দ্বিতীয় সেমিতে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড— মেসি-কেইনের দ্বৈরথ নাকি ইতিহাসের উত্তাপ

ক্রীড়া ডেস্ক
আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ১৪: ৪৭
আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি (বাঁয়ে) ও ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন (ডানে)। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে বৃহস্পতিবার আটলান্টা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে দুই দল। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ আছে, যেগুলো কেবল কেবল মাঠের লড়াই নয়, বরং নানা ঘটনা আর সময়ের ধারাবাহিকতায় সেসব ম্যাচ পরিণত হয় ইতিহাসে। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া তেমনই একটি অধ্যায়। ১৯৬৬, ১৯৮৬, ১৯৯৮ কিংবা ২০০২— দুই দলের প্রতিটি বিশ্বকাপ সাক্ষাৎ ফুটবলকে দিয়েছে নতুন গল্প। কোথাও বিতর্ক, কোথাও প্রতিশোধ, কোথাও অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্য। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফের মুখোমুখি দুই দল।

আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য বলেছেন, এটি ‘শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ’। একই সুর ইংল্যান্ড শিবিরেও। ম্যাচটিকে রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক আবেগের বদলে কেবল একটি বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল হিসেবেই দেখার আহ্বান জানিয়েছেন আর্জেন্টিনা কোচ। এমনকি আর্জেন্টিনার মালভিনাস (ফকল্যান্ড) যুদ্ধের ভেটেরানরাও সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন, এ ম্যাচকে যুদ্ধের প্রতীক না বানিয়ে ফুটবলের উৎসব হিসেবেই দেখতে।

তবে বাস্তবতা হলো— এই ইতিহাসকে পুরোপুরি আলাদা করাও সম্ভব নয়। দুই দেশের ফুটবল-সম্পর্কে অতীতের ছায়া থাকবেই।

কিন্তু এবারের সেমিফাইনালের সবচেয়ে বড় গল্প অতীত নয়, বর্তমান। এটি এমন দুই দলের লড়াই, যাদের সেমিফাইনালে পৌঁছানোর পথ একরকম নয়। আর্জেন্টিনাকে দৃশ্যত নকআউটে সংগ্রাম করে পার হতে হয়েছে একেকটি ধাপ। একাধিকবার পিছিয়েও পড়তে হয়েছে। তারপরও মাঠে টিকে থেকে স্নায়ুর লড়াইয়ে জয় ছিনিয়ে আনার সক্ষমতা দেখিয়েছেন লিওনেল মেসিরা। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান তাই আর্জেন্টিনার এবারের যাত্রাকে আখ্যা দিয়েছে ‘সাফারিংস’-এর ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা এক অভিযাত্রা হিসেবে।

কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই গোল করে সতীর্থদের সঙ্গে উচ্ছ্বাসে মাতেন আর্জেন্টিনার হুলিয়ান আলভারেজ। ম্যাচে ৩-১ গোলে জয় পায় আর্জেন্টিনা। ছবি: সংগৃহীত
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই গোল করে সতীর্থদের সঙ্গে উচ্ছ্বাসে মাতেন আর্জেন্টিনার হুলিয়ান আলভারেজ। ম্যাচে ৩-১ গোলে জয় পায় আর্জেন্টিনা। ছবি: সংগৃহীত

ইংল্যান্ডের পথও অবশ্য অতটা সহজ ছিল না। টমাস টুখেলের দলকেও নকআউটে বারবার প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও জয়, মেক্সিকোর বিপক্ষে ১০ জন নিয়ে লড়াই, আর কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জুড বেলিংহামের জোড়া গোলে নাটকীয় জয়— প্রতিটি ম্যাচই তাদের মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়েছে।

ফলে দুই দলের জন্যই সেমিফাইনালের লড়াই এসেছে ভিন্ন মাত্রা নিয়ে। একদিকে স্কালোনির দল, যারা বলের দখল ও ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে লড়াইকে শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষায় নিয়ে যেতে দ্বিধা করে না। অন্যদিকে টুখেলের ইংল্যান্ড, যারা কাঠামোগত শৃঙ্খলা, মাঝমাঠের শক্তি আর দ্রুত ভার্টিক্যাল আক্রমণের সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে ভেঙে ফেলতে চায়।

