
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

লাখো মানুষের উপস্থিতি, কড়া নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় একের পর এক আনুষ্ঠানিকতা— প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজাকে ঘিরে নজিরবিহীন আয়োজন করেছে ইরান। যুদ্ধের ক্ষত ও শোকের আবহের মধ্যেই শনিবার রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত এ রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শুধু শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থন প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তার বার্তা দেওয়ার বড় মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শেষে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো কতটা অটুট রয়েছে এবং নতুন নেতৃত্ব কতটা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে। খামেনির শেষ বিদায়ের এই বিশাল আয়োজন সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ারও একটি রাজনৈতিক প্রয়াস।
শোকার্ত মানুষের ঢল
শনিবার ভোর থেকেই রাজধানীর ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে মানুষের ঢল নামে। কালো পোশাক পরিহিত হাজারো নারী-পুরুষ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের লাল-সাদা-সবুজ পতাকা হাতে নিয়ে সেখানে জড়ো হন। অনেকের হাতেই ছিল প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রতিকৃতি।

জনসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কাচে আবৃত অবস্থায় রাখা হয় আলি খামেনির কফিন। পাশাপাশি তার পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের কফিনও প্রদর্শন করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন তার মেয়ে, জামাতা, পুত্রবধূ এবং মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তারাও নিহত হয়েছেন।
এর আগের দিন একই স্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কফিনগুলো শায়িত রাখা হয়। সে সময় ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত হয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
এখনো প্রকাশ্যে আসেননি মোজতবা
আলি খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নিলেও এখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি তাকে। ইরানি কর্তৃপক্ষও তার কোনো নতুন ছবি প্রকাশ করেনি।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, যে হামলায় আলি খামেনি নিহত হন, সেই হামলায় মোজতবাও আহত হয়েছিলেন। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। এর আগে ইরানের একাধিক সূত্র জানিয়েছিল, নিরাপত্তাজনিত কারণে বাবার জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতায় তিনি অংশ না-ও নিতে পারেন।
শোক থেকে প্রতিশোধের অঙ্গীকার
মোসাল্লা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হাজারো মানুষ বুক চাপড়ে শোক প্রকাশ করেন, বিলাপ করেন এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতাকা নাড়াতে থাকেন। লাউডস্পিকারে অনুষ্ঠান সঞ্চালক বারবার জনতাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আসুন, আমরা সবাই বিলাপ করি।’

এরপর পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে একযোগে ধ্বনি ওঠে— ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক।’
৪০ বছর বয়সী আরাশ রহিমি নামের এক শোকাহত ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেন, ‘এখানে যারা এসেছে, সবাই আমাদের সর্বোচ্চ নেতার রক্তের প্রতিশোধ নিতে এসেছে। আমাদের নেতা যেমন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের রক্তের শত্রুতা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কখনো ভালো হবে না।’
এদিকে ইরানের জনগণের পক্ষ থেকে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা শত্রুদের ওপর ‘ক্রোধের বজ্রাঘাত’ অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন বাহিনীটির কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইয়্যেদ মাজিদ মুসাভি।
শনিবার প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘ইরানের সম্মানিত জাতিকে আমি জানাতে চাই, আপনাদের জন্য জীবন উৎসর্গে প্রস্তুত মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আপনাদের পক্ষ থেকে শত্রুর ওপর ক্রোধের বজ্রাঘাত অব্যাহত রাখবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজ আমরা রক্তাক্ত হৃদয় ও গভীর শোক নিয়ে আমাদের শহীদ নেতাকে— যিনি ছিলেন যুগের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব— তার চিরস্থায়ী মর্যাদার আসনে বিদায় জানাচ্ছি। এ মুহূর্তে আমরা মহান আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করছি যে, তার নেতৃত্বে ইসলামি সমাজের জন্য নির্ধারিত মহান লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত আমরা এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকব না।’
‘ঐশী প্রতিশোধে’র হুঁশিয়ারি
আলি খামেনির জানাজাকে কেন্দ্র করে শুধু শোকই নয়, প্রতিশোধের বার্তাও জোরালোভাবে সামনে আনছে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব।
ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর প্রধান কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলি ওজমায়ি বলেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী শহিদ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির আদর্শ অনুসরণ অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘ঐশী প্রতিশোধ’ আসন্ন বলে সতর্ক করেছেন।
