হ্যারি কেইন ম্যাজিকে কঙ্গোর প্রাচীর পেরোল ইংল্যান্ড

ক্রীড়া ডেস্ক
আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ০১: ৪০
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে জয়সূচক গোলের পর হ্যারি কেইনের উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত

ম্যাচের বয়স মাত্র ৭ মিনিট। ব্রায়ান সিপেঙ্গার গোলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লিড ডিআর কঙ্গোর! এরপর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসিসহ কঙ্গোর ডিফেন্ডারররা যেন হয়ে উঠলেন চীনের প্রাচীর, যেখানে গিয়ে বারবার ফিরে আসতে হচ্ছিল ইংল্যান্ডের ফরোয়ার্ডদের। অসাধারণ আর অবিশ্বাস্য সব সেভে ৭৫ মিনিট পর্যন্ত ইংল্যান্ডকে বারবার প্রতিহত হতে হচ্ছিল সেই প্রাচীরে।

শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের হয়ে জ্বলে উঠলেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন। বুঝিয়ে দিলেন কেন তাকে সময়ের অন্যতম সেরা ফিনিশার বলা হয়। ৭৫ মিনিটে দারুণ এক হেডে বল জালে জড়িয়ে ‘লাইফলাইন’ এনে দিলেন ইংল্যান্ডকে। ৮৬ মিনিটে ডি-বক্সের মধ্যে দারুণ শারীরিক ভারসাম্য রেখে দুর্দান্ত শটে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল করে দলকে এনে দিলেন ২-১ গোলের লিড। ইংল্যান্ডকে নকআউটের প্রথম পর্বের বৈতরণী পার করিয়ে দিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় বাংলাদেশ সময় বুধবার (১ জুলাই) রাত ১০টায় রাউন্ড অব থার্টি টুয়ের ম্যাচে মাঠে নেমেছিল ইংল্যান্ড ও ডিআর কঙ্গো। ম্যাচের শুরু আর শেষের দৃশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে কঙ্গোর উল্লাসে ম্যাচ শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত শেষ হাসি হেসেছে ইংল্যান্ড। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েই গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটে ওঠা কঙ্গোর এবারের বিশ্বকাপযাত্রা শেষ হয়েছে শেষ ১৫ মিনিটের কেইন ম্যাজিকে।

কাগজে-কলমে কঙ্গোর তুলনায় অনেক শক্তিশালী দল নিয়ে মাঠে নামা ইংল্যান্ড শুরু থেকেই গতিশীল আর আক্রমণাত্মক ফুটবলের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু সপ্তম মিনিটেই বদলে যায় দৃশ্যপট। অধিনায়ক শানসেল এমবেম্বার বাড়িয়ে দেওয়া বল ডি-বক্সের বাঁ দিকে পেয়ে যান কঙ্গোর ফরোয়ার্ড ব্রায়ান সিপেঙ্গা। ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডকে ফাঁকি দিয়ে ডান পায়ের দারুণ এক শটে জালের একদম নিচের বাঁ দিকের কোনা খুঁজে নেন। গ্যালারিতে তখন নীল রঙের জোয়ার।

অপ্রত্যাশিতভাবে পিছিয়ে পড়েই গোল শোধে মরিয়া হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড। একের পর এক আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে কঙ্গোর রক্ষণভাগকে। এর সধ্যে কয়েকবার গোল পেতে পেতেও পাওয়া হয়নি ইংল্যান্ডের।

ম্যাচের ৩০ মিনিটের মাথায় শূন্যে ভেসে আসা একটি ক্রস বাতাসে ভেসে লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত হেডে গোলপোস্টের ডান দিকে পাঠিয়েছিলেন জুড বেলিংহাম। কিন্তু কঙ্গোর গোলরক্ষক এমপাসি প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান তার সামনে। অসামান্য রিফ্লেক্সে বল ফেরান। প্রায় নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত করেন ইংল্যান্ডকে।

এমপাসির বীরত্বের পাশাপাশি ইংল্যান্ডের দুর্ভাগ্যের এখানেই শেষ নয়। ঠিক ৫ মিনিট পরেই ৩৫ মিনিটের মাথায় মার্কাস রাশফোর্ড ডি-বক্সের মধ্যে বল পেয়েই জোরালো শটে জালে পাঠানোর চেষ্টা করেন। এবার কঙ্গোর এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বলটি ব্লক হয়ে গেলে সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয় ইংলিশদের।

