আমরা যা দেখাই, আমরা কি সত্যিই তাই

এম ডি মাসুদ খান

মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে— সে নিজেকে যেমন, তার চেয়ে একটু ভালো করে দেখাতে চায়। আগে এই প্রবণতার সীমা ছিল পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, অফিস কিংবা বন্ধুমহল পর্যন্ত। এখন সেই ছোট পরিসরটি বিস্ফোরিত হয়ে গেছে। হাতে একটি স্মার্টফোন, সামনে একটি ক্যামেরা, আর পেছনে কোটি কোটি দর্শকের সম্ভাবনা। ফলে মানুষ এখন শুধু জীবনযাপন করে না—জীবন প্রদর্শনও করে।

আমরা খাই, কিন্তু খাবারের ছবিও তুলি। ভ্রমণে যাই, কিন্তু ভ্রমণের চেয়ে তার ছবি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বন্ধুর সঙ্গে দেখা করি, কিন্তু বন্ধুত্বের চেয়ে ছবিটি বেশি জরুরি মনে হয়। বই পড়ি, আবার বইটির ছবিও প্রকাশ করি। দান করি, তারপর কখনো কখনো দানের ছবিটিও প্রকাশ করি। ধর্মীয় কথা বলি, দেশপ্রেমের কথা বলি, মানবতার কথা বলি— কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকে যায়: আমরা যা বলছি, বাস্তব জীবনে কি সত্যিই তা পালন করছি?

কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের হাতে শুধু যোগাযোগের প্রযুক্তি দেয়নি; এটি আমাদের সামনে একটি নতুন সামাজিক আয়না ধরেছে। কিন্তু সেই আয়নায় আমরা নিজের মুখ দেখি না। আমরা দেখি—অন্যেরা আমাদের কীভাবে দেখুক, সেই মুখটি।

একজন মানুষ বাস্তব জীবনে হয়তো সাধারণ, কিন্তু ফেসবুকে তিনি অসাধারণ। বাস্তবে হয়তো তিনি খুব কম বই পড়েন, কিন্তু তার টাইমলাইনে জ্ঞানের বন্যা। বাস্তবে হয়তো কারও বিপদে পাশে দাঁড়ান না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানবতার জন্য তার আহাজারির শেষ নেই। বাস্তবে হয়তো নিজের কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বশীল নন। কিন্তু দেশের উন্নয়ন নিয়ে তার দীর্ঘ বক্তৃতা আছে।

বাস্তবে হয়তো পরিবারের মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মা-বাবা নিয়ে আবেগঘন পোস্টের অভাব নেই। এখানেই আমাদের সময়ের এক গভীর দ্বন্দ্ব।

আমরা মানুষ হওয়ার চেয়ে মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছি। আমরা চরিত্র গঠনের চেয়ে চরিত্রের বিজ্ঞাপন দিতে শিখছি। আমরা ভালো কাজের চেয়ে ভালো কাজের দৃশ্য প্রদর্শনে বেশি আগ্রহী। আর এই জায়গাটিই বিপজ্জনক। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রতারণা অন্যকে প্রতারণা করা নয়। নিজেকে প্রতারণা করা।

আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবনের ফসল দেখাই; কিন্তু ফসল চাষের কষ্ট দেখাই না। আমরা সাফল্যের ছবি দেখাই; ব্যর্থতার রাত দেখাই না। আমরা হাসির ছবি প্রকাশ করি; কান্নার ইতিহাস গোপন রাখি।

ফলে একজন মানুষ যখন নিজের জীবনকে অন্যের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জীবনের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন তিনি একটি ভয়ংকর ভুল করেন। তিনি নিজের পুরো জীবনকে অন্যের নির্বাচিত কয়েকটি মুহূর্তের সঙ্গে তুলনা করেন। তারপর নিজেকেই ব্যর্থ মনে করেন।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের একটি পুরোনো স্বভাব আছে— তুলনা করা।

কার ছেলে কোথায় পড়ে? কার মেয়ে কোথায় চাকরি করে? কে বিদেশে গেল? কে কত বেতন পায়? কার বাড়ি কত বড়? কার গাড়ি কী?

আগে এই তুলনা ছিল পাড়ায়। এখন পুরো পৃথিবী আমাদের বসার ঘরে ঢুকে পড়েছে। আগে প্রতিবেশীর সঙ্গে তুলনা করতাম। এখন লন্ডন, দুবাই, নিউইয়র্ক, সিঙ্গাপুর, ঢাকা—সব একসঙ্গে আমাদের নিউজফিডে।

কেউ ইউরোপে ঘুরছে।

কেউ নতুন গাড়ি কিনছে।

কেউ সমুদ্রের পাশে বসে ছবি তুলছে।

কেউ পাঁচতারা হোটেলে রাত কাটাচ্ছে।

আর গ্রামের বা মফস্বলের একজন তরুণ নিজের ঘরে বসে ভাবছে—“আমি তাহলে কী করছি?”

এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার: অন্যের জীবনের দৃশ্য দেখে নিজের জীবনের বিচার করা বোকামি।

কারণ আপনি জানেন না—তার পেছনে কত ঋণ, কত ত্যাগ, কত পারিবারিক সহায়তা, কত ব্যর্থতা, কত অস্থিরতা। আপনি শুধু তার ছবিটি দেখছেন। ছবির পেছনের মানুষটিকে দেখছেন না।

আমাদের সময়ের সবচেয়ে কৌতুককর অথচ ভয়ংকর দৃশ্য হলো—মানুষ অনেক বিষয়ে মতামত দেয়, কিন্তু খুব কম বিষয়ে গভীরভাবে জানে। একটি সংবাদ পড়েই বিশেষজ্ঞ। একটি ভিডিও দেখেই গবেষক। একটি পোস্ট দেখেই ইতিহাসবিদ। দুই মিনিটের ভিডিও দেখে চিকিৎসা পরামর্শ। একটি রাজনৈতিক বক্তব্য শুনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষণ। একটি ধর্মীয় পোস্ট পড়ে ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যা।

সব জানার প্রয়োজনও নেই। সমস্যা হলো—আমরা জানি না—এই কথাটি বলতে লজ্জা পাই। “আমি জানি না”— এই তিনটি শব্দ একজন জ্ঞানী মানুষের শক্তি হতে পারে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অনেকে মনে করেন, সব বিষয়ে কথা বলতেই হবে।

কারণ নীরব থাকলে কেউ জানবে না যে তিনি আছেন। এ যেন জ্ঞানের চেয়ে দৃশ্যমানতার প্রতিযোগিতা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি গভীর সংকট— আমরা অনেক সময় সত্য খুঁজি না। আমরা খুঁজি—আমার বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন তথ্য।

আমি যে দলকে সমর্থন করি, তার ভুল দেখতে চাই না। আমি যে মতাদর্শে বিশ্বাস করি, তার দুর্বলতা শুনতে চাই না। আমি যে নেতাকে পছন্দ করি, তার সমালোচনা সহ্য করতে পারি না। আমি যে ধর্মীয় বা সামাজিক বিশ্বাসে বড় হয়েছি, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মনে করি, আমার অস্তিত্বের ওপর আঘাত এসেছে।

ফলে আলোচনা আর আলোচনা থাকে না। তা হয়ে ওঠে যুদ্ধ।

যুক্তির বদলে গালি, তথ্যের বদলে অপপ্রচার, প্রশ্নের বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণ। এখানে কেউ সত্যের কাছে যেতে চায় না। সবাই নিজের পক্ষকে জিতিয়ে দিতে চায়।

আমরা সত্যের অনুসারী নই; অনেক সময় আমরা নিজেদের মতের অনুসারী।

একটি মিথ্যা খবরের কোনো দায়িত্ব নেই। তার কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই। তার শুধু আবেগ দরকার। একটি উত্তেজক শিরোনাম দরকার।

একটি পুরোনো ছবি দরকার।

একটি কাটা ভিডিও দরকার।

তারপর মানুষের আঙুল।

শেয়ার।

শেয়ার।

আরও শেয়ার।

কিছুক্ষণ পর সেই মিথ্যা খবর এত মানুষের কাছে পৌঁছে যায় যে মানুষ বলতে শুরু করে— “সবাই তো বলছে!”

কিন্তু সত্যের কোনো গণতান্ত্রিক ভোট নেই। হাজার মানুষ মিথ্যা বললেও সত্য সত্যই থাকে। এই জায়গায় আমাদের নতুন ধরনের নাগরিক শিক্ষা দরকার।

শুধু পড়তে শেখা নয়, তথ্য যাচাই করতে শেখা।

শুধু মতামত দেওয়া নয়, প্রমাণ খুঁজতে শেখা।

শুধু শেয়ার করা নয়, দায়িত্ব নিতে শেখা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দা মানুষকে একটি অদ্ভুত সাহস দিয়েছে। যে কথা সামনাসামনি বলতে ভয় পায়, কমেন্ট বক্সে সেটিই অনায়াসে লিখে ফেলে।

কারও চেহারা নিয়ে বিদ্রূপ। কারও স্ত্রী বা স্বামী নিয়ে মন্তব্য। কারও সন্তানকে নিয়ে কটূক্তি। কারও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অপমান। কখনো ধর্মীয় বিদ্বেষ। কখনো মৃত মানুষকে নিয়েও অমানবিক ঠাট্টা।

এখানে আমরা একটি বিষয় ভুলে যাই—স্ক্রিনের ওপারে একটি মানুষ আছে। তারও অপমান লাগে। তারও পরিবার আছে। তারও সন্তান আছে। তারও রাত আছে, যখন সে একা হয়ে যায়।

আমরা হয়তো একটি কমেন্ট লিখে ভুলে গেলাম। কিন্তু যার উদ্দেশে লিখলাম, সে হয়তো সারারাত সেই কথাটি ভাবল।

এটাই ডিজিটাল নিষ্ঠুরতা।

একজনের ছবিতে পঞ্চাশ হাজার লাইক। আরেকজনের ছবিতে পঞ্চাশ। তাহলে কি প্রথমজন হাজার গুণ বেশি মূল্যবান?

না।

কিন্তু আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে সংখ্যাই যেন মর্যাদার প্রমাণ।

ফলোয়ার আছে—মানুষ গুরুত্বপূর্ণ। ভিউ আছে—মানুষ সফল। ভাইরাল হয়েছে—মানুষ প্রতিভাবান। এটি খুব বিপজ্জনক ধারণা।

একজন শিক্ষক হয়তো জীবনে কখনো ভাইরাল হননি। কিন্তু তাঁর পড়ানো একজন ছাত্র হয়তো একদিন শত মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করবেন।

একজন বাবা হয়তো কোনো পোস্ট লেখেন না। কিন্তু সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক তিনিই।

একজন সৎ কর্মচারীর কোনো ফলোয়ার নেই।

কিন্তু তাঁর সততার ওপর একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।

মানুষের প্রকৃত মূল্য দৃশ্যমানতার চেয়ে অনেক বড়।

এখন এমন এক সময় এসেছে, যখন অনেকের কাছে কোনো ঘটনা ঘটার আগে তার কনটেন্ট মূল্য বিবেচিত হয়।

বিয়ে— কনটেন্ট।

ভ্রমণ— কনটেন্ট।

শিশুর জন্মদিন— কনটেন্ট।

রেস্টুরেন্ট— কনটেন্ট।

পারিবারিক অনুষ্ঠান— কনটেন্ট।

এমনকি দুঃখও কখনো কখনো কনটেন্ট হয়ে যায়।

মানুষ কখনো কখনো কাঁদার আগেই ক্যামেরা চালু করে।

এখানে প্রশ্ন ওঠে—

আমরা কি মুহূর্তটি বাঁচছি, নাকি মুহূর্তটির দর্শক খুঁজছি?

একটি সুন্দর দৃশ্য দেখে যদি প্রথম চিন্তা হয়— “এটার ছবি কেমন হবে?” তাহলে হয়তো আমরা দৃশ্যটি দেখছি না। আমরা দেখছি তার প্রদর্শনযোগ্য সংস্করণ।

জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর কিছু হয়তো এমন হওয়া উচিত, যার কোনো ছবি নেই।

কোনো পোস্ট নেই।

কোনো লাইক নেই।

শুধু স্মৃতি আছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের একটি ‘ডিজিটাল আমি’ তৈরি করেছে।

এই ডিজিটাল আমিকে আমরা সাজাই। কোন ছবি থাকবে, কোন ছবি থাকবে না। কোন মতামত প্রকাশ করব, কোনটি গোপন রাখব।

কোথায় গিয়েছি দেখাব।

কোথায় ব্যর্থ হয়েছি লুকাব।

কী অর্জন করেছি বলব।

কী হারিয়েছি চেপে যাব।

ধীরে ধীরে এই সাজানো চরিত্রটিই আমাদের কাছে সত্যি মনে হতে শুরু করে।

এখানেই বিপদ।

কারণ মানুষ যখন নিজের বানানো চরিত্রের সঙ্গে বাস্তব মানুষটির পার্থক্য ভুলে যায়, তখন তার ভেতরে এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

সে অনলাইনে যে মানুষটি, বাস্তবে সে মানুষটি নয়।

তবু তাকে সেই মানুষটির মতো দেখাতে হয়।

এই অভিনয় ক্লান্তিকর।

তাহলে কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে দিতে হবে?

না।

প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে সমস্যার সমাধান হবে না।

প্রশ্ন হলো ব্যবহার।

ছুরি দিয়ে অস্ত্রোপচারও হয়, আবার মানুষও আহত হয়। আগুন দিয়ে রান্না হয়, আবার ঘরও পুড়ে যায়। প্রযুক্তিও তেমন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জ্ঞান ছড়াতে পারে। একজন তরুণের প্রতিভা বিশ্বকে দেখাতে পারে। একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা দাঁড় করাতে পারে। বিপদের সময়ে মানুষকে একত্র করতে পারে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে পারে।

কিন্তু একই সঙ্গে—

গুজব ছড়াতে পারে। ঘৃণা বাড়াতে পারে। মানুষকে বিভক্ত করতে পারে। আত্মসম্মান ক্ষয় করতে পারে। সময়ের অপচয় করতে পারে।

তাই প্রযুক্তিকে শত্রু বানানো নয়। নিজেকে প্রযুক্তির দাস হতে না দেওয়াই আসল কাজ।

একটি শিশু যখন দেখে তার বাবা-মা সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত, তখন সে কী শিখবে? যখন খাওয়ার টেবিলে সবাই ফোন দেখে, সে কী শিখবে? যখন পারিবারিক অনুষ্ঠানে কথোপকথনের চেয়ে ছবি তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সে কী শিখবে?

আমরা শিশুকে বলি—

“ফোন কম ব্যবহার করো।”

কিন্তু শিশুটি যদি দেখে বড়রা নিজেরাই ফোন ছাড়া পাঁচ মিনিট থাকতে পারেন না, তাহলে সে কীভাবে শিখবে?

শিশুকে প্রযুক্তি ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়ার আগে আমাদের নিজেদের আচরণ দেখতে হবে। কারণ শিশু আমাদের কথা যতটা শোনে, তার চেয়ে বেশি দেখে।

অভিভাবকের আচরণই শিশুর প্রথম অ্যালগরিদম।

আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক কিছুই প্রকাশ করি। কিন্তু কিছু জিনিস প্রকাশ করি না।

আমাদের ভয়, আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের অপরাধবোধ, আমাদের হিংসা, আমাদের একাকিত্ব, আমাদের অসম্পূর্ণতা। অথচ মানুষ হওয়ার সবচেয়ে স্বাভাবিক অংশ এগুলোই।

পূর্ণ মানুষ বলে কেউ নেই।

সবাই কোনো না কোনো জায়গায় অসম্পূর্ণ। তাই অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে নিজের অসম্পূর্ণ জীবনকে তুলনা করার কোনো অর্থ নেই।

বরং প্রশ্ন করা দরকার—

আমি গতকাল থেকে আজ একটু ভালো মানুষ হয়েছি কি?

আমি কাউকে অকারণে কষ্ট দেওয়া কমিয়েছি কি?

আমি নিজের দায়িত্ব একটু ভালোভাবে পালন করছি কি?

আমি অন্যের মত শুনতে শিখেছি কি?

আমি না জানলে “জানি না” বলতে শিখেছি কি?

আমি বিপদে কারও পাশে দাঁড়িয়েছি কি?

আমি আমার পরিবারকে সময় দিয়েছি কি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোনো নিউজফিডে পাওয়া যাবে না।

এগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে নিজের ভেতরে।

একদিন আমাদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থাকবে না। একদিন আমাদের ছবি পুরোনো হয়ে যাবে। একদিন আমাদের পোস্ট কেউ খুঁজবে না। একদিন আমাদের ফলোয়ারের সংখ্যা অর্থহীন হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের আচরণের স্মৃতি থেকে যাবে মানুষের মনে।

আপনি কত হাজার মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন—তা বড় কথা নয়। আপনি কতজন মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন—সেটিই বড় কথা।

আপনার কত লাইক ছিল—তা বড় কথা নয়। আপনার উপস্থিতিতে কতজন মানুষ সাহস পেয়েছিল—সেটিই বড় কথা।

