
হাবিব বাবুল

স্টিফেন হকিংয়ের A Brief History of Time ১৯৮৮ সালে প্রকাশের পর বিশ্ব জুড়ে এক বিস্ময়কর প্রকাশনা-সাফল্য অর্জন করেছিল। বইটি ৩৫টির বেশি ভাষায় অনূদিত হয়ে এক কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। অথচ একই বইকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে একটি মজার প্রবাদ— এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া এবং সবচেয়ে কম পড়া বইগুলোর একটি!
কথাটি নিছক রসিকতা হলেও এর ভেতরে আমাদের বই পড়ার সংস্কৃতি নিয়ে একটি গভীর প্রশ্ন আছে— বই কেনা আর বই পড়া কি একই বিষয়?
এক অর্থে মোটেই নয়। বই কেনা একটি অভ্যাস, কখনো সামাজিক মর্যাদার প্রকাশ; কিন্তু বই পড়া একটি মানসিক অনুশীলন। বইয়ের আলমারি ঘরে জ্ঞানের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই জ্ঞান মানুষের চিন্তা, বোধ ও আচরণে প্রবেশ করে কেবল পড়ার মধ্য দিয়ে। তাই আজকের দিনে আমাদের বড় সংকট বইয়ের অভাব নয়, বরং মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাসের সংকট।
একসময় ঘরে বই থাকাকে শিক্ষিত পরিবারের পরিচয় মনে করা হতো। এখনো বই কেনা হয়, বইমেলায় ভিড় হয়, নতুন বই প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেওয়া হয়, বইয়ের তাক সাজানো হয়।
কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে আরেকটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে— বই আমাদের জীবনের কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ঘরের সাজসজ্জার অংশ হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বইকে এমন এক ধরনের ‘সামাজিক আসবাব’ হিসেবেও ব্যবহার করেন, যা ঘরের রুচি ও সামাজিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। হকিংয়ের বই নিয়ে পুরোনো এক প্রতিবেদনে প্রকাশকরাই এমন বইকে ‘সোশ্যাল ফার্নিচার’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
তবে এই সংকটকে শুধু মানুষের আলস্য, তরুণ প্রজন্মের অবক্ষয় কিংবা মোবাইল ফোনের দোষ বলে ব্যাখ্যা করলে সমস্যাটিকে খুব সরল করে দেখা হবে। প্রযুক্তি আমাদের পাঠাভ্যাস বদলে দিয়েছে— এটি সত্য। কিন্তু প্রযুক্তি নিজে পাঠের শত্রু নয়। বরং প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি আমাদের মনোযোগকে কীভাবে ব্যবহার করছে এবং আমরা প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করছি।
স্মার্টফোনের পর্দায় আমরা একসঙ্গে খবর পড়ি, ভিডিও দেখি, বার্তা পাই, মন্তব্য করি, বিজ্ঞাপন দেখি, আবার অন্য একটি অ্যাপের নোটিফিকেশনও আসে। ফলে একটি দীর্ঘ লেখা পড়তে বসেও আমাদের মস্তিষ্ক বারবার অন্যদিকে টেনে নেওয়া হয়।
২০২৫ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে ৩২টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ডিজিটাল পরিবেশে মনোযোগের বিঘ্ন পাঠ-বোঝাপড়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো লেখা পড়ার আগে টিকটক ব্রাউজ করা পাঠকের নিবন্ধে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতার সঙ্গে নেতিবাচকভাবে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ সমস্যা কেবল স্ক্রিনে পড়া নয়, সমস্যা হলো ভাঙা মনোযোগ। বই পড়ার জন্য যে ধরনের দীর্ঘস্থায়ী মনোযোগ দরকার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক প্ল্যাটফর্ম তার বিপরীত অভ্যাস তৈরি করে। সেখানে আমাদের এক সেকেন্ডের মধ্যে নতুন ছবি, নতুন খবর, নতুন উত্তেজনা, নতুন মতামত পেতে অভ্যস্ত করা হয়। একটি বই আমাদের অপেক্ষা করতে শেখায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রায়ই আমাদের অপেক্ষা করতে দেয় না।
