
শরিফুজ্জামান পিন্টু

পাবলিক পরীক্ষা— বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক— শিক্ষার্থীদের জীবনে একটি নির্ধারণী মুহূর্ত। এই পরীক্ষার ফলাফল শুধু পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তরণের পথই নির্ধারণ করে না, বরং একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ পেশাগত যাত্রার ভিত্তি গড়ে দেয়। এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন— নিরিবিলি, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও চাপমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ। এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবারই দায়িত্ব।
বাস্তবতা হলো, আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। পরীক্ষার হল ক্রমেই এমন এক জায়গায় পরিণত করা হচ্ছে, যেখানে অপ্রয়োজনীয় উপস্থিতি ও প্রদর্শনবাদী তৎপরতা শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন মানসিক বোঝা তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম সিটি মেয়র এমনকি বিরোধী দলীয় নেতাও পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। এসব খবর ও ভিডিও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ জোরেশোরে প্রচারিত হয়েছে। এসব পরিদর্শনকে অনেক সময় তদারকি বা মনিটরিং হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই তদারকির প্রকৃত ফল কী? পরীক্ষার্থীরা কি এতে কোনো বাস্তব উপকার পায়? উত্তরটি সহজ— না। বরং এই ধরনের উপস্থিতি পরীক্ষার্থীদের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটায়, মানসিক চাপ বাড়ায় এবং পরীক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তবে একটি ব্যতিক্রম দেখা যায় চট্টগ্রামে। সেখানে কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ সময় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নাস্তা ও খাবার পানি দেওয়া হয়।
পরিদর্শনের সময় মেয়র কেন্দ্রের সার্বিক পরিবেশ ঘুরে দেখেন। তবে হলের ভেতর তিনি প্রবেশ করেছেন কি না, তা প্রকাশিত খবর, ভিডিও বা ছবিতে দেখা যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের একজন পরীক্ষার্থীর বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন— সরকারের একজন কর্তা ব্যক্তি আসবেন শুনে তিনি কয়েক মিনিট অকারণে অস্থির সময় পার করেছে; পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়েছে।
একজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষার হলে প্রবেশ করে, তখন সে এমনিতেই এক ধরনের চাপ অনুভব করে। দীর্ঘ প্রস্তুতি, পারিবারিক প্রত্যাশা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে তার মন সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে। এই সময় হঠাৎ করে বাইরের লোকজনের উপস্থিতি, পুলিশের তৎপরতা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, ভিডিও ক্যামেরার উপস্থিতি, সাংবাদিকদের ভিড়— এসব কিছু তার মনোযোগ ক্ষুণ্ণ করে। আসলে পরীক্ষার হল কোনো মেলা নয়, কোনো প্রদর্শনীর জায়গা নয়। এটি একটি নিয়ন্ত্রিত একাডেমিক পরিবেশ, যেখানে পরীক্ষার্থীর প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইন ও বিধিমালার দিক থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার। পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও পরীক্ষার কক্ষে প্রবেশের অনুমতি নেই। ম্যাজিস্ট্রেট, কেন্দ্র সচিব, কক্ষ পরিদর্শক, দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক— এদের বাইরে কেউ, সে যত বড় পদমর্যাদারই হোক না কেন, পরীক্ষার হলে প্রবেশ করতে পারেন না। বাস্তবে আমরা বারবার এই নিয়মের লঙ্ঘন দেখতে পাই। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা বা নীরব সমর্থনের কারণে এই অনধিকার প্রবেশকে অনেক সময় স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে।
এখানে একটি উদাহরণ প্রাসঙ্গিক। ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময় স্বল্প সময় দায়িত্ব পালন করা তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনে যাননি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছিল, এমন পরিদর্শন শিক্ষার্থীদের ওপর অযাচিত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এবং পরীক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত করে।
