এক যুগের অচলাবস্থার অবসান, চীন-উত্তর কোরিয়া নতুন সেতু চালু

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
বৃহস্পতিবার চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের দানদংয়ে নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রাখা এলাকায় পাহারা দিচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। সেতুটি চীনের দানদং নিউ জোনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজুকে যুক্ত করেছে। ছবি: রয়টার্স
বৃহস্পতিবার চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের দানদংয়ে নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রাখা এলাকায় পাহারা দিচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। সেতুটি চীনের দানদং নিউ জোনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজুকে যুক্ত করেছে। ছবি: রয়টার্স

দীর্ঘ এক যুগের অচলাবস্থা ও টানাপড়েন কাটিয়ে অবশেষে চালু হলো চীন ও উত্তর কোরিয়াকে সড়কপথে যুক্ত করা নতুন সেতু। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ নামের প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজুকে যুক্ত করেছে। ভবিষ্যতে দুই দেশের স্থলবাণিজ্যের প্রধান পথ হয়ে উঠতে পারে এটি।

১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনামলে নির্মিত পুরনো ‘চীন-উত্তর কোরিয়া মৈত্রী সেতু’র বিকল্প হিসেবে নতুন সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে এটি চালুর পরিকল্পনা ছিল। তবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হলে প্রকল্পটি থমকে যায়। সে সময় উত্তর কোরিয়া তাদের অংশে সংযোগ সড়ক ও শুল্ক অবকাঠামোর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়।

বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং নতুন সেতুটিকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ‘সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, এই সেতু দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়াতে সহায়তা করবে।

বৃহস্পতিবার নিউ ইয়ালু রিভার সেতু দিয়ে চীনের অংশে প্রবেশ করছে উত্তর কোরিয়ার পতাকাসজ্জিত ট্রাক। ছবি: রয়টার্স
বৃহস্পতিবার নিউ ইয়ালু রিভার সেতু দিয়ে চীনের অংশে প্রবেশ করছে উত্তর কোরিয়ার পতাকাসজ্জিত ট্রাক। ছবি: রয়টার্স

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। দেশটির অর্থনীতির জন্যও বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৭০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। এতে মহামারির আগের পর্যায়ে বাণিজ্য ফিরে আসার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে এই বাণিজ্যের বড় অংশই উত্তর কোরিয়ায় চীনের রপ্তানি।

জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় নতুন সেতু চালুর পরও সীমান্তবাণিজ্যে দ্রুত বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন না দক্ষিণ কোরিয়ার হানকুক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কাং জুন-ইয়ং।

বিবিসিকে তিনি বলেন, অবাধে চীনা পণ্য প্রবেশ করলে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারের নিয়ন্ত্রণ বেইজিংয়ের হাতে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়ার এই উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে চীনও সম্ভবত ধীরে ধীরে বাণিজ্য বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করবে।

চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব রয়েছে। চীনের একমাত্র আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে। দুই দেশের সম্পর্ককে প্রায়ই ‘দাঁত আর ঠোঁটের মত নিবিড় সম্পর্ক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

তবে এই ঘনিষ্ঠতায় বিভিন্ন সময়ে টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। ২০১০-এর দশকে উত্তর কোরিয়ার একের পর এক পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে বেইজিংয়ের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের দূরত্ব বাড়ে। পরে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চীনের অবস্থান কিছুটা নমনীয় হলে দুই দেশের সম্পর্কে বরফ গলতে শুরু করে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এডওয়ার্ড হাওয়েল বিবিসিকে বলেন, “মাত্র এক দশক আগেও পিয়ংইয়ংকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার প্রকাশ্য দাবি তুলে বেইজিং যেভাবে কড়া সমালোচনা করত, এখন তারা এ বিষয়ে কার্যত নীরব।”

সেতু পেরিয়ে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজুতে প্রবেশ করছে চীনের পতাকাসজ্জিত ট্রাক। ছবি: রয়টার্স
সেতু পেরিয়ে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজুতে প্রবেশ করছে চীনের পতাকাসজ্জিত ট্রাক। ছবি: রয়টার্স

করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সাল থেকে দীর্ঘ ছয় বছর বন্ধ থাকার পর গত মার্চে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল এবং বেইজিং-পিয়ংইয়ং ফ্লাইট আবার চালু হয়। এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও সম্পর্ক জোরদারের আভাস মিলছে।

এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে কৌশলগত ও সামরিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে চীন। গত মাসে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে প্রথম সড়ক সেতু চালু হয়। ওই সেতু দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি যানবাহন ও দুই হাজার মানুষ চলাচল করতে পারছেন।

এমন পরিস্থিতিতে উত্তর কোরিয়ার ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে বেইজিং। এ বছরের জুনে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে পিয়ংইয়ং যান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সেখানে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক করেন তিনি।

দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলভিত্তিক এহওয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লেইফ-এরিক ইজলি বলেন, “ইয়ালু নদীর সেতুটি চালু হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতিরই প্রমাণ। এতে স্পষ্ট হলো, জুনে শি জিনপিংয়ের পিয়ংইয়ং সফর স্রেফ লোক দেখানো ছিল না। তবে এই একটি সেতু চালুর পেছনে এক যুগের বিলম্বই বলে দেয়, উত্তর কোরিয়াকে সামলানো বেইজিংয়ের জন্য কতটা জটিল।”

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement