যুদ্ধ থামলেও তেলের দাম দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা ঘিরে অনেকের মনেই স্বাভাবিক প্রশ্ন— যুদ্ধবিরতি হলে তেলের দাম কত দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে? বাস্তবসম্মত উত্তর হলো— খুব দ্রুত নয়। কারণ, জ্বালানির বাজার শুধু যুদ্ধ বা শান্তির ঘোষণায় পরিচালিত হয় না; এটি পরিচালিত হয় সরবরাহ, আস্থা, পরিবহন ঝুঁকি, বিমা ব্যয়, মুদ্রা চাপ ও বৈশ্বিক বাজার মনস্তত্ত্বের সমন্বয়ে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এর অর্থ আরও স্পষ্ট— যুদ্ধের সামরিক উত্তাপ কমলেও অর্থনৈতিক অভিঘাত অনেক দিন স্থায়ী হতে পারে। সাধারণ ভোক্তার জন্য এর প্রভাব পড়বে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, খাদ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে।

হরমুজ প্রণালি: কৌশলগত পথ, বৈশ্বিক স্পন্দন

বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং উল্লেখযোগ্য এলএনজি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। এই পথের সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক বাজারে বড় ধাক্কা দেয়।

ইতিহাস বলে, এমন পরিস্থিতিতে বাজার শুধু সরবরাহের বর্তমান অবস্থা দেখে না, ভবিষ্যৎ ঝুঁকিও দাম নির্ধারণ করে। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক স্থাপনায় হামলার পর কয়েক দিনের মধ্যেই তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল, যদিও উৎপাদন দ্রুত পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল। কারণ বাজারের মূল উদ্বেগ ছিল— 'পরবর্তী ধাক্কা কখন?’

আজও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকলেও জাহাজ কোম্পানিগুলো বাড়তি সতর্কতা নেয়, বিমা কোম্পানিগুলো ‘ওয়ার রিস্ক প্রিমিয়াম’ বাড়ায়, ব্যাংকগুলো এলসি ক্লিয়ারেন্সে বেশি সময় নেয়, সরবরাহকারীরা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ধরে দাম বাড়িয়ে রাখে। অর্থাৎ, পথ ‘খুলেছে’ বললেই বাজার ‘স্বাভাবিক’ হয় না।

বাস্তবতা: সরবরাহ চেইন তাৎক্ষণিকভাবে ঠিক হয় না

জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় বাস্তবতা হলো সময়। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল বা এলএনজি এশিয়ায় পৌঁছাতে সাধারণত ২০ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে। অর্থাৎ, আজ যুদ্ধবিরতি হলেও আগের আটকে থাকা কার্গো পৌঁছাতে সময় লাগবে, বন্দরে জমে থাকা জট কাটাতে সময় লাগবে, নতুন শিডিউল পুনর্বিন্যাস করতে হবে। এটি অনেকটা নদীর বাঁধ খুলে দেওয়ার মতো— পানি সঙ্গে সঙ্গে শেষ প্রান্তে পৌঁছায় না। কোভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক শিপিং সংকটে আমরা দেখেছি, একবার সরবরাহ চেইন ভেঙে গেলে তা পুনরুদ্ধারে মাস লেগে যায়। জ্বালানি বাজারেও একই নিয়ম কাজ করে।

বাংলাদেশের জন্য বাস্তব চাপ: শুধু তেল নয়, ডলারেরও সংকট

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় দুর্বলতা হলো জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সরকারের সামনে তিনটি চাপ একসঙ্গে তৈরি হয়—

প্রথমত: বৈদেশিক মুদ্রার চাপ

ডলার দিয়ে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হলে রিজার্ভে চাপ পড়ে। যদি বাজারে ডলারের ঘাটতি বাড়ে, তবে টাকার ওপরও চাপ বাড়ে।

দ্বিতীয়ত: বিদ্যুৎ ও শিল্প ব্যয়

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ আমদানি করা জ্বালানি ও গ্যাসনির্ভর। তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, শিল্পে উৎপাদন খরচ বাড়ে, রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা কমে।

উদাহরণস্বরূপ, গার্মেন্টস খাতে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচ বাড়ে, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বিকল্প বাজারে যেতে উৎসাহিত করতে পারে।

তৃতীয়ত: খাদ্য ও পরিবহন মূল্যস্ফীতি

ডিজেলনির্ভর সেচ, ট্রাক, নৌ পথ—সবখানে ব্যয় বাড়ে। ফলে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ে, শহরে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ তৈরি হয়। ২০২২ সালের বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশে পরিবহন ব্যয় ও বিদ্যুৎ চাপের যে প্রভাব দেখা গিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকেও জটিল হতে পারে— যদি সরবরাহ অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হয়।

আগামী তিন মাস: বাজারে কী হতে পারে?

