রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের তেল টার্মিনালে ইউক্রেনের হামলা

বিবিসি বাংলা
রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের তেল কারখানায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। ছবি: জেলেনস্কির এক্স হ্যান্ডেল

রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি বড় তেল টার্মিনালে হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি এই টার্মিনালকে 'রাশিয়ার যুদ্ধ ব্যয় নির্বাহের জন্য আয় সৃষ্টিকারী অবকাঠামো' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এ ছাড়া ওই অঞ্চলে রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ ঘাঁটিতেও হামলা চালানোর দাবি করেছে ইউক্রেন।

সেন্ট পিটার্সবার্গের গভর্নর আলেকসান্দর বেগলভ জানান, শহরটি 'বড় ধরনের' ড্রোন হামলার মুখে পড়ে এবং তিনি তেল টার্মিনালে আঘাতের কথা স্বীকার করেছেন। তবে বলেছেন, এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

সম্প্রতি ইউক্রেন রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর দূরপাল্লার ড্রোন হামলা জোরদার করেছে, যার ফলে ব্যাপক জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। কিয়েভের দাবি, এসব হামলায় রাশিয়ার তেল শোধন সক্ষমতার প্রায় ৪৩ শতাংশ 'অকার্যকর' হয়ে গেছে। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলো তাদের বৈধ সামরিক লক্ষ্য। কারণ তারা মনে করে মস্কো তার যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জ্বালানি রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত সপ্তাহে ইউক্রেনের হামলার কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের কথা নজিরবিহীনভাবে স্বীকার করেছিলেন। শনিবার দেশীয় বাজারে জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি বিল তিনি আইনে পরিণত করেন।

এদিকে জেলেনস্কি শনিবার বলেছেন, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও আশপাশের অঞ্চলে যেসব স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, সেগুলো ইউক্রেনের সীমান্ত থেকে প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার (৫২৮ মাইল) দূরে অবস্থিত।

হামলায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ড্রোন লক্ষ্যবস্তুর দিকে উড়ে যাচ্ছে এবং হামলার পর সেখান থেকে বিশাল কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠছে। পরে বিবিসি যাচাই করে নিশ্চিত করেছে, সেন্ট পিটার্সবার্গের তেল টার্মিনালটি সত্যিই আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।

ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানায়, টার্মিনালটি রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ তেল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, যার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা এক কোটি ২৫ লাখ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য।

তারা আরও দাবি করেছে, ক্রনস্টাডে অবস্থিত রাশিয়ার বাল্টিক নৌ বহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ ঘাঁটিতেও হামলা হয়েছে। রাশিয়া এ দাবি সম্পর্কে এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।

গভর্নর বেগলভ জানান, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও বৃহত্তর লেনিনগ্রাদ অঞ্চলের আকাশে ইউক্রেনের ৭২টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তিনি শহরবাসীকে ড্রোন হামলার আশঙ্কা কেটে না যাওয়া পর্যন্ত ঘরে থাকার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করেন, মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

ওদিকে পূর্ব ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর কোস্তিয়ানতিনিভকা সম্পূর্ণভাবে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে— এমন দাবি অস্বীকার করেছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী। ইউক্রেনের সামরিক মুখপাত্র মেজর আন্দ্রি কোভালিওভ বলেছেন, "কোস্তিয়ানতিনিভকা এখনও ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।"

আন্দ্রি কোভালিওভ স্বীকার করেন, "শত্রুপক্ষের ছোট ছোট পদাতিক দল আমাদের বাহিনীর অবস্থানের গভীরে অনুপ্রবেশের কিছু ঘটনা ঘটেছে।" তবে এসব দলকে শনাক্ত করে ধ্বংস করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

জুন মাসে কোস্তিয়ানতিনিভকা শহরের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে— পুতিনের এমন মন্তব্যের একদিন পরে তিনি এই মন্তব্য করলেন। তবে নিজের এই দাবির পক্ষে পুতিন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।

শনিবার প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি টেলিগ্রামে লিখেছেন, যদি কোস্তিয়ানতিনিভকা এখন সত্যিই রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে সেখানে আমার সঙ্গে দেখা করতে এবং যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে পুতিনের নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে তিনি কখনোই ফ্রন্টলাইন অতিক্রম করবেন না। সত্য পুতিনের কথার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কোস্তিয়ানতিনিভকা হলো দোনেৎস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনের তথাকথিত 'ফর্ট্রেস বেল্ট' (দুর্গ প্রতিরক্ষা বলয়)-এর অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাবেষ্টিত শহরের একটি। দোনেৎস্ক অঞ্চলের অধিকাংশ অংশ বর্তমানে রাশিয়ার দখলে রয়েছে।

শনিবার বিকেলে প্রকাশিত সর্বশেষ সামরিক প্রতিবেদনে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, শুক্রবার রাতভর ও শনিবার ইউক্রেন থেকে ছোড়া পাঁচ শতাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তারা ভূপাতিত করেছে।

মন্ত্রণালয়ের দাবি, ইউক্রেনের এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পক্ষ থেকে ইউক্রেনের জনগণ ও 'বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের' দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া।

তাদের মতে, এটি করা হয়েছে ২ জুলাই কিয়েভে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটির পরিণতি এবং কোস্তিয়ানতিনিভকায় ইউক্রেনীয় বাহিনীর 'ভয়াবহ ব্যর্থতা' থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও সতর্ক করে বলেছে, রাশিয়ার বেসামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর ইউক্রেনের হামলার 'জবাব অবশ্যই দেওয়া হবে'।

পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, আগামী সপ্তাহে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ন্যাটো সম্মেলনের আগে উভয় পক্ষই কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়।

শনিবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান। সেখানে তিনি দুই দেশের মধ্যে 'গঠনমূলক সম্পর্ক' গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

এর আগে শুক্রবার পুতিন সামরিক পোশাক পরে সেনা কমান্ডারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সফরেই তিনি দাবি করেন, কোস্তিয়ানতিনিভকা শহরটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

অন্যদিকে ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, পুতিন রণাঙ্গনের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্বকে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

শত্রুর ওপর ‘ক্রোধের বজ্রাঘাত’ অব্যাহত থাকবে: আইআরজিসি কমান্ডার মুসাভি

ইরানের জনগণের পক্ষ থেকে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা শত্রুদের ওপর ‘ক্রোধের বজ্রাঘাত’ অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন বাহিনীটির কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইয়্যেদ মাজিদ মুসাভি।

১৭ ঘণ্টা আগে

মার্কিন চাপে খামেনির শেষকৃত্যে যোগ দেয়নি ১৩ দেশ, অন্যদেরও হুমকি

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও কূটনৈতিক প্রচারণার মুখে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে অন্তত ১৩টি দেশ অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি।

১ দিন আগে

আলি খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা, তেহরানে শোকের জনসমুদ্র

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে শনিবার শোকের জনসমুদ্রে পরিণত হয় তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্স। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জাতীয় সংগীত, ধর্মীয় শোকগাথা ও পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে তার সপ্তাহব্যাপী দাফন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

১ দিন আগে

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা উদ্‌যাপন, ভাষণে কমিউনিজম নিয়ে ট্রাম্পের তোপ

কমিউনিজমকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন হুমকি আখ্যা দিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশকে ইঙ্গিত করে তিনি তীব্র আক্রমণ শানান। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে ‘কমিউনিস্ট হুমকি’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং এ ধরনের মতাদর্শের সমর্থকরাই ‘১৭৭৬ সালের ৪ জুলাইয়ের শত্রু’।

১ দিন আগে