রাউন্ড অব ১৬-তে মেক্সিকোর বিপক্ষে দুর্দান্ত পেনাল্টিতে ইংল্যান্ডের জয়সূচক গোল করেন হ্যারি কেইন। ৩-২ গোলের জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে ইংল্যান্ড। ছবি: সংগৃহীত
রাউন্ড অব ১৬-তে মেক্সিকোর বিপক্ষে দুর্দান্ত পেনাল্টিতে ইংল্যান্ডের জয়সূচক গোল করেন হ্যারি কেইন। ৩-২ গোলের জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে ইংল্যান্ড। ছবি: সংগৃহীত

শক্তিমত্তার লড়াই: কোথায় এগিয়ে আর্জেন্টিনা, কোথায় ইংল্যান্ড?

আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের দুই দলের তারকার ছড়াছড়ি। রক্ষণ থেকে শুরু করে মাঝমাঠ কিংবা আক্রমণভাগ— কাগজে-কলমে শক্তিমত্তার বিচারে কাউকেই বড় ব্যবধানে এগিয়ে রাখার সুযোগ নেই। আবার দুই দলের খেলার ধরন, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি আর আক্রমণের উৎসও একেবারেই ভিন্ন।

আক্রমণভাগ: মেসির মেধা বনাম ইংল্যান্ডের বহুমাত্রিকতা

আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু এখনো লিওনেল মেসি। বয়স বাড়লেও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ, ডিফেন্স-স্প্লিটিং পাস আর ফাইনাল থার্ডে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় তিনি এখনো অনন্য। এবারের বিশ্বকাপে মেসি আগের তুলনায় আরও বেশি নিচে নেমে বল গ্রহণ করছেন।

ফলে মেসি শুধু গোলদাতা নন, আক্রমণের নির্মাতাও। বিশ্বকাপে নিজের নামের পাশে ৮টি গোল, দুটি অ্যাসিস্ট আর ৮টি ‘বিগ চান্স’ তৈরি তাকে ৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভয়ংকর খেলোয়াড়দের একজনে পরিণত করেছে।

রাউন্ড অব ৩২-এ কেপ ভার্দে ম্যাচের ২৯ মিনিটের মাথায় দুর্দান্ত ফিনিশে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত
রাউন্ড অব ৩২-এ কেপ ভার্দে ম্যাচের ২৯ মিনিটের মাথায় দুর্দান্ত ফিনিশে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত

মেসির চারপাশে যারা খেলছেন— বিশেষ করে হুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্টিনেজ, নিকো গনসালেস কিংবা মাঝেমধ্যে ভেতরে ঢুকে পড়া মিডফিল্ডার— তারাও আর্জেন্টিনার আক্রমণকে গতি দিচ্ছেন। ফলে মেসির ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি দলগত পারফরম্যান্সকেও গুরুত্ব দিচ্ছে আর্জেন্টিনা।

ইংল্যান্ডের আক্রমণের ধরন আবার কিছুটা আলাদা। হ্যারি কেইন প্রায়ই নিচে নেমে এসে খেলা গড়েন। আর তার তৈরি করা জায়গায় বেলিংহাম, সাকা কিংবা অ্যান্থনি গর্ডনের মতো খেলোয়াড়রা আক্রমণে ঢুকে পড়েন। টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ডের আক্রমণ আগের তুলনায় অনেক বেশি ভার্টিক্যাল ও দ্রুতগতির। মাঝমাঠ থেকে সরাসরি আক্রমণে যাওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে।

মাঝমাঠ: সেমিফাইনালের আসল যুদ্ধ

এই ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারিত হতে পারে মাঝমাঠে। আর্জেন্টিনার শক্তি তাদের ভারসাম্য। ডিফেন্সিভ মিডের লিয়ান্দ্রে পারদেস থেকে শুরু করে এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও ডি পল— আর্জেন্টিনার এই মাঝমাঠই গত বিশ্বকাপে শিরোপা এনে দিয়েছে। এবারও এদের ওপরই ভরসা করছেন স্কালোনি।

তবে মাঝমাঠ গত বিশ্বকাপের তুলনায় গতি হারিয়েছে, সৃজনশীলতাতেও পিছিয়ে পড়েছে। এই চারজনই এখনো বলের দখল ধরে রাখা, প্রেস ভাঙা ও আক্রমণের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। প্রয়োজন হলে তাদের একজন নিচে নেমে বিল্ড-আপে সাহায্য করেন, আবার আরেকজন আক্রমণে যোগ দেন। প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম না করলেও এই মিডফিল্ড শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে জয়ও এনে দিচ্ছে ম্যাচের পর ম্যাচে।