এপ্রিল থেকে জুন— এই সময়টিকে বিশ্লেষকেরা ‘সতর্ক অনিশ্চয়তার পর্যায়’ হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, যুদ্ধের আগের তুলনায় দাম উঁচু থাকতে পারে, বাজারে ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ বজায় থাকতে পারে, আমদানিনির্ভর দেশে মূল্য সমন্বয় বিলম্বিত হতে পারে। বাংলাদেশে এর অর্থ— জ্বালানি সাশ্রয় নীতি আরও কড়াকড়ি হতে পারে, কিছু খাতে রেশনিং বা অগ্রাধিকারভিত্তিক সরবরাহ জারি থাকতে পারে, সরকারি ভর্তুকি ব্যয় বাড়তে পারে।

করণীয়: আতঙ্ক নয়, বাস্তববাদ

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আতঙ্ক নয়, পরিকল্পিত অভিযোজন।

স্বল্পমেয়াদে: জ্বালানি অপচয় কমানো, জরুরি খাতে অগ্রাধিকার সরবরাহ, বাজার তদারকি।

মধ্যমেয়াদে: কৌশলগত জ্বালানি মজুত বাড়ানো, বিকল্প সরবরাহ উৎস খোঁজা।

দীর্ঘমেয়াদে: সৌরশক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা কমানো।

বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতা কমানো কোনো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, পরিকল্পিত অর্থনৈতিক রূপান্তরের বিষয়। এর জন্য প্রথমেই জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্য আনতে হবে— সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়িয়ে আমদানি করা তেল ও এলএনজির ওপর চাপ কমানো জরুরি। একই সঙ্গে কৃষিতে উন্নত বীজ, সেচ প্রযুক্তি, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং ভোজ্যতেল ফসলের উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে।

শিল্প খাতে স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদন, টেক্সটাইলের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালীকরণ, ওষুধ ও রাসায়নিক কাঁচামালের দেশীয় উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্লাস্টার গড়ে তোলা প্রয়োজন। রপ্তানি খাতে তৈরি পোশাকের বাইরে আইটি, ওষুধ, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য ও জাহাজ নির্মাণে বহুমুখীকরণ ডলার আয়ের নতুন পথ তৈরি করবে। পাশাপাশি বন্দর দক্ষতা, ডিজিটাল কাস্টমস, সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত জ্বালানি ও খাদ্য মজুত গড়ে তোলা সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।

দীর্ঘমেয়াদে কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এমন একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে, যা বৈশ্বিক ধাক্কা সামলেও স্থিতিশীল থাকতে পারে। অর্থাৎ, আমদানিনির্ভরতা কমানোর মূল পথ হলো নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে অর্থনীতিকে আরও সহনশীল, দক্ষ ও আত্মনির্ভর করে তোলা।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বাস্তব বার্তা হলো— জ্বালানির বাজারে দ্রুত স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা সীমিত। যুদ্ধ থেমে গেলেও সরবরাহের ক্ষত, বাজারের ভীতি ও আর্থিক চাপ এত দ্রুত সারে না। তেল আজ শুধু পাম্পের পণ্য নয়; এটি অর্থনীতি, জীবনযাত্রা এবং জাতীয় স্থিতিশীলতার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক।

যুদ্ধের শব্দ থেমে যেতে পারে, কিন্তু তার অর্থনৈতিক প্রতিধ্বনি দীর্ঘদিন শোনা যায়। জ্বালানির বাজারে আস্থা ফিরতে সময় লাগে, আর সেই সময়টাই এখন সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

দায়মুক্তি: এই লেখা তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণমূলক মতামত। বাজার ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল, বাস্তব ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।

লেখক: কলামিস্ট ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

৭ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৮ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

১০ দিন আগে

বাংলাদেশ-ভারতের স্বার্থে ফারাক্কা ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন

ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৫২ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতীয় রাজনীতিবিদরা যখন এটি ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন, তখন ফারাক্কা বাঁধ যে কতটা ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারও বাকি থাকার কথা নয়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের এই দাবির প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধের অপ্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

১১ দিন আগে