এ জায়গাতেই বই পড়ার গুরুত্ব নতুন করে বুঝতে হবে। বই পড়া মানে শুধু তথ্য সংগ্রহ করা নয়। একটি ভালো বই পাঠককে ধীরে ধীরে ভাবতে শেখায়। চরিত্রের সঙ্গে হাঁটতে হয়, যুক্তির সঙ্গে এগোতে হয়, একটি ধারণাকে নিজের মাথায় জায়গা দিতে হয়। উপন্যাস আমাদের অন্য মানুষের জীবন অনুভব করতে শেখায়, ইতিহাস আমাদের বর্তমানকে অতীতের আলোয় দেখতে শেখায়, দর্শন প্রশ্ন করতে শেখায়, বিজ্ঞান আমাদের অজানার প্রতি কৌতূহলী করে।
তাই পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনার প্রথম কাজ হতে পারে ‘বেশি বই পড়তে হবে’— এই চাপ তৈরি না করে ‘মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে’— এই সংস্কৃতি তৈরি করা। প্রতিদিন ২০ বা ৩০ মিনিট নিরবচ্ছিন্ন পড়া হয়তো এক দিনে কাউকে বড় পাঠক বানাবে না, কিন্তু কয়েক মাস পর সেই অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। শুরুতেই ৫০০ পৃষ্ঠার কঠিন বই হাতে নেওয়ার দরকার নেই। যে বিষয় ভালো লাগে, সেখান থেকেই শুরু করা যায়।
আমাদের পরিবারেও এ বিষয়ে পরিবর্তন দরকার। শিশুকে বই পড়তে বলার আগে বড়দের নিজেদের পড়তে হবে। সন্তানকে মোবাইল থেকে দূরে রাখতে গিয়ে মা-বাবা যদি নিজেরাই সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সেই উপদেশ খুব কার্যকর হবে না। শিশুর সামনে বই পড়ার দৃশ্য তৈরি করা— এটি কোনো বক্তৃতার চেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা।
স্কুলের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার জন্য পড়া আর পাঠক হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়াকে আনন্দ, কৌতূহল ও আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একটি বই পড়ে তার সারাংশ মুখস্থ করে পরীক্ষায় লেখার চেয়ে বইটি নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে বিতর্ক করা, চরিত্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা লেখকের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। পাঠাগারকে তাই শুধু বই রাখার ঘর না বানিয়ে আলোচনার জায়গা করতে হবে।
পাঠাগার প্রসঙ্গে আমাদের শহর ও মফস্বলের বাস্তবতাও ভাবতে হবে। সব মানুষের ব্যক্তিগতভাবে বই কেনার সামর্থ্য নেই। কিন্তু একটি ভালো গণপাঠাগার বহু মানুষের জন্য বইয়ের দরজা খুলে দিতে পারে। স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও বেসরকারি উদ্যোগ মিলিয়ে ছোট ছোট পাঠাগার গড়ে তোলা সম্ভব। সেখানে শুধু বই থাকবে না; নিয়মিত পাঠচক্র, লেখক-পাঠক আলোচনা, শিশুদের গল্পের আসর এবং বিজ্ঞানবিষয়ক আলোচনা হতে পারে।
আরেকটি ভুল ধারণা দূর করা দরকার— ডিজিটাল মাধ্যম মানেই পাঠের শত্রু। তা নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ই-বুক, অডিওবুক, ই-রিডার, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তথ্য ও পাঠের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এমনকি ডিজিটাল মাধ্যমে একাধিক নথি পড়ার ক্ষেত্রে বই পড়ার অভ্যাস ও মনোযোগ পাঠ-বোঝাপড়ার সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত হতে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তিকে বাদ দিয়ে পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, বরং প্রযুক্তিকে পাঠের সহযোগীতে পরিণত করতে হবে।
তবে মাধ্যমের পার্থক্যও অস্বীকার করার উপায় নেই। সাম্প্রতিক একটি গবেষণা-সমীক্ষায় কাগজে পড়াকে সামগ্রিকভাবে পাঠ-বোঝাপড়ার জন্য স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমের তুলনায় বেশি সহায়ক পাওয়া গেছে, বিশেষ করে যখন পড়ার সময় বারবার স্ক্রল করতে হয়। ফলে দীর্ঘ ও মনোযোগনির্ভর পাঠের জন্য কাগজের বইয়ের ব্যবহার এখনো যথেষ্ট অর্থবহ। কিন্তু এর মানে এই নয় যে মোবাইলে বই পড়া যাবে না। বরং কোন বই কোন মাধ্যমে পড়লে মনোযোগ বেশি থাকবে, সেটি ব্যক্তিগতভাবে নির্ধারণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সংস্কৃতিতেও সামান্য শৃঙ্খলা প্রয়োজন। প্রতিটি নোটিফিকেশন জরুরি নয়। প্রতিটি খবর এখনই জানা দরকার নেই। প্রতিটি মন্তব্যের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন নেই। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় যদি ‘নোটিফিকেশনমুক্ত সময়’ হিসেবে রাখা যায়, তাহলে সেই সময়টিই বইয়ের জন্য বরাদ্দ করা সম্ভব। ঘুমানোর আগে বিছানায় এক ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বদলে আধঘণ্টা বই পড়ার অভ্যাস একজন মানুষের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— বই পড়াকে যেন আবার আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। আমরা অনেক সময় বই পড়াকে নৈতিক দায়িত্বের মতো উপস্থাপন করি— ‘বই পড়লে জ্ঞান বাড়ে’, ‘বই পড়া ভালো অভ্যাস’ ইত্যাদি। কথাগুলো সত্য, কিন্তু অসম্পূর্ণ। বই পড়া আনন্দেরও বিষয়।
একটি ভালো গল্পে হারিয়ে যাওয়া, কোনো অজানা দেশের ইতিহাস জানা, কোনো বিজ্ঞানীর চিন্তার জগতে প্রবেশ করা কিংবা কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তিতে নিজের অনুভূতিকে নতুন করে আবিষ্কার করা— এসবের আনন্দ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত উত্তেজনার চেয়ে গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী।
তাই বই বিক্রির পরিসংখ্যান দিয়ে আমাদের পাঠাভ্যাসের স্বাস্থ্য মাপা যাবে না। কত মানুষ বই কিনছেন, তার পাশাপাশি কত মানুষ বই শেষ করছেন, কতজন বই নিয়ে আলোচনা করছেন, কতজন একটি বই থেকে নতুন বইয়ের সন্ধান পাচ্ছেন— এসবও গুরুত্বপূর্ণ। বইমেলায় বিক্রির হিসাব যেমন প্রয়োজন, তেমনি পাঠাগারে পাঠকের উপস্থিতির হিসাবও প্রয়োজন।
হকিংয়ের ‘A Brief History of Time’ আমাদের জন্য তাই শুধু মহাবিশ্বের ইতিহাসের বই নয়, এটি বই এবং পাঠকের সম্পর্ক নিয়েও একটি চমৎকার প্রতীক। একটি বই লাখ লাখ মানুষের ঘরে পৌঁছাতে পারে, কিন্তু তার প্রকৃত যাত্রা শুরু হয় যখন একজন পাঠক বইটি খুলে মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করেন।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো আরও বেশি বই কেনা নয়, বরং একটু কম স্ক্রল করা এবং একটু বেশি পড়া। প্রযুক্তিকে পরিত্যাগ করার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন প্রযুক্তির ওপর নিজের মনোযোগের অধিকার পুনরুদ্ধার করা। ঘরের বইয়ের তাককে সাজসজ্জার জায়গা থেকে আবার চিন্তার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। পরিবারে, স্কুলে, পাঠাগারে এবং সমাজে বইকে আলোচনার কেন্দ্র করতে হবে।
বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আসলে সভ্যতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। যে সমাজ গভীরভাবে পড়ে, সে সমাজ গভীরভাবে প্রশ্ন করতে শেখে। আর যে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে, সে সমাজই নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে। তাই পাঠাভ্যাসের এই ফাটল মেরামত করা কেবল বই পড়ার আন্দোলন নয়; এটি মনোযোগ, চিন্তা, কল্পনা ও মানবিকতার পুনর্গঠনের আন্দোলন।
লেখক: প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম, ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানির

স্টিফেন হকিংয়ের A Brief History of Time ১৯৮৮ সালে প্রকাশের পর বিশ্ব জুড়ে এক বিস্ময়কর প্রকাশনা-সাফল্য অর্জন করেছিল। বইটি ৩৫টির বেশি ভাষায় অনূদিত হয়ে এক কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। অথচ একই বইকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে একটি মজার প্রবাদ— এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া এবং সবচেয়ে কম পড়া বইগুলোর একটি!
কথাটি নিছক রসিকতা হলেও এর ভেতরে আমাদের বই পড়ার সংস্কৃতি নিয়ে একটি গভীর প্রশ্ন আছে— বই কেনা আর বই পড়া কি একই বিষয়?