ইংল্যান্ডের অব্যাহত আক্রমণের মুখে প্রায়ই কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল ডিআর কঙ্গো, কিন্তু আক্রমণগুলো জমছিল না। ৪২ মিনিটে ম্যাচের গতির বিপরীতে এবার দারুণ সুযোগ পেয়ে যায় কঙ্গো।

ইংলিশ দুই ডিফেন্ডার এজরি কনসা আর মার্ক গেহির পজিশনে না থাকার সুযোগ নিয়ে বক্সের ভেতরে বল বাড়িয়ে দেন অ্যারন ওয়ান-বিসাকা। ফরোয়ার্ড ইয়োয়ানে উইসা বল পেয়ে প্রথম ছোঁয়াতেই নিয়েছিলেন দারুণ শট। বলটি পোস্টের একদম কোনায় লেগে ফিরে এলে ব্যবধান বাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি কঙ্গোর। কেইন বাহিনীও বেঁচে যায় দ্বিতীয় গোল হজম করা থেকে।

দুই মিনিট পরে মাঝমাঠ থেকে বাড়িয়ে দেওয়া লম্বা পাস তাড়া করে কঙ্গোর ডি-বক্সের ঢুকে পড়েন হ্যারি কেইন। পজিশন থেকে সামনে এনে গোলরক্ষক এমপাসি প্রতিহত করেন কেইনকে, দুজনেই পড়ে যান ডি-বক্সে। কেইন ও সতীর্থরা এ সময় পেনাল্টির জন্য জোরালো আবেদন করেন। কিন্তু লাভ হয়নি, রেফারি উলটো ফাউল দেন কেইনের বিপক্ষেই।

আক্রমণের ধারায় প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আরও একবার সমতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছিল ইংল্যান্ড। ডান দিক থেকে ভেসে আসা চমৎকার এক ক্রসকে হেডের মাধ্যমে গোলপোস্ট বরাবর পাঠিয়ে দিয়েছিলেন জুড বেলিংহাম। এবারে এমপাসি ঝাঁপিয়ে পড়ে যেভাবে বলটি বাইরে ঠেলে দেন তা এই বিশ্বকাপের সেরা সেভগুলোর একটি হয়ে থাকবে। বলা চলে নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয় ইংল্যান্ড। ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেই বিরতিতে যেতে হয় তাদের।

বিরতির পরও খেলার ধারায় খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। ৫৪ মিনিটের মাথায় আবার আক্রমণে বেলিংহাম। এবার তার দারুণ শট কঙ্গোর এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে জালেই জড়িয়ে যাচ্ছিল। আগের মতোই এবারও ত্রাতা হয়ে হাজির এমপাসি। ক্ষিপ্রতার সঙ্গে নিজের অবস্থান বদলে ঠেকিয়ে দেন সে বল। ১-০ গোলের লিড ধরে রাখে কঙ্গো।

ইংল্যান্ডকে গোলের অপেক্ষায় বারবার বঞ্চিত হতে হয় আরও ২০ মিনিট। শেষ পর্যন্ত ৭৫ মিনিটের মাথায় ডেডলক ভাঙেন ইংলিশ ক্যাপ্টেন হ্যারি কেইন। ৬০ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা অ্যান্থনি গর্ডন ডি-বক্সের বাঁ প্রান্ত থেকে দারুণ এক ক্রস ভাসিয়ে দেন মাঝ বরাবার। গোললাইনের কাছাকাছি থাকা কেইন এগিয়ে এসে ডি-বক্সের মাঝামাঝি খুঁজে নেন বল। দারুণ হেডে শেষ পর্যন্ত ভাঙতে পারেন এমপাসির প্রাচীর। এমপাসি হাত বাড়িয়ে বল ছুঁয়ে দিলেও জাল স্পর্শ করা থেকে ঠেকাতে পারেননি। ১১ সমতায় ফিরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ইংল্যান্ড।

১১ মিনিট পর ম্যাচের ৮৬ মিনিটের মাথায় আবারও গর্ডন-কেইন জুটির ম্যাজিক। ডি-বক্সের কিছুটা বাইরে থেকে বক্সের মাথায় মাঝামাঝিতে দাঁড়ানো কেইনের দিকে বল ঠেলে দেন গর্ডন। কেইন বল পেয়ে দারুণ শারীরিক ভারসাম্যে ঘুরে সামনে দাঁড়ানো কঙ্গোর তিন ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে দারুণ এক শট নেন। সেই শট আর এমপাসির পক্ষে ঠেকানো সম্ভব হয়নি। ২-০ গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড।