নরওয়ে বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে জয়সূচক গোলটি করেন ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম। এই গোলে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ছয়ে নিয়ে যান ইংলিশ মিডফিল্ডার। ছবি: সংগৃহীত
নরওয়ে বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে জয়সূচক গোলটি করেন ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম। এই গোলে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ছয়ে নিয়ে যান ইংলিশ মিডফিল্ডার। ছবি: সংগৃহীত

বিপরীতে ইংল্যান্ডের মিডফিল্ড অনেক বেশি শারীরিক ও গতিশীল। ডেকলান রাইস বল পুনরুদ্ধার ও রক্ষণকে সুরক্ষা দেন, আর জুড বেলিংহ্যাম দুই বক্সের মাঝখানে অবিরাম দৌড়ে ম্যাচের ছন্দ বদলে দিতে পারেন। টুখেলের পরিকল্পনায় মাঝমাঠ শুধু বল দখলের জায়গা নয়, বরং দ্রুত আক্রমণ শুরুর প্ল্যাটফর্ম।

এ কারণে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে— ইংল্যান্ড কি আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডকে সময় ও জায়গা দেবে, নাকি শুরু থেকেই তাদের ওপর চাপ তৈরি করবে?

রক্ষণ: সংগঠন বনাম শক্তি

স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনার রক্ষণ শুধু চার ডিফেন্ডারের ওপর নির্ভর করে না। পুরো দল মিলে একটি কমপ্যাক্ট ব্লক তৈরি করে। বল হারানোর পর দ্রুত রিকভারি ও মাঝমাঠ থেকে রক্ষণে নেমে আসার প্রবণতা তাদের অন্যতম শক্তি। ফলে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, নিকোলাস ওটামেন্ডি, মেদিনার মতো রক্ষণের খেলোয়াড়ের পাশাপাশি পারদেস এবং এমনকি মেসিকে পর্যন্ত ডিফেন্স লাইনে নেমে পড়তে দেখা যাচ্ছে হরহামেশাই।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের আগে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার ম্যারিয়েটার আটলান্টা ইউনাইটেড ট্রেনিং গ্রাউন্ডে অনুশীলনে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের আগে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার ম্যারিয়েটার আটলান্টা ইউনাইটেড ট্রেনিং গ্রাউন্ডে অনুশীলনে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত

ইংল্যান্ডের রক্ষণ আরও শারীরিক। তারা আকাশে শক্তিশালী, সেট-পিস সামলাতে দক্ষ এবং ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতেও আত্মবিশ্বাসী। তবে দ্রুত ছোট পাসের সমন্বয় ও পজিশন পরিবর্তনের বিপক্ষে কখনো কখনো তাদের রক্ষণকে সমস্যায় পড়তে দেখা গেছে। যদি মেসি দুই লাইনের মাঝখানে নিয়মিত বল পান, তাহলে ইংল্যান্ডের সেন্টার-ব্যাকদের সামনে উঠে আসতে হতে পারে। আর সেখানেই তৈরি হতে পারে বিপজ্জনক ফাঁকা জায়গা।

বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের আগে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির কানসাস সিটির সোয়োপ সকার ভিলেজে অনুশীলনে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের আগে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির কানসাস সিটির সোয়োপ সকার ভিলেজে অনুশীলনে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন। ছবি: সংগৃহীত

বেঞ্চ: ম্যাচ ঘোরানোর অস্ত্র

বিশ্বকাপের নকআউটে প্রায়ই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেন বদলি খেলোয়াড়রা। আর্জেন্টিনার বেঞ্চ বলতে গেলে পুরোটাই তারুণ্য আর গতিতে ভরপুর। সেখানে আক্রমণভাগের জন্য যেমন রয়েছেন নিকো পাজ, গিউলিয়ানো সিমিওনে, হোসে লোপেজের মতো খেলোয়াড়রা। জিওভানি লো সেলসো, মার্কোস সেনেসি, ইজেকিউয়েল প্যালাসিওর মতো মিডফিল্ডাররাও রয়েছেন। সঙ্গে রয়েছেন ভ্যালেন্টিন বার্কো, ফাকুন্দো মেদিনার মতো ডিফেন্ডাররাও। এখন পর্যন্ত ফরমেশন তেমন একটা না ভাঙা স্কালোনির সামনে তাই সুযোগ রয়েছে বদলি খেলোয়াড় দিয়ে হলেও ফরমেশন ভেঙে খেলা নিয়ন্ত্রণের।