আপনি কতবার দেশপ্রেমের কথা লিখেছেন— তা বড় কথা নয়। নিজের দায়িত্ব কতটা সততার সঙ্গে পালন করেছেন—সেটিই বড় কথা।

আপনি কত ধর্মীয় পোস্ট শেয়ার করেছেন—তা বড় কথা নয়। আপনার চরিত্রে সেই শিক্ষার কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে—সেটিই বড় কথা।

আপনি কতবার মানবতার কথা বলেছেন— তা বড় কথা নয়। একজন অসহায় মানুষ দরজায় দাঁড়ালে আপনি দরজা খুলেছিলেন কি না— সেটিই বড় কথা।

কারণ—

পোস্ট মুছে যায়।

ছবি পুরোনো হয়।

লাইক হারিয়ে যায়।

ফলোয়ার চলে যায়।

কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের স্মৃতি থেকে যায়।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে বড় দেখানোর আগে বাস্তব জীবনে নিজেকে বড় করার চেষ্টা করি।

জ্ঞানী দেখানোর আগে জ্ঞান অর্জন করি। সুখী দেখানোর আগে সুখী হওয়ার চেষ্টা করি। মানবিকতার পোস্ট দেওয়ার আগে একজন মানুষের পাশে দাঁড়াই। দেশপ্রেমের স্ট্যাটাস দেওয়ার আগে নিজের দায়িত্ব পালন করি। ধর্মের কথা বলার আগে নিজের চরিত্রে তার আলো জ্বালাই।

আর সবচেয়ে বড় কথা—

নিজেকে দেখানোর চেয়ে নিজেকে গড়ে তুলি। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রোফাইলটি ফেসবুকে নয়।

সেটি লেখা থাকে—অন্য মানুষের হৃদয়ে।

বাংলাদেশের কঠিন বাস্তবতার এই আয়নায় তাই একবার নিজের মুখের দিকে তাকানো যাক।

তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করি— “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমি যে মানুষটি হওয়ার অভিনয় করছি, বাস্তব জীবনে আমি কি সত্যিই সেই মানুষটি?”

এই প্রশ্নের উত্তর যদি সৎ হয়, তাহলে হয়তো আমাদের সমাজও একটু সত্যের দিকে ফিরবে।

আর যদি উত্তরটি অসৎ হয়—তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রোফাইল ছবির আড়ালেও আমরা নিজের কাছেই অপরিচিত থেকে যাব।

আয়না কখনো মিথ্যা বলে না। মিথ্যা বলি আমরা— নিজেদের সম্পর্কে।

লেখক: কলামিস্ট ও বনবিদ

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

বই কেনা নয়, পড়ার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে

বই আমাদের জীবনের কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ঘরের সাজসজ্জার অংশ হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বইকে এমন এক ধরনের ‘সামাজিক আসবাব’ হিসেবেও ব্যবহার করেন, যা ঘরের রুচি ও সামাজিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। হকিংয়ের বই নিয়ে পুরোনো এক প্রতিবেদনে প্রকাশকরাই এমন বইকে ‘সোশ্যাল ফার্নিচার’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

৫ দিন আগে

ভূমিকম্পের পরে উদ্ধার নয়, বিপর্যয়ের আগেই জীবন বাঁচাতে হবে

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সতর্ক করেছেন— বড় ভূমিকম্পে ঢাকার বহু এলাকায় উদ্ধারকারী দলের পৌঁছানো কঠিন হবে, কোথাও কোথাও উদ্ধার অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। তার এ বক্তব্যকে একটি সংস্থার সীমাবদ

৫ দিন আগে

জ্বালানি সংকট: সাময়িক সমাধানের চেয়ে প্রয়োজন আরও বেশি কিছু

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির সংকট। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, দুর্বল চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং বছরের পর বছর ধরে চলা পরিকল্পনার ঘাটতি মিলেই বারবার এই সংকট তৈরি করছে।

৬ দিন আগে

শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির বাণিজ্যের পথ যেন সুগম না হয়

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার বিকল্প নেই। এনটিআরসিএ’র বিদ্যমান কাঠামোর কোনো দুর্বলতা থাকলে তা পর্যালোচনা ও সংস্কারের মাধ্যমে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এই প্রক্রিয়াকে পেছনে ঠেলে দিয়ে আবার ব্যক্তি বা কমিটির দুর্নীতির সুযোগ করে

৬ দিন আগে