শ্রদ্ধঞ্জলি

মাহফুজা আপা: এক নক্ষত্রের পতন

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৫, ১৭: ৪৯
মাহফুজা খানম। প্রতিকৃতি: চ্যাটজিপিটি
মাহফুজা খানম। প্রতিকৃতি: চ্যাটজিপিটি

বাংলার আকাশে মাঝে মাঝে এমন সব নক্ষত্র উদিত হন, যাঁর আলো কেবল একটি প্রজন্মকে নয়, পরবর্তী প্রজন্মগুলোকেও নিজের আলোয় পথ দেখায়। মাহফুজা আপা—আমাদের মাহফুজা খানম ছিলেন তেমনই এক বিরল নক্ষত্র—যাঁর দীপ্তি এত গভীর, যে তা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চিরকাল প্রজ্বলিত থাকবে।

কলকাতার মাটিতে জন্ম হলেও, তার হৃদয় ও আত্মা ছিল বাংলাদেশের মাটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। শৈশব থেকেই জ্ঞানের প্রতি অদম্য তৃষ্ণা ও সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা তাঁকে এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রী হলেও তিনি কেবল বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; জ্ঞানের প্রতিটি শাখাকে তিনি নিজের মনের আঙিনায় স্থান দিয়েছিলেন।

তারুণ্যে তিনি ছাত্ররাজনীতির অঙ্গনে পা রাখেন—তখনই প্রমাণ হয়, তিনি কেবল বইয়ের ভেতরের আলো নয়, সমাজের অন্ধকার ভেদ করারও সাহস রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রথম নারী ভিপি-ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি হয়ে ওঠেন হাজার তরুণীর প্রেরণা। সেদিন থেকেই ‘আপা’ হয়ে ওঠেন কেবল সহপাঠীদের নয়, সমগ্র জাতির।

শিক্ষকতার পেশায় তিনি ছিলেন এক কঠোর অথচ স্নেহময়ী পথপ্রদর্শক। শ্রেণিকক্ষে তিনি শিখিয়েছেন সমীকরণ, সূত্র ও তত্ত্ব; কিন্তু তার চেয়েও বড় শিক্ষা দিয়েছেন সততা, ন্যায় এবং মানবতার। স্কুল-কলেজের দেয়াল পেরিয়ে তিনি পা রেখেছেন সমাজসেবার বিস্তৃত অঙ্গনে—খেলাঘর আসর থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রশাসনের উচ্চতম পদ পর্যন্ত সর্বত্র তাঁর পদচিহ্ন ছড়িয়ে আছে।

তিনি ছিলেন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক, নারী-পুরুষ সমতার এক অবিচল সৈনিক। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, নারী শিক্ষার প্রসারে—যে কোনো ন্যায়সংগ্রামে তিনি ছিলেন সম্মুখসারিতে। তাঁর কণ্ঠ ছিল দৃঢ়, কিন্তু হৃদয় ছিল কোমল; যিনি প্রতিবাদ করতে জানতেন, আবার আহতের মাথায় হাত রাখতেও জানতেন।

রাষ্ট্র তাঁকে দিয়েছে একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদকসহ বহু সম্মাননা; কিন্তু এসব তাঁর প্রকৃত পরিচয় নয়। তাঁর প্রকৃত পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন আমাদের সকলের আপা। যাঁর দরজা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত, যাঁর হাসিতে ছিল ভরসা, আর যার কথায় ছিল সাহস।

১২ আগস্ট ২০২৫—এ দিনটিতে তিনি চলে গেলেন—যেন হঠাৎই এক নক্ষত্রের পতন হল। কিন্তু আপার এই মৃত্যু কেবল তাঁর মৃৎকমলের; আমাদের হৃদকমলে তাঁর আলোক শিখা চিরজাগরুক থাকবে।

বাংলার মাটি হয়তো শত শত বছরেও তাঁর মতো এমন এক নক্ষত্রকে আবার আপনবক্ষে ধারণ করতে পারবে না। কারণ মাহফুজা আপা কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না—তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন, ভালোবাসার এক অবিনাশী নাম।

তাঁর মতো মানুষ এ দেশে জন্মায় না বারবার। আমরা, যারা তাঁর সান্নিধ‍্য পেয়েছিলাম, তাঁর স্নেহে আদরে নিজেদের জীবনকে গড়তে পেরেছি, তারাই প্রকৃত সৌভাগ্যবান।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement