লক্ষাধিক কর্মীর কাঠামো, বিপুল অর্থের নির্বাচন

এস কে তৌফিক হক
সাইমন মোহসিন
আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩: ১০

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। এই নির্বাচনি অনুশীলনের মাত্রা বিস্ময়কর। ২৯৯টি আসনে এক হাজার ৯৮৫ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মধ্য থেকে পছন্দের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করতে ভোট দেবেন ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটার। তাদের জন্য সারা দেশে ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে ৪২ হাজার ৭৭৯টি।

এই বিশাল আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক চাহিদাও সুবিশাল। পুরুষ ভোটারদের জন্য এক লাখ ১৪ হাজার ৯৩৯টি বুথ এবং নারী ভোটারদের জন্য থাকছে এক লাখ ২৯ হাজার ১০৭টি বুথ। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে গড়ে ভোটার প্রায় তিন হাজার।

বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে কত ব্যাপক একটি আয়োজন, এসব সংখ্যা সেটিই নির্দেশ করে। এই অবকাঠামো এমন এক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যা বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজন লক্ষাধিক জনবল, যার মধ্যে যুক্ত রয়েছেন মনিটরিং এজেন্ট থেকে শুরু করে স্থানীয় নির্বাচনি কার্যক্রমের কর্মী পর্যন্ত এক বিশাল কর্মী বাহিনী।

বাংলাদেশের নির্বাচনি বাস্তবতায় ভোটকেন্দ্র মানে শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়, এটি একটি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র। প্রতিটি কেন্দ্র ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো অনানুষ্ঠানিক হলেও একটি কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটি গড়ে তোলে। সাধারণত একটি কেন্দ্রে ন্যূনতম ২১ সদস্যের একটি কমিটি গড়ে তোলা হয়।

ছোট দলগুলো যেখানে কেবল একটি কমিটি গড়ে তোলে, সেখানে বড় দলগুলো তিন থেকে পাঁচটি পর্যন্ত এ রকম কমিটির সমান্তরাল কাঠামো দাঁড় করায়। এই সমান্তরাল কমিটিগুলো দলীয় ইউনিট, সহযোগী সংগঠন, যুব ও ছাত্র শাখা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়।

প্রতি কেন্দ্রে মাত্র ২১ সদস্যের একটি কমিটি নিয়ে একটি মানসম্মত নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য আট লাখ ৮২ হাজার আনুষ্ঠানিক কর্মীর প্রয়োজন। বড় দলগুলো সাধারণত প্রতি কেন্দ্রে তিন থেকে পাঁচটি সমান্তরাল কমিটি মোতায়েনের মাধ্যমে এই কার্যক্রমটি প্রসারিত করে। ফলে কেবল এই একটি কাজেই তাদের প্রয়োজন হয় ২৬ লাখ থেকে ৪৪ লাখ পর্যন্ত কর্মী।

এর বাইরে রয়েছে সমন্বয়কারী, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী, পরিবহন সংগঠক এবং নিরাপত্তারক্ষীদের সহায়ক স্তর। আরও থাকে কমপক্ষে চার লাখ ২০ হাজার থেকে ১২ লাখ পর্যন্ত পোলিং এজেন্ট। প্রতিটি ভোটকক্ষে প্রার্থীর একজন করে পোলিং এজেন্ট থাকা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ প্রায় আড়াই লাখ মানুষের ভোটের দিন কেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

এরা ঝুঁকি নেয়, দীর্ঘ সময় কেন্দ্রে থাকে, অনেক ক্ষেত্রে সংঘাতের মুখে পড়ে। তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ— সবই সরাসরি অর্থের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নির্বাচনে অর্থের ভূমিকা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি কাঠামোগত প্রয়োজন।

এভাবেই লাখ লাখ ভোটারকে একত্রিত করতে সক্ষম একটি নির্বাচন দলীয় কর্মী বাহিনীর একত্রিতকরণের একটি অপারেশনে পরিণত হয়। ফলে শুধু ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনাতেই কয়েক লাখ সংগঠিত কর্মী মাঠে নামাতে হয়। এই মানুষগুলো স্বেচ্ছাসেবী নন, তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয় অর্থ, প্রভাব ও সুবিধার আশ্বাস দিয়ে।

এবারের জাতীয় নির্বাচনে আরও একটি নতুন ব্যয়ের স্তর যুক্ত হয়েছে— ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যম। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ ও অনলাইন নিউজ প্ল্যাটফর্ম ভোটার মনোভাব গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে।