ইংল্যান্ডের বেঞ্চও সমান শক্তিশালী। বিশেষ করে শেষ ৩০ মিনিটে গতি বাড়ানো কিংবা অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে টুখেলের হাতে একাধিক বিকল্প রয়েছে। বুকায়ো সাকা, মরগান রজার্স, মার্কাস রাশফোর্ডের মতো তারকাদেরও টুখেল এখন পর্যন্ত বদলি হিসেবেই ব্যবহার করছেন স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। ছবি: সংগৃহীত
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। ছবি: সংগৃহীত

২ কোচের লড়াই

এই ম্যাচে আরেকটি বড় আকর্ষণ দুই কোচের কৌশল। স্কালোনির সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল প্রতিপক্ষ অনুযায়ী পরিকল্পনা বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। ২০২২ বিশ্বকাপে তিনি একাধিক নকআউট ম্যাচে ভিন্ন ফরমেশন ও ভিন্ন একাদশ ব্যবহার করেছিলেন। এবারের টুর্নামেন্টে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও নকআউটের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি আবারও চমক দিতে পারেন— এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

নরওয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল। ছবি: সংগৃহীত
নরওয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে থমাস টুখেল দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপের সবচেয়ে কৌশলী কোচদের একজন হিসেবে পরিচিত। ম্যাচের ভেতরে কাঠামো বদলানো, প্রতিপক্ষের শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করার পরিকল্পনা এবং সময়োপযোগী বদলি— এসব ক্ষেত্রে তার সুনাম রয়েছে। তাই এই সেমিফাইনাল কেবল মেসি-কেইন বা আলভারেজ-বেলিংহামের নয়, এটি স্কালোনি বনাম টুখেলেরও লড়াই।

ম্যাচের ভাগ্য গড়তে পারেন যারা

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো ম্যাচে আলো স্বাভাবিকভাবেই লিওনেল মেসি, হ্যারি কেইন বা জুড বেলিংহ্যামের মতো তারকাদের ওপর থাকে। কিন্তু এমন ম্যাচের ভাগ্য অনেক সময় নির্ধারিত হয় এমন কিছু দ্বৈরথে, যেগুলো স্কোরশিটে সব সময় ধরা পড়ে না। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড লড়াইটিও তেমন হতে পারে।

লিওনেল মেসি বনাম ইংল্যান্ডের মিড-ব্লক

এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই লিওনেল মেসি। মজার ব্যাপার হলো— দুই দশকেরও বেশি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এই প্রথমবার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন তিনি। আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম একে বলছে— ভাগ্য যেন ম্যাচটি মেসির জন্য তুলে রেখেছিল।

তবে ২০২৬ সালের মেসির ভূমিকা ২০২২ সালের মতো নয়। তিনি এখন আর শুধু অ্যাটাকিং থার্ডে বেশি মনোযোগী নন, বরং মাঝমাঠে নেমে এসে খেলা তৈরি করছেন নিয়মিতই। লো-ব্লকের সামনে দল যখন অসহায়, তখন ডান প্রান্তে সরে গিয়েও দারুণ সব আক্রমণ গড়ে তুলছেন। আবার প্রয়োজন হলে শেষ পাসটিও তিনিই দেন।

তাই ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে— মেসিকে থামানো নয়, মেসির জন্য জায়গা সংকুচিত করা। কারণ তাকে পুরো ৯০ মিনিট আটকানো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু খেলার মাঠে জায়গা কমিয়ে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কমিয়ে দেওয়া সম্ভব।

জুড বেলিংহ্যাম বনাম আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড

ইংল্যান্ডের এবারের বিশ্বকাপ অভিযানের সবচেয়ে বড় নায়ক হিসেবে একজনকে বেছে নিতে বলা হলে হ্যারি কেইনের বদলে অনেকে জুড বেলিংহামকেই বেছে নেবেন। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জোড়া গোল করে দলকে সেমিফাইনালে তুলেছেন তিনি। নকআউটে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছে।

