
সাইমন মোহসিন

বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রায়ই একটি অভিযোগ শোনা যায়— নিম্ন-দক্ষতার উৎপাদনখাতে (পোশাক, জুতা, বস্ত্র, খেলনা ইত্যাদি) চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য দরিদ্র দেশগুলোর শিল্পায়নের পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।
যুক্তিটি হলো— চীনের এত দিনে এসব খাত থেকে ‘গ্র্যাজুয়েট’ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া একসময় যেভাবে এসব খাত থেকে সরে গিয়ে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি করেছিল, চীনেরও ঠিক একইভাবে বাংলাদেশ, কেনিয়া ও অন্যান্য স্বল্প আয়ের দেশের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চীন তা করেনি। বরং নিম্নমূল্যের মুদ্রানীতির জোরালো সমর্থনে এসব খাত আঁকড়ে ধরে থাকাটা উন্নয়নশীল বিশ্বের ওপর এক ধরনের বাণিজ্যবাদী চাপ প্রয়োগেরই নামান্তর।
গল্পটি শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু আরেকটু গভীরে গেলে বোঝা যায়— এটি সত্যের অর্ধেক মাত্র। আর যে অর্ধেকটা প্রায়ই বলা হয় না, সেটিই আসলে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার।
চীনের বিরুদ্ধে দেওয়া পুরো যুক্তিটি উন্নয়নের একটি নির্দিষ্ট তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী, অর্থনীতিগুলো একটি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে। ধনী দেশগুলো উচ্চমূল্যের উৎপাদনের ওপরের ধাপগুলো দখল করে থাকে। আর দরিদ্র দেশগুলো নিচের ধাপে মৌলিক উৎপাদনের দায়িত্ব নেয়। বিষয়টি অনেকটা একটি সুশৃঙ্খল রিলে দৌড়ের মতো।
পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের তৈরি করা এই ‘স্টেয়ারকেস মডেল’ থেকে যে ধারণার জন্ম, চীনের বিরুদ্ধে মূলত সেই ধারণাটিই প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এই ধারাবাহিকতাকেই কেন অর্থনীতির চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে মেনে নিতে হবে? প্রতিটি দেশেরই অধিকার আছে, তার সম্পদভিত্তি, শ্রমশক্তি, পুঁজিবাজার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যে উন্নয়নপথকে ধরে রাখতে পারে, সেই পথ অনুসরণ করার।
চীন কোনো চুক্তি সই করেনি যে মাথাপিছু আয় একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই দেশটি টি-শার্টের কারখানা ছেড়ে দেবে। চীনের অর্থনীতি বিশাল। দেশটির জনসংখ্যা শতকোটির বেশি, অর্থাৎ বিশ্বের মোট মানবসম্পদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। তাই চীনকে মাঝারি আকারের কোনো ইউরোপীয় অর্থনীতির মতো আচরণ করতে হবে— এমন প্রত্যাশা একটি সরল সত্যকে উপেক্ষা করে। আর তা হলো— একটি দেশের আকার-আয়তন তার অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশও বদলে দেয়।
চীনের মতো একটি দেশ শ্রমঘন উৎপাদন একদিনে ছেড়ে দিতে পারে না। কারণ তা করলে কোটি কোটি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বেন। চীনের ক্ষেত্রে এর বিপরীত কিছু দাবি করা তাই অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ছক জোর করে চাপিয়ে দেওয়া।
চীনের মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবস্থাপিত বিনিময় হার নিয়েও অনেক কথা বলা হয়। এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়, যেন এটিই প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতার মাঠ আগে থেকেই চীনের পক্ষে হেলে রয়েছে।
কিন্তু ডলার বা ইউরোর মতো ইউয়ান বৈশ্বিক লেনদেনে ব্যবহৃত রিজার্ভ মুদ্রা নয়। যদি তা হতো, তাহলে ইউয়ান নিজের সক্ষমতাতেই শক্তিশালী হতো এবং বেইজিংয়ের পক্ষে এর বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগও কমে আসত।
