ইতিহাস

লালবাগ কেল্লার ইতিহাস

অরুণাভ বিশ্বাস
লালবাগ কেল্লা। ছবি: এআইয়ের তৈরি

ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা লালবাগ কেল্লা কেবল ইট-পাথরের কোনো দুর্গ নয়, এটি আমাদের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। মোগল আমলের গৌরব, স্থাপত্যশৈলীর জৌলুস আর অসমাপ্ত স্বপ্নের এক অনন্য স্মারক হলো এই কেল্লা। চারশো বছরের পুরনো এই স্থাপত্য আজও দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে। লালবাগ কেল্লার ইতিহাসে যেমন আছে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, তেমনি আছে ব্যক্তিগত বেদনার ছায়াও।

মোগল আমলে ঢাকা ছিল বাংলার রাজধানী। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে তাঁর জামাতা সুবাদার মুজাফফর হোসেন শায়েস্তা খানের পুত্র মুহাম্মদ আজম শাহ ১৬৭৮ সালে এখানে কেল্লার নির্মাণকাজ শুরু করেন। আজম শাহ ছিলেন মোগল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী এবং পরবর্তীতে তিনি সম্রাট হয়েছিলেন। কেল্লার নির্মাণে তিনি যে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তা থেকেই বোঝা যায় এই স্থাপনাটি ছিল রাজনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে কতটা কৌশলগত। কিন্তু এর পেছনে ব্যক্তিগত এক করুণ ঘটনা জড়িয়ে যায়, যা কেল্লার ইতিহাসকে আরও রহস্যময় করে তোলে।

নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পরপরই এক অঘটন ঘটে। শায়েস্তা খানের কন্যা পরীবিবি হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন। ধারণা করা হয় তিনি এখানে বসবাস করছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর কেল্লার নির্মাণকাজ প্রায় থমকে যায়। শায়েস্তা খান বিশ্বাস করতেন, এই স্থাপনা অশুভ। ফলে তিনি রাজধানী ঢাকার কেন্দ্র থেকে শাসনকার্য সরিয়ে নিয়ে যান। এরপর আর কখনো কেল্লার নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। আজও দর্শনার্থীরা দেখতে পান একটি অসমাপ্ত দুর্গের রূপ—যা লালবাগ কেল্লাকে মোগল স্থাপত্যের মধ্যে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে লালবাগ কেল্লা ছিল মোগলদের সেই সময়কার আধুনিক পরিকল্পনার অংশ। এখানে একটি মসজিদ, দরবার হল, বাগান, জলাধার এবং পরীবিবির সমাধি রয়েছে। পরীবিবির সমাধি মোগল সমাধি শিল্পের অন্যতম উৎকৃষ্ট নিদর্শন। সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি এ সমাধি আজও দর্শকদের মনে এক ধরণের শান্তি ও রহস্যের ছাপ ফেলে।

বিদেশি গবেষকরা লালবাগ কেল্লা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছেন। ব্রিটিশ গবেষক জেমস টেলর, যিনি ১৯ শতকে বাংলার স্থাপত্য নিয়ে কাজ করেছিলেন, তিনি লিখেছিলেন—“লালবাগ দুর্গ অসম্পূর্ণ হলেও এর প্রতিটি ইট মোগল স্থাপত্যের মহিমা বহন করে।” টেলরের এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, অসমাপ্ত হলেও স্থাপত্যের দিক থেকে কেল্লাটি কতখানি মূল্যবান।

আমেরিকান ইতিহাসবিদ অ্যানেট বেভারিজ, যিনি আওরঙ্গজেবের আমলের ওপর গভীর গবেষণা করেছেন, তিনি বলেছেন—“ঢাকার লালবাগ কেল্লা হলো মোগল সাম্রাজ্যের এক অপূর্ণ প্রতীক। এখানে স্থাপত্যে রাজকীয়তার ছাপ থাকলেও ভেতরে লুকিয়ে আছে ব্যক্তিগত শোকের ইতিহাস।” তাঁর মতে, পরীবিবির মৃত্যুই ছিল কেল্লার ভাগ্য নির্ধারণকারী ঘটনা।

আধুনিক ফরাসি গবেষক বার্নার্ড হাওয়ার্ডও এ বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায়—“ঢাকার লালবাগ দুর্গ একদিকে সামরিক দুর্গ, অন্যদিকে এটি অসমাপ্ত এক প্রাসাদ। অসমাপ্ত হওয়ার কারণেই এটি ইতিহাসে অনন্য হয়ে উঠেছে।”

কেল্লার ভেতরের স্থাপত্যের দিকে তাকালে বোঝা যায় মোগলরা শুধু সামরিক দিকেই নয়, নান্দনিক দিকেও কতটা মনোযোগী ছিলেন। বাগানগুলো চার ভাগে বিভক্ত, যাকে চারবাগ বলা হয়, যা মোগলদের ঐতিহ্যবাহী উদ্যান নকশার প্রতিফলন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা এই বাগান নকশা মোগলরা ভারতে নিয়ে আসেন এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যবহার করেন।