শেষ ৮ মিনিট আর যোগ করা ৬ মিনিটে কঙ্গো যথেষ্টই চেষ্টা করেছে আক্রমণে ফিরে ইংল্যান্ডের রক্ষণদুর্গ ভাঙার। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি। ইনজুরি টাইমের শেষ মিনিটে ডি-বক্সের একটু বাইরে ফ্রিকিকও পেয়েছিল তারা। উইসা শটও নিয়েছিলেন ভালোই, কিন্তু সেটি গোলবারের সামান্য ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেলে কঙ্গোর আশার সমাপ্তি ঘটে।

ম্যাচও শেষ হয়ে যায় সেখানেই। পুরো ম্যাচ দারুণ লড়াই করেও কেইনের ১১ মিনিটের ম্যাজিকে হতাশায় ভেঙে পড়া কঙ্গোর খেলোয়াড়দের বিপরীতে উল্লাসে মেতে ওঠেন ইংলিশ ফুটবলাররা। গ্যালারিতেও নীল ঢেউ থামিয়ে জোয়ার ওঠে সাদার।

শেষ বত্রিশের ফাঁড়া কাটিয়ে শেষ ষোলোতে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ স্বাগতিক মেক্সিকো। আগামী ৬ জুলাই বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে দুই দল। সে ম্যাচের বিজয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনালে শেষ ষোলোর ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচের বিজয়ীর মুখোমুখি হবে।

কেইনের রেকর্ড

১১ মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচে অধিনায়ক হ্যারি কেইনই সেরা পারফরমার। এই দুই গোলের মাধ্যমে এবারের বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা এখন ৫। সামনে রয়েছেন কেবল লিওনেল মেসি আর কিলিয়ান এমবাপ্পে।

তাছাড়া ১৯৯০ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে ক্যামেরনের বিপক্ষে জোড়া গোল পেয়েছিলেন ইংলিশ কিংবদিন্তি গ্যারি লিনেকার। ৩৬ বছর পর এই প্রথম আবার বিশ্বকাপের কোনো নকআউট ম্যাচে জোড়া গোলের দেখা পেলেন ইংলিশ ফুটবলার।

এদিকে দ্বিতীয় গোলের পর বিশ্বকাপে এখন কেইনের গোলসংখ্যা ১৩। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপে ১২ গোল করা ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলেকে ছাড়িয়ে গেলেন ইংলিশ ক্যাপ্টেন। ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপযাত্রা এগিয়ে নিতে হলে তাকে গোলের টালি আরও বাড়িয়ে নিতে হবে, তা বলাই বাহুল্য।

ad
ad

খেলা থেকে আরও পড়ুন

আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারাতে পারি — ভবিষ্যদ্বাণী কেপ ভার্দ প্রেসিডেন্টের

কেপ ভার্দ প্রেসিডেন্ট নেভেস বলেন, ‘আমরা জয়ের জন্যই খেলতে নামি। কোনো দলকে নিয়ে যখন প্রত্যাশা কম থাকে, কিন্তু সেই দলের জেতার প্রবল ইচ্ছা থাকে, তখন অসম্ভবও সম্ভব হতে পারে। কেপ ভার্দের মতো ছোট একটি দেশের সব সময় মানুষকে চমকে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।’

১৮ ঘণ্টা আগে

হাল্যান্ডের গোলে আইভরি কোস্টকে হারিয়ে ব্রাজিলের মুখোমুখি নরওয়ে

বিশ্বকাপে এর আগে কখনো নকআউট পর্বে জয়ের স্বাদ পায়নি নরওয়ে। ১৯৩৮ ও ১৯৯৮— দুবারই বিদায় নিতে হয়েছিল ইতালির কাছে। এবার ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেই সে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শেষ ষোলোতে উঠেছে ইউরোপের দলটি। অন্যদিকে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আইভরি কোস্ট আরেকটি সাহসী লড়াই উপহার দিলেও বিদা

১৯ ঘণ্টা আগে

রেকর্ড গড়া জিম্বাবুয়ের সামনে অসহায় বাংলাদেশ, ইনিংস ব্যবধানে হার

হারারের টেস্ট হয়ে থাকল জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়। নিজেদের টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয় তুলে নিয়েছে স্বাগতিকরা, আর সেই রেকর্ড গড়ার দিনে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে বাংলাদেশ।

১ দিন আগে

টাইব্রেকার ডাচদের বিদায় করে শেষ ১৬-তে মরক্কো

মন্টেরি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে শুরুতে কোডি গাকপোর গোলে লিড নেয় নেদারল্যান্ডস। তবে নির্ধারিত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে (৯০ মিনিটে) ইসা দিওপের দুর্দান্ত গোলে সমতায় ফেরে মরক্কো। অতিরিক্ত সময়েও আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।

২ দিন আগে