অগ্নিঝরা মার্চ জুড়েই মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ১২: ১৪

একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের ৪ তারিখও ছিল ঘটনাবহুল। প্রতিদিনই সেনাবাহিনীর বেপরোয়া নির্মম আচরণ চলতে থাকে। জবাবে বাঙালি আরও বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। আগের দিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে মুক্তিকামী বাঙালিকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন ছাত্রনেতারা। ওই দিন থেকেই বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ইয়াহিয়ার শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় বাঙালিরা গর্জে ওঠে।

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার প্রতিবাদে ১লা মার্চ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ২রা ও ৩রা মার্চ ঢাকায় সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। দুই দিনের হরতালে সেনাবাহিনী ও সরকারের পেটোয়া বাহিনীর হামলায় হরতাল পালনকারীদের অনেকেই হতাহত হন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ও দুই দিনের গণহত্যার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ৪ঠা মার্চ থেকে ৬ই মার্চ পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা বাংলায় দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল আহ্বান করেন। এদিন ঢাকাসহ সারা বাংলায় সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। পূর্ব বাংলার বেসামরিক শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। খুলনায় সেনাবাহিনীর গুলিতে ৬ জন শহিদ হন। দুই দিনে চট্টগ্রামে প্রাণহানি দাঁড়ায় ১২১ জনে।

আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে সেনাবাহিনী গুলি চালালে অনেকেই আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। আহত মুমূর্ষু বীর সংগ্রামীদের প্রাণরক্ষার্থে বঙ্গবন্ধু রক্ত দেওয়ার আহ্বান জানান। শত শত নারী-পুরুষ ও ছাত্রছাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৫ ও ৬ই মার্চ সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যেসব সরকারি ও বেসরকারি অফিসে কর্মচারীরা এখনো বেতন পাননি, শুধু বেতন প্রদানের জন্য সেসব অফিস আড়াইটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত খোলা থাকবে। বাংলাদেশের জন্য অনধিক ১ হাজার ৫০০ টাকা পরিমাণ বেতনের চেকই কেবল ক্যাশ করা যাবে। স্টেট ব্যাংকের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো মাধ্যমে বাংলাদেশের বাইরে কোনো টাকা পাঠানো যাবে না। বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, চরম ত্যাগ স্বীকার ছাড়া কোনো দিন কোনো জাতির মুক্তি আসেনি। তিনি উপনিবেশবাদী শোষণ ও শাসন অব্যাহত রাখার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বানে সাড়া দেওয়ায় বীর জাতিকে অভিনন্দন জানান।

এ দিন এক বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, দেশের মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বাঙালি বা অবাঙালি— সব সম্প্রদায়ের মধ্যে সহযোগিতা ও পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, ওরা সাম্রাজ্যবাদের দালাল। ওদের শোষণ-নির্যাতনে ৮৫ ভাগ বাঙালি আজ প্রায় মৃত্যুর সম্মুখীন। সুতরাং যে ব্যক্তি, যে রাজনৈতিক দল অথবা যে রাজনৈতিক নেতা পশ্চিমাদের সঙ্গে কিংবা সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে কোনো রকম আঁতাত করবে বা করতে যাবে, সে শুধু তার নিজস্ব ক্ষেত্র থেকে বিতাড়িত হবে তা নয়, বরং তার জানমালও বিপন্ন হবে।

করাচি প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান দেশকে বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান। পিডিপি প্রধান নূরুল আমীন এক বিবৃতিতে ১০ই মার্চ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে প্রেসিডেন্টকে অবিলম্বে ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার দাবি জানান।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দেশের সংহতির জন্য তাঁর দল যতদূর সম্ভব ৬-দফার কাছাকাছি হওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানের বিস্ফোরণমুখ পরিস্থিতির অবসানের জন্য তিনি এখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে রাজি হবেন কি না— এ প্রশ্নের জবাবে ভুট্টো বলেন, ‘ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত ঘটছে। এ সম্পর্কে অবহিত করার জন্য আমরা সাংবাদিকদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করব।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫ জন শিক্ষক পৃথক পৃথক বিবৃতিতে ঢাকার ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার গণবিরোধী ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

আজ থেকে রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’ এবং পাকিস্তান টেলিভিশন ‘ঢাকা টেলিভিশন’ হিসেবে সম্প্রচার শুরু করে। বেতার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র শিল্পীরা এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, যতদিন পর্যন্ত দেশের জনগণ ও ছাত্রসমাজ সংগ্রামে লিপ্ত থাকবেন, ততদিন পর্যন্ত বেতার ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে তারা অংশ নেবেন না। এই বিবৃতিতে সই করেন লায়লা আর্জুমান্দ বেগম, আফসারী খানম, আতীকুল ইসলাম, ফেরদৌসী রহমান, মুস্তফা জামান আব্বাসী, গোলাম মোস্তফা, হাসান ইমাম, জাহেদুর রহিম, আলতাফ মাহমুদ, ওয়াহিদুল হক, এ এম হামিদসহ আরও কয়েকজন।

পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এ দিন জরুরি এক সভায় বাংলার জনগণের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে সামরিক শাসন প্রত্যাহারের দাবি জানায়। ওই সভা থেকে ৬ই মার্চ সাংবাদিকদের মিছিল এবং বায়তুল মোকাররমে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

লেখক: চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) সাবেক মহাপরিচালক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

যুদ্ধ থামলেও তেলের দাম দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এর অর্থ আরও স্পষ্ট— যুদ্ধের সামরিক উত্তাপ কমলেও অর্থনৈতিক অভিঘাত অনেক দিন স্থায়ী হতে পারে। সাধারণ ভোক্তার জন্য এর প্রভাব পড়বে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, খাদ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে।

৮ দিন আগে

মেধা ও রাজনীতি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরিপূরক

রাষ্ট্র পরিচালনা করেন রাজনীতিবিদরা; তাদের সহায়তা করে প্রশাসন, বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস; আর নীতিগত সুবিধা অনেকাংশে পায় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এই ত্রিমুখী কাঠামোর ভেতরে মেধাবী ছাত্রদের অবস্থান কোথায়— এই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

৯ দিন আগে

সরকারি প্রাথমিকে অনলাইন ক্লাস চালু করা কতটা প্রাসঙ্গিক?

বাংলাদেশের জনগণের বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত। তাদের অধিকাংশই সাধারণ মোবাইল ব্যবহার করে। অপরদিকে ওয়াই-ফাই সকলের বাসা-বাড়িতে নেই। এ অবস্থায় নানা আর্থিক প্রতিকূলতার কারণে সাধারণ মানুষের সন্তানদের অনলাইন ক্লাস করা বিঘ্নিত হবে।

১৩ দিন আগে

ইরান যুদ্ধ: জ্বালানি শক্তি পুনর্বিন্যাসের তীব্র লড়াই

জ্বালানি তেল সংকট কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে— একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এখনই বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং অবৈধ মজুতদারি প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

১৬ দিন আগে