
এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

২০ জানুয়ারি, শহিদ আসাদ দিবস। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে যে দিনগুলো উদ্দীপিত, আলোড়িত ও অভিভূত হওয়ার, তারই অন্যতম একটি দিন এটি। ১৯৬৯ সালে শহিদ আসাদ স্মরণে কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন কালজয়ী কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। আত্মত্যাগের ঘটনায় তিনি লিখেছেন—
‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের
জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়….
আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক—
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’
১.
২০ জানুয়ারি শহিদ আসাদের ৫৬তম মৃত্যুদিবস। স্মরণে ভুলে যেতে বসেছি কি আমরা আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের মহানায়কদের? বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার এ পথপরিক্রমায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান একটি মাইলফলক।
রাজধানী শেরেবাংলা নগর পেরিয়ে মোহাম্মদপুরের প্রবেশদ্বারে রয়েছে একটি বিশাল তোরণ, যা ‘আসাদ গেট’ নামেই পরিচিত। ‘আসাদ গেট’ নামটি শোনেনি— এমন মানুষ বর্তমান প্রজন্মেও দুর্লভ। কিন্তু তারা কি জানেন— কে সেই আসাদ, যার নামে নামকরণ করা হয়েছে এই তোরণের? কেনই বা তার নামে দেওয়া হয়েছে তোরণটির নাম?
২.
শহিদ আসাদ শুধু একটি নাম নয়— একটি প্রেরণা, একটি সংগ্রাম এবং একটি আদর্শের নাম। তার পুরো নাম আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। জনগণের স্বাধীনতা, জাতীয় মুক্তি, গণতন্ত্র, শোষণমুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পতাকায় সে নাম উজ্জ্বলভাবে লিপিবদ্ধ।
ষাটের দশকে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসন, জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়ন এবং শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার সংগ্রামে ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে আসাদ শহিদ হওয়ার ঘটনা বাংলার সংগ্রামী মানুষের প্রাণে জাগিয়েছিল অমিত সাহস ও প্রচণ্ড শক্তি। এরপর আসাদের রক্তমাখা শার্ট হয়ে ওঠে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক।
আসাদের জন্ম ১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদী জেলার শিবপুর গ্রামে। তার জীবনের ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করে তিনি জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ও মুরারিচাঁদ কলেজে পড়ালেখা করেন। পরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) ঢাকা হল শাখার সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান সংগঠক। দরিদ্র ও ক্ষমতাহীনদের শিক্ষার অধিকারে তিনি ছিলেন আন্তরিক— শিবপুরে নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও একটি কলেজ স্থাপনে তহবিল সংগ্রহ করেন তিনি।
১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার সমাবেশ থেকে ১১ দফার বাস্তবায়ন এবং ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ ও ইপিআর বাহিনীর নির্যাতন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্রতা লঙ্ঘনের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি ২০ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘটের আহ্বান জানায়।
ধর্মঘট মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। তবু বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হয় এবং দুপুর ১২টার দিকে বটতলায় এক সংক্ষিপ্ত সভা শেষে প্রায় দশ হাজার ছাত্রের একটি বিশাল মিছিল ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে পা বাড়ায়।
মিছিলটি চানখারপুলের কাছাকাছি তৎকালীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশের হামলা শুরু হয়। প্রায় এক ঘণ্টা সংঘর্ষের পর আসাদসহ কয়েকজন ছাত্রনেতা মিছিলটিকে ঢাকা হলের পাশ দিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একজন পুলিশ কর্মকর্তা খুব কাছ থেকে রিভলভার দিয়ে গুলি করে আসাদকে হত্যা করে।
৩.
