তারেক রহমানের দেশে না ফেরা হতে পারে হিসেবি রাজনৈতিক কৌশল

ড. মামুন আল মোস্তফা
আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ২২: ২১

তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে বিএনপির ভেতরে যে ধোঁয়াশা বা গোপনীয়তা আছে, সেটি মোটেও হঠাৎ বা কাকতালীয় নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দিক থেকে দেখলে এটি আসলে দলের একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল। আইনি জটিলতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি— সব মিলিয়ে দলীয় হাইকমান্ড এখন অপেক্ষা-দেখার নীতি অনুসরণ করছে।

এই নীরবতা দুইভাবে কাজ করছে—

প্রথমত, এটি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আশা টিকিয়ে রাখছে। ‘তিনি ফিরবেন’— এই বিশ্বাসকে জীবন্ত রাখছে।

দ্বিতীয়ত, এটি একটি শক্ত রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে— দল চাইলে নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, আবার প্রয়োজনে অদৃশ্য অবস্থান থেকেও প্রভাব বজায় রাখতে পারে।

দীর্ঘ সময় ধরে তারেক রহমান দেশের বাইরে। এটি এখন বিএনপির জন্য নতুন কিছু নয়। তৃণমূলের বহু নেতাকর্মী বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। সত্যি বলতে, তিনি দেশে ফিরলে দল অবশ্যই নতুন উদ্দীপনা পাবে। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতেও দলের সাংগঠনিক কাজ থেমে নেই— এটাই গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

আজকের রাজনীতিতে ভার্চুয়াল যোগাযোগ, অনলাইন সভা-সমন্বয়— এসবের কারণে নেতৃত্ব দেশে না থাকলেও দল চালানো সম্ভব হচ্ছে। এভাবে এক ধরনের কার্যকর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে— ‘না এলেও দলের কাজ চলে’।

তারেক রহমানের দেশে না ফেরা নিয়ে কথা হচ্ছে অনেক দিন থেকেই, বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে তা জোরালো হয়েছে। এর মধ্যেও বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার নিজেরই এক ফেসবুক স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে, যেখানে তিনি লিখেছেন— মায়ের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হলেও তিনি মায়ের স্পর্শ পেতে দেশে ফিরতে পারছেন না।

শনিবার তারেক রহমান তার স্ট্যটাসে লিখেছেন, ‘এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সবার মতো এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এ বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত।’

প্রশ্ন উঠেছে, মায়ের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হলেও যখন তিনি ফিরতে পারছেন না, তখন রাজনৈতিক কোন প্রেক্ষাপটে তাহলে তিনি দেশে ফিরবেন? এর মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের কাছে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— দলের কাঠামোর মূল ভরকেন্দ্র হচ্ছে তারেক রহমানের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবারকেন্দ্রিক আনুগত্য নতুন কিছু নয়। এই আবেগনির্ভর বিশ্বাসই নিশ্চিত করেছে, তার শারীরিক অনুপস্থিতি কখনোই নেতৃত্বের সংকট তৈরি করেনি। বরং দূর থেকেই তিনি দলের প্রধান শক্তি, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছেন।

সবশেষে বলা যায়, তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে যে নীরবতা দেখা যাচ্ছে, তা দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং বিএনপির জন্য এটি একটি হিসেবি রাজনৈতিক কৌশল, যা এখন পর্যন্ত কার্যকর বলেই মনে হয়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

পরীক্ষার হল কি রাজনৈতিক মঞ্চ?

পরীক্ষার কক্ষে পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে— মন্ত্রী, এমপি, বিরোধী নেতা কিংবা সাংবাদিক— কেউই এর ব্যতিক্রম নন। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো ধরনের প্রদর্শনমূলক কার্যক্রম বা রাজনৈতিক উপস্থিতি এই সংবেদনশীল পরিবেশে অনুমোদন করা উচিত নয়।

৫ দিন আগে

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা আবশ্যক

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব দেশের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি অগ্রাধিকারে রাখলে এবং পূর্বের ন্যায় দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে আশা করা যায়।

৫ দিন আগে

একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার সমন্বয় টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি

ভবিষ্যতের বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র ডিগ্রি নয়, বরং বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা অপরিহার্য। মানবসম্পদ উন্নয়নে একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ই হতে পারে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

৮ দিন আগে

সক্রিয় তদারকিতে হজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা দৃশ্যমান

এ বছর ধর্মমন্ত্রীকে সরাসরি মাঠে গিয়ে হজযাত্রীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া তিনি হজযাত্রা ও এর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। এসবের মাধ্যমে যেসব বাস্তব সমস্যা খুঁজে পাচ্ছেন, দ্রুত সেগুলো সমাধানেরও উদ্যোগ নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার একটি

১১ দিন আগে