হঠাৎ জ্বরের প্রকোপ, কোভিডের ঝুঁকি মাথায় রেখেই চিকিৎসার পরামর্শ

জান্নাতুল বাকেয়া কেকা

রাজধানীসহ দেশ জুড়ে দেখা দিয়েছে জ্বরের প্রকোপ। প্রবীণদের মতে, আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে এই সময়টাতে জ্বর হওয়া অনেকটাই স্বাভাবিক। তারা অতীতে এমনটাই হয়ে আসতে দেখেছেন। কেননা ফেব্রুয়ারিতে শীতের সমাপনীর সাথে প্রকৃতিতে চলে ঋতু বদলের পালা। বসন্তের শেষে খুব দ্রুত তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে গ্রীষ্মের সূচনা ঘটে। এই ঋতু বদলের পালায় তাপমাত্রার তারতম্যের নতুন আবহাওয়ায় মানব শরীরকে সহ্য করতে হয় হঠাৎ গরম কিংবা ঠান্ডা আবহাওয়া।

এই কখনো ঠান্ডা, কখনো গরম— এমন পরিস্থিতির পালাবদলে নারী, পুরুষ, শিশু ও তরুণদের অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ ‘সর্দি জ্বরে’। এর মধ্যেই আবার দেখা দিয়েছে ‘ভাইরাসজনিত ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বর’ও। শিশুরা ভুগছে নানান ভাইরাসের সংক্রমণে ‘শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত জ্বরে’। এমনকি শিশুদের মধ্যে প্রি-নিউমোনিয়ার প্রকোপও দেখা যাচ্ছে বলছেন চিকিৎসকরা। এভাবেই সাধারণ ‘সর্দি জ্বরে’র ছদ্মবেশেই নীরবে সংক্রমিত হচ্ছে ভাইরাসজনিত জ্বরের প্রকোপ। ‘সাধারণ সর্দি জ্বর’ থেকে ‘সংক্রিমত নানান জ্বর’, বিশেষত শিশুদের প্রি-নিউমোনিয়াজনিত জ্বরের প্রকোপের ধরন নিয়েই আজকের আলোচনা।

রাজধানীসহ প্রায় সারা দেশেই চলছে ঈদ-পরবর্তী এক ভোগান্তি। পবিত্র ঈদুল ফিতরের উৎসব পালনে নাড়ির টানে রাজধানীবাসী অনেকেই গিয়েছিলেন যার যার গ্রামে। দীর্ঘ যাত্রাপথের নানান ভোগান্তি পেরিয়ে স্বজন-প্রিয়জনদের নিয়ে তারা মেতেছেন ঈদের আনন্দে। তবে ঈদযাত্রা কিংবা ফিরতি যাত্রায় অনেকের জীবনই নিভে গেছে সড়কের মৃত্যুর মিছিলে।

একইভাবে ত্রিশ দিনের রমজান বা সিয়াম পালনের পর আবারো চার-ছয় বেলা খাবারের নিয়মে ফেরার কারণে অনেকেই ভুগছেন এসিডিটির সমস্যায়। আবার ঈদের উৎসব ঘিরে স্বজন-প্রিয়জনদের কাছে ফেরার আবেগ উত্তেজনা ও ক্লান্তিকর ভ্রমণেও অনেকেই আক্রান্ত। ফলে আবহাওয়ার পালাবদলের সাথে শরীর মনের এতসব চাপ-উত্তাপ নিতে গিয়েই অনেক মানুষই ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত। এ অবস্থায় ভাইরাসজনিত জ্বরের প্রকোপে সহজেই ধরাশায়ী সাধারণ জনমানুষ।

তাই চারপাশে তাকালেই দেখা যাচ্ছে সাধারণ সর্দি জ্বর ছাড়াও ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণজনিত জ্বরে ভুগছেন অধিকাংশ সাধারণ মানুষ। বাসে-মেট্রোতে পথ চলতি মানুষদের দিকে তাকালেই জ্বরজ্বারি নিয়ে মানুষের কষ্টকর ভোগান্তি সহজেই চোখে পড়ছে। চিকিৎসাও বলছেন, একাধিক রোগ উপসর্গের ভিত্তিতে একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। যেমন: ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ভাইরাসজনিত জ্বরের একজন রোগী আবার টাইফয়েডের মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে ভুগছেন। একইভাবে মৌসুমি জ্বরেও আক্রান্ত হচ্ছে অনেক শিশু। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ‘হতে পারে কোভিড।’

রাজধানীর ঘরে ঘরে জ্বরের প্রকোপ কোথায় কেমন, সেই বিষয়টি বোঝা যায় রাজধানীর ওষুধের ফার্মেসিগুলোর দিকে তাকালে। কেননা জ্বরে ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই সরাসরি কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারে যান না, এটি একটি বাস্তবতা বটে। আবার ঈদের সময়টতে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর বিশেষায়িত চেম্বারগুলো ছিল বন্ধ। বিভিন্ন সরকারি ও বসরকারি হাসপাপতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসার জন্য যাওয়া অধিকাংশ ভুক্তভোগী রোগীরা বলছেন, ‘মনে হচ্ছে’ তারা সাধারণ সর্দি জ্বরে ভুগছেন। কিন্তু তাদের অনেকেই করোনার মতো রোগ লক্ষণ: ঠান্ডা-কাশীর তীব্রতায় ভুগছেন। অনেকের আবার এর সাথে চিকুনগুনিয়ার মতো শরীরের নানান জয়েন্ট পেইনের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ডেঙ্গুজ্বরের ন্যায় সাধারণ জ্বরের রোগীর তীব্র মাথা ও চোখ ব্যথা, এমনকি ঠোঁট লাল হয়ে রক্তবর্ণ বা শরীরে রক্তচাপ কমে যাওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে।