মুদ্রাব্যবস্থাপনা এখনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতির বৈধ হাতিয়ার। এটি কোনো আন্তর্জাতিক নিয়ম ভঙ্গের বিষয় নয়। বাংলাদেশও দীর্ঘদিন ধরে টাকার সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘনিষ্ঠ তদারকিতে রেখেছে, একে পুরোপুরি মুক্তভাবে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়নি।
কোনো ব্যবস্থাই নিজে থেকে ভালো বা খারাপ নয়। প্রতিটি ব্যবস্থারই কিছু সুবিধা ও অসুবিধা আছে। ব্যবস্থাপিত বিনিময় হার রপ্তানিকারকদের জন্য দামের স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমেয়তা তৈরি করতে পারে। আবার এর কারণে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে বিরোধের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
মূল কথা হলো— ব্যবস্থাপিত মুদ্রা যে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য একটি স্বাভাবিক নীতিগত পছন্দ। এটিকে শুধু চীনের কোনো বিশেষ অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
চীনের আধিপত্য দরিদ্র দেশগুলোর জন্য চিরস্থায়ী বাধা নয়। বাংলাদেশই তার একটি উদাহরণ। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে তাদের শিল্প কার্যক্রম ক্রমেই বাড়াচ্ছে।
২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের নেতৃত্বের এক উচ্চপর্যায়ের বেইজিং সফরের সময় ১২টি চীনা কোম্পানি ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। এসব বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক স্মার্ট মিটার উৎপাদন, রেলের রোলিং স্টক ও বন্দরের লজিস্টিকস।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বাংলাদেশে অবস্থিত ওভারসিজ চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সরাসরি যৌথ উদ্যোগ, কারখানা অধিগ্রহণ ও যন্ত্রপাতির উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশি কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যেই এসব উদ্যোগকে সম্ভাবনার নতুন দরজা হিসেবে দেখছেন।
চীনে মজুরি বাড়ছে এবং দেশটির শিল্প খাতও আরও উন্নত উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমঘন উৎপাদন চীনের জন্য এমন একটি খাত, যেখান থেকে উৎপাদন অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রণোদনা তার নিজেরই রয়েছে। বাংলাদেশও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা এই সুযোগ গ্রহণে প্রস্তুত।
এটি কোনো দানশীলতার বিষয় নয় এবং এটিকে সেভাবে দেখারও কারণ নেই। এটি বাণিজ্য। যেখানে খরচ ও অন্যান্য পরিস্থিতি লাভজনক, ব্যবসা সেখানেই প্রবাহিত হয়।
এসব অংশীদারত্বের কিছু সফল হবে, আবার কিছু ব্যর্থও হতে পারে। কোনো কোনো উদ্যোগ শুল্ক জটিলতা, অর্থায়নের ঘাটতি কিংবা অস্পষ্ট ভূমিনীতির কারণে আটকে যেতে পারে।
কোনো যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হলে তার অর্থ এই নয় যে চীন তার প্রযুক্তি নিয়ে কৃপণতা করছে। বরং এর অর্থ হতে পারে, নির্দিষ্ট চুক্তিটি নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা, ঋণের সহজলভ্যতা বা স্থানীয় ব্যবসার পরিবেশের মতো সাধারণ বাধাগুলো অতিক্রম করতে পারেনি।
ভারতের সঙ্গে জাপান, কোরিয়া ও অন্যান্য দেশের উৎপাদনখাতের অংশীদারত্বের ফলও মিশ্র ছিল। কিছু উদ্যোগ সফল হয়েছে, কিছু হয়নি। কিন্তু কেউ কখনো দাবি করেনি যে জাপানের ভারতের জন্য একটি গাড়িশিল্প তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল।