এই সিদ্ধান্ত ছিল সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত এবং শিক্ষার্থীবান্ধব।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টাও পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। আমরা এখন দেখছি, পরিদর্শনের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। এমনকি এবার বিরোধী দলের নেতাও যুক্ত হয়েছেন। পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে বিরোধী নেতা যাওয়ার উদাহরণ সম্ভবত এই প্রথম। তাদের এই উপস্থিতি মূলত প্রতীকী, হতে পারে সরকারি দলের সঙ্গে টেক্কা দেওয়া। তবে এসবের সঙ্গে পরীক্ষার গুণগত মান বা সুষ্ঠু পরিচালনার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই।
সাংবাদিকদের ভূমিকাও এখানে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোথাও কোথাও পরীক্ষাকেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। আবার কোথাও তাদের প্রবেশের দাবি উঠছে। বাস্তবতা হলো— পরীক্ষার কক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশের দাবিও সমানভাবে অযৌক্তিক। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নামে পরীক্ষার হলে ঢুকে পড়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে পরীক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট হয়, পরিবেশ বিঘ্নিত হয় এবং পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ক্ষুণ্ণ হয়। সাংবাদিকদের দায়িত্ব অবশ্যই আছে— অনিয়ম তুলে ধরা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু সেটি করতে হবে পরীক্ষার কক্ষের বাইরে থেকে, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে; পরীক্ষার ভেতরে গিয়ে নয়।
একাধিক সংবাদপত্রে শিক্ষা বিষয়ক রিপোর্টার, চিফ রিপোর্টার, নিউজ এডিটর বা এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় মাঠের সাংবাদিক সহকর্মীদের এ বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেছি, যাতে তারা পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতরে যাওয়ার আবদার না করেন। অনেকে বিষয়টি বুঝেছেন, ভালোভাবে মেনে নিয়েছেন। কেউ কেউ হয়তো বুঝতে চাননি। আজও দেখা যায়— ‘পরীক্ষার হলে সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি’— এমন শিরোনামে কিছু পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়।
এ প্রসঙ্গে বলে রাখা প্রয়োজন, ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত আমি নিজেও দেশের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। ওই সময় ঢাকা থেকে সাংবাদিকদের নিয়ে যাওয়া হতো দেশের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রের পরিস্থিতি দেখার জন্য। তবে আমরা পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেছি— এমনটা মনে পড়ে না। সে সময় পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সংবাদপত্রে লেখা হতো— ‘নকলের মহোৎসব’। পরীক্ষাকেন্দ্রে সহিংসতা ঠেকাতে পুলিশ হিমশিম খেত।
প্রয়াত শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে নকল বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তুলনামূলক নরম। এরপর সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুকও নকল বন্ধে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তবে তিনি ভয়ভীতি বা আতঙ্ক সৃষ্টি করে তা করতে চাননি। ওই সময়ের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন নকলবিরোধী অভিযানে কঠোর অবস্থান নেন। হেলিকপ্টারে করে পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন, হঠাৎ অভিযান, কঠোর ব্যবস্থা— এসবের মাধ্যমে তিনি একটি ভয় ও নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ তৈরি করেন, যা অনেকটাই কাজে এসেছিল। ফলে নকল অনেকাংশে কমে আসে, বড় কৃতিত্ব পান এহছানুল হক মিলন।
এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে, নকল পুরোপুরি নির্মূল না হলেও সেই মহোৎসব আজ আর নেই। কিন্তু নকল নিয়ে এই দীর্ঘ আলোচনার ফাঁকে শিক্ষার আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। কোথাও ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, কোথাও সেট কোডে গরমিল, আবার কোথাও পুরনো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার মতো অবহেলাও ঘটছে।
চাঁদপুরের মতলব, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, ঢাকায় বিসিএসআইআর স্কুল, বাড্ডার একরামুন্নেসা বালক উচ্চ বিদ্যালয়, মতিঝিল সরকারি বালক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্রে এমন ঘটনা ঘটেছে। কিছু স্কুল শাস্তির ভয়ে এমন সব ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে ফেলেছে। কোথাও শাস্তি পেয়েছেন কিছু পরীক্ষক। কিন্তু যে পরীক্ষার্থী পরীক্ষার হলে অন্য প্রশ্নপত্র পেয়ে পরীক্ষা দেওয়া শুরু করে দিয়েছিল বা সময় নষ্ট করেছে— তার কী হবে? কোনও কোনও পরীক্ষার্থী বাড়তি সময় পেলেও সবাই যথেষ্ট সময় পায়নি। ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত পরীক্ষার্থীর যে দুশ্চিন্তা এর দায় কে নেবে?
