দশম গ্রেড বুঝি না, আম্মুর অভাব বুঝি

জাকির আহমদ খান কামাল

‘দশম গ্রেড বুঝি না, আম্মুর অভাব বুঝি’— চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার ঝিনাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফাতেমা বেগমের নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তান জুনায়েদ সিদ্দিকী তার মায়ের বিয়োগব্যথায় এভাবেই শোক প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে দশম গ্রেডে অন্তর্ভুক্তির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। গত ৮ নভেম্বর ঢাকার শাহবাগে আন্দোলনরত অবস্থায় পুলিশের ছোড়া সাউন্ড গ্রেনেডে তিনি আহত হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৬ নভেম্বর মৃত্যু হয় তার।

শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি যে প্রাথমিক স্তর, সেই স্তরকে ধরে রাখেন এই ফাতেমারা, যাদের দায়িত্ব শুধু পাঠদান নয়; শিশুর প্রথম সামাজিকীকরণ, শেখার আগ্রহ তৈরি এবং মানবিক মূল্যবোধ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও তাদের ওপর ন্যস্ত। অথচ বেতন-ভাতা ও সম্মান রক্ষার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রাণ দিতে হলো ফাতেমাকে।

প্রয়াত শিক্ষকের সন্তান জুনায়েদের ‘দশম গ্রেড বুঝি না, আম্মুর অভাব বুঝি’ বক্তব্যটি শিক্ষক সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই সরল উচ্চারণ বাস্তবতার কঠিন সত্যকে আরও স্পষ্ট করে দেয়।

শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনার টেবিলে যত তর্ক-বিতর্কই থাকুক, শিক্ষক পরিবারের বাস্তব সংকট অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দশম গ্রেডের অর্থ একজন শিক্ষকের জীবনযাপনের মান, সন্তান লালন-পালনের সুরক্ষা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নিশ্চয়তা।

যখন একজন শিক্ষকের সন্তান বলে, ‘আম্মুর অভাব বুঝি’, তখন বোঝা যায়— এই অভাব আসলে নিত্যদিনের বাস্তব সংগ্রামের প্রতিফলন। শিক্ষিত সমাজের অংশ হয়েও তারা অনেক সময় মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খান— এ দৃশ্য একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য মোটেও স্বস্তিকর নয়।

প্রাথমিক শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক স্বস্তি নিশ্চিত করা শুধু একটি শ্রেণির দাবি নয়, এটি জাতীয় বিনিয়োগ। কারণ প্রতিটি শিশুর শেখার ভিত্তি গড়ে দেন এই শিক্ষকরা। তাদের মনোযোগ, আত্মসম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তা যত দৃঢ় হবে, শিক্ষা ব্যবস্থায় ততই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। অন্যদিকে হতাশ ও অবমূল্যায়িত একজন শিক্ষক কখনোই শিক্ষার্থীর জন্য কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন না।

দশম গ্রেডের দাবি ন্যায়সঙ্গত কি না— এ নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে শিক্ষক সমাজকে মর্যাদার উচ্চ আসনে রাখা একটি সুশিক্ষিত জাতি গঠনের পূর্বশর্ত। নীতিনির্ধারকদের উচিত বাস্তবতা পর্যালোচনা করে যুক্তিসঙ্গত সমাধানে এগিয়ে আসা, যাতে শিক্ষক পরিবারের সন্তানদের আর বলতে না হয়— ‘আম্মুর অভাব বুঝি।’

আমরা যদি সত্যিই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন চাই, তবে প্রাথমিক শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রথম পদক্ষেপ। কারণ একটি জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হলো তার শিক্ষক— যারা স্বপ্ন দেখান, গড়ে তোলেন এবং পরোক্ষভাবে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও কলাম লেখক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মেধা সম্পদ ও একাডেমিক মেরিটোক্রেসি

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায়শই একাডেমিক মেরিটোক্রেসিকে (বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, পদোন্নতি, মূল্যায়ন ও নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে শুধু যোগ্যতা ও কাজের মানের ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব বা তদবিরের ভিত্তিতে নয়) যথাযথভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয় না।

৪ দিন আগে

আফসানা বেগম কি সংস্কারের শাস্তি পেলেন?

একজন উপদেষ্টার কাছ থেকে আমরা আশা করি নীতিগত সততা, সংস্কারের সাহস এবং মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা। কিন্তু এখানে দেখা গেল উল্টো চিত্র— সংস্কারের প্রস্তাবকে শাস্তি দিয়ে দমন করা হলো। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়; নীরবতা এখানে পক্ষ নেওয়া। আর সেই পক্ষটি দুর্নীতির সুবিধাভোগীদের।

৫ দিন আগে

বিএনপিকে সামনে এগিয়ে নেওয়াই এখন সময়ের দাবি

কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, দেশ ও জাতির প্রয়োজনে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন বা সংস্কার অনিবার্য। সেই সংস্কারের স্পিরিট বা চেতনা আমি এখন বিএনপির রাজনীতির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। তাই দেশের এ বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বিএনপির সঙ্গেই পথ চলাকে আমি শ্রেয় মনে করেছি এবং যোগদানের সিদ্ধান

৫ দিন আগে

উপকূলীয় পর্যটনই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে এখনো পিছিয়ে। বছরে ৩০-৪০ লাখ দেশীয় পর্যটক এলেও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা নগণ্য। তুলনায় থাইল্যান্ড বছরে প্রায় চার কোটি বিদেশি পর্যটক থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে। আর মালদ্বীপ মাত্র ২০ লাখ পর্যটক থেকেই তার জিডিপ

৭ দিন আগে