কোনো বিনিয়োগের ফলাফল নির্ধারণে বিনিয়োগকারী দেশের উদারতা প্রধান বিষয় নয়। বরং গ্রহীতা দেশের নিজস্ব নীতিগত পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং বিনিয়োগকে উৎপাদনশীলভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতাই মূল বিষয়।
প্রতিযোগিতামূলক শিল্পগুলো স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়ে অন্য দেশকে সেই জায়গা দেওয়ার দায়িত্ব চীনের নয়। কোনো দেশই প্রতিদ্বন্দ্বী সরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় বসে থেকে উন্নত হয়নি।
বাংলাদেশ, কেনিয়া বা ভিয়েতনাম যদি চীন কিংবা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে চায়, তাহলে সেই দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই নিতে হবে। তাদের বাণিজ্য ও শুল্কনীতি সংস্কার করতে হবে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও বন্দর অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে এমন একটি পূর্বানুমেয় নিয়ন্ত্রক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেন বিনিয়োগকারীরা এখানে পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহী হন।
ব্যবসা মূলত লাভের পেছনে ছোটে, নৈতিক যুক্তির পেছনে নয়। একটি দেশ আরেকটি দেশকে বাজারের অংশীদারিত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য করবে— এমন ধারণা প্রতিযোগিতা সক্ষমতার বিষয়টিকেই ভুলভাবে বোঝা।
এর অর্থ এই নয়— দরিদ্র দেশগুলো যে কঠিন চাপের মুখে আছে, তা অস্বীকার করা হচ্ছে। এর মধ্যে দক্ষ ও বড় আকারের চীনা রপ্তানিকারকদের তৈরি করা মূল্য-চাপও রয়েছে। তবে সমস্যার সঠিক কারণ চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
কেনিয়ার পোশাক রপ্তানিকারকেরা বাজার সুবিধা ও বিনিয়োগের কারণে দ্রুত বেড়েছে, চীন সরে যাওয়ার কারণে নয়। এ উদাহরণ দেখিয়েছে, কোনো দেশ সঠিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারলে তার জন্য প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
বৃহৎ, তরুণ জনসংখ্যা ও সীমিত পুঁজির দেশগুলোর কেন মৌলিক উৎপাদন থেকে দ্রুত সরে যাওয়া উচিত নয়, এর পেছনে আরও গভীর একটি যুক্তি রয়েছে। শ্রমঘন শিল্পে উৎপাদনের প্রতি ডলারে তুলনামূলক বেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। ফলে যে দেশের জনসংখ্যা বিশাল এবং পুঁজি তুলনামূলক সীমিত, তার জন্য খুব দ্রুত পুঁজিঘন ও উচ্চ-দক্ষ শিল্পে চলে যাওয়া সবসময় বুদ্ধিমানের কাজ নাও হতে পারে। এসব শিল্পে উৎপাদনের প্রতি এককে শ্রমের প্রয়োজন কম।
এ ধরনের পরিস্থিতি উন্নয়নের পরিশীলিত চেহারা তৈরি করতে পারে, কিন্তু দেশের কৌশল ও সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। এতে কর্মক্ষম মানুষের একটি বড় অংশ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে যেতে পারে, যা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিকর।
একটি দেশের অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে থাকা উচিত তার সবচেয়ে বড় সম্পদ, অর্থাৎ শ্রমশক্তি। কেবল মর্যাদার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়াকে লক্ষ্য করা উচিত নয়। চীন এবং অন্যান্য শ্রম-প্রাচুর্যের দেশগুলোর শিল্পনীতির পেছনে এই যুক্তিই কাজ করে।
বাংলাদেশ ও আফ্রিকার প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করা অবশ্যই বিচক্ষণতার কাজ। কিন্তু সাফল্য আসবে নিজেদের বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার মাধ্যমে, চীনকে সরে দাঁড়াতে বলে নয়।