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, সমস্যার মূল জায়গা হলো ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব পালনের ঘাটতি। অথচ এই জায়গায় কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে আমরা বাহ্যিক পরিদর্শন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি— যা কাম্য নয়।
শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদানের অভাব, কোচিংনির্ভরতা, প্রাইভেট পড়ানো, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় অনিয়ম— এসবই শিক্ষার গুণগত মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। শিক্ষায় বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আবার যেটুকু আছে, তারও সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে না। পাশাপাশি রয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা, বদলি সমস্যা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতা। শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষাখাতকে দুর্নীতিমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন— এটি প্রশংসনীয়, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষাব্যবস্থার এই বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে নকল একটি সমস্যা মাত্র। এটি পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে প্রয়োজন কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, কঠোর তদারকি এবং দায়িত্বশীল পরিদর্শন। এটি কোনোভাবেই মন্ত্রী-এমপি বা রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। যার কাজ, তাকে কাজ করতে দিতে হবে। কেন্দ্র সচিব, কক্ষ পরিদর্শক এবং স্থানীয় প্রশাসন যদি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তাহলে অনেক সমস্যাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।
সোজা কথায়, পরীক্ষার হল কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়, কোনো প্রচারণার স্থান নয়, কোনো প্রদর্শনীর জায়গাও নয়। এটি একটি সংবেদনশীল, নিয়ন্ত্রিত একাডেমিক পরিসর, যেখানে কেবল পরীক্ষার্থী এবং পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিই থাকা উচিত। এর বাইরে যে কেউ— সে যত ক্ষমতাবানই হোক— তার প্রবেশ অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক এবং অনেক ক্ষেত্রে বেআইনি।
এখন সময় এসেছে একটি স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান নেওয়ার। পরীক্ষার কক্ষে পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে— মন্ত্রী, এমপি, বিরোধী নেতা কিংবা সাংবাদিক— কেউই এর ব্যতিক্রম নন। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো ধরনের প্রদর্শনমূলক কার্যক্রম বা রাজনৈতিক উপস্থিতি এই সংবেদনশীল পরিবেশে অনুমোদন করা উচিত নয়।
তাই স্পষ্ট করে একযোগে সবার বলা দরকার— পরীক্ষার হল কেবল পরীক্ষক ও পরীক্ষার্থীর জন্য। অন্য কেউ সেখানে যেতে পারবেন না।

পাবলিক পরীক্ষা— বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক— শিক্ষার্থীদের জীবনে একটি নির্ধারণী মুহূর্ত। এই পরীক্ষার ফলাফল শুধু পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তরণের পথই নির্ধারণ করে না, বরং একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ পেশাগত যাত্রার ভিত্তি গড়ে দেয়। এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন— নিরিবিলি, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও চাপমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ। এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবারই দায়িত্ব।