একই রোগীর রোগ উপসর্গে করোনা, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো নানান উপসর্গের এই যে ‘ককটেল লক্ষণ’ কেন হচ্ছে, তা নিয়েই কথা বলেছিলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক অধ্যক্ষ এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। তিনি জানিয়েছেন, ঈদের আগে থেকেই তারা ২-৩ ধরনের জ্বরে ভুক্তভোগী রোগীর দেখা পেয়েছেন। এর মধ্যে এই মৌসুমে মূলত ‘কমন ক্লোড’ বা ‘রাইনো ভাইরাসজনিত জ্বরে’র রোগী পাচ্ছেন। এ ছাড়াও অন্যান্য ভাইরাসজনিত ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা’ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে ‘আরএসবি’ বা শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত বা প্রি-নিউমোনিয়ার রোগী পাচ্ছেন ডা. খান আবুল কালাম আজাদ।

এখন প্রশ্ন হলো— সাধারণ ‘সর্দি জ্বর’ থেকে ‘ভাইরাসজনিত ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বর’ যা কখনো কখনো ‘শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহে সংক্রমণজনিত জ্বর’— কোনটি কেমন ক্ষতিকর? উত্তরে বলি— এখনকার জ্বর মানে সচেতন থাকটা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক খান আবুল কালাম আজাদের মতামত উল্লেখ করাটা জরুরি। এই বিশেষজ্ঞ বলছেন, উল্লেখিত তিন ধরনের রোগীদের মধ্যে কিছু কমন রোগ লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যেমন: শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহে ভুক্তভোগী রোগীদের মধ্যে ফুসফুসে ইনফেকশন ও কাশির অধিক তীব্রতা থাকলে বাড়তি করোনার সম্পৃক্ততার কথা তাদের মাথায় রাখতেই হচ্ছে। আবার সাধারণ জ্বরের রোগীর ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার জ্বর ও শরীর ব্যথার উপস্থিতি থাকলে বাড়তি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে সহজেই ডেঙ্গু জ্বর কি না তা নিশ্চিত হতে ‘ডেঙ্গু এনএস-১’ পরীক্ষার পরই তিনি চিকিৎসা দিচ্ছেন।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোস্তফা কামাল রইফ জানিয়েছেন, এ সময় নানান ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত জ্বরের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। তবে শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত জ্বরের রোগী সংখ্যাও কম না। এক্ষেত্রে তিনি শিশু ও কম বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে তাদের অভিভাবকদের সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

ডা. মোস্তফা কামাল রইফ বলছেন, এই সময়ে যেকোনো ভাইরাসজনিত জ্বরে শরীর ব্যাথা ও জয়েন্টে পেইন হচ্ছে। যেকোনো ভাইরাস বা ইনফেকশনজনিত জ্বরে কমতে পারে প্লাটিলেটও। তাই পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার খেতে হবে। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের সাথে কোভিডের সংযোগ থাকতে পারে বলে সতর্ক করে তিনি মুখে মাস্ক পরা, বয়সী ও শিশুদের সাথে দূরত্ব মেনে চলা এবং নাকমুখ ঢেকে হাঁচি-কাশি দেওয়ার শিষ্টাচার মেনে চলার জোর পরামর্শ দিয়েছেন।

এ ছাড়া প্রয়োজনে বুকের এক্সরে (CRX) করে ফুসফুসের সংক্রমণ কি না নিশ্চিত হয়ে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসায় শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রতিরোধের কথা জানিয়েছেন ডা. মোস্তফা কামাল রউফ। আর সাধারণ জ্বর নাকি ডেঙ্গু জ্বর, সংক্রমণের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ‘ডেঙ্গু এনএস-১’ পরীক্ষা করে তা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক।

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

৪ দিন আগে

বাংলাদেশ-ভারতের স্বার্থে ফারাক্কা ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন

ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৫২ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতীয় রাজনীতিবিদরা যখন এটি ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন, তখন ফারাক্কা বাঁধ যে কতটা ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারও বাকি থাকার কথা নয়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের এই দাবির প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধের অপ্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

৫ দিন আগে

ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ায় জলসম্পদের ভূরাজনীতি

এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ বাংলাদেশ। কারণ দেশের ৮০ শতাংশের বেশি নদীপ্রবাহ আন্তঃরাষ্ট্রীয় উৎস থেকে আসে। কৃষি উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে মৌসুমি পানির ওপর নির্ভরশীল। নদীভাঙন ও লবণাক্ততা এরই মধ্যে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রবাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

৬ দিন আগে

ভিক্ষাবৃত্তির বিস্তার ও আমাদের দায়

ঘটনাটি শুনতে কঠোর, এমনকি কিছুটা অমানবিকও মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভেতরে একটি গভীর সামাজিক বার্তা রয়েছে— অনেক উন্নত সমাজে ভিক্ষাবৃত্তিকে শুধু দারিদ্র্যের বিষয় হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি কর্মসংস্কৃতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করা হয়।

৭ দিন আগে