
এ কে এম মাহফুজুর রহমান

দেশের অবহেলিত মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো প্রাথমিক স্তর থেকেই দক্ষতাভিত্তিক ব্যবহারিক শিক্ষা ও বাস্তবতা নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত তাত্ত্বিক জ্ঞানকেন্দ্রিক ছিল, যেখানে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। অতীতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিক্ষিপ্তভাবে গুরুত্বহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে গত ৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। তা হলো, সরকার দেশের প্রতিটি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ এবং সব জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। কারণ, প্রাথমিক ভিত্তি পর্যায় থেকেই প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করলে ভবিষ্যতে একজন শিক্ষার্থী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করে, বিদেশি রেমিট্যান্স অর্জিত হয় এবং সামগ্রিকভাবে নাগরিক, দেশ ও জাতীয় অর্থনীতির দ্রুত উন্নয়ন সাধিত হয়। এর ফলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও এগিয়ে আসতে সাহস পায়।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মেশিন লার্নিং, অটোমেশন এবং ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ— এসব পরিবর্তনের ফলে কর্মক্ষেত্রের প্রকৃতি আমূল বদলে যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) ‘Future of Jobs’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৮৫ মিলিয়ন চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে, আবার একই সঙ্গে প্রায় ৯৭ মিলিয়ন নতুন ধরনের চাকরির সৃষ্টি হবে, যেগুলো মূলত প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতায় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা (HRM) এখন আর কেবল প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়; বরং এটি একটি প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত অংশীদার।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানবসম্পদ (HR) শিক্ষার মূল ভিত্তি তাত্ত্বিক জ্ঞান ও গবেষণানির্ভর। নিয়োগ ও নির্বাচন, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, ক্ষতিপূরণ ও সুবিধা এবং কর্মী সম্পর্ক— এসব বিষয় আধুনিক মানবসম্পদ শিক্ষার মূল স্তম্ভ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) তথ্য অনুযায়ী, কার্যকর মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা গড়ে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। একইভাবে, উন্নত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কর্মীদের পারফরম্যান্স ২৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত করতে সক্ষম।
বাংলাদেশেও এই বাস্তবতা প্রতিফলিত হচ্ছে। তৈরি পোশাক শিল্প, টেলিযোগাযোগ খাত এবং বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে আধুনিক এইচআর প্র্যাকটিস চালু হওয়ার ফলে কর্মদক্ষতা, কর্মপরিবেশ এবং উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (BIDS) গবেষণা বলছে, যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং ডেটাচালিত এইচআর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক ও টেকসই। তবে একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার মধ্যে এখনো একটি সুস্পষ্ট ব্যবধান বিদ্যমান, যা ‘Research-Practice Gap’ হিসেবে পরিচিত।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬০ শতাংশ এইচআর পেশাজীবী নিয়মিত একাডেমিক গবেষণা অনুসরণ করেন না। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় অভিজ্ঞতা বা প্রচলিত ধারণার ওপর ভিত্তি করে, যা সব সময় বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর নয়। এই ব্যবধানের অন্যতম কারণ হলো একাডেমিক গবেষণার জটিলতা ও প্রয়োগযোগ্যতার সীমাবদ্ধতা। কর্পোরেট পরিবেশে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থাকায় দীর্ঘ গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ প্রায়ই বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে নেতৃত্ব বিকাশ, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা, কর্মক্ষেত্রের মানসিক স্বাস্থ্য, সাংগঠনিক সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের মতো বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না।
প্রশাসনিক কাঠামোর ক্ষেত্রেও পার্থক্য সুস্পষ্ট। সরকারি ও একাডেমিক প্রতিষ্ঠানে এইচআর কার্যক্রম সাধারণত নিয়মনীতি ও কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যেখানে স্থায়িত্ব ও আনুষ্ঠানিকতা বেশি গুরুত্ব পায়। বিপরীতে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা অধিকতর ফলাফলনির্ভর, গতিশীল এবং প্রযুক্তিনির্ভর। এখানে কর্মদক্ষতা, উদ্ভাবন এবং দ্রুত অভিযোজন ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি মূল্যায়িত হয়। এই বাস্তবতায় এইচআর পেশাজীবীদের ভূমিকা দিন দিন আরও জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বর্তমানে এইচআর-এর একটি নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, যাকে বলা হয় ‘HR Analytics’ বা ‘People Analytics’। এর মাধ্যমে কর্মীদের পারফরম্যান্স, আচরণ, সন্তুষ্টি এবং দক্ষতা ডেটার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়। গার্টনারের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠান এইচআর অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে, তারা ২৫ শতাংশ বেশি কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এখন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিপ্লব ঘটাচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় সিভি (CV) স্ক্রিনিং, ভিডিও ইন্টারভিউ বিশ্লেষণ, এমনকি কর্মীদের কর্মদক্ষতা পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। লিংকডইনের (LinkedIn) এক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এইচআর প্রযুক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ইন্টার্নশিপ, লাইভ প্রজেক্ট, কেস স্টাডি এবং সিমুলেশনভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।
