বড়দিন বড় হওয়ার আহ্বান, নতুন মানুষ হওয়ার আহ্বান

বিজয় এন ডি’ক্রুজ

বিশ্বের কোটি কোটি খ্রিষ্টান ২৫ ডিসেম্বর দিনটিতে মহাসমারোহে ক্রিসমাস, অর্থাৎ বড়দিনের পর্ব উদযাপন করেন। আজ থেকে প্রায় দুই হাজার চব্বিশ বছর পূর্বে ঈশ্বরতনয় আশ্চর্যজনকভাবে ঐশী শক্তিতে মেরীর কোলে বেথলেহেমের জীর্ণ গোশালায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

ইহুদি জাতি যুগ যুগ ধরে মুক্তিদাতা মসিহের জন্য অপেক্ষা করছিল। নবীরা তার আগমনের কথা ঘোষণা করেছেন, মানুষকে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। হৃদয়-মন পরিবর্তন করে সৎ, পবিত্র, ন্যায়নিষ্ঠ জীবন যাপন এবং অন্যের কল্যাণ ও দরিদ্রদের প্রতি দয়া করার আহ্বান জানিয়েছেন।

সময় পূর্ণ হলে মানবজাতির প্রতীক্ষিত মুক্তিদাতা প্রভু যিশু ৩০ বছর বয়সে প্রকাশ্যে তার প্রচার কার্য শুরু করেন। বাণী প্রচারের সঙ্গে সঙ্গেই চারদিকে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মানুষ তার অমৃতময় বাণী শোনার জন্য তার চারপাশে ভিড় জমায়।

যিশু শ্রোতাদের মন পরিবর্তনের আহ্বান জানান— পাপ, অসত্য ও অন্যায় থেকে ফিরে এসে সত্য, সুন্দর ও ভালো কাজে মনোনিবেশ করতে বলেন। তিনি শিক্ষা দেন, আমরা যেন পাপকে ঘৃণা করি, পাপীকে নয়। তিনি অবহেলিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত ও অল্পপদের মানুষের পক্ষে দাঁড়ান। তিনি বলতেন, অসুস্থদেরই চিকিৎসক প্রয়োজন, সুস্থদের নয়।

পৃথিবীতে থাকাকালীন তিনি বহু আশ্চর্যজনক কাজ করেছেন— অন্ধকে দিয়েছেন দৃষ্টি, কালাকে দিয়েছেন শোনার ক্ষমতা, প্রতিবন্ধীকে দিয়েছেন হাঁটার শক্তি, এমনকি মৃতকেও দিয়েছেন জীবন। তিনি একে অন্যকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে শিক্ষা দেন। শুধু পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধুদেরই নয়, এমনকি শত্রুদেরও ভালোবাসতে বলেন। তিনি একে অপরকে ক্ষমা করতে শিক্ষা দেন।

যিশু বলেছেন, তিনি সেবা পেতে নয়, সেবা করতেই এ জগতে এসেছেন। অন্যকে সেবা করার মধ্য দিয়েই আমরা মুক্তি ও পরিত্রাণ লাভ করি। প্রতিবেশী ভাই-বোনদের— বিশেষ করে ক্ষুধার্তকে অন্নদান, তৃষ্ণার্তকে জল, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র প্রদান, অসুস্থের সেবা এবং অসহায় ও গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ালে— সেই সেবাই তিনি গ্রহণ করেন।

যিশুর কাছে ব্যক্তির স্থান ছিল অনেক ঊর্ধ্বে, কারণ মানুষ ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে সৃষ্ট। তাই তিনি ধর্মের ঊর্ধ্বে মানুষকে স্থান দিয়েছেন। ধর্ম মানুষের জন্য, মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য— ধর্মের জন্য মানুষ নয়।

এ বছর আমরা যখন বড়দিন উদযাপন করছি, তখন যীশুর জন্মভূমি ফিলিস্তিনের গাজা ছাড়াও ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধ, আমেরিকাসহ ইউরোপের বহু দেশের সংশ্লিষ্টতা আমাদের চোখে পড়ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষদের মধ্যে চলছে সহিংসতা, হানাহানি ও মারামারি।

যিশু খ্রিষ্টের জন্মের সাত শ বছর পূর্বে নবিরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, “আশ্চর্য মন্ত্রণাদাতা, বিক্রমশালী ঈশ্বর, সনাতন পিতা, শান্তিরাজ। সীমাহীন শান্তিতে তিনি তার আধিপত্য বিস্তার করবেন।” (যিশাইয়া ৯:৫–৬)।

যিশুর জন্মকাহিনীতে আমরা শুনি: “উর্ধ্বলোকের ঈশ্বরের জয়, আর পৃথিবীতে তার অনুগ্রহপ্রাপ্ত মানুষের মধ্যে শান্তি।” (লূক ২:১৪)

যিশু তার শিষ্যদের জন্য শান্তি দান করেছেন, “শান্তি তোমাদের জন্য রেখে যাচ্ছি, আমারই শান্তি তোমাদের দান করছি।” (যোহন ১৪:২৭)

এই শান্তি শক্তিশালী, ঐশ্বরিক ও চিরস্থায়ী। জগতের দুঃখ-কষ্ট ও বাধা-বিপত্তি এই শান্তি কেড়ে নিতে পারে না। শান্তি স্থাপনকারীদের বাইবেলে উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে: “ধন্য তারা, যারা শান্তি স্থাপন করে, কারণ তারাই ঈশ্বরের সন্তান বলে পরিচিত হবে।” (মথি ৫:৯)

ঈশ্বরের রাজ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ হলো শান্তি (রোমীয় ১৪:১৭)। পুনরুত্থিত খ্রিষ্টের প্রথম ও প্রধান উপহার হলো শান্তি।

বড়দিন বড় হওয়ার আহ্বান, নতুন মানুষ হওয়ার আহ্বান। বড়দিন বয়ে আনুক অনাবিল সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি।

[বড়দিনের প্রস্তুতি সভায় লিখিত বক্তব্য]

লেখক: আর্চবিশপ, ঢাকার কাকরাইলের সেন্ট মেরি’স ক্যাথেড্রাল চার্চ

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

হজের শিক্ষা: ব্যক্তি পরিবর্তন থেকে সমাজ উন্নয়ন

হজ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আত্মশুদ্ধি অর্জন করেন এবং সমাজের জন্য একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠেন। ব্যক্তি পরিবর্তনের মাধ্যমেই সমাজ উন্নয়ন সম্ভব— এই চিরন্তন সত্য হজ আমাদের শিখিয়ে দেয়।

৩ দিন আগে

ছাত্র ইউনিয়ন ও আগামীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম ও বিকাশ একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে— প্রগতিশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা। এই চারটি স্তম্ভ কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক দর্শনেরও প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে তাদের প্রতিটি আন্দোলন, প্রতিটি কর্মসূচি সরাসরি

৩ দিন আগে

পরীক্ষার হল কি রাজনৈতিক মঞ্চ?

পরীক্ষার কক্ষে পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে— মন্ত্রী, এমপি, বিরোধী নেতা কিংবা সাংবাদিক— কেউই এর ব্যতিক্রম নন। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো ধরনের প্রদর্শনমূলক কার্যক্রম বা রাজনৈতিক উপস্থিতি এই সংবেদনশীল পরিবেশে অনুমোদন করা উচিত নয়।

৬ দিন আগে

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা আবশ্যক

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব দেশের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি অগ্রাধিকারে রাখলে এবং পূর্বের ন্যায় দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে আশা করা যায়।

৬ দিন আগে