
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

[জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোটে অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চলছে। সরকার কোনো ভোটে এভাবে কোনো অবস্থানের পক্ষ নিতে পারে কি না, তা নিয়ে নানা মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে রোববার (১৮ জানুয়ারি) গণমাধ্যমে এই বিবৃতি পাঠানো হয়েছে। রাজনীতি ডটকমের পাঠকদের জন্য সামান্য বিবৃতিটি হুবহু তুলে ধরা হলো।]
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মন্তব্যে বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের ওপর আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্য সমর্থন একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নিরপেক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। এ উদ্বেগ আলোচনার যোগ্য হলেও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে মূল্যায়ন করলে এ ধরনের সমালোচনার ভিত্তি নেই।
বাংলাদেশের এই সংকটময় সময়ে নীরবতা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়; বরং তা দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাবই ফুটিয়ে তোলে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুধু দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনা বা নিরপেক্ষ নির্বাচন তত্ত্বাবধানের জন্য গঠিত হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের অপশাসনের ফলে সৃষ্ট শাসনতান্ত্রিক সংকট, জনঅনাস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক চরম দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে এই সরকারের মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা, গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারের একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক ইউনূস গত ১৮ মাসে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণদের সঙ্গে ব্যাপক পরামর্শের মাধ্যমে যে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছেন, বর্তমান সংস্কার প্যাকেজ তারই ফল। তাই এই সংস্কারের পক্ষে অবস্থান না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের মূল উদ্দেশ্যকে ভুলভাবে বোঝার শামিল।
যে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের দায়িত্ব নিয়ে গঠিত, গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মুহূর্তে সেই সংস্কার থেকে সেই সরকার নিজেকে দূরে রাখবে— এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন হোক বা নির্বাচিত হোক আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চায় সরকারপ্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নিয়ে নীরব থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। বরং গণতন্ত্রে প্রত্যাশা করা হয় যে নেতারা জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় নীতি ও সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরবেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেবেন।
অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও গণভোট কোনো টেকনোক্র্যাটিক প্রক্রিয়া নয়। এটি সরাসরি জনগণের মতামত জানার মাধ্যম। সরকারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা যখন স্পষ্টভাবে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন, তখন ভোটারদের সিদ্ধান্ত আরও তথ্যভিত্তিক ও অর্থবহ হয়।
গণতান্ত্রিক বৈধতার মূল প্রশ্ন হলো নেতারা অবস্থান নিলেন কি না, তা নয়; বরং—
এই সব শর্ত বর্তমান প্রেক্ষাপটে অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
বাংলাদেশের সংস্কার গণভোট কোনো বিমূর্ত নীতিগত প্রশ্ন নয়, এটি দীর্ঘদিনের শাসনব্যর্থতার জবাব, যা বছরের পর বছর নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বিগ্ন রেখেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন এবং তত্ত্বাবধানকারী সংস্থার রাজনীতিকরণের মাধ্যমে দেশকে সংকটে ফেলেছে।
এই বাস্তবতায় সংস্কারের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতারই প্রকাশ। যিনি নিজে সংস্কারের সমস্যা চিহ্নিত করেছেন এবং সমাধানে ঐকমত্য তৈরির নেতৃত্ব দিয়েছেন, তার জন্য এখন নীরব থাকা হবে অসঙ্গত ও দায়িত্বহীন।
যে অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের বৈধতা সংস্কার থেকে আসে, তাদের পক্ষে সংস্কারের পক্ষে কথা বলা পক্ষপাত নয়; বরং তা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।
এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো ব্যতিক্রম নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বীকার করবে যে বিশ্বজুড়ে বহু দেশে সরকারপ্রধানরা—ইউরোপ, এশিয়া বা অন্য যে কোনো অঞ্চলে—গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিবর্তনসংক্রান্ত গণভোটে প্রকাশ্যে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এসব ঘটনাকে গণতান্ত্রিক রীতির লঙ্ঘন হিসেবে নয়, বরং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবেই দেখা হয়।
আধুনিক ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের (২০১৬) প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ব্রেক্সিট গণভোটে ‘থাকুন’ ভোটের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালান এবং ইইউ সদস্যপদ বজায় রাখাকে জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরেন।
স্কটল্যান্ডের (২০১৪) ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স স্যালমন্ড ‘ইয়েস স্কটল্যান্ড’ প্রচারে ছিলেন প্রধান মুখ এবং গণভোটকে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গণতান্ত্রিক সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
তুরস্কের (২০১৭) প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান নির্বাহী ক্ষমতা বাড়ানোর সাংবিধানিক সংশোধনের পক্ষে দেশব্যাপী প্রচারণা চালান।
কিরগিজস্তানের (২০১৬) প্রেসিডেন্ট আলমাজবেক আতামবায়েভ সংসদীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
ফ্রান্সের (১৯৬২) প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য গণভোটের পক্ষে সরাসরি জনগণের সমর্থন চান, সংসদীয় বিরোধিতা উপেক্ষা করে।
সব ক্ষেত্রেই বর্তমান সরকারপ্রধানদের সমর্থনকে অগণতান্ত্রিক বলা হয়নি। বরং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে— নেতারা যা সঠিক মনে করেন তার পক্ষে কথা বলেন এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের সিদ্ধান্ত মেনে নেন।
গণভোটের বৈধতা নেতাদের নীরবতার ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে ভোটারদের স্বাধীনভাবে পক্ষে বা বিপক্ষে মত দেওয়ার সুযোগের ওপর।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো— গণভোটের ফলাফলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো নির্বাচনি স্বার্থ জড়িত নেই। অধ্যাপক ইউনূস ও তার উপদেষ্টারা ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লাভ বা দলীয় সুবিধা চান না। তাদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে সময়সীমাবদ্ধ ও অন্তর্বর্তী।
একবার সংস্কার গৃহীত বা প্রত্যাখ্যাত হলে তার বাস্তবায়ন বা পরিণতি বহন করবে নির্বাচিত সরকার। ফলে অযথা প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি খুবই সীমিত, এবং এই সমর্থনের সৎ উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
জেলা পর্যায়ে প্রচার চালানো নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, তা প্রেক্ষাপটসহ বিবেচনা করা প্রয়োজন। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য সংস্কারের বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব জনগণের কাছে স্পষ্ট করা, বিশেষ করে যেখানে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি সচেতন অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
ক্রান্তিকালে এ ধরনের সরকারি সম্পৃক্ততা স্বাভাবিক এবং এটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতিরিক্ত বা অনৈতিক প্রচারণা বলা যায় না। জন পরিসরে থাকা আলোচনায় সরকারের উপস্থিতি বিরোধী মত দমন করে না; বরং নিশ্চিত করে যে নাগরিকরা বুঝেশুনে সংস্কার বিষয়ে মতামত দিতে পারেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সমর্থনে নয়, বরং দ্বিধা ও নীরবতায়। যে সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, তা সমর্থন না করলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে, ভোটাররা বিভ্রান্ত হবে এবং পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হবে।
‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ—
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণেরই। এটাই গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা। নেতৃত্ব সেই সিদ্ধান্ত কেড়ে নেয় না; বরং তা স্পষ্ট ও অর্থবহ করতে সহায়তা করে।

[জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোটে অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চলছে। সরকার কোনো ভোটে এভাবে কোনো অবস্থানের পক্ষ নিতে পারে কি না, তা নিয়ে নানা মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে রোববার (১৮ জানুয়ারি) গণমাধ্যমে এই বিবৃতি পাঠানো হয়েছে। রাজনীতি ডটকমের পাঠকদের জন্য সামান্য বিবৃতিটি হুবহু তুলে ধরা হলো।]