তবে বেলিংহামকে শুধু একজন আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার ভাবলে ভুল হবে। তিনি কখনো দ্বিতীয় স্ট্রাইকার, কখনো বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার, আবার কখনো প্রেসিংয়ের প্রথম খেলোয়াড়। তাকে কোথায় থামানো হবে, সেটিই স্কালোনির অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত।

ছন্দের নিয়ন্ত্রক এনজো-ম্যাক অ্যালিস্টার

আর্জেন্টিনা কেবল নয়, বিশ্বকাপেরই সবচেয়ে বড় তারকা মেসি। তবে দলের খেলার ছন্দ অনেকটাই নির্ভর করছে এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ওপর। তারা দুজনই বলের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন, প্রেস ভাঙেন, আক্রমণের প্রথম পাসটি দেন। এমনকি একটু নিচের দিকে নেমে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল ছিনিয়ে নিয়েও নিজেদের দখল নিশ্চিত করছেন।

যদি ইংল্যান্ড তাদের ওপর শুরু থেকেই চাপ তৈরি করতে পারে, তাহলে মেসির কাছেও বল পৌঁছাতে সময় লাগবে। অন্যদিকে এই দুজন যদি চাপের মধ্যেও প্রথম লাইন ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারেন, তাহলে ইংল্যান্ডের রক্ষণ সরাসরি পরীক্ষার মুখে পড়বে।

ডেকলান রাইস: ইংল্যান্ডের ভারসাম্যের কেন্দ্র

ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় সম্ভবত ডেকলান রাইস। কোয়ার্টার ফাইনালের পর তার ফিটনেস নিয়ে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি অনুশীলনে ফিরেছেন এবং সেমিফাইনালে খেলার সম্ভাবনাই বেশি।

রাইসের কাজ শুধু বল কেড়ে নেওয়া নয়। তাকে একই সঙ্গে মেসিকে নজরে রাখতে হবে, এনজো-ম্যাক অ্যালিস্টারের পাসিং লেন বন্ধ করতে হবে, আবার আক্রমণ শুরুও করতে হবে। এই বহুমুখী দায়িত্বই তাকে ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।

হুলিয়ান আলভারেজ বনাম স্টোনস-কনসা

মেসিকে ঘিরে আলোচনা হলেও গত বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনা নিয়ে আলোচনায় অন্যতম নাম হুলিয়ান আলভারেজ। শেষ ম্যাচেও শেষ মুহূর্তে দূরপাল্লার শটে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলও করেছেন তিনি। স্কালোনির প্রথম একাদশেও তিনি এখন নিয়মিত মুখ।

স্কালোনির আক্রমণভাগে আলভারেজই প্রথম প্রেশার তৈরি করেন। সেন্টার-ব্যাকদের ভুল করাতে বাধ্য করা, ডিফেন্সের পেছনে দৌড় দেওয়া এবং মেসির জন্য জায়গা তৈরি— এই তিনটি ভূমিকাতেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ।

ইংল্যান্ডের রক্ষণের জন স্টোনস-এজরি কনসা জুটির ওপরই সম্ভবত সেমিফাইনালে দায়িত্ব থাকবে আলভারেজকে আটকানোর। আলভারেজ তাদের জন্য হয়ে উঠবেন বাড়তি চাপ, কারণ তাদের সামনে মেসিও থাকবেন!

৫ ট্যাকটিক্যাল দ্বৈরথ

দ্বিতীয় এই সেমিফাইনালের ফল অনেকটাই নির্ভর করতে পারে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তরের ওপর—

  • মেসি কি দুই লাইনের মাঝখানে নিয়মিত বল পেতে পারবেন, নাকি ইংল্যান্ডের মিড-ব্লক সেই জায়গা বন্ধ করে দেবে?
  • বেলিংহ্যামের বক্স-টু-বক্স দৌড় থামাতে আর্জেন্টিনা কি অতিরিক্ত একজন মিডফিল্ডার ব্যবহার করবে?
  • ডেকলান রাইস কি মেসি ও ম্যাক অ্যালিস্টারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারবেন?
  • হুলিয়ান আলভারেজের প্রেস কি ইংল্যান্ডের বিল্ড-আপে ভুল করাতে পারবে?
  • শেষ ৩০ মিনিটে বেঞ্চ থেকে নামা খেলোয়াড়দের মধ্যে কে ম্যাচের গতি বদলে দেবেন?

