আবাসন সংকটে বিপর্যস্ত স্প্যানিশরা, রাজপথে লাখো মানুষের বিক্ষোভ

আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া ও আবাসন সংকটের বিরুদ্ধে স্পেন জুড়ে রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। রাজধানী মাদ্রিদসহ প্রায় ৫০টি শহরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হয়েছে। এর এক দিন আগে পার্লামেন্টে আবাসন সংকট মোকাবিলায় সরকারের আনা দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বিরোধীদের ভোটে আটকে যাওয়ার পর ক্ষোভ আরও তীব্র হয়।
মাদ্রিদের রাস্তায় বিক্ষোভকারীরা সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বানসংবলিত পোস্টার বহন করেন। কর্তৃপক্ষের হিসাবে শুধু মাদ্রিদেই বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ হাজার। আয়োজকদের দাবি, অংশ নিয়েছেন প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ।
দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, আবাসন ব্যয় কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ ও ভাড়া বাড়ির বাজার নিয়ন্ত্রণের দাবিতে স্প্যানিশদের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে এই ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা। হুইলচেয়ারে চলাফেরা করা এই নারী মাদ্রিদের যে বাড়িতে ৭০ বছর ধরে বসবাস করছিলেন, গত মাসের শেষ দিকে সেখান থেকে তাকে উচ্ছেদ করা হয়। তিনি জানান, তার বাড়ি কিনে নেওয়া একটি বিনিয়োগ তহবিল ভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়ানোর পর সেই অর্থ দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
শুক্রবার স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক জোট আবাসন সংকট মোকাবিলায় দুটি ডিক্রি পার্লামেন্টে উত্থাপন করে। প্রস্তাবগুলোতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত উচ্ছেদে নিষেধাজ্ঞা, স্বল্পমেয়াদি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও কক্ষভিত্তিক ভাড়ার ওপর নিয়ন্ত্রণসহ আবাসনপ্রাপ্তি সহজ করার বিভিন্ন পদক্ষেপ ছিল।

তবে রক্ষণশীল পিপলস পার্টি, উগ্র ডানপন্থি ভক্স ও কাতালান স্বাধীনতাপন্থি জুন্টস— তিন দলই প্রস্তাব দুটির বিরুদ্ধে ভোট দেয়। পিপলস পার্টির আইনপ্রণেতা হুয়ান ব্রাভো বলেন, ডিক্রি জারি করে আবাসন সাশ্রয়ী করা যায় না, বরং আরও বেশি বাড়ি নির্মাণ করাই সংকট সমাধানের পথ।
প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার খবর সংসদের বাইরে থাকা বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে। তারা ‘লজ্জা’ বলে স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি ‘তোমাদের মুনাফা, আমাদের দুর্দশা’ বলে প্রতিবাদ করেন।
মাদ্রিলেনোর ২৬ বছর বয়সী নান্দো দে আঙ্গুলো বলেন, রাজনীতিবিদদের জনগণের চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া উচিত। ‘এভাবে চলতে পারে না’ বলেও ক্ষোভ জানান তিনি।
একই পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন সৌর প্যানেল স্থাপনকারী ৩১ বছর বয়সী হ্যাভিয়ের। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি মৌলিক অধিকার দাবি করছি— উপযুক্ত বাসস্থান, স্থিতিশীলতা ও একটি সম্মানজনক জীবন গড়ার মতো পরিস্থিতি।’ নিজের বেতনের অর্ধেকই একটি ছোট ঘরের পেছনে চলে যায় বলে জানান তিনি।
মাদ্রিদের ২৬ বছর বয়সী গ্রন্থাগারিক মার্কোস সাইঞ্জ জানান, কয়েক বছর আগে বন্ধুদের সঙ্গে দুটি বেডরুমের একটি ফ্ল্যাটে থাকতে মাসে ৯০০ ইউরো ভাড়া দিতেন। এখন একটি এক বেডরুমের ফ্ল্যাটের ভাড়াই প্রায় ১ হাজার ইউরো, যা রাজধানীবাসীর মধ্যআয়ের একজন ব্যক্তির মাসিক বেতনের প্রায় অর্ধেক।
সরকারের প্রস্তাব আটকে যাওয়ার পর স্পেনের রাজনীতিতেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সানচেজ নভেম্বরে আগাম নির্বাচন ডাকতে পারেন। শনিবারের বিক্ষোভে মানুষের অংশগ্রহণ ও জনমতের চাপ তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে বিক্ষোভের বেশির ভাগই শান্তিপূর্ণ থাকলেও ভ্যালেন্সিয়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। প্রায় ৩০ জন একটি সাংস্কৃতিক স্থাপনা ‘সিটি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস’-এ ঢুকে পড়লে পুলিশ তাদের বের করে দেয়।
দিনের শেষ দিকে মাদ্রিদে উগ্র ডানপন্থিদের একটি দল বিক্ষোভস্থলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এল পাইস জানিয়েছে, তাদের কয়েকজন ‘নাৎসি স্যালুট’ করছিলেন। পুলিশ তাদের বাধা দেয় এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ভাড়াবাড়ির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ এখন স্পেনের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ভাড়াটিয়া ইউনিয়নের মুখপাত্র ভ্যালেরিয়া রাকু বলেন, রাস্তায় যে নতুন শক্তি দেখা যাচ্ছে, তা প্রমাণ করছে— মানুষের আট দিনের আন্দোলন আট বছরের প্রগতিশীল সরকারের চেয়েও বেশি পরিবর্তন আনতে পারে।
সানচেজের সরকারের জন্য তাই আবাসন সংকট এখন শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, এটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষাতেও পরিণত হয়েছে।












-b88157.jpg)
-5a5f6b.jpg)