শনিবার প্রকাশিত এক বার্তায় ওজমায়ি বলেন, ‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত নৌবাহিনীর সব সদস্যের সঙ্গে তিনিও দৃঢ়তা ও অবিচলতার সঙ্গে আয়াতুল্লাহ খামেনির পথ অনুসরণ করে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সন্ত্রাসী যুক্তরাষ্ট্র এবং অবৈধ শাসক-চক্র ইহুদিবাদী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আল্লাহর প্রতিশোধ বেশি দূরে নয়। সত্যের পতাকা মর্যাদা ও শক্তির সর্বোচ্চ শিখরে উড্ডীন থাকবে।’
কমান্ডার ওজমায়ি খামেনির জানাজাকে তার আদর্শের প্রতি নতুন করে আনুগত্যের শপথ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, এই শপথের মাধ্যমে ইসলামি উম্মাহর প্রতিরক্ষা এবং ‘দাম্ভিক ও খোদাদ্রোহী ফ্রন্টে’র বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যারা এই অপরাধ করেছে, তারা ভেবেছিল সত্যের পথকে থামিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তারা নিজেদের ইতিহাসের নিন্দা এবং এই জাতির ক্রোধ ও কঠোর প্রতিশোধের মুখোমুখি করেছে।’
যুদ্ধের পর শাসকগোষ্ঠীর শক্ত অবস্থান
এমন এক সময়ে এই রাষ্ট্রীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্ব নিজেদের বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার পরও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা টিকে আছে— এ কথাই জোর দিয়ে প্রচার করছে তেহরান। যুদ্ধবিরতির পর সরকার দাবি করছে, তারা একটি ‘সুপারপাওয়ারে’র বিরুদ্ধে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে এবং এই সমঝোতা শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশে সরকারের প্রতি প্রকৃত জনসমর্থন কতটা, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কারণ যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ, সেই আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে হাজারো মানুষ নিহত হন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর প্রকাশ্যে সেই সরকারবিরোধী আন্দোলনের বড় ধরনের উপস্থিতি আর দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বিদেশি হামলা সাময়িকভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে আড়াল করে জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্ররক্ষার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
যুদ্ধের ভয়াবহ মূল্য
ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শুধু সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যরাই নন, দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর উচ্চপদস্থ কমান্ডার এবং সামরিক কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়েছে একাধিক সামরিক ঘাঁটি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনা। এতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান।
অন্যদিকে ইরানও পালটা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। পাশাপাশি উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে হরমুজ প্রণালিতে, যেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করে ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। দেশটির অভ্যন্তরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর চাপও বাড়তে থাকে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ওয়াশিংটনের আগ্রহ বেড়ে যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে পরবর্তী সমঝোতা তৈরির ক্ষেত্রে এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বদলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চালচিত্র— লাভবান ইরান, শঙ্কিত প্রতিদ্বন্দ্বীরাঅর্থনীতিতে স্বস্তির প্রত্যাশা
গত মাসে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতার আওতায় বিদেশে আটকে থাকা ইরানের কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদ ছাড়ের পথ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির ওপর আরোপিত কয়েকটি আর্থিক নিষেধাজ্ঞা থেকেও সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অর্থনীতিকে চাপে রেখেছিল।
তেহরানের প্রত্যাশা, এসব পদক্ষেপ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সংকট মোকাবিলায় কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে।
খামেনির মৃত্যু ঘিরে ধর্ম ও রাজনীতির সমীকরণ
ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতা শুধু রাষ্ট্রপ্রধান নন; তিনি একই সঙ্গে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি এবং ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক অভিভাবক। শিয়া মতাদর্শ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা পৃথিবীতে দ্বাদশ ইমামের প্রতিনিধিত্বকারী ধর্মীয় কর্তৃত্বেরও প্রতীক।
ফলে যুদ্ধ চলাকালে শত্রুপক্ষের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু শুধু রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় আবেগেরও একটি বড় ঘটনা হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় প্রচারে তার মৃত্যুকে শিয়া ইসলামের দীর্ঘ শহীদ ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইনের শাহাদাত শিয়া মুসলিমদের কাছে আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের সর্বোচ্চ প্রতীক। বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির মৃত্যুকেও সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে ইরানি রাষ্ট্র, যাতে জনগণের ধর্মীয় আবেগ আরও শক্তিশালী হয় এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন সুসংহত করা যায়।
কেন বিলম্বে দাফন?
