
ড. মিহির কুমার রায়

নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গটি বারবার আসে। রাজনীতিবিদরা নির্বাচন এলেই বলেন, দেশে সংখ্যালঘু বলে কিছু নেই— সবাই আমরা বাংলাদেশি। এটা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছাড়া আর কিছুই নয়। নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুরা বিনিদ্র রজনী কাটায়, যা এখন এক ধরনের রীতিতে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো দল মনে করে, এই সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের ভোটব্যাংক— যা কোনোভাবেই সত্য নয়।
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্তের মতে, ব্রিটিশ আমল থেকে এখন পর্যন্ত সহিংসতার কোনো বিচার হয়নি, কেবল কিছু পুলিশি পদক্ষেপ ছাড়া।
ইতিহাসের পাতায় রয়েছে— ব্রিটিশ আমলের (১৮৫৮–১৯৪৭) ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি, যার ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয় এবং ১৯৪৭ সালে দেশভাগ ঘটে। পাকিস্তানি আমলে (১৯৪৭ থেকে ১৯৭১) সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন; ১৯৭১ সালে হিন্দু সম্প্রদায়কে টার্গেট করে নির্যাতন, যার ফলে এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়; স্বাধীন বাংলাদেশে চার মূলনীতি— সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়ন; ১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা; এরপর সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখল (১৯৭৬ থেকে ১৯৯০), যা ছিল রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ও সংখ্যালঘুদের জন্য ক্রান্তিকাল; প্রো-ইসলামিক নীতি, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ, তাদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশে নেমে আসা; ১৯৯০ সালের পর আক্রমণের ভয়াবহতা; ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা; ৮ অক্টোবর ২০০১ সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় পূর্ণিমা রানী শীলকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের ঘটনা— ইত্যাদি স্মরণীয় ঘটনাগুলো উঠে আসে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে— এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এ কথাও অনস্বীকার্য যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক গণতন্ত্রে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। এখন বাংলাদেশের মানুষকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে— তারা পশ্চিমা তথা মার্কিন গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে থাকবে, নাকি দেশীয় পারিপার্শ্বিকতায় লালিত স্বদেশি বাংলাদেশি গণতন্ত্রের অনুশীলনকে সমৃদ্ধ করবে।
ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অতি লোভনীয় উদীয়মান অর্থনীতির এই দেশ কি বহির্শক্তির খেলার মাঠে পরিণত হবে, নাকি বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় একাট্টা হয়ে নিজেদের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতিকার নিজেরাই করবে— তা নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে।
ধর্ম নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসা নতুন নয়, এটি পুরোনো ব্যাপার। ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তানি জমানায় এ ব্যবস্থা ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার ফলে দেশের মানুষের ভীষণ ক্ষতি হয়েছে। ধর্মকে সাইনবোর্ড বানিয়ে মানুষের খাওয়া-পরা, বেঁচে থাকার সংকট থেকে তাদের অন্যমনস্ক করে দেওয়া হয়েছে। ওই ঐতিহ্য এখনো শেষ হয়নি, বরং আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে দেশে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল প্রচারে মুখোমুখি। তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণব্যবস্থা চালুর আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হিন্দু শাখা গঠন করে অনেক জেলায় কমিটি করেছে।
আসন্ন নির্বাচনে খুলনার একটি আসনে জামায়াত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। আবার দরিদ্র শ্রেণির মানুষের মধ্যে খাদ্য ও অর্থসাহায্যও দেওয়া হচ্ছে, যার অনেকটাই হয়তো রাজনৈতিক কৌশল।
তবে নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের প্রতি সেই দলের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে— সে বিষয়ে অতীতের রেকর্ড আশাব্যঞ্জক নয়। কারণ ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম— তা সংবিধান স্বীকৃত। যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের আমলেও জমি দখল, সম্পত্তি দখল, দুর্গাপূজায় প্রতিমা ভাঙচুরসহ নানা ঘটনা ঘটেছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় হিন্দু অধ্যুষিত পল্লিতে এক সপ্তাহে সাতটি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, যা উদ্বেগজনক হলেও বিস্ময়কর নয়। অগ্নিকাণ্ডগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে কোনো বিশেষ মহল আতঙ্ক ছড়িয়ে হিন্দু ভোটারদের ভোটদান থেকে বিরত রাখতে চাইছে। রহস্যজনকভাবে এসব নাশকতা শুরু হওয়ার পর থানাপুলিশ অবগত হয়ে এলাকা পরিদর্শন করলেও অগ্নিসংযোগ বন্ধ হয়নি।
