সরকারের ৬ মাস: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট, ব্যর্থতা এবং উত্তরণের পথ

অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম

বর্তমান সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলো। এই ছয় মাসের পথচলায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের সফলতা, ব্যর্থতা এবং নীতিগত অবস্থানকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

প্রথমত, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকারকে একের পর এক জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। শুরুতেই বেসরকারি খাতের জিম্মি দশার কারণে এলপিজি সংকট তৈরি হলো। এর পরপরই ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তরল জ্বালানি বা লিকুইড ফুয়েল আমদানিতে সংকট দেখা দেয়। এরপর যুক্ত হয় এলএনজি সংকট ও সার্বিক বিদ্যুৎ সংকট।

সরকার এসব সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে সত্য, তবে সেই সমাধানগুলো হয়েছে অত্যন্ত সাময়িক এবং 'কন্টিনজেন্সি' বা অ্যাডহক ভিত্তিতে। সহজ ভাষায় একে বলা যায় 'প্যারাসিটামল টাইপের চিকিৎসা', যেকোনো উপায়ে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি ঠেকিয়ে রাখার একটি প্রয়াস। কিন্তু সংকটের ভেতরে ঢুকে তার মৌলিক কারণগুলো চিহ্নিত করে টেকসই বা স্থায়ী সমাধানের দিকে সরকার এখনো পৌঁছাতে পারেনি।

এ পরিস্থিতির বিচারে সরকারকে এককভাবে কোনো ক্রেডিট (কৃতিত্ব) বা ডিসক্রেডিট (অকৃতিত্ব) দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। সরকার হয়তো আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতে পারে, তারা সবেমাত্র দায়িত্বে এসেছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সময় লাগছে বা লাগবে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার— একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল, যাদের এতদিন ধরে সরকার পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে, বিগত সরকারগুলো কীভাবে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করেছে এবং কীভাবে এ খাতকে অলিগার্ক ও অসাধু আমলাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জনগণের স্বার্থবিরোধী রূপান্তর ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট ধারণা ও পারসেপশন (উপলব্ধি) আগে থেকেই থাকার কথা।

নিজেদের ইশতেহারের প্রতিফলন ঘটিয়ে আগাম কর্মকৌশল প্রণয়ন করা ও অতীত অভিজ্ঞতা দিয়ে সংকটের পূর্বাভাস পেয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার যে প্রস্তুতি, তার অভাব দৃশ্যমান। আগাম পূর্বপ্রস্তুতি না থাকার কারণেই আজ সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা কিছুটা কমেছে এবং সমালোচনার জায়গা বেড়েছে।

আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে বলতে চাই— বিত্তবানদের জন্য নয়; সরকার মূলত প্রয়োজন দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য, তাদের অধিকার সংরক্ষণ ও সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য। দিন শেষে সংকট যাই হোক না কেন, তা সরকারকেই সমাধান করতে হবে এবং জনগণের ভরসার মূল কেন্দ্রও সরকারই।

এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের জায়গা রয়েছে। তা হলো— নবায়নযোগ্য জ্বালানি (রিনিউয়েবল এনার্জি) উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে বর্তমান মেয়াদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলপত্র প্রণয়ন করা। সেখানে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গ্রিডের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করবে।

এ ছাড়া কৌশলপত্রে মাত্র ৭ টাকা মূল্যহারে এই সৌরবিদ্যুৎ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গ্রিডে যুক্ত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। সরকার যদি সততার সঙ্গে প্রতি ইউনিট ৭ টাকা দরে এই বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারে এবং চাহিদার ২০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে সাশ্রয়ী করতে পারে, তবে বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে আমরা অনেকখানি এগিয়ে যাব। একইসঙ্গে জ্বালানি দক্ষতা (১০ থেকে ১৫ শতাংশ) ও সংরক্ষণ জোরদার করা গেলে গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, এলএনজি বা তেল আমদানির বিশাল ব্যয়ও আনুপাতিক হারে কমানো সম্ভব হবে।

তবে এই কৌশলপত্র বাস্তবায়নে সরকারকে অবশ্যই ভোক্তা বা গণবান্ধব কর্মকৌশল গ্রহণ করতে হবে। অসাধু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের প্রতিটি ধাপে লুণ্ঠনমূলক অপব্যয় বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো সরবরাহ ব্যয় অতিরিক্ত বেশি হওয়া। সরকার যদি নিজেকে 'মুনাফাখোর' অভিধা থেকে মুক্ত করে মুনাফামুক্ত সেবা দিতে পারে, তবেই জনগণের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক ব্যবসা হিসেবে না দেখে পুনরায় 'সেবা খাত' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বিগত দিনে এ খাতে অপরাধের মাধ্যমে যে লুণ্ঠনের সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, তার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল সরকার সংকট মোকাবিলায় কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে পারবে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট) বিষয়ে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত রহস্যজনক ও হতাশাজনক। দায়িত্ব নেওয়ার এই ছয় মাসে ওই পাওয়ার প্ল্যান্ট ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সরকারের দৃশ্যমান কোনো আগ্রহ বা উদ্যোগ দেখা যায়নি। এই প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে এসেছে এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুনির্দিষ্ট অভিযোগও জমা দেওয়া হয়েছে।

দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো— সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ থেকে এ বিষয়ে কোনো কঠোর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। তারা এখনো এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমার্শিয়াল প্রোডাকশন বা সিওডি (কমার্শিয়াল অপারেশন ডেট) নির্ধারণ করতে পারেনি, বিদ্যুৎ গ্রিডে আনার বিষয়েও কোনো অগ্রগতি নেই। বিদ্যুৎ বিভাগ এ বিষয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে দাবি করলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে কত টাকা ব্যয় হবে বা তার সঠিক হিসাব-নিকাশ সংক্রান্ত কোনো এস্টিমেট বা তথ্যচিত্র তারা পাচ্ছে না। সরকারি বিভাগগুলোর এই চরম সমন্বয়হীনতা ও ব্যর্থতার কারণে ক্যাব হাইকোর্টে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা চেয়ে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সবশেষে বর্তমান জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে এটা 'হঠাৎ তৈরি হওয়া সংকট'। কিন্তু আমার বিশ্লেষণ— এই সংকট মোটেই হঠাৎ করে আসেনি এবং এটি মোকাবিলায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে কোনো দেশের জ্বালানি সরবরাহের আসল সক্ষমতা মাপা যায় না। আসল সক্ষমতা নির্ভর করে এ খাতের 'আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য' রক্ষার ওপর।

আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষার প্রধান দুটি পথ রয়েছে—

সরকার যে দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা ক্রয় করে, ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ খরচসহ ঠিক সেই দামে বা তার চেয়ে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করা, যেন সরকারকে জ্বালানি আমদানির জন্য আলাদা করে বাজেট থেকে অর্থ দিতে না হয়।

সামাজিক বা রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে কম দামে বিক্রি করে সরকারকে সরাসরি ভর্তুকি নিশ্চিত করা।

আমাদের দেশে বর্তমানে যা ঘটছে তা চরম উদ্বেগজনক। সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে উৎপাদনে যে ব্যয় করে, তার থেকে গড়ে অন্তত ৪ টাকা কম দামে বিক্রি করছে। ফলে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকার মতো ক্ষতি বা ভর্তুকির দায় তৈরি হচ্ছে। সরকার ডলার সংকটে ভুগছে এবং বিশাল ভর্তুকি দিয়েও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বকেয়া বিল পরিশোধ করতে পারছে না। তার ওপর বিদ্যুৎ খাতে আমাদের ঋণের বোঝা দাঁড়িয়েছে কমবেশি দেড় লাখ কোটি টাকা, যার কিস্তি পরিশোধের সময় ২০২৪-২৬ সালের মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে বা যাচ্ছে।

এই চরম বাস্তবতায় সরকারের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল— হয় বিপুল ভর্তুকি ও ডলার সংস্থান করে শতভাগ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, না হয় জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলেও আমদানি কমিয়ে দেওয়া এবং বাজেট সংকট সামাল দেওয়া। বর্তমান সরকার মূলত দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছে। তারা জ্বালানি আমদানি কম রেখে অর্থসংস্থানের সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, যার মাসুল দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ জনগণকে।

পরিশেষে বলতে চাই, সাময়িক জোড়াতালি বা অ্যাডহক নীতি দিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই গভীর সংকট দূর করা সম্ভব নয়। লুণ্ঠনমূলক ব্যয় বন্ধ, স্বচ্ছতা আনা, অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে টেকসই রূপান্তরের মাধ্যমেই কেবল এই খাতকে রক্ষা করা সম্ভব।

লেখক: জ্বালানি উপদেষ্টা, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

জ্বালানি সংকট: সাময়িক সমাধানের চেয়ে প্রয়োজন আরও বেশি কিছু

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির সংকট। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, দুর্বল চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং বছরের পর বছর ধরে চলা পরিকল্পনার ঘাটতি মিলেই বারবার এই সংকট তৈরি করছে।

২ দিন আগে

শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির বাণিজ্যের পথ যেন সুগম না হয়

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার বিকল্প নেই। এনটিআরসিএ’র বিদ্যমান কাঠামোর কোনো দুর্বলতা থাকলে তা পর্যালোচনা ও সংস্কারের মাধ্যমে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এই প্রক্রিয়াকে পেছনে ঠেলে দিয়ে আবার ব্যক্তি বা কমিটির দুর্নীতির সুযোগ করে

২ দিন আগে

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট: দেশের জন্য অশনিসংকেত

এখন প্রতীয়মান হচ্ছে, এর কোনোটিই প্রত্যাশামাফিক কার্যকর হয়নি। ২০১১-১২ সাল থেকেই পেট্রোবাংলা গ্যাস আমদানিনির্ভর পরিকল্পনা গ্রহণ করে আসছে। ২০১৬-১৭ সালে নিজস্ব উৎস (পেট্রোবাংলা ও আইওসি মিলিয়ে) থেকে গ্যাসের উৎপাদন যেখানে ২৭০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছেছিল, সেটা এখন কমে প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুটে এসে ঠেকেছে। এটা পেট্রোব

৩ দিন আগে

ত্রিদেশীয় নিরাপত্তা চুক্তি কি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনতে পারবে?

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি একটি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সই হয়েছে। বিষয়টি সঙ্গত কারণে কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে আলোচিত হচ্ছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে রয়েছে। তাছাড়া বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে আজ মধ্যপ্র

৪ দিন আগে