এক অর্থে মোটেই নয়। বই কেনা একটি অভ্যাস, কখনো সামাজিক মর্যাদার প্রকাশ; কিন্তু বই পড়া একটি মানসিক অনুশীলন। বইয়ের আলমারি ঘরে জ্ঞানের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই জ্ঞান মানুষের চিন্তা, বোধ ও আচরণে প্রবেশ করে কেবল পড়ার মধ্য দিয়ে। তাই আজকের দিনে আমাদের বড় সংকট বইয়ের অভাব নয়, বরং মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাসের সংকট।
একসময় ঘরে বই থাকাকে শিক্ষিত পরিবারের পরিচয় মনে করা হতো। এখনো বই কেনা হয়, বইমেলায় ভিড় হয়, নতুন বই প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেওয়া হয়, বইয়ের তাক সাজানো হয়।
কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে আরেকটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে— বই আমাদের জীবনের কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ঘরের সাজসজ্জার অংশ হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বইকে এমন এক ধরনের ‘সামাজিক আসবাব’ হিসেবেও ব্যবহার করেন, যা ঘরের রুচি ও সামাজিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। হকিংয়ের বই নিয়ে পুরোনো এক প্রতিবেদনে প্রকাশকরাই এমন বইকে ‘সোশ্যাল ফার্নিচার’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
তবে এই সংকটকে শুধু মানুষের আলস্য, তরুণ প্রজন্মের অবক্ষয় কিংবা মোবাইল ফোনের দোষ বলে ব্যাখ্যা করলে সমস্যাটিকে খুব সরল করে দেখা হবে। প্রযুক্তি আমাদের পাঠাভ্যাস বদলে দিয়েছে— এটি সত্য। কিন্তু প্রযুক্তি নিজে পাঠের শত্রু নয়। বরং প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি আমাদের মনোযোগকে কীভাবে ব্যবহার করছে এবং আমরা প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করছি।
স্মার্টফোনের পর্দায় আমরা একসঙ্গে খবর পড়ি, ভিডিও দেখি, বার্তা পাই, মন্তব্য করি, বিজ্ঞাপন দেখি, আবার অন্য একটি অ্যাপের নোটিফিকেশনও আসে। ফলে একটি দীর্ঘ লেখা পড়তে বসেও আমাদের মস্তিষ্ক বারবার অন্যদিকে টেনে নেওয়া হয়।
২০২৫ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে ৩২টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ডিজিটাল পরিবেশে মনোযোগের বিঘ্ন পাঠ-বোঝাপড়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো লেখা পড়ার আগে টিকটক ব্রাউজ করা পাঠকের নিবন্ধে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতার সঙ্গে নেতিবাচকভাবে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ সমস্যা কেবল স্ক্রিনে পড়া নয়, সমস্যা হলো ভাঙা মনোযোগ। বই পড়ার জন্য যে ধরনের দীর্ঘস্থায়ী মনোযোগ দরকার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক প্ল্যাটফর্ম তার বিপরীত অভ্যাস তৈরি করে। সেখানে আমাদের এক সেকেন্ডের মধ্যে নতুন ছবি, নতুন খবর, নতুন উত্তেজনা, নতুন মতামত পেতে অভ্যস্ত করা হয়। একটি বই আমাদের অপেক্ষা করতে শেখায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রায়ই আমাদের অপেক্ষা করতে দেয় না।
এ জায়গাতেই বই পড়ার গুরুত্ব নতুন করে বুঝতে হবে। বই পড়া মানে শুধু তথ্য সংগ্রহ করা নয়। একটি ভালো বই পাঠককে ধীরে ধীরে ভাবতে শেখায়। চরিত্রের সঙ্গে হাঁটতে হয়, যুক্তির সঙ্গে এগোতে হয়, একটি ধারণাকে নিজের মাথায় জায়গা দিতে হয়। উপন্যাস আমাদের অন্য মানুষের জীবন অনুভব করতে শেখায়, ইতিহাস আমাদের বর্তমানকে অতীতের আলোয় দেখতে শেখায়, দর্শন প্রশ্ন করতে শেখায়, বিজ্ঞান আমাদের অজানার প্রতি কৌতূহলী করে।
তাই পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনার প্রথম কাজ হতে পারে ‘বেশি বই পড়তে হবে’— এই চাপ তৈরি না করে ‘মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে’— এই সংস্কৃতি তৈরি করা। প্রতিদিন ২০ বা ৩০ মিনিট নিরবচ্ছিন্ন পড়া হয়তো এক দিনে কাউকে বড় পাঠক বানাবে না, কিন্তু কয়েক মাস পর সেই অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। শুরুতেই ৫০০ পৃষ্ঠার কঠিন বই হাতে নেওয়ার দরকার নেই। যে বিষয় ভালো লাগে, সেখান থেকেই শুরু করা যায়।