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মন্তব্যে বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের ওপর আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্য সমর্থন একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নিরপেক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। এ উদ্বেগ আলোচনার যোগ্য হলেও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে মূল্যায়ন করলে এ ধরনের সমালোচনার ভিত্তি নেই।
বাংলাদেশের এই সংকটময় সময়ে নীরবতা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়; বরং তা দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাবই ফুটিয়ে তোলে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুধু দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনা বা নিরপেক্ষ নির্বাচন তত্ত্বাবধানের জন্য গঠিত হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের অপশাসনের ফলে সৃষ্ট শাসনতান্ত্রিক সংকট, জনঅনাস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক চরম দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে এই সরকারের মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা, গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারের একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক ইউনূস গত ১৮ মাসে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণদের সঙ্গে ব্যাপক পরামর্শের মাধ্যমে যে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছেন, বর্তমান সংস্কার প্যাকেজ তারই ফল। তাই এই সংস্কারের পক্ষে অবস্থান না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের মূল উদ্দেশ্যকে ভুলভাবে বোঝার শামিল।
যে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের দায়িত্ব নিয়ে গঠিত, গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মুহূর্তে সেই সংস্কার থেকে সেই সরকার নিজেকে দূরে রাখবে— এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন হোক বা নির্বাচিত হোক আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চায় সরকারপ্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নিয়ে নীরব থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। বরং গণতন্ত্রে প্রত্যাশা করা হয় যে নেতারা জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় নীতি ও সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরবেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেবেন।
অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও গণভোট কোনো টেকনোক্র্যাটিক প্রক্রিয়া নয়। এটি সরাসরি জনগণের মতামত জানার মাধ্যম। সরকারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা যখন স্পষ্টভাবে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন, তখন ভোটারদের সিদ্ধান্ত আরও তথ্যভিত্তিক ও অর্থবহ হয়।
গণতান্ত্রিক বৈধতার মূল প্রশ্ন হলো নেতারা অবস্থান নিলেন কি না, তা নয়; বরং—
এই সব শর্ত বর্তমান প্রেক্ষাপটে অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
বাংলাদেশের সংস্কার গণভোট কোনো বিমূর্ত নীতিগত প্রশ্ন নয়, এটি দীর্ঘদিনের শাসনব্যর্থতার জবাব, যা বছরের পর বছর নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বিগ্ন রেখেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন এবং তত্ত্বাবধানকারী সংস্থার রাজনীতিকরণের মাধ্যমে দেশকে সংকটে ফেলেছে।
এই বাস্তবতায় সংস্কারের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতারই প্রকাশ। যিনি নিজে সংস্কারের সমস্যা চিহ্নিত করেছেন এবং সমাধানে ঐকমত্য তৈরির নেতৃত্ব দিয়েছেন, তার জন্য এখন নীরব থাকা হবে অসঙ্গত ও দায়িত্বহীন।
যে অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের বৈধতা সংস্কার থেকে আসে, তাদের পক্ষে সংস্কারের পক্ষে কথা বলা পক্ষপাত নয়; বরং তা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।
এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো ব্যতিক্রম নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বীকার করবে যে বিশ্বজুড়ে বহু দেশে সরকারপ্রধানরা—ইউরোপ, এশিয়া বা অন্য যে কোনো অঞ্চলে—গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিবর্তনসংক্রান্ত গণভোটে প্রকাশ্যে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এসব ঘটনাকে গণতান্ত্রিক রীতির লঙ্ঘন হিসেবে নয়, বরং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবেই দেখা হয়।
আধুনিক ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের (২০১৬) প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ব্রেক্সিট গণভোটে ‘থাকুন’ ভোটের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালান এবং ইইউ সদস্যপদ বজায় রাখাকে জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরেন।