এই খাতে খরচ করা অর্থ নিছক বিজ্ঞাপনের জন্য খরচ করা অর্থ নয়; বরং এখানে দলগুলোকে নিয়োগ দিতে হয়েছে ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা, অনলাইন ক্যাম্পেইনার, ডেটা বিশ্লেষক এবং এমন কর্মী, যারা একদিকে দলীয় বার্তা ছড়াবে, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের প্রচারণা নজরদারি ও মোকাবিলা করবে। মাঠের কর্মীদের পাশাপাশি এখন ভার্চুয়াল মাঠেও একটি সমান্তরাল মানবসম্পদ বাহিনী প্রয়োজন, যার প্রতিটিই অর্থনির্ভর।

এত বিপুল পরিসরের একটি নির্বাচন পরিচালনা করা যে বিপুল আর্থিক সম্পদের দাবি করে, তা কোনোভাবেই শুধু রাষ্ট্রীয় বা আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের সীমারেখার মধ্যে থেকে পূরণ করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে নির্বাচন ক্রমেই নাগরিকের মতামত প্রকাশের প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক বাজারে অর্থ ঢালার খেলায় পরিণত হয়েছে। বহুদলীয় গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনি ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ হলেও বাংলাদেশে সেটি তেমন নয়। এ দেশে জনসেবার যুক্তিকে ছাপিয়ে গেছে অর্থের যুক্তি। এখানে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করতে সক্ষম প্রার্থীরাই শেষ পর্যন্ত বিজয়ের সর্বাধিক সম্ভাব্য দাবিদার হয়ে ওঠেন।

ওয়েস্টমিনস্টার ফাউন্ডেশন ফর ডেমোক্র্যাসি এবং যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস প্রণীত বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের আলোকে করা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাস্তব নির্বাচনি ব্যয় হিসেবে প্রার্থীরা প্রায়ই পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকা, কখনো তারও বেশি খরচ করেন, যা নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত আইনি ব্যয়সীমার তুলনায় বহুগুণ বেশি।

এ ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে নির্বাচনের বহু বছর আগে থেকেই অনুগত সমর্থক গড়ে তোলার খরচ, স্থানীয় সমাবেশ ও অনুষ্ঠান আয়োজন, ব্যানার-ফেস্টুন মুদ্রণ এবং ভোটার পরিবহনের মতো লজিস্টিক ব্যবস্থাপনাও অন্তর্ভুক্ত থাকে। ভোটের আগের রাত কিংবা ভোটের দিন ‘উপহার’ ও নগদ প্রণোদনা হিসেবে একজন প্রার্থীর ব্যয় প্রায়ই ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও অবস্থান সুসংহত রাখতে স্থানীয় উন্নয়ন ও দলীয় কার্যক্রমে প্রতিবছর আরও কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করার নজির রয়েছে।

এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আর কেবল নির্বাচনি প্রচার নয়, বরং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মুখোশে পরিচালিত এক ধরনের পরিকল্পিত রাজনৈতিক বিনিয়োগ। এখানে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ক্ষমতার অঙ্ক, আসন বণ্টনের হিসাব এবং জোটের ভেতরের দরকষাকষি। আদর্শিক ঐক্য কিংবা নীতিগত সমঝোতার বদলে নির্বাচনকেন্দ্রিক লাভ-ক্ষতির হিসাবই হয়ে উঠছে মুখ্য। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ক্রমেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে সরে গিয়ে সুবিধাভিত্তিক সমীকরণে আবদ্ধ হচ্ছে।

এ প্রক্রিয়ায় সাধারণ ভোটার একদিকে যেমন বিভ্রান্ত হচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তার আস্থা ক্ষয়ে যাচ্ছে। কারণ ভোটাররা দেখতে পাচ্ছেন— যে রাজনৈতিক আদর্শের কথা বলা হচ্ছে, তা অনেক সময়ই টেকসই নয়। নির্বাচনের আগে উচ্চকণ্ঠে যে নৈতিকতার কথা উচ্চারিত হয়, নির্বাচনের পর তা আর দৃশ্যমান থাকে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী— দলীয় গণতন্ত্র দুর্বল হয়, নেতৃত্বের জবাবদিহিতা কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ বাস্তবতায় প্রয়োজন নির্বাচনি রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তা না হলে গণতন্ত্র নামের কাঠামোটি থাকলেও তার ভেতরের প্রাণশক্তি ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে পড়বে, যার দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে রাষ্ট্র ও জনগণকেই।