আমাদের পরিবারেও এ বিষয়ে পরিবর্তন দরকার। শিশুকে বই পড়তে বলার আগে বড়দের নিজেদের পড়তে হবে। সন্তানকে মোবাইল থেকে দূরে রাখতে গিয়ে মা-বাবা যদি নিজেরাই সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সেই উপদেশ খুব কার্যকর হবে না। শিশুর সামনে বই পড়ার দৃশ্য তৈরি করা— এটি কোনো বক্তৃতার চেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা।
স্কুলের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার জন্য পড়া আর পাঠক হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়াকে আনন্দ, কৌতূহল ও আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একটি বই পড়ে তার সারাংশ মুখস্থ করে পরীক্ষায় লেখার চেয়ে বইটি নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে বিতর্ক করা, চরিত্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা লেখকের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। পাঠাগারকে তাই শুধু বই রাখার ঘর না বানিয়ে আলোচনার জায়গা করতে হবে।
পাঠাগার প্রসঙ্গে আমাদের শহর ও মফস্বলের বাস্তবতাও ভাবতে হবে। সব মানুষের ব্যক্তিগতভাবে বই কেনার সামর্থ্য নেই। কিন্তু একটি ভালো গণপাঠাগার বহু মানুষের জন্য বইয়ের দরজা খুলে দিতে পারে। স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও বেসরকারি উদ্যোগ মিলিয়ে ছোট ছোট পাঠাগার গড়ে তোলা সম্ভব। সেখানে শুধু বই থাকবে না; নিয়মিত পাঠচক্র, লেখক-পাঠক আলোচনা, শিশুদের গল্পের আসর এবং বিজ্ঞানবিষয়ক আলোচনা হতে পারে।
আরেকটি ভুল ধারণা দূর করা দরকার— ডিজিটাল মাধ্যম মানেই পাঠের শত্রু। তা নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ই-বুক, অডিওবুক, ই-রিডার, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তথ্য ও পাঠের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এমনকি ডিজিটাল মাধ্যমে একাধিক নথি পড়ার ক্ষেত্রে বই পড়ার অভ্যাস ও মনোযোগ পাঠ-বোঝাপড়ার সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত হতে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তিকে বাদ দিয়ে পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, বরং প্রযুক্তিকে পাঠের সহযোগীতে পরিণত করতে হবে।
তবে মাধ্যমের পার্থক্যও অস্বীকার করার উপায় নেই। সাম্প্রতিক একটি গবেষণা-সমীক্ষায় কাগজে পড়াকে সামগ্রিকভাবে পাঠ-বোঝাপড়ার জন্য স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমের তুলনায় বেশি সহায়ক পাওয়া গেছে, বিশেষ করে যখন পড়ার সময় বারবার স্ক্রল করতে হয়। ফলে দীর্ঘ ও মনোযোগনির্ভর পাঠের জন্য কাগজের বইয়ের ব্যবহার এখনো যথেষ্ট অর্থবহ। কিন্তু এর মানে এই নয় যে মোবাইলে বই পড়া যাবে না। বরং কোন বই কোন মাধ্যমে পড়লে মনোযোগ বেশি থাকবে, সেটি ব্যক্তিগতভাবে নির্ধারণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সংস্কৃতিতেও সামান্য শৃঙ্খলা প্রয়োজন। প্রতিটি নোটিফিকেশন জরুরি নয়। প্রতিটি খবর এখনই জানা দরকার নেই। প্রতিটি মন্তব্যের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন নেই। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় যদি ‘নোটিফিকেশনমুক্ত সময়’ হিসেবে রাখা যায়, তাহলে সেই সময়টিই বইয়ের জন্য বরাদ্দ করা সম্ভব। ঘুমানোর আগে বিছানায় এক ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বদলে আধঘণ্টা বই পড়ার অভ্যাস একজন মানুষের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— বই পড়াকে যেন আবার আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। আমরা অনেক সময় বই পড়াকে নৈতিক দায়িত্বের মতো উপস্থাপন করি— ‘বই পড়লে জ্ঞান বাড়ে’, ‘বই পড়া ভালো অভ্যাস’ ইত্যাদি। কথাগুলো সত্য, কিন্তু অসম্পূর্ণ। বই পড়া আনন্দেরও বিষয়।