গত ১ নভেম্বর থেকে ৫০ দিনে চট্টগ্রামের রাউজানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ১২টি ঘরে আগুন দেওয়া হয়। এমনকি ঘরের ভেতরে মানুষ রেখে বাইরে থেকে তালা মেরে আগুন লাগানোর ঘটনাও ঘটে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে।
এ বিষয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও সরকার প্রথমে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা অস্বীকার করে। পরে কিছু ঘটনা স্বীকার করলেও এখনো কোনো ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেয়েছেন— এমন নজির নেই।
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাটবনগ্রাম বাজারসংলগ্ন বারপল্লী মহাশ্মশান কালীমন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। দুর্বৃত্তরা মন্দিরে প্রবেশ করে কালী, মহাদেব, ডাকিনী-যোগিনী ও সর্প প্রতিমা ভাঙচুর করে। বিশেষ করে কালী ও মহাদেবের মুখমণ্ডল লাঠি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলের মানুষ ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক নষ্ট করতে এমন কাজ করছে।
নির্বাচনের একদিন বাকি, সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে টিআইবি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে দেশে ১৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে, যাতে চারজন নিহত ও ২৬৮ জন আহত হন। জানুয়ারিতে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে— এ মাসে ৭৫টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যেখানে নিহত হন ১১ জন এবং আহত হন ৬১৬ জন।
এ রাজনৈতিক অস্থিরতায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। ডিসেম্বরে ১১ জন সাংবাদিক লাঞ্ছিত বা বাধাগ্রস্ত হলেও জানুয়ারিতে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ জনে।
গত ২৯ জানুয়ারি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বরাবরে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে—
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন জমে উঠেছে— এমনটা বলা যায় না। তবে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে কথার লড়াই ছিল তীব্র। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ না থাকায় এবার বিএনপিকে দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে। এখন সংখ্যালঘু ভোট কোনদিকে যাবে— তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।
অনেকের ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা। কিন্তু এবার দলটি নির্বাচনে না থাকায় ভোটের বিষয়টি সংখ্যালঘুরাই নির্ধারণ করবেন। কারণ তারা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ— সংখ্যায় যা এক কোটিরও বেশি।
বিএনপি বলছে, তাদের ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়— এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। তারা প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই তাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা— এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
অন্যদিকে জামায়াত বলছে, তারা সবাইকে নিয়ে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। এখন অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচন পর্যন্ত। তবে এটা অবশ্যই সত্য, রাজনীতি হওয়া উচিত যুক্তির প্রতিযোগিতা, নীতির প্রতিযোগিতা, পরিকল্পনার প্রতিযোগিতা এবং মানুষের সমর্থন অর্জনের প্রতিযোগিতা। কিন্তু যদি রাজনীতির নিয়ম ঠিক করে প্রতিহিংসার দানব, তাহলে ক্ষতি সবারই— সাধারণ মানুষের, সামাজিক স্থিতির, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর।
এই দানব দল দেখে না, মতাদর্শ দেখে না, বয়স দেখে না। আজ যার বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে, কাল তার পক্ষেও তা ফিরে আসতে পারে— সহিংসতা কখনো কারও নিজস্ব সম্পদ নয়।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন গবেষক

নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গটি বারবার আসে। রাজনীতিবিদরা নির্বাচন এলেই বলেন, দেশে সংখ্যালঘু বলে কিছু নেই— সবাই আমরা বাংলাদেশি। এটা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছাড়া আর কিছুই নয়। নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুরা বিনিদ্র রজনী কাটায়, যা এখন এক ধরনের রীতিতে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো দল মনে করে, এই সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের ভোটব্যাংক— যা কোনোভাবেই সত্য নয়।