শহিদ আসাদের সঙ্গে বরেণ্য প্রয়াত বাম রাজনীতিবিদ ও লেখক কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর সুসম্পর্ক ছিল। স্মৃতিচারণে তিনি লিখেছেন— ‘আসাদ শহিদ হওয়ার কিছুদিন আগেও কৃষক আন্দোলনে পুলিশের হাতে চরমভাবে মার খেয়েছিলেন। সত্যিকার অর্থে তিনি ছিলেন অসম্ভব সাহসী ও চরিত্রবান বিপ্লবী। শহিদ আসাদের সঙ্গে আমার পরিচয় ষাটের দশকেই। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলেন, নেতৃস্থানীয় পদেও ছিলেন। আসাদ মনেপ্রাণে বিপ্লবকে ধারণ করতেন। মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী এই সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষটি একই সঙ্গে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন কৃষক সংগঠনেও সক্রিয় ছিলেন।’
শহিদ আসাদের মৃত্যুর পরই ঢাকাসহ সারা বাংলার রাজপথে প্রতিবাদী মানুষের বাঁধভাঙা জোয়ার নামে। সংঘটিত হয় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং পরে মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের পতন ঘটে।
গণতন্ত্র ও স্বদেশের মুক্তির লড়াইয়ে আসাদ ছিলেন এক সাহসী পথপ্রদর্শক এবং আন্দোলন-সংগ্রামের অনন্ত প্রেরণা। আসাদ শহিদ না হলে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান হতো না— এই উপলব্ধি থেকেই আসাদের আত্মদান স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতনের পথ প্রশস্ত করে। শহিদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট ছুঁয়ে নেওয়া শপথ গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের সংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ইতিহাসে আসাদ অবিচ্ছেদ্য, যদিও ইতিহাস থেকে অনেককে বাদ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
৪.
বর্তমান প্রজন্মকে স্বদেশ-মুক্তি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের কথা জানতে হলে আসাদকে জানতে হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতিপর্বে আসাদ এক বিরল প্রতিবাদী নাম। তার স্বপ্ন ছিল জনগণতন্ত্র, যা আজও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শহিদ আসাদ স্বাধীন, জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলার স্বপ্ন দেখতেন। বায়ান্ন থেকে ঊনসত্তর— এই সময়ে মানুষের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা আরও স্পষ্ট ও তীব্র হয়েছে; সেই ধারারই ফল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু এত বছর পর প্রশ্ন থেকেই যায়— আসাদের স্বপ্ন কি সফল হয়েছে? আসাদের স্বপ্নের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যে আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শহিদ আসাদের আত্মত্যাগ ছিল শোষণমুক্তির প্রেরণা। যতদিন শোষণ, বঞ্চনা ও নিপীড়ন থাকবে, ততদিন মৃত্যুঞ্জয়ী আসাদ মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে সাহসী পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবেন। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর অপশাসন ও ক্ষমতার লোভে গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে; এর সুযোগে প্রতিক্রিয়াশীল ও দেশবিরোধীরা বারবার ক্ষমতায় এসেছে।
৫.
মুক্তিযুদ্ধের যে স্বপ্ন এ দেশের মানুষ দেখেছিল, তা লাঞ্ছিত হয়েছে—প্রতিক্রিয়াশীলদের জয় হয়েছে। তাই মুক্তিকামী জাতি আসাদকে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করে। শহিদ আসাদ জনগণতান্ত্রিক বাংলা প্রতিষ্ঠার বার্তা বহন করেন। ধ্রুবতারার মতো তিনি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে আছেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় জীবনের এক গৌরবময় অর্জন; একুশের মতোই ঊনসত্তর বাঙালি জাতীয়তাবোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধেই সীমিত নয়। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানই প্রকৃত অর্থে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সোপান রচনা করেছিল। বায়ান্ন বাঙালিকে ঘরমুখো করেছিল, আর ঊনসত্তর তাকে তার ঘরের ঠিকানা খুঁজে দিয়েছিল। আসাদের মৃত্যুর পর স্বাধিকারের আন্দোলন সহসাই গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়— এ কারণেই আসাদ গণঅভ্যুত্থানের নায়ক।
৬.
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের ‘লৌহমানব’ আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে। প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার ও পার্লামেন্টারি শাসনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়; আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিসহ রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে সরকার বাধ্য হয়। শ্রেণিশোষণমুক্ত ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের চেতনা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
এই গতিবেগই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। আসাদ বিশ্বাস করতেন— প্রচলিত গণতন্ত্র শাসকশ্রেণির গণতন্ত্র; এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে জনগণতন্ত্র।
৭.