প্রতিটি শিল্পোন্নত অর্থনীতিই এই পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে এবং পরীক্ষাটি সবসময় কঠিন ছিল। জাপান কারও অনুমতির অপেক্ষায় বসে থাকেনি। তারা অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করেছে এবং প্রতিযোগিতা করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানও একই পথ অনুসরণ করেছে।
সমালোচকদের বলা গল্প অনুযায়ী চীন নিজেই বিশ্বের উৎপাদন খাতের একেবারে নিচের দিক থেকে উঠে এসেছে। কয়েক দশক ধরে নীতিগত শৃঙ্খলা, অবকাঠামোয় বিনিয়োগ ও উন্নত দেশের মতো হয়ে ওঠার পরও কম মুনাফার উৎপাদন খাতে মনোযোগ ধরে রাখার মধ্য দিয়ে দেশটি ধীরে ধীরে ওপরে উঠেছে।
তাই পরবর্তী প্রজন্মের উৎপাদনশীল দেশগুলোকে একই পথ আরও সহজ করে দিতে চীনের দায়িত্ব আছে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের বন্দর, বিদ্যুৎ গ্রিড ও পোশাকযন্ত্রে যে চীনা পুঁজির প্রতিশ্রুতি এখন আসছে, তা একটি সুযোগ, কোনো অধিকার নয়। আর কোনো সুযোগের মূল্য ততটুকুই, যতটা কাজে লাগানোর সক্ষমতা একটি দেশের রয়েছে।
লেখক: রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক

বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রায়ই একটি অভিযোগ শোনা যায়— নিম্ন-দক্ষতার উৎপাদনখাতে (পোশাক, জুতা, বস্ত্র, খেলনা ইত্যাদি) চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য দরিদ্র দেশগুলোর শিল্পায়নের পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।
যুক্তিটি হলো— চীনের এত দিনে এসব খাত থেকে ‘গ্র্যাজুয়েট’ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া একসময় যেভাবে এসব খাত থেকে সরে গিয়ে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি করেছিল, চীনেরও ঠিক একইভাবে বাংলাদেশ, কেনিয়া ও অন্যান্য স্বল্প আয়ের দেশের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চীন তা করেনি। বরং নিম্নমূল্যের মুদ্রানীতির জোরালো সমর্থনে এসব খাত আঁকড়ে ধরে থাকাটা উন্নয়নশীল বিশ্বের ওপর এক ধরনের বাণিজ্যবাদী চাপ প্রয়োগেরই নামান্তর।
গল্পটি শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু আরেকটু গভীরে গেলে বোঝা যায়— এটি সত্যের অর্ধেক মাত্র। আর যে অর্ধেকটা প্রায়ই বলা হয় না, সেটিই আসলে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার।
চীনের বিরুদ্ধে দেওয়া পুরো যুক্তিটি উন্নয়নের একটি নির্দিষ্ট তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী, অর্থনীতিগুলো একটি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে। ধনী দেশগুলো উচ্চমূল্যের উৎপাদনের ওপরের ধাপগুলো দখল করে থাকে। আর দরিদ্র দেশগুলো নিচের ধাপে মৌলিক উৎপাদনের দায়িত্ব নেয়। বিষয়টি অনেকটা একটি সুশৃঙ্খল রিলে দৌড়ের মতো।
পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের তৈরি করা এই ‘স্টেয়ারকেস মডেল’ থেকে যে ধারণার জন্ম, চীনের বিরুদ্ধে মূলত সেই ধারণাটিই প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এই ধারাবাহিকতাকেই কেন অর্থনীতির চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে মেনে নিতে হবে? প্রতিটি দেশেরই অধিকার আছে, তার সম্পদভিত্তি, শ্রমশক্তি, পুঁজিবাজার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যে উন্নয়নপথকে ধরে রাখতে পারে, সেই পথ অনুসরণ করার।