একটি ভালো গল্পে হারিয়ে যাওয়া, কোনো অজানা দেশের ইতিহাস জানা, কোনো বিজ্ঞানীর চিন্তার জগতে প্রবেশ করা কিংবা কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তিতে নিজের অনুভূতিকে নতুন করে আবিষ্কার করা— এসবের আনন্দ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত উত্তেজনার চেয়ে গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী।
তাই বই বিক্রির পরিসংখ্যান দিয়ে আমাদের পাঠাভ্যাসের স্বাস্থ্য মাপা যাবে না। কত মানুষ বই কিনছেন, তার পাশাপাশি কত মানুষ বই শেষ করছেন, কতজন বই নিয়ে আলোচনা করছেন, কতজন একটি বই থেকে নতুন বইয়ের সন্ধান পাচ্ছেন— এসবও গুরুত্বপূর্ণ। বইমেলায় বিক্রির হিসাব যেমন প্রয়োজন, তেমনি পাঠাগারে পাঠকের উপস্থিতির হিসাবও প্রয়োজন।
হকিংয়ের ‘A Brief History of Time’ আমাদের জন্য তাই শুধু মহাবিশ্বের ইতিহাসের বই নয়, এটি বই এবং পাঠকের সম্পর্ক নিয়েও একটি চমৎকার প্রতীক। একটি বই লাখ লাখ মানুষের ঘরে পৌঁছাতে পারে, কিন্তু তার প্রকৃত যাত্রা শুরু হয় যখন একজন পাঠক বইটি খুলে মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করেন।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো আরও বেশি বই কেনা নয়, বরং একটু কম স্ক্রল করা এবং একটু বেশি পড়া। প্রযুক্তিকে পরিত্যাগ করার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন প্রযুক্তির ওপর নিজের মনোযোগের অধিকার পুনরুদ্ধার করা। ঘরের বইয়ের তাককে সাজসজ্জার জায়গা থেকে আবার চিন্তার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। পরিবারে, স্কুলে, পাঠাগারে এবং সমাজে বইকে আলোচনার কেন্দ্র করতে হবে।
বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আসলে সভ্যতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। যে সমাজ গভীরভাবে পড়ে, সে সমাজ গভীরভাবে প্রশ্ন করতে শেখে। আর যে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে, সে সমাজই নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে। তাই পাঠাভ্যাসের এই ফাটল মেরামত করা কেবল বই পড়ার আন্দোলন নয়; এটি মনোযোগ, চিন্তা, কল্পনা ও মানবিকতার পুনর্গঠনের আন্দোলন।
লেখক: প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম, ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানির

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি একটি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সই হয়েছে। বিষয়টি সঙ্গত কারণে কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে আলোচিত হচ্ছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে রয়েছে। তাছাড়া বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে আজ মধ্যপ্র
৩ দিন আগে
এটি নিছক আরেকটি কূটনৈতিক ইশতেহার নয়। এটি সম্ভবত মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে একটি প্রকৃত যৌথ প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তোলার প্রথম বিশ্বাসযোগ্য প্রয়াস। এমন এক স্থাপনা, যা একদিন কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং গোটা মুসলিম বিশ্বকেও সুরক্ষার ছায়া দিতে পারে।
৪ দিন আগে
বিদ্যুৎ ঘাটতির সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছে দেশের গ্রামাঞ্চল। পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সেখানে প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টার লোডশেডিং এক নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ভ্যাপসা গরম, অন্যদিকে সেচ সংকটে কৃষকের হাহাকার— সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
৫ দিন আগে
স্যুটের একাধিক স্তর— মোটা কাপড়, টাই এবং কখনো ওয়েস্টকোট— শরীরের তাপ আটকে রাখে এবং বাতাস চলাচলের সুযোগ কমিয়ে দেয়। যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস বা গাড়ির ভেতরে স্যুট পরেন, তাদের হয়তো এই অস্বস্তি অনুভব করতে হয় না। কিন্তু জনসমাগম, সমাবেশ বা মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনের জন্য বাইরে বের হলে এই বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ও
৬ দিন আগে