৫৬ বছর আগের সেই উত্তাপ না থাকলেও আত্মত্যাগ আজও অবিস্মরণীয়। সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও শহিদ আসাদ ছিলেন অনুপ্রেরণা। আজও পত্রিকায় দেখা যায়— নিজ বাড়ির বকুলতলায় ‘অবহেলিত শহিদ আসাদের কবর’।
শিবপুরে আসাদের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও তার ইতিহাস অনেকের অজানা। তাই প্রয়োজন আসাদের আত্মত্যাগকে মহিমান্বিত করা। কারণ গণতন্ত্রের ইতিহাসে শহিদ আসাদ এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, অবিস্মরণীয় একটি দিন ‘শহিদ আসাদ দিবস’। তার রক্তমাখা শার্ট আন্দোলনের দুর্বার প্রতীক— শহিদ আসাদ জনগণের মুক্তির প্রেরণা ও ঊনসত্তরের দিশারী।
আমাদের স্বাধীনতার মূল্যবোধে শপথ নিতে হবে— শহিদ আসাদসহ সব শহিদের স্বপ্ন ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার। আসাদ গেটের সংস্কার, প্রতিকৃতি সংরক্ষণ এবং জীবনসংগ্রামের তথ্য সংরক্ষণ হোক সর্বত্র। মৃত্যুর মাঝেই যারা জীবনের সন্ধান পান, তারা অমর হয়ে থাকেন। এমন এক বীর সৈনিক ছিলেন শহিদ আসাদ— নির্ভীক, স্বাধীনতাপ্রিয়, নিপীড়িত বাঙালির মুক্তির দীপ্ত আলোর পথপ্রদর্শক।
লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

২০ জানুয়ারি, শহিদ আসাদ দিবস। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে যে দিনগুলো উদ্দীপিত, আলোড়িত ও অভিভূত হওয়ার, তারই অন্যতম একটি দিন এটি। ১৯৬৯ সালে শহিদ আসাদ স্মরণে কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন কালজয়ী কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। আত্মত্যাগের ঘটনায় তিনি লিখেছেন—
‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের
জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়….
আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক—
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’
১.
২০ জানুয়ারি শহিদ আসাদের ৫৬তম মৃত্যুদিবস। স্মরণে ভুলে যেতে বসেছি কি আমরা আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের মহানায়কদের? বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার এ পথপরিক্রমায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান একটি মাইলফলক।
রাজধানী শেরেবাংলা নগর পেরিয়ে মোহাম্মদপুরের প্রবেশদ্বারে রয়েছে একটি বিশাল তোরণ, যা ‘আসাদ গেট’ নামেই পরিচিত। ‘আসাদ গেট’ নামটি শোনেনি— এমন মানুষ বর্তমান প্রজন্মেও দুর্লভ। কিন্তু তারা কি জানেন— কে সেই আসাদ, যার নামে নামকরণ করা হয়েছে এই তোরণের? কেনই বা তার নামে দেওয়া হয়েছে তোরণটির নাম?
২.
শহিদ আসাদ শুধু একটি নাম নয়— একটি প্রেরণা, একটি সংগ্রাম এবং একটি আদর্শের নাম। তার পুরো নাম আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। জনগণের স্বাধীনতা, জাতীয় মুক্তি, গণতন্ত্র, শোষণমুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পতাকায় সে নাম উজ্জ্বলভাবে লিপিবদ্ধ।
ষাটের দশকে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসন, জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়ন এবং শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার সংগ্রামে ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে আসাদ শহিদ হওয়ার ঘটনা বাংলার সংগ্রামী মানুষের প্রাণে জাগিয়েছিল অমিত সাহস ও প্রচণ্ড শক্তি। এরপর আসাদের রক্তমাখা শার্ট হয়ে ওঠে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক।
আসাদের জন্ম ১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদী জেলার শিবপুর গ্রামে। তার জীবনের ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করে তিনি জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ও মুরারিচাঁদ কলেজে পড়ালেখা করেন। পরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) ঢাকা হল শাখার সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান সংগঠক। দরিদ্র ও ক্ষমতাহীনদের শিক্ষার অধিকারে তিনি ছিলেন আন্তরিক— শিবপুরে নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও একটি কলেজ স্থাপনে তহবিল সংগ্রহ করেন তিনি।
১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার সমাবেশ থেকে ১১ দফার বাস্তবায়ন এবং ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ ও ইপিআর বাহিনীর নির্যাতন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্রতা লঙ্ঘনের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি ২০ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘটের আহ্বান জানায়।
ধর্মঘট মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। তবু বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হয় এবং দুপুর ১২টার দিকে বটতলায় এক সংক্ষিপ্ত সভা শেষে প্রায় দশ হাজার ছাত্রের একটি বিশাল মিছিল ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে পা বাড়ায়।
মিছিলটি চানখারপুলের কাছাকাছি তৎকালীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশের হামলা শুরু হয়। প্রায় এক ঘণ্টা সংঘর্ষের পর আসাদসহ কয়েকজন ছাত্রনেতা মিছিলটিকে ঢাকা হলের পাশ দিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একজন পুলিশ কর্মকর্তা খুব কাছ থেকে রিভলভার দিয়ে গুলি করে আসাদকে হত্যা করে।
৩.