চীন কোনো চুক্তি সই করেনি যে মাথাপিছু আয় একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই দেশটি টি-শার্টের কারখানা ছেড়ে দেবে। চীনের অর্থনীতি বিশাল। দেশটির জনসংখ্যা শতকোটির বেশি, অর্থাৎ বিশ্বের মোট মানবসম্পদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। তাই চীনকে মাঝারি আকারের কোনো ইউরোপীয় অর্থনীতির মতো আচরণ করতে হবে— এমন প্রত্যাশা একটি সরল সত্যকে উপেক্ষা করে। আর তা হলো— একটি দেশের আকার-আয়তন তার অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশও বদলে দেয়।
চীনের মতো একটি দেশ শ্রমঘন উৎপাদন একদিনে ছেড়ে দিতে পারে না। কারণ তা করলে কোটি কোটি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বেন। চীনের ক্ষেত্রে এর বিপরীত কিছু দাবি করা তাই অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ছক জোর করে চাপিয়ে দেওয়া।
চীনের মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবস্থাপিত বিনিময় হার নিয়েও অনেক কথা বলা হয়। এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়, যেন এটিই প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতার মাঠ আগে থেকেই চীনের পক্ষে হেলে রয়েছে।
কিন্তু ডলার বা ইউরোর মতো ইউয়ান বৈশ্বিক লেনদেনে ব্যবহৃত রিজার্ভ মুদ্রা নয়। যদি তা হতো, তাহলে ইউয়ান নিজের সক্ষমতাতেই শক্তিশালী হতো এবং বেইজিংয়ের পক্ষে এর বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগও কমে আসত।
মুদ্রাব্যবস্থাপনা এখনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতির বৈধ হাতিয়ার। এটি কোনো আন্তর্জাতিক নিয়ম ভঙ্গের বিষয় নয়। বাংলাদেশও দীর্ঘদিন ধরে টাকার সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘনিষ্ঠ তদারকিতে রেখেছে, একে পুরোপুরি মুক্তভাবে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়নি।
কোনো ব্যবস্থাই নিজে থেকে ভালো বা খারাপ নয়। প্রতিটি ব্যবস্থারই কিছু সুবিধা ও অসুবিধা আছে। ব্যবস্থাপিত বিনিময় হার রপ্তানিকারকদের জন্য দামের স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমেয়তা তৈরি করতে পারে। আবার এর কারণে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে বিরোধের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
মূল কথা হলো— ব্যবস্থাপিত মুদ্রা যে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য একটি স্বাভাবিক নীতিগত পছন্দ। এটিকে শুধু চীনের কোনো বিশেষ অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
চীনের আধিপত্য দরিদ্র দেশগুলোর জন্য চিরস্থায়ী বাধা নয়। বাংলাদেশই তার একটি উদাহরণ। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে তাদের শিল্প কার্যক্রম ক্রমেই বাড়াচ্ছে।
২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের নেতৃত্বের এক উচ্চপর্যায়ের বেইজিং সফরের সময় ১২টি চীনা কোম্পানি ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। এসব বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক স্মার্ট মিটার উৎপাদন, রেলের রোলিং স্টক ও বন্দরের লজিস্টিকস।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বাংলাদেশে অবস্থিত ওভারসিজ চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সরাসরি যৌথ উদ্যোগ, কারখানা অধিগ্রহণ ও যন্ত্রপাতির উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশি কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যেই এসব উদ্যোগকে সম্ভাবনার নতুন দরজা হিসেবে দেখছেন।
চীনে মজুরি বাড়ছে এবং দেশটির শিল্প খাতও আরও উন্নত উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমঘন উৎপাদন চীনের জন্য এমন একটি খাত, যেখান থেকে উৎপাদন অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রণোদনা তার নিজেরই রয়েছে। বাংলাদেশও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা এই সুযোগ গ্রহণে প্রস্তুত।