বাস্তবতা হলো, আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। পরীক্ষার হল ক্রমেই এমন এক জায়গায় পরিণত করা হচ্ছে, যেখানে অপ্রয়োজনীয় উপস্থিতি ও প্রদর্শনবাদী তৎপরতা শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন মানসিক বোঝা তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম সিটি মেয়র এমনকি বিরোধী দলীয় নেতাও পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। এসব খবর ও ভিডিও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ জোরেশোরে প্রচারিত হয়েছে। এসব পরিদর্শনকে অনেক সময় তদারকি বা মনিটরিং হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই তদারকির প্রকৃত ফল কী? পরীক্ষার্থীরা কি এতে কোনো বাস্তব উপকার পায়? উত্তরটি সহজ— না। বরং এই ধরনের উপস্থিতি পরীক্ষার্থীদের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটায়, মানসিক চাপ বাড়ায় এবং পরীক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তবে একটি ব্যতিক্রম দেখা যায় চট্টগ্রামে। সেখানে কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ সময় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নাস্তা ও খাবার পানি দেওয়া হয়।
পরিদর্শনের সময় মেয়র কেন্দ্রের সার্বিক পরিবেশ ঘুরে দেখেন। তবে হলের ভেতর তিনি প্রবেশ করেছেন কি না, তা প্রকাশিত খবর, ভিডিও বা ছবিতে দেখা যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের একজন পরীক্ষার্থীর বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন— সরকারের একজন কর্তা ব্যক্তি আসবেন শুনে তিনি কয়েক মিনিট অকারণে অস্থির সময় পার করেছে; পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়েছে।
একজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষার হলে প্রবেশ করে, তখন সে এমনিতেই এক ধরনের চাপ অনুভব করে। দীর্ঘ প্রস্তুতি, পারিবারিক প্রত্যাশা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে তার মন সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে। এই সময় হঠাৎ করে বাইরের লোকজনের উপস্থিতি, পুলিশের তৎপরতা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, ভিডিও ক্যামেরার উপস্থিতি, সাংবাদিকদের ভিড়— এসব কিছু তার মনোযোগ ক্ষুণ্ণ করে। আসলে পরীক্ষার হল কোনো মেলা নয়, কোনো প্রদর্শনীর জায়গা নয়। এটি একটি নিয়ন্ত্রিত একাডেমিক পরিবেশ, যেখানে পরীক্ষার্থীর প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইন ও বিধিমালার দিক থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার। পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও পরীক্ষার কক্ষে প্রবেশের অনুমতি নেই। ম্যাজিস্ট্রেট, কেন্দ্র সচিব, কক্ষ পরিদর্শক, দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক— এদের বাইরে কেউ, সে যত বড় পদমর্যাদারই হোক না কেন, পরীক্ষার হলে প্রবেশ করতে পারেন না। বাস্তবে আমরা বারবার এই নিয়মের লঙ্ঘন দেখতে পাই। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা বা নীরব সমর্থনের কারণে এই অনধিকার প্রবেশকে অনেক সময় স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে।
এখানে একটি উদাহরণ প্রাসঙ্গিক। ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময় স্বল্প সময় দায়িত্ব পালন করা তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনে যাননি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছিল, এমন পরিদর্শন শিক্ষার্থীদের ওপর অযাচিত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এবং পরীক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত করে।
এই সিদ্ধান্ত ছিল সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত এবং শিক্ষার্থীবান্ধব।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টাও পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। আমরা এখন দেখছি, পরিদর্শনের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। এমনকি এবার বিরোধী দলের নেতাও যুক্ত হয়েছেন। পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে বিরোধী নেতা যাওয়ার উদাহরণ সম্ভবত এই প্রথম। তাদের এই উপস্থিতি মূলত প্রতীকী, হতে পারে সরকারি দলের সঙ্গে টেক্কা দেওয়া। তবে এসবের সঙ্গে পরীক্ষার গুণগত মান বা সুষ্ঠু পরিচালনার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই।