দ্বিতীয়ত, Evidence-based এইচআর চর্চা জোরদার করতে হবে। ডেটা, গবেষণা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া ভবিষ্যতের এইচআর কার্যকর হবে না।
তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে ডিজিটাল এইচআর, রিমোট ওয়ার্ক, সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
চতুর্থত, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়াতে হবে। যৌথ গবেষণা, কর্পোরেট প্রশিক্ষণ, গেস্ট লেকচার এবং মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম এই ব্যবধান কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পঞ্চমত, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (PPP) মাধ্যমে প্রযুক্তিগত শিক্ষা সম্প্রসারণ করতে হবে। এতে করে শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি হবে, যা বেকারত্ব কমাতে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়ক হবে।
ভবিষ্যতের বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র ডিগ্রি নয়, বরং বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা অপরিহার্য। মানবসম্পদ উন্নয়নে একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ই হতে পারে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি।
লেখক: ডেপুটি ডিরেক্টর (ফ্যাকাল্টি এইচআর), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এবং সাবেক সহসভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা)

দেশের অবহেলিত মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো প্রাথমিক স্তর থেকেই দক্ষতাভিত্তিক ব্যবহারিক শিক্ষা ও বাস্তবতা নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত তাত্ত্বিক জ্ঞানকেন্দ্রিক ছিল, যেখানে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। অতীতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিক্ষিপ্তভাবে গুরুত্বহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে গত ৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। তা হলো, সরকার দেশের প্রতিটি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ এবং সব জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। কারণ, প্রাথমিক ভিত্তি পর্যায় থেকেই প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করলে ভবিষ্যতে একজন শিক্ষার্থী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করে, বিদেশি রেমিট্যান্স অর্জিত হয় এবং সামগ্রিকভাবে নাগরিক, দেশ ও জাতীয় অর্থনীতির দ্রুত উন্নয়ন সাধিত হয়। এর ফলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও এগিয়ে আসতে সাহস পায়।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মেশিন লার্নিং, অটোমেশন এবং ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ— এসব পরিবর্তনের ফলে কর্মক্ষেত্রের প্রকৃতি আমূল বদলে যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) ‘Future of Jobs’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৮৫ মিলিয়ন চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে, আবার একই সঙ্গে প্রায় ৯৭ মিলিয়ন নতুন ধরনের চাকরির সৃষ্টি হবে, যেগুলো মূলত প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতায় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা (HRM) এখন আর কেবল প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়; বরং এটি একটি প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত অংশীদার।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানবসম্পদ (HR) শিক্ষার মূল ভিত্তি তাত্ত্বিক জ্ঞান ও গবেষণানির্ভর। নিয়োগ ও নির্বাচন, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, ক্ষতিপূরণ ও সুবিধা এবং কর্মী সম্পর্ক— এসব বিষয় আধুনিক মানবসম্পদ শিক্ষার মূল স্তম্ভ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) তথ্য অনুযায়ী, কার্যকর মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা গড়ে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। একইভাবে, উন্নত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কর্মীদের পারফরম্যান্স ২৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত করতে সক্ষম।