এটি কোনো দানশীলতার বিষয় নয় এবং এটিকে সেভাবে দেখারও কারণ নেই। এটি বাণিজ্য। যেখানে খরচ ও অন্যান্য পরিস্থিতি লাভজনক, ব্যবসা সেখানেই প্রবাহিত হয়।
এসব অংশীদারত্বের কিছু সফল হবে, আবার কিছু ব্যর্থও হতে পারে। কোনো কোনো উদ্যোগ শুল্ক জটিলতা, অর্থায়নের ঘাটতি কিংবা অস্পষ্ট ভূমিনীতির কারণে আটকে যেতে পারে।
কোনো যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হলে তার অর্থ এই নয় যে চীন তার প্রযুক্তি নিয়ে কৃপণতা করছে। বরং এর অর্থ হতে পারে, নির্দিষ্ট চুক্তিটি নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা, ঋণের সহজলভ্যতা বা স্থানীয় ব্যবসার পরিবেশের মতো সাধারণ বাধাগুলো অতিক্রম করতে পারেনি।
ভারতের সঙ্গে জাপান, কোরিয়া ও অন্যান্য দেশের উৎপাদনখাতের অংশীদারত্বের ফলও মিশ্র ছিল। কিছু উদ্যোগ সফল হয়েছে, কিছু হয়নি। কিন্তু কেউ কখনো দাবি করেনি যে জাপানের ভারতের জন্য একটি গাড়িশিল্প তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল।
কোনো বিনিয়োগের ফলাফল নির্ধারণে বিনিয়োগকারী দেশের উদারতা প্রধান বিষয় নয়। বরং গ্রহীতা দেশের নিজস্ব নীতিগত পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং বিনিয়োগকে উৎপাদনশীলভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতাই মূল বিষয়।
প্রতিযোগিতামূলক শিল্পগুলো স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়ে অন্য দেশকে সেই জায়গা দেওয়ার দায়িত্ব চীনের নয়। কোনো দেশই প্রতিদ্বন্দ্বী সরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় বসে থেকে উন্নত হয়নি।
বাংলাদেশ, কেনিয়া বা ভিয়েতনাম যদি চীন কিংবা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে চায়, তাহলে সেই দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই নিতে হবে। তাদের বাণিজ্য ও শুল্কনীতি সংস্কার করতে হবে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও বন্দর অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে এমন একটি পূর্বানুমেয় নিয়ন্ত্রক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেন বিনিয়োগকারীরা এখানে পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহী হন।
ব্যবসা মূলত লাভের পেছনে ছোটে, নৈতিক যুক্তির পেছনে নয়। একটি দেশ আরেকটি দেশকে বাজারের অংশীদারিত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য করবে— এমন ধারণা প্রতিযোগিতা সক্ষমতার বিষয়টিকেই ভুলভাবে বোঝা।
এর অর্থ এই নয়— দরিদ্র দেশগুলো যে কঠিন চাপের মুখে আছে, তা অস্বীকার করা হচ্ছে। এর মধ্যে দক্ষ ও বড় আকারের চীনা রপ্তানিকারকদের তৈরি করা মূল্য-চাপও রয়েছে। তবে সমস্যার সঠিক কারণ চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
কেনিয়ার পোশাক রপ্তানিকারকেরা বাজার সুবিধা ও বিনিয়োগের কারণে দ্রুত বেড়েছে, চীন সরে যাওয়ার কারণে নয়। এ উদাহরণ দেখিয়েছে, কোনো দেশ সঠিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারলে তার জন্য প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
বৃহৎ, তরুণ জনসংখ্যা ও সীমিত পুঁজির দেশগুলোর কেন মৌলিক উৎপাদন থেকে দ্রুত সরে যাওয়া উচিত নয়, এর পেছনে আরও গভীর একটি যুক্তি রয়েছে। শ্রমঘন শিল্পে উৎপাদনের প্রতি ডলারে তুলনামূলক বেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। ফলে যে দেশের জনসংখ্যা বিশাল এবং পুঁজি তুলনামূলক সীমিত, তার জন্য খুব দ্রুত পুঁজিঘন ও উচ্চ-দক্ষ শিল্পে চলে যাওয়া সবসময় বুদ্ধিমানের কাজ নাও হতে পারে। এসব শিল্পে উৎপাদনের প্রতি এককে শ্রমের প্রয়োজন কম।