সাংবাদিকদের ভূমিকাও এখানে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোথাও কোথাও পরীক্ষাকেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। আবার কোথাও তাদের প্রবেশের দাবি উঠছে। বাস্তবতা হলো— পরীক্ষার কক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশের দাবিও সমানভাবে অযৌক্তিক। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নামে পরীক্ষার হলে ঢুকে পড়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে পরীক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট হয়, পরিবেশ বিঘ্নিত হয় এবং পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ক্ষুণ্ণ হয়। সাংবাদিকদের দায়িত্ব অবশ্যই আছে— অনিয়ম তুলে ধরা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু সেটি করতে হবে পরীক্ষার কক্ষের বাইরে থেকে, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে; পরীক্ষার ভেতরে গিয়ে নয়।
একাধিক সংবাদপত্রে শিক্ষা বিষয়ক রিপোর্টার, চিফ রিপোর্টার, নিউজ এডিটর বা এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় মাঠের সাংবাদিক সহকর্মীদের এ বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেছি, যাতে তারা পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতরে যাওয়ার আবদার না করেন। অনেকে বিষয়টি বুঝেছেন, ভালোভাবে মেনে নিয়েছেন। কেউ কেউ হয়তো বুঝতে চাননি। আজও দেখা যায়— ‘পরীক্ষার হলে সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি’— এমন শিরোনামে কিছু পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়।
এ প্রসঙ্গে বলে রাখা প্রয়োজন, ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত আমি নিজেও দেশের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। ওই সময় ঢাকা থেকে সাংবাদিকদের নিয়ে যাওয়া হতো দেশের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রের পরিস্থিতি দেখার জন্য। তবে আমরা পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেছি— এমনটা মনে পড়ে না। সে সময় পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সংবাদপত্রে লেখা হতো— ‘নকলের মহোৎসব’। পরীক্ষাকেন্দ্রে সহিংসতা ঠেকাতে পুলিশ হিমশিম খেত।
প্রয়াত শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে নকল বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তুলনামূলক নরম। এরপর সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুকও নকল বন্ধে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তবে তিনি ভয়ভীতি বা আতঙ্ক সৃষ্টি করে তা করতে চাননি। ওই সময়ের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন নকলবিরোধী অভিযানে কঠোর অবস্থান নেন। হেলিকপ্টারে করে পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন, হঠাৎ অভিযান, কঠোর ব্যবস্থা— এসবের মাধ্যমে তিনি একটি ভয় ও নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ তৈরি করেন, যা অনেকটাই কাজে এসেছিল। ফলে নকল অনেকাংশে কমে আসে, বড় কৃতিত্ব পান এহছানুল হক মিলন।
এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে, নকল পুরোপুরি নির্মূল না হলেও সেই মহোৎসব আজ আর নেই। কিন্তু নকল নিয়ে এই দীর্ঘ আলোচনার ফাঁকে শিক্ষার আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। কোথাও ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, কোথাও সেট কোডে গরমিল, আবার কোথাও পুরনো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার মতো অবহেলাও ঘটছে।
চাঁদপুরের মতলব, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, ঢাকায় বিসিএসআইআর স্কুল, বাড্ডার একরামুন্নেসা বালক উচ্চ বিদ্যালয়, মতিঝিল সরকারি বালক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্রে এমন ঘটনা ঘটেছে। কিছু স্কুল শাস্তির ভয়ে এমন সব ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে ফেলেছে। কোথাও শাস্তি পেয়েছেন কিছু পরীক্ষক। কিন্তু যে পরীক্ষার্থী পরীক্ষার হলে অন্য প্রশ্নপত্র পেয়ে পরীক্ষা দেওয়া শুরু করে দিয়েছিল বা সময় নষ্ট করেছে— তার কী হবে? কোনও কোনও পরীক্ষার্থী বাড়তি সময় পেলেও সবাই যথেষ্ট সময় পায়নি। ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত পরীক্ষার্থীর যে দুশ্চিন্তা এর দায় কে নেবে?