ইসলামে মৃত্যুর পর যত দ্রুত সম্ভব দাফন সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালে বিশাল জনসমাগমে নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কায় খামেনির দাফন বিলম্বিত করা হয়। গত মাসে অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরই পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়।
এক সপ্তাহের রাষ্ট্রীয় শোক
খামেনির মৃত্যুতে এক সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইরান সরকার। বৃহস্পতিবার রাতে প্রথমবারের মতো জনসাধারণের জন্য তার কফিন উন্মুক্ত করা হয়। শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত রাজধানীর ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় কফিন রাখা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
এরপর সোমবার রাজধানী তেহরানের কেন্দ্র জুড়ে বিশাল শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। পরে মরদেহ নেওয়া হবে ধর্মীয় শিক্ষা নগরী কোমে, যেখানে মঙ্গলবার আলাদা ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে।
বুধবার মরদেহ বিমানে করে নেওয়া হবে ইরাকে। শিয়া মুসলমানদের দুই পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বৃহস্পতিবার আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। সবশেষে মাশহাদে মধ্যযুগীয় শিয়া ইমাম রেজার মাজারের পাশে আলি খামেনিকে দাফন করা হবে।
এই পুরো কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেশ জুড়ে লাখো মানুষকে সংগঠিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। অংশগ্রহণকারীদের জন্য পরিবহন, খাবার ও আবাসনের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের নতুন বাস্তবতা
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের শাসনব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ছিল। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রচারে খামেনির মৃত্যুকে ‘শাহাদাত’ এবং জাতীয় প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনসমর্থন পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। তবে এটিই পুরো ইরানি সমাজের প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ এখনো নেই। কারণ যুদ্ধের আগে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছিল, আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশপ্রেমের প্রশ্নে সেই বিরোধিতা অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র নন; তিনি দেশটির ধর্মীয় বৈধতা, নিরাপত্তা কাঠামো এবং আঞ্চলিক কৌশলেরও মূল স্তম্ভ। ফলে তার মৃত্যু এবং পরবর্তী উত্তরাধিকার প্রশ্ন শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, শিয়া রাজনীতি এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-ইসরায়েল সম্পর্কের ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স, গার্ডিয়ান, এএফপি, আল-জাজিরা, বিবিসি

লাখো মানুষের উপস্থিতি, কড়া নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় একের পর এক আনুষ্ঠানিকতা— প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজাকে ঘিরে নজিরবিহীন আয়োজন করেছে ইরান। যুদ্ধের ক্ষত ও শোকের আবহের মধ্যেই শনিবার রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত এ রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শুধু শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থন প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তার বার্তা দেওয়ার বড় মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শেষে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো কতটা অটুট রয়েছে এবং নতুন নেতৃত্ব কতটা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে। খামেনির শেষ বিদায়ের এই বিশাল আয়োজন সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ারও একটি রাজনৈতিক প্রয়াস।
শোকার্ত মানুষের ঢল
শনিবার ভোর থেকেই রাজধানীর ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে মানুষের ঢল নামে। কালো পোশাক পরিহিত হাজারো নারী-পুরুষ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের লাল-সাদা-সবুজ পতাকা হাতে নিয়ে সেখানে জড়ো হন। অনেকের হাতেই ছিল প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রতিকৃতি।

জনসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কাচে আবৃত অবস্থায় রাখা হয় আলি খামেনির কফিন। পাশাপাশি তার পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের কফিনও প্রদর্শন করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন তার মেয়ে, জামাতা, পুত্রবধূ এবং মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তারাও নিহত হয়েছেন।