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্তের মতে, ব্রিটিশ আমল থেকে এখন পর্যন্ত সহিংসতার কোনো বিচার হয়নি, কেবল কিছু পুলিশি পদক্ষেপ ছাড়া।
ইতিহাসের পাতায় রয়েছে— ব্রিটিশ আমলের (১৮৫৮–১৯৪৭) ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি, যার ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয় এবং ১৯৪৭ সালে দেশভাগ ঘটে। পাকিস্তানি আমলে (১৯৪৭ থেকে ১৯৭১) সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন; ১৯৭১ সালে হিন্দু সম্প্রদায়কে টার্গেট করে নির্যাতন, যার ফলে এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়; স্বাধীন বাংলাদেশে চার মূলনীতি— সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়ন; ১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা; এরপর সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখল (১৯৭৬ থেকে ১৯৯০), যা ছিল রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ও সংখ্যালঘুদের জন্য ক্রান্তিকাল; প্রো-ইসলামিক নীতি, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ, তাদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশে নেমে আসা; ১৯৯০ সালের পর আক্রমণের ভয়াবহতা; ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা; ৮ অক্টোবর ২০০১ সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় পূর্ণিমা রানী শীলকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের ঘটনা— ইত্যাদি স্মরণীয় ঘটনাগুলো উঠে আসে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে— এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এ কথাও অনস্বীকার্য যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক গণতন্ত্রে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। এখন বাংলাদেশের মানুষকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে— তারা পশ্চিমা তথা মার্কিন গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে থাকবে, নাকি দেশীয় পারিপার্শ্বিকতায় লালিত স্বদেশি বাংলাদেশি গণতন্ত্রের অনুশীলনকে সমৃদ্ধ করবে।
ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অতি লোভনীয় উদীয়মান অর্থনীতির এই দেশ কি বহির্শক্তির খেলার মাঠে পরিণত হবে, নাকি বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় একাট্টা হয়ে নিজেদের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতিকার নিজেরাই করবে— তা নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে।
ধর্ম নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসা নতুন নয়, এটি পুরোনো ব্যাপার। ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তানি জমানায় এ ব্যবস্থা ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার ফলে দেশের মানুষের ভীষণ ক্ষতি হয়েছে। ধর্মকে সাইনবোর্ড বানিয়ে মানুষের খাওয়া-পরা, বেঁচে থাকার সংকট থেকে তাদের অন্যমনস্ক করে দেওয়া হয়েছে। ওই ঐতিহ্য এখনো শেষ হয়নি, বরং আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে দেশে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল প্রচারে মুখোমুখি। তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণব্যবস্থা চালুর আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হিন্দু শাখা গঠন করে অনেক জেলায় কমিটি করেছে।
আসন্ন নির্বাচনে খুলনার একটি আসনে জামায়াত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। আবার দরিদ্র শ্রেণির মানুষের মধ্যে খাদ্য ও অর্থসাহায্যও দেওয়া হচ্ছে, যার অনেকটাই হয়তো রাজনৈতিক কৌশল।
তবে নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের প্রতি সেই দলের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে— সে বিষয়ে অতীতের রেকর্ড আশাব্যঞ্জক নয়। কারণ ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম— তা সংবিধান স্বীকৃত। যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের আমলেও জমি দখল, সম্পত্তি দখল, দুর্গাপূজায় প্রতিমা ভাঙচুরসহ নানা ঘটনা ঘটেছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় হিন্দু অধ্যুষিত পল্লিতে এক সপ্তাহে সাতটি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, যা উদ্বেগজনক হলেও বিস্ময়কর নয়। অগ্নিকাণ্ডগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে কোনো বিশেষ মহল আতঙ্ক ছড়িয়ে হিন্দু ভোটারদের ভোটদান থেকে বিরত রাখতে চাইছে। রহস্যজনকভাবে এসব নাশকতা শুরু হওয়ার পর থানাপুলিশ অবগত হয়ে এলাকা পরিদর্শন করলেও অগ্নিসংযোগ বন্ধ হয়নি।
গত ১ নভেম্বর থেকে ৫০ দিনে চট্টগ্রামের রাউজানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ১২টি ঘরে আগুন দেওয়া হয়। এমনকি ঘরের ভেতরে মানুষ রেখে বাইরে থেকে তালা মেরে আগুন লাগানোর ঘটনাও ঘটে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে।