এ ধরনের পরিস্থিতি উন্নয়নের পরিশীলিত চেহারা তৈরি করতে পারে, কিন্তু দেশের কৌশল ও সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। এতে কর্মক্ষম মানুষের একটি বড় অংশ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে যেতে পারে, যা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিকর।
একটি দেশের অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে থাকা উচিত তার সবচেয়ে বড় সম্পদ, অর্থাৎ শ্রমশক্তি। কেবল মর্যাদার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়াকে লক্ষ্য করা উচিত নয়। চীন এবং অন্যান্য শ্রম-প্রাচুর্যের দেশগুলোর শিল্পনীতির পেছনে এই যুক্তিই কাজ করে।
বাংলাদেশ ও আফ্রিকার প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করা অবশ্যই বিচক্ষণতার কাজ। কিন্তু সাফল্য আসবে নিজেদের বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার মাধ্যমে, চীনকে সরে দাঁড়াতে বলে নয়।
প্রতিটি শিল্পোন্নত অর্থনীতিই এই পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে এবং পরীক্ষাটি সবসময় কঠিন ছিল। জাপান কারও অনুমতির অপেক্ষায় বসে থাকেনি। তারা অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করেছে এবং প্রতিযোগিতা করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানও একই পথ অনুসরণ করেছে।
সমালোচকদের বলা গল্প অনুযায়ী চীন নিজেই বিশ্বের উৎপাদন খাতের একেবারে নিচের দিক থেকে উঠে এসেছে। কয়েক দশক ধরে নীতিগত শৃঙ্খলা, অবকাঠামোয় বিনিয়োগ ও উন্নত দেশের মতো হয়ে ওঠার পরও কম মুনাফার উৎপাদন খাতে মনোযোগ ধরে রাখার মধ্য দিয়ে দেশটি ধীরে ধীরে ওপরে উঠেছে।
তাই পরবর্তী প্রজন্মের উৎপাদনশীল দেশগুলোকে একই পথ আরও সহজ করে দিতে চীনের দায়িত্ব আছে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের বন্দর, বিদ্যুৎ গ্রিড ও পোশাকযন্ত্রে যে চীনা পুঁজির প্রতিশ্রুতি এখন আসছে, তা একটি সুযোগ, কোনো অধিকার নয়। আর কোনো সুযোগের মূল্য ততটুকুই, যতটা কাজে লাগানোর সক্ষমতা একটি দেশের রয়েছে।
লেখক: রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সতর্ক করেছেন— বড় ভূমিকম্পে ঢাকার বহু এলাকায় উদ্ধারকারী দলের পৌঁছানো কঠিন হবে, কোথাও কোথাও উদ্ধার অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। তার এ বক্তব্যকে একটি সংস্থার সীমাবদ
২ দিন আগে
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির সংকট। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, দুর্বল চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং বছরের পর বছর ধরে চলা পরিকল্পনার ঘাটতি মিলেই বারবার এই সংকট তৈরি করছে।
৩ দিন আগে
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার বিকল্প নেই। এনটিআরসিএ’র বিদ্যমান কাঠামোর কোনো দুর্বলতা থাকলে তা পর্যালোচনা ও সংস্কারের মাধ্যমে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এই প্রক্রিয়াকে পেছনে ঠেলে দিয়ে আবার ব্যক্তি বা কমিটির দুর্নীতির সুযোগ করে
৩ দিন আগে
এখন প্রতীয়মান হচ্ছে, এর কোনোটিই প্রত্যাশামাফিক কার্যকর হয়নি। ২০১১-১২ সাল থেকেই পেট্রোবাংলা গ্যাস আমদানিনির্ভর পরিকল্পনা গ্রহণ করে আসছে। ২০১৬-১৭ সালে নিজস্ব উৎস (পেট্রোবাংলা ও আইওসি মিলিয়ে) থেকে গ্যাসের উৎপাদন যেখানে ২৭০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছেছিল, সেটা এখন কমে প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুটে এসে ঠেকেছে। এটা পেট্রোব
৪ দিন আগে