এর আগের দিন একই স্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কফিনগুলো শায়িত রাখা হয়। সে সময় ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত হয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
এখনো প্রকাশ্যে আসেননি মোজতবা
আলি খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নিলেও এখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি তাকে। ইরানি কর্তৃপক্ষও তার কোনো নতুন ছবি প্রকাশ করেনি।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, যে হামলায় আলি খামেনি নিহত হন, সেই হামলায় মোজতবাও আহত হয়েছিলেন। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। এর আগে ইরানের একাধিক সূত্র জানিয়েছিল, নিরাপত্তাজনিত কারণে বাবার জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতায় তিনি অংশ না-ও নিতে পারেন।
শোক থেকে প্রতিশোধের অঙ্গীকার
মোসাল্লা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হাজারো মানুষ বুক চাপড়ে শোক প্রকাশ করেন, বিলাপ করেন এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতাকা নাড়াতে থাকেন। লাউডস্পিকারে অনুষ্ঠান সঞ্চালক বারবার জনতাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আসুন, আমরা সবাই বিলাপ করি।’

এরপর পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে একযোগে ধ্বনি ওঠে— ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক।’
৪০ বছর বয়সী আরাশ রহিমি নামের এক শোকাহত ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেন, ‘এখানে যারা এসেছে, সবাই আমাদের সর্বোচ্চ নেতার রক্তের প্রতিশোধ নিতে এসেছে। আমাদের নেতা যেমন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের রক্তের শত্রুতা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কখনো ভালো হবে না।’
এদিকে ইরানের জনগণের পক্ষ থেকে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা শত্রুদের ওপর ‘ক্রোধের বজ্রাঘাত’ অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন বাহিনীটির কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইয়্যেদ মাজিদ মুসাভি।
শনিবার প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘ইরানের সম্মানিত জাতিকে আমি জানাতে চাই, আপনাদের জন্য জীবন উৎসর্গে প্রস্তুত মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আপনাদের পক্ষ থেকে শত্রুর ওপর ক্রোধের বজ্রাঘাত অব্যাহত রাখবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজ আমরা রক্তাক্ত হৃদয় ও গভীর শোক নিয়ে আমাদের শহীদ নেতাকে— যিনি ছিলেন যুগের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব— তার চিরস্থায়ী মর্যাদার আসনে বিদায় জানাচ্ছি। এ মুহূর্তে আমরা মহান আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করছি যে, তার নেতৃত্বে ইসলামি সমাজের জন্য নির্ধারিত মহান লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত আমরা এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকব না।’
‘ঐশী প্রতিশোধে’র হুঁশিয়ারি
আলি খামেনির জানাজাকে কেন্দ্র করে শুধু শোকই নয়, প্রতিশোধের বার্তাও জোরালোভাবে সামনে আনছে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব।
ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর প্রধান কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলি ওজমায়ি বলেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী শহিদ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির আদর্শ অনুসরণ অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘ঐশী প্রতিশোধ’ আসন্ন বলে সতর্ক করেছেন।
শনিবার প্রকাশিত এক বার্তায় ওজমায়ি বলেন, ‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত নৌবাহিনীর সব সদস্যের সঙ্গে তিনিও দৃঢ়তা ও অবিচলতার সঙ্গে আয়াতুল্লাহ খামেনির পথ অনুসরণ করে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সন্ত্রাসী যুক্তরাষ্ট্র এবং অবৈধ শাসক-চক্র ইহুদিবাদী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আল্লাহর প্রতিশোধ বেশি দূরে নয়। সত্যের পতাকা মর্যাদা ও শক্তির সর্বোচ্চ শিখরে উড্ডীন থাকবে।’
কমান্ডার ওজমায়ি খামেনির জানাজাকে তার আদর্শের প্রতি নতুন করে আনুগত্যের শপথ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, এই শপথের মাধ্যমে ইসলামি উম্মাহর প্রতিরক্ষা এবং ‘দাম্ভিক ও খোদাদ্রোহী ফ্রন্টে’র বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যারা এই অপরাধ করেছে, তারা ভেবেছিল সত্যের পথকে থামিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তারা নিজেদের ইতিহাসের নিন্দা এবং এই জাতির ক্রোধ ও কঠোর প্রতিশোধের মুখোমুখি করেছে।’