বাংলাদেশেও এই বাস্তবতা প্রতিফলিত হচ্ছে। তৈরি পোশাক শিল্প, টেলিযোগাযোগ খাত এবং বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে আধুনিক এইচআর প্র্যাকটিস চালু হওয়ার ফলে কর্মদক্ষতা, কর্মপরিবেশ এবং উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (BIDS) গবেষণা বলছে, যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং ডেটাচালিত এইচআর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক ও টেকসই। তবে একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার মধ্যে এখনো একটি সুস্পষ্ট ব্যবধান বিদ্যমান, যা ‘Research-Practice Gap’ হিসেবে পরিচিত।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬০ শতাংশ এইচআর পেশাজীবী নিয়মিত একাডেমিক গবেষণা অনুসরণ করেন না। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় অভিজ্ঞতা বা প্রচলিত ধারণার ওপর ভিত্তি করে, যা সব সময় বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর নয়। এই ব্যবধানের অন্যতম কারণ হলো একাডেমিক গবেষণার জটিলতা ও প্রয়োগযোগ্যতার সীমাবদ্ধতা। কর্পোরেট পরিবেশে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থাকায় দীর্ঘ গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ প্রায়ই বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে নেতৃত্ব বিকাশ, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা, কর্মক্ষেত্রের মানসিক স্বাস্থ্য, সাংগঠনিক সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের মতো বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না।
প্রশাসনিক কাঠামোর ক্ষেত্রেও পার্থক্য সুস্পষ্ট। সরকারি ও একাডেমিক প্রতিষ্ঠানে এইচআর কার্যক্রম সাধারণত নিয়মনীতি ও কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যেখানে স্থায়িত্ব ও আনুষ্ঠানিকতা বেশি গুরুত্ব পায়। বিপরীতে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা অধিকতর ফলাফলনির্ভর, গতিশীল এবং প্রযুক্তিনির্ভর। এখানে কর্মদক্ষতা, উদ্ভাবন এবং দ্রুত অভিযোজন ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি মূল্যায়িত হয়। এই বাস্তবতায় এইচআর পেশাজীবীদের ভূমিকা দিন দিন আরও জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বর্তমানে এইচআর-এর একটি নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, যাকে বলা হয় ‘HR Analytics’ বা ‘People Analytics’। এর মাধ্যমে কর্মীদের পারফরম্যান্স, আচরণ, সন্তুষ্টি এবং দক্ষতা ডেটার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়। গার্টনারের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠান এইচআর অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে, তারা ২৫ শতাংশ বেশি কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এখন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিপ্লব ঘটাচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় সিভি (CV) স্ক্রিনিং, ভিডিও ইন্টারভিউ বিশ্লেষণ, এমনকি কর্মীদের কর্মদক্ষতা পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। লিংকডইনের (LinkedIn) এক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এইচআর প্রযুক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ইন্টার্নশিপ, লাইভ প্রজেক্ট, কেস স্টাডি এবং সিমুলেশনভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।
দ্বিতীয়ত, Evidence-based এইচআর চর্চা জোরদার করতে হবে। ডেটা, গবেষণা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া ভবিষ্যতের এইচআর কার্যকর হবে না।
তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে ডিজিটাল এইচআর, রিমোট ওয়ার্ক, সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
চতুর্থত, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়াতে হবে। যৌথ গবেষণা, কর্পোরেট প্রশিক্ষণ, গেস্ট লেকচার এবং মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম এই ব্যবধান কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পঞ্চমত, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (PPP) মাধ্যমে প্রযুক্তিগত শিক্ষা সম্প্রসারণ করতে হবে। এতে করে শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি হবে, যা বেকারত্ব কমাতে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়ক হবে।
ভবিষ্যতের বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র ডিগ্রি নয়, বরং বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা অপরিহার্য। মানবসম্পদ উন্নয়নে একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ই হতে পারে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি।
লেখক: ডেপুটি ডিরেক্টর (ফ্যাকাল্টি এইচআর), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এবং সাবেক সহসভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা)

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এর অর্থ আরও স্পষ্ট— যুদ্ধের সামরিক উত্তাপ কমলেও অর্থনৈতিক অভিঘাত অনেক দিন স্থায়ী হতে পারে। সাধারণ ভোক্তার জন্য এর প্রভাব পড়বে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, খাদ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
১০ দিন আগে
রাষ্ট্র পরিচালনা করেন রাজনীতিবিদরা; তাদের সহায়তা করে প্রশাসন, বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস; আর নীতিগত সুবিধা অনেকাংশে পায় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এই ত্রিমুখী কাঠামোর ভেতরে মেধাবী ছাত্রদের অবস্থান কোথায়— এই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
১০ দিন আগে
বাংলাদেশের জনগণের বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত। তাদের অধিকাংশই সাধারণ মোবাইল ব্যবহার করে। অপরদিকে ওয়াই-ফাই সকলের বাসা-বাড়িতে নেই। এ অবস্থায় নানা আর্থিক প্রতিকূলতার কারণে সাধারণ মানুষের সন্তানদের অনলাইন ক্লাস করা বিঘ্নিত হবে।
১৪ দিন আগে
জ্বালানি তেল সংকট কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে— একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এখনই বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং অবৈধ মজুতদারি প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
১৭ দিন আগে