ওপরে আলোচিত বিপুল মানবসম্পদ চাহিদা সরাসরি যুক্ত হয়ে আছে এই ক্রমবর্ধমান ব্যয় কাঠামোর সঙ্গে। দেশজুড়ে ৪২ হাজার ৬০০টিরও বেশি ভোটকেন্দ্রে লাখ লাখ প্রচার কর্মী ও এজেন্টকে সক্রিয় ও নিয়োজিত রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রয়োজন হয় বড় ধরনের আর্থিক ব্যয়, যা সাধারণ সমর্থকদের পক্ষে জোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এর ফলেই দলগুলো ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে ধনবান দাতা ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের ওপর।

এই বিপুল মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার কারণেই নির্বাচন ক্রমে একটি ব্যয়বহুল প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। মানুষ যত বেশি, বিনিয়োগ তত বেশি। আর বিনিয়োগ যত বেশি, জয়ের সম্ভাবনাও তত বেশি।

এখানেই নির্বাচন একটি শূন্য-সম খেলায় রূপ নেয়, যেখানে হার মানে শুধু পরাজয় নয়— রাজনৈতিক প্রভাব হারানো, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়া এবং বিনিয়োগ করা অর্থের ক্ষতি। ফলে প্রার্থী ও মাঠ কর্মীদের মধ্যে ‘যে করেই হোক জিততে হবে’ মানসিকতা গড়ে ওঠে, যা নির্বাচনি সহিংসতার সামাজিক ভিত্তি তৈরি করে।

এ বাস্তবতার সঙ্গে গত এক দশকের আরেকটি গুরুতর উপাদান যুক্ত হয়েছে— নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনের ভেতরের দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্ব। আওয়ামী লীগ শাসনামলের শেষ কয়েকটি নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ দখল, ব্যালট বাক্স নিয়ন্ত্রণ এবং বিরোধী এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

এ প্রক্রিয়ায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশকে ‘সহযোগী’ করতে যে অর্থ ও সুবিধা লেনদেন হয়েছে, তা নির্বাচনি ব্যয়কে আরও বাড়িয়েছে এবং প্রতিযোগিতাকে আরও সহিংস ও অসম করে তুলেছে। অর্থ এখানে শুধু কর্মী ধরে রাখার উপায় নয়, এটি ক্ষমতার কাঠামোকে প্রভাবিত করার হাতিয়ারও।

ফলে নির্বাচন আজ একটি বহুস্তরীয় বিনিয়োগ প্রকল্প— মাঠের মানুষ, কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং ডিজিটাল প্রভাব— সবকিছুই অর্থের মাধ্যমে সচল হয়। এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে শুধু ‘টাকার খেলা’ বলা যথেষ্ট নয়; বরং বলা উচিত— বিপুল মানবসম্পদনির্ভর কাঠামোই নির্বাচনকে টাকার খেলায় পরিণত করেছে।

যতদিন এই কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে, ততদিন নির্বাচনের দিন শুধু ভোটের উৎসব নয়, সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবেও থেকে যাবে। এর ফলে রাজনীতি এমন এক ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে বাস্তবসম্মতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ কেবল ধনবান বা ক্ষমতাবান নেটওয়ার্কে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্যই সংরক্ষিত।

রাজনীতিকরা ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন প্রভাবশালী অর্থদাতাদের ওপর, আর রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম রূপ নিচ্ছে পুঁজিনির্ভর উদ্যোগে— যেখানে সীমিত সামর্থ্যের মানুষগুলো কার্যত প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এটি আর অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি নয়, এটি নিছকই এক বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা।

একবার যখন বিজয়ের প্রকৃত নির্ধারক হয়ে ওঠে অর্থ, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহি ভোটারের কাছে নয়, বরং অর্থদাতাদের কাছেই কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। নীতিনির্ধারণ, অবকাঠামো চুক্তি এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকে পড়ে সেইসব গোষ্ঠীর পক্ষে, যারা নির্বাচনি তহবিলে অর্থ জোগায়। এর মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে শক্তিশালী স্বার্থনির্ভর নেটওয়ার্ক, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে লেনদেনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