রোড টু সেমিফাইনাল: এক দলের সংগ্রাম, অন্য দলের পুনর্জাগরণ

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পৌঁছানোর পর আর কোনো জয়ই সহজ নয়। কখনো ফুটবল জেতায় আধিপত্য, কখনো ধৈর্য, আবার কখনো শুধু মানসিক দৃঢ়তা। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড— দুই দলও সেমিফাইনালে উঠেছে, কিন্তু তাদের যাত্রাপথ ছিল ভিন্ন চরিত্রের। এক দল ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পেয়েছে। অন্য দল প্রতিটি বাধা পেরিয়ে আরও দৃঢ় হয়ে উঠেছে।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও আর্জেন্টিনার যাত্রা কখনোই মসৃণ ছিল না। গ্রুপ পর্বেই বোঝা গিয়েছিল, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের মতো এবার প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে ট্যাকটিক্যালভাবে ছাপিয়ে যাওয়া সহজ হবে না। স্কালোনির দল বলের দখল ধরে রাখলেও অনেক ম্যাচে শেষ তৃতীয়াংশে কার্যকারিতার ঘাটতি ছিল। তবে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল— ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারালেও মানসিকভাবে ভেঙে না পড়া।

বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। টুর্নামেন্টে অপরাজিত থাকা দুই দলের গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত যাত্রাপথ ও ম্যাচের ফলাফল। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। টুর্নামেন্টে অপরাজিত থাকা দুই দলের গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত যাত্রাপথ ও ম্যাচের ফলাফল। ছবি: সংগৃহীত

নকআউটে সেই বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শেষ ষোলো ও কোয়ার্টার ফাইনাল— দুই ম্যাচেই আর্জেন্টিনাকে দীর্ঘ সময় চাপ সামলাতে হয়েছে। এমনকি অতিরিক্ত সময় পর্যন্তও গড়িয়েছে লড়াই। কিন্তু প্রতিবারই স্কালোনির দল পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। কোথাও রক্ষণ আরও কমপ্যাক্ট করেছে, কোথাও মাঝমাঠে অতিরিক্ত একজন খেলোয়াড় এনে প্রতিপক্ষের ছন্দ ভেঙেছে। ফিফার টেকনিক্যাল বিশ্লেষণেও আর্জেন্টিনার এই ‘গেম ম্যানেজমেন্ট’কে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ করে কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল আর্জেন্টিনার চরিত্রের পরীক্ষা। স্কোরলাইন যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল চাপের মধ্যে দলটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। স্কালোনির বদলি খেলোয়াড়দের ব্যবহার এবং ম্যাচের শেষ ভাগে কাঠামো পরিবর্তনের সিদ্ধান্তই দলকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে দেয়।

অন্যদিকে বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ডকে নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— নতুন কোচ থমাস টুখেলের অধীনে দলটি কত দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারবে? টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তরও তত পরিষ্কার হয়েছে। গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ড হয়তো চোখধাঁধানো ফুটবল খেলেনি, কিন্তু প্রয়োজনীয় ফল করেছে। আসল পরিবর্তন দেখা গেছে নকআউটে।

শেষ বত্রিশে কঙ্গো ডেমোক্রেটিক রিপাবলিকের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরে আসে তারা। কোয়ার্টার ফাইনালেও পিছিয়ে পড়েছিল নরওয়ের বিপক্ষে। এ ম্যাচ বের করতে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জুড বেলিংহ্যামের জোড়া গোলই ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালের টিকিট এনে দেয়।

টুখেলের ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো— দলটি এখন বলের দখলের চেয়ে স্পেসের নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে অকারণে ওপরে উঠে প্রেস করার প্রবণতা কমেছে, অন্যদিকে সুযোগ পেলেই দ্রুত ভার্টিক্যাল অ্যাটাকের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে তছনছ করে দেওয়ার চেষ্টাও বেড়েছে।

আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালে ওঠার গল্প বলছে— তারা এখনো নকআউট ফুটবলের সবচেয়ে মানসিকভাবে শক্তিশালী দলগুলোর একটি। প্রতিটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তারা ম্যাচের ভেতরে নতুন সমাধান খুঁজে বের করেছে। আর ইংল্যান্ডের গল্প বলছে— তারা আর শুধু প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের দল নয়, টুখেলের অধীনে তারা একটি সুসংগঠিত, কৌশলগতভাবে পরিণত ইউনিটে পরিণত হয়েছে।

ফলে সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল, যারা হয়তো দুই ভিন্ন পথে এসেছে, কিন্তু একটি জায়গায় এসে মিলেছে— চাপ সামলে জেতার ক্ষমতায়।

কোথায় নির্ধারিত হতে পারে ম্যাচের ভাগ্য?

বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খুব কমই নিছক তারকাদের লড়াই হয়ে থাকে। বেশির ভাগ সময় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে কয়েকটি ছোট ট্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্ত, একটি সফল বদলি কিংবা একটি মুহূর্তের ভুল। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের এই লড়াইটিও সে পথেই এগোতে পারে।

এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হবে সম্ভবত মাঝমাঠে। আর্জেন্টিনা চাইবে এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও রদ্রিগো ডি পলের সমন্বয়ে বলের দখল ধরে রেখে মেসির জন্য জায়গা তৈরি করতে। ইংল্যান্ডের লক্ষ্য হবে সেই সংযোগটাই বিচ্ছিন্ন করা।

ডেকলান রাইস যদি মেসি ও আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডের মাঝের পাসিং লেন বন্ধ করতে পারেন, তাহলে স্কালোনির দলের আক্রমণ অনেকটাই ধীর হয়ে যাবে। অন্যদিকে এনজো ও ম্যাক অ্যালিস্টার যদি প্রথম প্রেস ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারেন, তাহলে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে নিয়মিত পিছিয়ে যেতে হবে।

বড় প্রশ্ন হিসেবে এ ম্যাচের আগে আলোচনায় রয়েছে স্কালোনির চমক দেওয়ার সম্ভাবনাও। ২০২২ বিশ্বকাপে স্কালোনির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল প্রতিপক্ষ অনুযায়ী একাদশ ও ফরমেশন বদলে দেওয়া। ২০২৬ বিশ্বকাপে তুলনামূলকভাবে তিনি অনেক বেশি স্থির থেকেছেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে কি তিনি আবারও বিশেষ কোনো কৌশল নেবেন?

মাঝমাঠে কি আপাত নিষ্প্রভ ডি পলকে সরিয়ে লো সেলসোর মতো সৃজনশীল মিডফিল্ডার ব্যবহার করবেন? বিশ্বকাপ জুড়ে উইংয়ে দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠোয় নিকো পাজ বা সিমিওনি বা বার্কোকে কি ব্যবহার করবেন উইংয়ে গড়ি বাড়াতে? মেসির ভূমিকাই বা কী হবে— ফলস নাইন নাকি রাইট উইংগার? নাকি আরও স্বাধীন কোনো ভূমিকা?

যদি স্কালোনি ম্যাচের শুরুতেই ট্যাকটিক্যাল চমক দিতে পারেন, তাহলে ইংল্যান্ডকে প্রথম ২০ মিনিটেই পরিকল্পনা বদলাতে হতে পারে।

সেটপিসও এ ম্যাচের রেজাল্ট নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে যেকোনো সময়, সেটি হোক একটি কর্নার বা একটি ফ্রি-কিক। ইংল্যান্ডকে ঐতিহ্যগতভাবেই সেটপিসে শক্তিশালী বিবেচনা করা হয়। আর্জেন্টিনাও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ জায়গায় অনেক উন্নতি করেছে। এবারের বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার স্বস্তি ফেরানো গোলের কয়েকটিই এসেছে সেটপিস থেকে, যার মধ্যে কর্নারে হেড থেকে সরাসরি ফ্রি-কিকের গোলও রয়েছে।

আর বরাবরের মতোই সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি গড়ে দিতে পারেন সেই একজন— লিওনেল মেসি। সবাই স্বীকার করেন, মেসিকে পুরো ম্যাচে আটকে রাখা প্রায় অসম্ভব। আবার মেসি যত বেশি সময় বল নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন, আর্জেন্টিনার আক্রমণ তত বেশি বিপজ্জনক হবে। তাই ইংল্যান্ডের প্রেসের গতি এবং মাঝমাঠের কমপ্যাক্টনেসই এখানে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য একাদশ