শহিদ আসাদের সঙ্গে বরেণ্য প্রয়াত বাম রাজনীতিবিদ ও লেখক কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর সুসম্পর্ক ছিল। স্মৃতিচারণে তিনি লিখেছেন— ‘আসাদ শহিদ হওয়ার কিছুদিন আগেও কৃষক আন্দোলনে পুলিশের হাতে চরমভাবে মার খেয়েছিলেন। সত্যিকার অর্থে তিনি ছিলেন অসম্ভব সাহসী ও চরিত্রবান বিপ্লবী। শহিদ আসাদের সঙ্গে আমার পরিচয় ষাটের দশকেই। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলেন, নেতৃস্থানীয় পদেও ছিলেন। আসাদ মনেপ্রাণে বিপ্লবকে ধারণ করতেন। মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী এই সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষটি একই সঙ্গে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন কৃষক সংগঠনেও সক্রিয় ছিলেন।’
শহিদ আসাদের মৃত্যুর পরই ঢাকাসহ সারা বাংলার রাজপথে প্রতিবাদী মানুষের বাঁধভাঙা জোয়ার নামে। সংঘটিত হয় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং পরে মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের পতন ঘটে।
গণতন্ত্র ও স্বদেশের মুক্তির লড়াইয়ে আসাদ ছিলেন এক সাহসী পথপ্রদর্শক এবং আন্দোলন-সংগ্রামের অনন্ত প্রেরণা। আসাদ শহিদ না হলে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান হতো না— এই উপলব্ধি থেকেই আসাদের আত্মদান স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতনের পথ প্রশস্ত করে। শহিদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট ছুঁয়ে নেওয়া শপথ গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের সংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ইতিহাসে আসাদ অবিচ্ছেদ্য, যদিও ইতিহাস থেকে অনেককে বাদ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
৪.
বর্তমান প্রজন্মকে স্বদেশ-মুক্তি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের কথা জানতে হলে আসাদকে জানতে হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতিপর্বে আসাদ এক বিরল প্রতিবাদী নাম। তার স্বপ্ন ছিল জনগণতন্ত্র, যা আজও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শহিদ আসাদ স্বাধীন, জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলার স্বপ্ন দেখতেন। বায়ান্ন থেকে ঊনসত্তর— এই সময়ে মানুষের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা আরও স্পষ্ট ও তীব্র হয়েছে; সেই ধারারই ফল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু এত বছর পর প্রশ্ন থেকেই যায়— আসাদের স্বপ্ন কি সফল হয়েছে? আসাদের স্বপ্নের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যে আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শহিদ আসাদের আত্মত্যাগ ছিল শোষণমুক্তির প্রেরণা। যতদিন শোষণ, বঞ্চনা ও নিপীড়ন থাকবে, ততদিন মৃত্যুঞ্জয়ী আসাদ মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে সাহসী পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবেন। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর অপশাসন ও ক্ষমতার লোভে গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে; এর সুযোগে প্রতিক্রিয়াশীল ও দেশবিরোধীরা বারবার ক্ষমতায় এসেছে।
৫.
মুক্তিযুদ্ধের যে স্বপ্ন এ দেশের মানুষ দেখেছিল, তা লাঞ্ছিত হয়েছে—প্রতিক্রিয়াশীলদের জয় হয়েছে। তাই মুক্তিকামী জাতি আসাদকে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করে। শহিদ আসাদ জনগণতান্ত্রিক বাংলা প্রতিষ্ঠার বার্তা বহন করেন। ধ্রুবতারার মতো তিনি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে আছেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় জীবনের এক গৌরবময় অর্জন; একুশের মতোই ঊনসত্তর বাঙালি জাতীয়তাবোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধেই সীমিত নয়। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানই প্রকৃত অর্থে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সোপান রচনা করেছিল। বায়ান্ন বাঙালিকে ঘরমুখো করেছিল, আর ঊনসত্তর তাকে তার ঘরের ঠিকানা খুঁজে দিয়েছিল। আসাদের মৃত্যুর পর স্বাধিকারের আন্দোলন সহসাই গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়— এ কারণেই আসাদ গণঅভ্যুত্থানের নায়ক।
৬.
