পাঠদান ব্যাহত হয়েছে। অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ায় নির্ধারিত পাঠদানের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সম্পন্ন করা যায়নি।
শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবি
শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো বলছে, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট দূর করতে অবকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, ভর্তি প্রক্রিয়া ও আর্থিক সহায়তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন প্রয়োজন। তাদের যৌথ ১০ দফা দাবিতে রয়েছে—
বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন সংস্কার: জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মেরামত এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় পাঠদানের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা।
শিক্ষক ও সহায়ক কর্মী নিয়োগ: শিক্ষকসংকট দূর করা এবং শিক্ষার্থীদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় পরামর্শক ও অন্যান্য কর্মী নিয়োগ দেওয়া।
শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা: অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনাসহ শিক্ষার পরিবেশের সমস্যাগুলো সমাধান করা।
পারকুরসুপ ব্যবস্থা বাতিল: বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বর্তমান অনলাইন বাছাইপ্রক্রিয়া বন্ধ করে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ আরও স্বচ্ছ ও সমতাভিত্তিক করা।
উচ্চশিক্ষায় আসন বাড়ানো: বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও আড়াই লাখ আসন বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ সম্প্রসারণ করা।
শিক্ষার্থীদের ভাতা বৃদ্ধি: মাসিক আর্থিক সহায়তা ২০০ ইউরো বাড়ানো এবং আরও বেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তির আওতায় আনা।
সাশ্রয়ী খাবারের ব্যবস্থা: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এক ইউরোতে খাবার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাড়তি ফি বাতিল: ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের ওপর আরোপিত বাড়তি ভর্তি ফি বাতিল করা।
ছাত্রাবাসের ভাড়া স্থগিত ও আবাসন বাড়ানো: সরকারি ছাত্রাবাসের ভাড়া স্থগিত রাখা, পুরোনো আবাসন সংস্কার এবং নতুন আবাসনের ব্যবস্থা করা।
শিক্ষার্থীদের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা: আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের শাস্তি না দেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে দমনমূলক ব্যবস্থা বন্ধ করা।
শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলা এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। তাদের মতে, পর্যাপ্ত শিক্ষক, উন্নত অবকাঠামো ও আর্থিক সহায়তা ছাড়া শিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যাবে না।
ম্যাখোঁর সঙ্গে বৈঠকেও সন্তুষ্ট নন শিক্ষার্থীরা
শুক্রবার শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ। এতে ২০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। শিক্ষার্থী আন্দোলনের সংগঠন হাই স্কুল রিনিউয়ালের সভাপতি নাথানায়েল কম্বারি বলেন, ম্যাখোঁ তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
তবে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ঘোষণা না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা। পারকুরসুপ সংস্কারের মতো বিষয় নিয়ে সোমবার প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর সঙ্গে আলোচনার কথা রয়েছে তাদের।
প্যারিসের এক শিক্ষক বেনেদিকত পিতিওঁ তার ১৬ বছর বয়সী মেয়ে গারঁসকে নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। আন্দোলন শুরুর পর থেকে তারা এর প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছিলেন, তবে এবারই প্রথম একসঙ্গে মিছিলে যোগ দেন।
পিতিওঁ বলেন, “যেসব তরুণ বিক্ষোভ করছেন, তাদের কথা শোনা হয়নি। একজন অভিভাবক ও শিক্ষক হিসেবে আমি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।”
গত সপ্তাহের সহিংসতার ছবি দেখে বিক্ষোভে অংশ নিতে ভয় পেয়েছিলেন বলে জানান গারঁস। তবে তার মতে, আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ালে সরকারই সুবিধা পাবে।