গোলরক্ষক: এমিলিয়ানো মার্তিনেজ

রক্ষণ: নাহুয়েল মোলিনা, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, নিকোলাস তালিয়াফিকো

ডিফেন্সিভ মিড: লিয়ান্দ্রে পারদেস

মিডফিল্ড: রদ্রিগো দি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার

আক্রমণ: লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ

ইংল্যান্ডের সম্ভাব্য একাদশ

গোলরক্ষক: জর্ডান পিকফোর্ড

রক্ষণ: কাইল ওয়াকার, মার্ক গেহি, জন স্টোনস, এজরি কনসা

ডিফেন্সিভ মিড: ডেকলান রাইস, কোবি মাইনু

মিডফিল্ড: বুকায়ো সাকা, জুড বেলিংহ্যাম, অ্যান্থনি গর্ডন

আক্রমণ: হ্যারি কেইন

কে হাসবে শেষ হাসি?

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচকে শুধু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন দুই দলের লড়াই, যারা দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনে বিশ্বাস করে। আর্জেন্টিনা বিশ্বাস করে ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে নিজের খেলায় টেনে আনার ওপর। ইংল্যান্ড বিশ্বাস করে ম্যাচের গতি বদল আর প্রতিপক্ষের ভুলের সুযোগ নেওয়ায়।

একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে বহু প্রতীক্ষিত শিরোপার স্বপ্ন। একদিকে মেসির শেষ বিশ্বকাপ অভিযানের আবেগ। অন্যদিকে কেইন-বেলিংহামদের নতুন ইতিহাস লেখার আকাঙ্ক্ষা। সবকিছুর মিলিয়েই দ্বিতীয় এ সেমিফাইনাল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আবেগঘন লড়াইয়ের পাশাপাশি আকর্ষণীয় ট্যাকটিক্যাল পরীক্ষা হয়েও এসেছে সামনে।

ad
ad

খেলা থেকে আরও পড়ুন

সেমিতে হেরে রেফারির যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ফ্রান্স কোচ দেশমের

ম্যাচে রেফারির দায়িত্বে ছিলেন এল সালভাদরের ইভান বার্টন। তার পেনাল্টির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে দেশম প্রশ্ন তুলেছেন, বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল পরিচালনার মতো মান আদৌ রেফারির ছিল কি না। তবে একই সঙ্গে স্পেনের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে হারের দায়ও নিজেদের কাঁধেই নিয়েছেন অভিজ্ঞ এই ফরাসি কোচ।

৬ ঘণ্টা আগে

ফ্রান্সের গতির ঝড় থামিয়ে ফাইনালে ধৈর্যশীল স্পেন

শেষ বাঁশি বাজিয়েছেন রেফারি। সেই সঙ্গে শেষ হলো বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল। সেখানে দাপুটে এক জয় নিয়ে ফাইনালে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করল স্পেন। ফ্রান্সের গতিকে থামিয়ে পজেশনাল ফুটবলের অনন্য নৈপুণ্য দেখিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখল লা ফুয়েন্তের তারুণ্যে ঠাসা দলটি।

১৮ ঘণ্টা আগে

ফ্রান্স-স্পেনের সেমিফাইনাল ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন যারা

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি কৌশলগত লড়াইও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্পেন-ফ্রান্স ম্যাচেও কয়েকটি নির্দিষ্ট দ্বৈরথের দিকে থাকবে সবার নজর। এমবাপ্পেকে কীভাবে সামলাবে স্পেন, ইয়ামালকে কীভাবে থামাবে ফ্রান্স, আর মাঝমাঠে রদ্রি-পেদ্রির সঙ্গে র‌্যাবিও-মানু কোনের লড়াই— এসবই নির্ধারণ করে

১ দিন আগে

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তাড়া করে ফেরে অতীতের ভূত!

স্পেন, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড—শেষ চারে থাকা চার দলই এবার এমন এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে, যেখানে বর্তমানের প্রতিপক্ষের পাশাপাশি লড়তে হবে নিজেদের অতীতের স্মৃতি, সাফল্য ও ব্যর্থতার সঙ্গেও। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিশ্বকাপের ইতিহাস কীভাবে প্রতিটি সেমিফাইনালকে আরও বেশি চা

১ দিন আগে