স্কটল্যান্ডের (২০১৪) ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স স্যালমন্ড ‘ইয়েস স্কটল্যান্ড’ প্রচারে ছিলেন প্রধান মুখ এবং গণভোটকে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গণতান্ত্রিক সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
তুরস্কের (২০১৭) প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান নির্বাহী ক্ষমতা বাড়ানোর সাংবিধানিক সংশোধনের পক্ষে দেশব্যাপী প্রচারণা চালান।
কিরগিজস্তানের (২০১৬) প্রেসিডেন্ট আলমাজবেক আতামবায়েভ সংসদীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
ফ্রান্সের (১৯৬২) প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য গণভোটের পক্ষে সরাসরি জনগণের সমর্থন চান, সংসদীয় বিরোধিতা উপেক্ষা করে।
সব ক্ষেত্রেই বর্তমান সরকারপ্রধানদের সমর্থনকে অগণতান্ত্রিক বলা হয়নি। বরং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে— নেতারা যা সঠিক মনে করেন তার পক্ষে কথা বলেন এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের সিদ্ধান্ত মেনে নেন।
গণভোটের বৈধতা নেতাদের নীরবতার ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে ভোটারদের স্বাধীনভাবে পক্ষে বা বিপক্ষে মত দেওয়ার সুযোগের ওপর।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো— গণভোটের ফলাফলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো নির্বাচনি স্বার্থ জড়িত নেই। অধ্যাপক ইউনূস ও তার উপদেষ্টারা ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লাভ বা দলীয় সুবিধা চান না। তাদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে সময়সীমাবদ্ধ ও অন্তর্বর্তী।
একবার সংস্কার গৃহীত বা প্রত্যাখ্যাত হলে তার বাস্তবায়ন বা পরিণতি বহন করবে নির্বাচিত সরকার। ফলে অযথা প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি খুবই সীমিত, এবং এই সমর্থনের সৎ উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
জেলা পর্যায়ে প্রচার চালানো নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, তা প্রেক্ষাপটসহ বিবেচনা করা প্রয়োজন। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য সংস্কারের বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব জনগণের কাছে স্পষ্ট করা, বিশেষ করে যেখানে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি সচেতন অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
ক্রান্তিকালে এ ধরনের সরকারি সম্পৃক্ততা স্বাভাবিক এবং এটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতিরিক্ত বা অনৈতিক প্রচারণা বলা যায় না। জন পরিসরে থাকা আলোচনায় সরকারের উপস্থিতি বিরোধী মত দমন করে না; বরং নিশ্চিত করে যে নাগরিকরা বুঝেশুনে সংস্কার বিষয়ে মতামত দিতে পারেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সমর্থনে নয়, বরং দ্বিধা ও নীরবতায়। যে সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, তা সমর্থন না করলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে, ভোটাররা বিভ্রান্ত হবে এবং পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হবে।
‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ—
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণেরই। এটাই গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা। নেতৃত্ব সেই সিদ্ধান্ত কেড়ে নেয় না; বরং তা স্পষ্ট ও অর্থবহ করতে সহায়তা করে।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে এ দেশের মানুষের এই বন্ধন যেন ছিল রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তার জানাজায় আসা সবাই দলীয় নেতাকর্মী ছিলেন না। অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ। কীভাবে তিনি এত এত সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিলেন, তা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। ইতিহাসের এক কালজয়ী অধ্যায়।
৯ দিন আগে
প্রশ্ন জাগে— তাদের দাবি কী? সব দাবিই কি কেবল এই ব্যবসায়ীদের? ভোক্তা বা দেশের নাগরিকদের কি কোনো দাবি থাকতে পারে না? জনগণকে জিম্মি করে এভাবে দাবি আদায়ের নামে যারা আন্দোলন করে, তারা কি আসলেই ব্যবসায়ী, নাকি লুটেরা?
১০ দিন আগে
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ দীর্ঘ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রণীত একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যাতে দেশে বিদ্যমান সক্রিয় প্রায় সব দল সই করেছে। যেহেতু সংবিধান হলো ‘উইল অব দ্য পিপল’ বা জনগণের চরম অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি, তাই জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে জনগণের সম্মতি বা গণভোট আয়ো
১১ দিন আগে