ফ্রান্সের কট্টর বামপন্থি দল লা ফ্রঁস আঁসুমিজের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁও প্যারিসের মিছিলে যোগ দেন। তিনি বলেন, সরকার জনগণের দাবি পূরণ না করা পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে বিক্ষোভ চলবে। ম্যাখোঁর উদ্দেশে তিনি বলেন, “তিনি বুঝতে পারবেন, এটি প্রতি সপ্তাহে আবার ঘটবে।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, “এখনো তার ছাড় দেওয়ার সময় আছে।”
ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সংগঠকেরা আগামী ৩১ অক্টোবর আরেকটি বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। তাদের দাবি, বিক্ষোভ করার অধিকার রক্ষায় আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে।
নিরাপত্তা জোরদার, বন্ধ জাদুঘর ও মেট্রো স্টেশন
গত সপ্তাহের বিক্ষোভে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। সে সময় ফ্রান্স জুড়ে প্রায় তিন হাজার দোকান ভাঙচুর বা লুটপাটের শিকার হয়। কয়েকটি শহরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি বলে সোমবার স্বীকার করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ। তিনি পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করেননি ম্যাখোঁ।
নতুন করে সহিংসতা ঠেকাতে প্যারিসের ২৪টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। শহরের প্রধান চত্বর, সরকারি ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। অনেক দোকানপাটও বন্ধ ছিল। সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা পেতে দোকানিরা জানালা ও সামনের অংশ কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢেকে দেন।
সাঁ-লাজার এলাকার কাছে একটি চশমার দোকানের সামনের অংশ ঢেকে দিচ্ছিলেন ৩৪ বছর বয়সী ঠিকাদার আকরাম আহমেদ। তিনি বলেন, “গত রাতে আমাকে ফোন করা হয়েছিল। দোকানের মালিককে খুব অসহায় মনে হচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন, আমি তার জীবন বাঁচাচ্ছি।”
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে শনিবার ল্যুভর, ওর্সে জাদুঘর, পিকাসো জাদুঘর ও গ্রঁ পালে বন্ধ রাখা হয়। গ্রঁ পালে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পল সেজানের একটি প্রদর্শনী চলছিল। সমকালীন শিল্পকর্মের প্রদর্শনী আর্ট বাসেল শুক্রবার দর্শনার্থীদের জন্য খোলা হলেও অস্থিরতার আশঙ্কায় সপ্তাহান্তের কর্মসূচি বাতিল করা হয়। নটর ডেম ক্যাথেড্রালে প্রবেশের জন্য পর্যটকদের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (এনএফএল) ‘এনএফএল হাউস’ও বন্ধ করে দেওয়া হয়। সম্ভাব্য প্রবেশ ও যাতায়াতসংক্রান্ত সমস্যার আশঙ্কায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়। রোববার স্তাদ দ্য ফ্রঁস স্টেডিয়ামে নিউ অরলিন্স সেইন্টস ও পিটসবার্গ স্টিলার্সের ম্যাচ হওয়ার কথা। ফ্রান্সে এনএফএলের ইতিহাসে এটিই প্রথম নিয়মিত মৌসুমের ম্যাচ।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ
শিক্ষা খাতের সংকটের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়ও ফরাসিদের ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইনসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে জ্বালানির দাম বেড়েছে ২১ দশমিক ৩ শতাংশ। এতে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ১ শতাংশে।
প্যারিসের বিক্ষোভকারী ৫৮ বছর বয়সী নার্স সৌমায়া আবেদ বলেন, তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু কখনো প্যারিসের উপকণ্ঠে পোর্ত দ্য ইতালি থেকে কোনো মিছিল শুরু হতে দেখেননি।
তিনি বলেন, “গত সপ্তাহে যা ঘটেছে, সেটিকে ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এতে আন্দোলন থামবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নত পরিবেশের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও বন্ধ হবে না।”
প্যারিসের আরেক বিক্ষোভকারী লুই লেদু-জাতার বলেন, বৈষম্য নিয়ে তিনি হতাশ। তিনি বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরিস্থিতিতে পড়তে চাই না, যেখানে সমাজের একাংশের সবকিছু আছে, আর অন্যদের কিছুই নেই।”
তিনি আরও বলেন, “ত্রিশ বছর বয়স হওয়ার আগেই আমাকে এতবার রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে হবে, তা কখনো ভাবিনি।”
ম্যাখোঁর জনপ্রিয়তা ২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। মেয়াদের শেষ দিকে এসে বিক্ষোভ তার নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি দল জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান জোরদার করার চেষ্টা করছে।





-d282c7.jpg)














-b3e939-256x144.webp)