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, সমস্যার মূল জায়গা হলো ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব পালনের ঘাটতি। অথচ এই জায়গায় কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে আমরা বাহ্যিক পরিদর্শন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি— যা কাম্য নয়।
শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদানের অভাব, কোচিংনির্ভরতা, প্রাইভেট পড়ানো, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় অনিয়ম— এসবই শিক্ষার গুণগত মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। শিক্ষায় বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আবার যেটুকু আছে, তারও সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে না। পাশাপাশি রয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা, বদলি সমস্যা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতা। শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষাখাতকে দুর্নীতিমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন— এটি প্রশংসনীয়, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষাব্যবস্থার এই বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে নকল একটি সমস্যা মাত্র। এটি পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে প্রয়োজন কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, কঠোর তদারকি এবং দায়িত্বশীল পরিদর্শন। এটি কোনোভাবেই মন্ত্রী-এমপি বা রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। যার কাজ, তাকে কাজ করতে দিতে হবে। কেন্দ্র সচিব, কক্ষ পরিদর্শক এবং স্থানীয় প্রশাসন যদি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তাহলে অনেক সমস্যাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।
সোজা কথায়, পরীক্ষার হল কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়, কোনো প্রচারণার স্থান নয়, কোনো প্রদর্শনীর জায়গাও নয়। এটি একটি সংবেদনশীল, নিয়ন্ত্রিত একাডেমিক পরিসর, যেখানে কেবল পরীক্ষার্থী এবং পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিই থাকা উচিত। এর বাইরে যে কেউ— সে যত ক্ষমতাবানই হোক— তার প্রবেশ অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক এবং অনেক ক্ষেত্রে বেআইনি।
এখন সময় এসেছে একটি স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান নেওয়ার। পরীক্ষার কক্ষে পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে— মন্ত্রী, এমপি, বিরোধী নেতা কিংবা সাংবাদিক— কেউই এর ব্যতিক্রম নন। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো ধরনের প্রদর্শনমূলক কার্যক্রম বা রাজনৈতিক উপস্থিতি এই সংবেদনশীল পরিবেশে অনুমোদন করা উচিত নয়।
তাই স্পষ্ট করে একযোগে সবার বলা দরকার— পরীক্ষার হল কেবল পরীক্ষক ও পরীক্ষার্থীর জন্য। অন্য কেউ সেখানে যেতে পারবেন না।

এই আপাত ব্যর্থতার অন্তরালে একটি সূক্ষ্ম, বরং আরও অর্থপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে— কূটনৈতিক সক্ষমতাসম্পন্ন, মধ্যস্থতাকারী ও আঞ্চলিক স্বার্থধারী হিসেবে পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থান নীরবে মূল্যবান হয়ে উঠেছে। এমনকি কোনো বাস্তব কূটনৈতিক অগ্রগতি ছাড়াই ইসলামাবাদ মনে হচ্ছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা প্রক্রিয়াকে নিজের সুবি
৭ দিন আগে
এমন অদ্ভুত আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের বরখেলাপ আমাদের আবারও অতীতের স্বৈরাচারী শাসকদের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। আমরা কি এমন গণতান্ত্রিক সরকার চেয়েছিলাম, যারা অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের মতোই মব-সন্ত্রাসীদের কাছে নতজানু থাকবে? সরকার কি ভুলে গেছে, একটি ঘটনায় প্রশাসনের নতজানু অবস্থা আরও বহু ঘটনার পথ প্রশস
১১ দিন আগে
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এর অর্থ আরও স্পষ্ট— যুদ্ধের সামরিক উত্তাপ কমলেও অর্থনৈতিক অভিঘাত অনেক দিন স্থায়ী হতে পারে। সাধারণ ভোক্তার জন্য এর প্রভাব পড়বে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, খাদ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
১৩ দিন আগে
রাষ্ট্র পরিচালনা করেন রাজনীতিবিদরা; তাদের সহায়তা করে প্রশাসন, বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস; আর নীতিগত সুবিধা অনেকাংশে পায় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এই ত্রিমুখী কাঠামোর ভেতরে মেধাবী ছাত্রদের অবস্থান কোথায়— এই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
১৩ দিন আগে