যুদ্ধের পর শাসকগোষ্ঠীর শক্ত অবস্থান
এমন এক সময়ে এই রাষ্ট্রীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্ব নিজেদের বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার পরও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা টিকে আছে— এ কথাই জোর দিয়ে প্রচার করছে তেহরান। যুদ্ধবিরতির পর সরকার দাবি করছে, তারা একটি ‘সুপারপাওয়ারে’র বিরুদ্ধে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে এবং এই সমঝোতা শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশে সরকারের প্রতি প্রকৃত জনসমর্থন কতটা, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কারণ যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ, সেই আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে হাজারো মানুষ নিহত হন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর প্রকাশ্যে সেই সরকারবিরোধী আন্দোলনের বড় ধরনের উপস্থিতি আর দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বিদেশি হামলা সাময়িকভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে আড়াল করে জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্ররক্ষার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
যুদ্ধের ভয়াবহ মূল্য
ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শুধু সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যরাই নন, দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর উচ্চপদস্থ কমান্ডার এবং সামরিক কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়েছে একাধিক সামরিক ঘাঁটি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনা। এতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান।
অন্যদিকে ইরানও পালটা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। পাশাপাশি উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে হরমুজ প্রণালিতে, যেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করে ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। দেশটির অভ্যন্তরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর চাপও বাড়তে থাকে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ওয়াশিংটনের আগ্রহ বেড়ে যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে পরবর্তী সমঝোতা তৈরির ক্ষেত্রে এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বদলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চালচিত্র— লাভবান ইরান, শঙ্কিত প্রতিদ্বন্দ্বীরাঅর্থনীতিতে স্বস্তির প্রত্যাশা
গত মাসে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতার আওতায় বিদেশে আটকে থাকা ইরানের কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদ ছাড়ের পথ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির ওপর আরোপিত কয়েকটি আর্থিক নিষেধাজ্ঞা থেকেও সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অর্থনীতিকে চাপে রেখেছিল।
তেহরানের প্রত্যাশা, এসব পদক্ষেপ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সংকট মোকাবিলায় কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে।
খামেনির মৃত্যু ঘিরে ধর্ম ও রাজনীতির সমীকরণ
ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতা শুধু রাষ্ট্রপ্রধান নন; তিনি একই সঙ্গে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি এবং ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক অভিভাবক। শিয়া মতাদর্শ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা পৃথিবীতে দ্বাদশ ইমামের প্রতিনিধিত্বকারী ধর্মীয় কর্তৃত্বেরও প্রতীক।
ফলে যুদ্ধ চলাকালে শত্রুপক্ষের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু শুধু রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় আবেগেরও একটি বড় ঘটনা হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় প্রচারে তার মৃত্যুকে শিয়া ইসলামের দীর্ঘ শহীদ ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইনের শাহাদাত শিয়া মুসলিমদের কাছে আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের সর্বোচ্চ প্রতীক। বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির মৃত্যুকেও সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে ইরানি রাষ্ট্র, যাতে জনগণের ধর্মীয় আবেগ আরও শক্তিশালী হয় এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন সুসংহত করা যায়।
কেন বিলম্বে দাফন?