লালবাগ কেল্লার ইতিহাস শুধু মোগল স্থাপত্যের নয়, এটি ঢাকার নগর ইতিহাসেরও অংশ। কেল্লার চারপাশ ঘিরে গড়ে ওঠে ব্যবসা-বাণিজ্য, বসতি আর সংস্কৃতির বিস্তার। পরবর্তী সময়ে যখন মোগল শক্তি দুর্বল হতে থাকে, তখন ব্রিটিশ আমলে কেল্লার গুরুত্ব কমে যায়। তবে এটি কখনোই ভেঙে ফেলা হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি পরিণত হয়েছে ঐতিহাসিক নিদর্শনে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর লালবাগ কেল্লা নতুনভাবে গুরুত্ব পায়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটি সংরক্ষণ করে। এখন এটি কেবল পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং গবেষণার ক্ষেত্র। দেশি-বিদেশি ইতিহাসবিদরা নিয়মিত এখানে আসেন এবং মোগল আমলের রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করেন।

তবে লালবাগ কেল্লাকে ঘিরে অনেক কাহিনি ও লোককথা প্রচলিত আছে। কেউ বলেন, এখানে গোপন সুড়ঙ্গপথ ছিল যা দূরে বুড়িগঙ্গা নদীর দিকে চলে গেছে। আবার অনেকে বিশ্বাস করেন, এখানে গুপ্তধন লুকানো ছিল। এসব কাহিনি লালবাগ কেল্লাকে শুধু ইতিহাসের নয়, কল্পকাহিনিরও অংশ করে তুলেছে।

আজকের দিনে লালবাগ কেল্লা আমাদের জন্য কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি একধরনের পরিচয়ের প্রতীক। ঢাকার মতো জনবহুল ও আধুনিক শহরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন দুর্গ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা এক গৌরবময় ঐতিহ্যের উত্তরসূরি।

আমেরিকার স্থাপত্য ইতিহাসবিদ জর্জ মিচেল একবার মন্তব্য করেছিলেন—“লালবাগ দুর্গ আমাদের শেখায়, প্রতিটি স্থাপনা কেবল ইট-পাথরের নয়, বরং এটি মানুষের স্বপ্ন, বেদনা আর অপূর্ণতার বহিঃপ্রকাশ।” এই মন্তব্য যেন লালবাগ কেল্লার ইতিহাসকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে।

সবশেষে বলা যায়, লালবাগ কেল্লা এক অসমাপ্ত ইতিহাসের প্রতীক। এর ভেতরে যেমন আছে মোগলদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তেমনি আছে ব্যক্তিগত শোকের ছায়া। এর প্রতিটি দেয়ালে খোদাই করা আছে সময়ের সাক্ষর। আর সেই সাক্ষরই আজ আমাদের অতীতকে মনে করিয়ে দেয় এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রেরণা জোগায়।

ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

শুটিংয়ের সেটে পানিতে ডুবে প্রাণ গেল কলকাতার রাহুল অরুণোদয়ের

কলকাতার গণমাধ্যম আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়েছে, ওড়িশা রাজ্যের তালসারিতে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিংয়ের সেটে রোববার (২৯ মার্চ) সন্ধ্যায় ঘটেছে এমন ঘটনা। অভিনেতার মরদেহ দিঘা হাসপাতালে রাখা হয়েছে। সেখানেই তার ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

১৪ দিন আগে

‘মুখ ও মুখোশ’-এর কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই

ঢাকার প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর কণ্ঠশিল্পী, একুশে পদকপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

১৬ দিন আগে

তুমুল গতিতে ছুটছে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’

ঈদের উৎসবমুখর আবহে প্রেক্ষাগৃহে নতুন প্রাণ ফিরিয়েছে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। বড় বাজেটের অ্যাকশনধর্মী সিনেমার ভিড়েও ভিন্নধর্মী গল্প আর শক্তিশালী অভিনয়ের জোরে সিনেমাটি দর্শকদের কাছে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটিকে ঘিরে চলছে ইতিবাচক আলোচনা, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বক্সঅফিসের আয়েও।

১৮ দিন আগে

ঈদের বিনোদনে এবারও বড় চমক নিয়ে আসছে ‘ইত্যাদি’

বরাবরের মতোই সামাজিক অসংগতি ও গ্রামীণ জীবনের নানা সমস্যা ফুটে উঠবে অনুষ্ঠানের বিভিন্ন নাট্যাংশে। এ ছাড়াও থাকছে মিউজিক্যাল ড্রামা, দর্শকদের নিয়ে বিশেষ প্রতিযোগিতা এবং বিদেশিদের অংশগ্রহণে একটি ব্যতিক্রমী পর্ব। সমসাময়িক প্রসঙ্গের পাশাপাশি বিনোদনের সব রসদ নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের পর্বটি।

২৩ দিন আগে