এ বিষয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও সরকার প্রথমে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা অস্বীকার করে। পরে কিছু ঘটনা স্বীকার করলেও এখনো কোনো ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেয়েছেন— এমন নজির নেই।
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাটবনগ্রাম বাজারসংলগ্ন বারপল্লী মহাশ্মশান কালীমন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। দুর্বৃত্তরা মন্দিরে প্রবেশ করে কালী, মহাদেব, ডাকিনী-যোগিনী ও সর্প প্রতিমা ভাঙচুর করে। বিশেষ করে কালী ও মহাদেবের মুখমণ্ডল লাঠি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলের মানুষ ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক নষ্ট করতে এমন কাজ করছে।
নির্বাচনের একদিন বাকি, সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে টিআইবি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে দেশে ১৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে, যাতে চারজন নিহত ও ২৬৮ জন আহত হন। জানুয়ারিতে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে— এ মাসে ৭৫টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যেখানে নিহত হন ১১ জন এবং আহত হন ৬১৬ জন।
এ রাজনৈতিক অস্থিরতায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। ডিসেম্বরে ১১ জন সাংবাদিক লাঞ্ছিত বা বাধাগ্রস্ত হলেও জানুয়ারিতে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ জনে।
গত ২৯ জানুয়ারি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বরাবরে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে—
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন জমে উঠেছে— এমনটা বলা যায় না। তবে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে কথার লড়াই ছিল তীব্র। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ না থাকায় এবার বিএনপিকে দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে। এখন সংখ্যালঘু ভোট কোনদিকে যাবে— তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।
অনেকের ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা। কিন্তু এবার দলটি নির্বাচনে না থাকায় ভোটের বিষয়টি সংখ্যালঘুরাই নির্ধারণ করবেন। কারণ তারা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ— সংখ্যায় যা এক কোটিরও বেশি।
বিএনপি বলছে, তাদের ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়— এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। তারা প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই তাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা— এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
অন্যদিকে জামায়াত বলছে, তারা সবাইকে নিয়ে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। এখন অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচন পর্যন্ত। তবে এটা অবশ্যই সত্য, রাজনীতি হওয়া উচিত যুক্তির প্রতিযোগিতা, নীতির প্রতিযোগিতা, পরিকল্পনার প্রতিযোগিতা এবং মানুষের সমর্থন অর্জনের প্রতিযোগিতা। কিন্তু যদি রাজনীতির নিয়ম ঠিক করে প্রতিহিংসার দানব, তাহলে ক্ষতি সবারই— সাধারণ মানুষের, সামাজিক স্থিতির, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর।
এই দানব দল দেখে না, মতাদর্শ দেখে না, বয়স দেখে না। আজ যার বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে, কাল তার পক্ষেও তা ফিরে আসতে পারে— সহিংসতা কখনো কারও নিজস্ব সম্পদ নয়।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন গবেষক

অর্থাৎ এ পর্যন্ত তিনবার ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে; এবারেরটি হবে চতুর্থ। তবে নির্বাচনের কারণে বইমেলা কখনো বন্ধ থাকেনি। ১৯৭৯ সালে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলা চলেছে। ১৯৯১ সালেও মেলা চলেছে পুরো ফেব্রুয়ারি জুড়ে। ১৯৯৬ সালেও একই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। ১৯৭৯ সালের মেলাটি কিছুটা ব্যতিক
৩ দিন আগে
যতদিন শাসনব্যবস্থা মানুষকে রাজকীয় যন্ত্রের বিনিময়যোগ্য যন্ত্রাংশ হিসেবে গণ্য করবে, ততদিন এ দেশ বহু রাজার, শোষিত প্রজার দেশ হয়েই থাকবে— আর নাগরিকরা চিরকালই গলা মিলিয়ে গান গাইতে বাধ্য হবে— আমরা সবাই গাধা…
৬ দিন আগে
প্রকৃতপক্ষে দেশের প্রয়োজনের সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই। যদি থাকত, তাহলে সরকার এর ব্যাখ্যা দিতে পারত। আমরা জাতীয় উন্নয়ন বা অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক দেখি না।
৭ দিন আগে
তবে লাইলাতুল বরাতের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আত্মসমালোচনা, নৈতিক সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের আহ্বান। ভোগবাদ, স্বার্থপরতা ও সংঘাতে পূর্ণ আধুনিক বিশ্বে এই রাতের শিক্ষা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৯ দিন আগে