তারেক রহানের দেশে না ফেরা হতে পারে হিসেবি রাজনৈতিক কৌশল

ড. মামুন আল মোস্তফা

তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে বিএনপির ভেতরে যে ধোঁয়াশা বা গোপনীয়তা আছে, সেটি মোটেও হঠাৎ বা কাকতালীয় নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দিক থেকে দেখলে এটি আসলে দলের একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল। আইনি জটিলতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি— সব মিলিয়ে দলীয় হাইকমান্ড এখন অপেক্ষা-দেখার নীতি অনুসরণ করছে।

এই নীরবতা দুইভাবে কাজ করছে—

প্রথমত, এটি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আশা টিকিয়ে রাখছে। ‘তিনি ফিরবেন’— এই বিশ্বাসকে জীবন্ত রাখছে।

দ্বিতীয়ত, এটি একটি শক্ত রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে— দল চাইলে নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, আবার প্রয়োজনে অদৃশ্য অবস্থান থেকেও প্রভাব বজায় রাখতে পারে।

দীর্ঘ সময় ধরে তারেক রহমান দেশের বাইরে। এটি এখন বিএনপির জন্য নতুন কিছু নয়। তৃণমূলের বহু নেতাকর্মী বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। সত্যি বলতে, তিনি দেশে ফিরলে দল অবশ্যই নতুন উদ্দীপনা পাবে। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতেও দলের সাংগঠনিক কাজ থেমে নেই— এটাই গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

আজকের রাজনীতিতে ভার্চুয়াল যোগাযোগ, অনলাইন সভা-সমন্বয়— এসবের কারণে নেতৃত্ব দেশে না থাকলেও দল চালানো সম্ভব হচ্ছে। এভাবে এক ধরনের কার্যকর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে— ‘না এলেও দলের কাজ চলে’।

তারেক রহমানের দেশে না ফেরা নিয়ে কথা হচ্ছে অনেক দিন থেকেই, বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে তা জোরালো হয়েছে। এর মধ্যেও বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার নিজেরই এক ফেসবুক স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে, যেখানে তিনি লিখেছেন— মায়ের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হলেও তিনি মায়ের স্পর্শ পেতে দেশে ফিরতে পারছেন না।

শনিবার তারেক রহমান তার স্ট্যটাসে লিখেছেন, ‘এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সবার মতো এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এ বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত।’

প্রশ্ন উঠেছে, মায়ের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হলেও যখন তিনি ফিরতে পারছেন না, তখন রাজনৈতিক কোন প্রেক্ষাপটে তাহলে তিনি দেশে ফিরবেন? এর মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের কাছে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— দলের কাঠামোর মূল ভরকেন্দ্র হচ্ছে তারেক রহমানের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবারকেন্দ্রিক আনুগত্য নতুন কিছু নয়। এই আবেগনির্ভর বিশ্বাসই নিশ্চিত করেছে, তার শারীরিক অনুপস্থিতি কখনোই নেতৃত্বের সংকট তৈরি করেনি। বরং দূর থেকেই তিনি দলের প্রধান শক্তি, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছেন।

সবশেষে বলা যায়, তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে যে নীরবতা দেখা যাচ্ছে, তা দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং বিএনপির জন্য এটি একটি হিসেবি রাজনৈতিক কৌশল, যা এখন পর্যন্ত কার্যকর বলেই মনে হয়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

দশম গ্রেড বুঝি না, আম্মুর অভাব বুঝি

শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনার টেবিলে যত তর্ক-বিতর্কই থাকুক, শিক্ষক পরিবারের বাস্তব সংকট অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দশম গ্রেডের অর্থ একজন শিক্ষকের জীবনযাপনের মান, সন্তান লালন-পালনের সুরক্ষা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নিশ্চয়তা।

৪ দিন আগে

আবুল সরকারকে মুক্তি দাও, হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করো

আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে বাউল-ফকিরদের সমাবেশে হামলা করেছে তথাকথিত ’তৌহিদী জনতা’। মানিকগঞ্জে স্লোগান উঠেছে— ’একটা একটা বাউল ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর।’ আমরা এই দুই ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে আবুল সরকারের মুক্তির দাবি করছি।

৫ দিন আগে

নাগরিক জীবন, নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা

ভূমিকম্পের সময় স্পষ্ট হয়, অনেক ভবনের কাঠামো দুর্বল, যান্ত্রিকভাবে অযোগ্য এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে অপ্রস্তুত। সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকিতে, আর প্রশাসনের সক্ষমতাও এই ঝুঁকি মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়।

৭ দিন আগে

ভূমিকম্প– আতঙ্ক ও বিপর্যস্ত জনজীবন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এমন ভূমিকম্প হওয়ারই কথা। রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হলে বড় আকারের ধ্বংসের আশঙ্কা আছে। যদি ৫.৭ না হয়ে ৭ বা ৮ স্কেল হতো, তাহলে ঢাকা শহর বিপর্যস্ত হতো। শুক্রবারের ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিকে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ বলা হচ্ছে। এমন ভূমিকম্পের শঙ্কা বিশেষজ্ঞরা আগেই প্রকাশ করে আসছিলেন

৯ দিন আগে