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের ‘লৌহমানব’ আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে। প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার ও পার্লামেন্টারি শাসনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়; আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিসহ রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে সরকার বাধ্য হয়। শ্রেণিশোষণমুক্ত ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের চেতনা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
এই গতিবেগই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। আসাদ বিশ্বাস করতেন— প্রচলিত গণতন্ত্র শাসকশ্রেণির গণতন্ত্র; এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে জনগণতন্ত্র।
৭.
৫৬ বছর আগের সেই উত্তাপ না থাকলেও আত্মত্যাগ আজও অবিস্মরণীয়। সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও শহিদ আসাদ ছিলেন অনুপ্রেরণা। আজও পত্রিকায় দেখা যায়— নিজ বাড়ির বকুলতলায় ‘অবহেলিত শহিদ আসাদের কবর’।
শিবপুরে আসাদের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও তার ইতিহাস অনেকের অজানা। তাই প্রয়োজন আসাদের আত্মত্যাগকে মহিমান্বিত করা। কারণ গণতন্ত্রের ইতিহাসে শহিদ আসাদ এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, অবিস্মরণীয় একটি দিন ‘শহিদ আসাদ দিবস’। তার রক্তমাখা শার্ট আন্দোলনের দুর্বার প্রতীক— শহিদ আসাদ জনগণের মুক্তির প্রেরণা ও ঊনসত্তরের দিশারী।
আমাদের স্বাধীনতার মূল্যবোধে শপথ নিতে হবে— শহিদ আসাদসহ সব শহিদের স্বপ্ন ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার। আসাদ গেটের সংস্কার, প্রতিকৃতি সংরক্ষণ এবং জীবনসংগ্রামের তথ্য সংরক্ষণ হোক সর্বত্র। মৃত্যুর মাঝেই যারা জীবনের সন্ধান পান, তারা অমর হয়ে থাকেন। এমন এক বীর সৈনিক ছিলেন শহিদ আসাদ— নির্ভীক, স্বাধীনতাপ্রিয়, নিপীড়িত বাঙালির মুক্তির দীপ্ত আলোর পথপ্রদর্শক।
লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

বাংলাদেশ নামক পুণ্যভূমিতে জন্মগ্রহণ করিলেই মানুষ অতি অল্প বয়সে দুইটি মৌলিক শিক্ষা লাভ করে। প্রথমত, লাইনে দাঁড়াইয়া কাজ আদায় একটি কাব্যিক কল্পনামাত্র; বাস্তব জীবনে ইহার কার্যকর অস্তিত্ব নাই। দ্বিতীয়ত, যন্ত্র হউক বা মানুষ— উভয়ের ক্ষেত্রেই সামান্য তৈল না ঢালিলে চাক্র ঘূর্ণায়মান হয় না। এই তৈলই হইল চাটুকা
৭ দিন আগে
২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে আরও জানানো হয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা এখন থেকে অন্য কোনো বেতনের চাকরি বা অর্থপ্রাপ্তির কাজে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। নীতিমালার ১১ নম্বর ধারা এবং ১৭ উপধারা (ক) ও (খ)-এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা আর
৮ দিন আগে
খালেদা জিয়ার সঙ্গে এ দেশের মানুষের এই বন্ধন যেন ছিল রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তার জানাজায় আসা সবাই দলীয় নেতাকর্মী ছিলেন না। অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ। কীভাবে তিনি এত এত সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিলেন, তা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। ইতিহাসের এক কালজয়ী অধ্যায়।
১০ দিন আগে
প্রশ্ন জাগে— তাদের দাবি কী? সব দাবিই কি কেবল এই ব্যবসায়ীদের? ভোক্তা বা দেশের নাগরিকদের কি কোনো দাবি থাকতে পারে না? জনগণকে জিম্মি করে এভাবে দাবি আদায়ের নামে যারা আন্দোলন করে, তারা কি আসলেই ব্যবসায়ী, নাকি লুটেরা?
১১ দিন আগে