ইসলামে মৃত্যুর পর যত দ্রুত সম্ভব দাফন সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালে বিশাল জনসমাগমে নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কায় খামেনির দাফন বিলম্বিত করা হয়। গত মাসে অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরই পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়।
এক সপ্তাহের রাষ্ট্রীয় শোক
খামেনির মৃত্যুতে এক সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইরান সরকার। বৃহস্পতিবার রাতে প্রথমবারের মতো জনসাধারণের জন্য তার কফিন উন্মুক্ত করা হয়। শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত রাজধানীর ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় কফিন রাখা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
এরপর সোমবার রাজধানী তেহরানের কেন্দ্র জুড়ে বিশাল শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। পরে মরদেহ নেওয়া হবে ধর্মীয় শিক্ষা নগরী কোমে, যেখানে মঙ্গলবার আলাদা ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে।
বুধবার মরদেহ বিমানে করে নেওয়া হবে ইরাকে। শিয়া মুসলমানদের দুই পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বৃহস্পতিবার আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। সবশেষে মাশহাদে মধ্যযুগীয় শিয়া ইমাম রেজার মাজারের পাশে আলি খামেনিকে দাফন করা হবে।
এই পুরো কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেশ জুড়ে লাখো মানুষকে সংগঠিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। অংশগ্রহণকারীদের জন্য পরিবহন, খাবার ও আবাসনের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের নতুন বাস্তবতা
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের শাসনব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ছিল। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রচারে খামেনির মৃত্যুকে ‘শাহাদাত’ এবং জাতীয় প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনসমর্থন পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। তবে এটিই পুরো ইরানি সমাজের প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ এখনো নেই। কারণ যুদ্ধের আগে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছিল, আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশপ্রেমের প্রশ্নে সেই বিরোধিতা অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র নন; তিনি দেশটির ধর্মীয় বৈধতা, নিরাপত্তা কাঠামো এবং আঞ্চলিক কৌশলেরও মূল স্তম্ভ। ফলে তার মৃত্যু এবং পরবর্তী উত্তরাধিকার প্রশ্ন শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, শিয়া রাজনীতি এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-ইসরায়েল সম্পর্কের ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স, গার্ডিয়ান, এএফপি, আল-জাজিরা, বিবিসি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে শনিবার শোকের জনসমুদ্রে পরিণত হয় তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্স। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জাতীয় সংগীত, ধর্মীয় শোকগাথা ও পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে তার সপ্তাহব্যাপী দাফন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
১১ ঘণ্টা আগে
কমিউনিজমকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন হুমকি আখ্যা দিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশকে ইঙ্গিত করে তিনি তীব্র আক্রমণ শানান। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে ‘কমিউনিস্ট হুমকি’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং এ ধরনের মতাদর্শের সমর্থকরাই ‘১৭৭৬ সালের ৪ জুলাইয়ের শত্রু’।
১২ ঘণ্টা আগে
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে প্রথমবারের মতো খামেনির কফিন জনসাধারণের সামনে আনা হয়। এ সময় হাজারো ইরানি কান্নায় ভেঙে পড়েন। শোকগীতি গাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা দুলতে থাকেন এবং মাথায় আঘাত করতে থাকেন। কফিনের ওপর ফুল ছুড়ে দেওয়া হলে সেগুলো পরে জনতার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
১৩ ঘণ্টা আগে
গত এপ্রিলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনার সময় ইরানের পক্ষে প্রতিনিধিত্বারীদের হত্যার ‘ষড়যন্ত্র’ করেছিল ইসরায়েল। আর এ বিষয়ে ইরানকে সতর্ক করে দিয়েছিল খোদ যুক্তরাষ্ট্র। বলেছিল, তেহরান যেন এ পরিকল্পনার বিষয়ে সজাগ থাকে।
১৪ ঘণ্টা আগে