গণতন্ত্রের ওপর এর পরিণতিগুলো গভীর ও বহুমাত্রিক। বাস্তবসম্মত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল মানবসম্পদ ও বাজেট কেবল ধনবান প্রার্থী কিংবা প্রভাবশালী অর্থদাতার নাগালে থাকা ব্যক্তিরাই বহন করতে সক্ষম হন। যখন নির্বাচনি সাফল্য বিপুল আর্থিক ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন অনানুষ্ঠানিক ‘বিনিয়োগ’ ও পে-টু-প্লে ব্যবস্থাই নিয়মে পরিণত হয়, ব্যতিক্রম নয়।

আর্থিক সক্ষমতাকে যেখানে গণইচ্ছার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়, সেখানে নাগরিকেরা ক্রমশ নিজেদের এই ব্যবস্থার বাইরে ও বিচ্ছিন্ন বলে অনুভব করতে শুরু করেন। নির্বাচিত হওয়ার পর জনপ্রতিনিধিরা জনস্বার্থের চেয়ে অর্থদাতাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতায় আবদ্ধ হয়ে পড়েন। আরও বাজে অবস্থা হয়, যখন জনপ্রতিনিধিরা তাদের বিনিয়োগ করা অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য রাজনৈতিক পদবি ও ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেন।

বাংলাদেশের নির্বাচনি সংস্কার নিয়ে আলোচনায় তাই মানবসম্পদের এই বাস্তবতা এবং তার আর্থিক পরিণতি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ মানুষ ছাড়া নির্বাচন হয় না— ভোটার, কর্মী, প্রার্থী, এজেন্ট, প্রশাসন— প্রতিটি স্তরেই মানুষই মূল চালিকাশক্তি।

আর এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে গেলেই অর্থ মূল আলোচনায় চলে আসে। নির্বাচনি মাঠে তখন আদর্শ, নীতি বা সংস্কারের প্রশ্ন গৌণ হয়ে পড়ে; প্রাধান্য পায় অর্থের জোর, প্রভাব বিস্তার এবং সংগঠিত ব্যবস্থাপনা।

এই বাস্তবতা অস্বীকার করার ফলেই আমরা বারবার নির্বাচনি সহিংসতা, অতিরিক্ত ব্যয়, কালো টাকার দৌরাত্ম্য এবং রাজনৈতিক অনাস্থার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই। সংস্কারের নামে যদি কেবল কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলা হয়, অথচ অর্থ ও ক্ষমতার সম্পর্ককে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না করা হয়, তাহলে সেই সংস্কার টেকসই হয় না। গণতন্ত্র তখন নিয়মের মধ্যে বন্দি থাকে, কিন্তু বিশ্বাসের জায়গায় পৌঁছাতে পারে না।

অতএব, নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং মানবসম্পদের ব্যবহারের বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে। অন্যথায় নির্বাচনি সংস্কার কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়। আর গণতান্ত্রিক আস্থার সংকট কোনোভাবেই কমবে না।

এস কে তৌফিক হক: পরিচালক, সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

সাইমন মোহসিন: রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লাইলাতুল বরাত: ক্ষমা, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক পুনর্জাগরণের রাত

তবে লাইলাতুল বরাতের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আত্মসমালোচনা, নৈতিক সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের আহ্বান। ভোগবাদ, স্বার্থপরতা ও সংঘাতে পূর্ণ আধুনিক বিশ্বে এই রাতের শিক্ষা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৭ দিন আগে

বিতর্কের রাজনীতিতে অবহেলিত নারীর মানবাধিকার

প্রকৃতপক্ষে দেখা গেল, রাজনৈতিক দলগুলো সেই ‘দয়া’ দেখাতেও পিছু হটল। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো তো কোনো চিন্তাই করেনি, তারা নারীদের মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে কিছুই ভাবেনি। তারা বলছে, এখন না— পরে হয়তো নারীর নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে চিন্তা করতে পারে। কিন্তু নারীর অধিকারের জায়গায় তারা যে পিছু হটেছে,

৮ দিন আগে

আপনার ভোট: অধিকার নাকি শুধুই আনুষ্ঠানিকতা?

প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা প্রায় একই চিত্র দেখি। একাধিক প্রার্থী মাঠে নামেন, প্রচারণা চলে। কেউ বলেন, ‘আমি অমুক দলের প্রার্থী, আমার মার্কা অমুক— দোয়া করবেন।’ করমর্দন, কোলাকুলি আর সাময়িক সৌজন্যের মধ্য দিয়েই যেন জনগণ ও প্রতিনিধির সম্পর্কের সূচনা এবং সমাপ্তি ঘটে।

১০ দিন আগে

বিজয়ের ৪৫ দিন পর স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ল মিরপুরে

১০ দিন আগে