মাথা নত করেননি বলেই তিনি হারেননি

এম ডি মাসুদ খান

ইতিহাসে জন্ম নেয় এমন কিছু মানুষ, যাদের উপস্থিতি শুধু সময়কে নয়, সমাজের বিবেককেও আলোকিত করে। খালেদা জিয়া তেমন একজন মানুষ— একজন বিপ্লবী দেশনেত্রী, যার জীবন ও সংগ্রাম রাষ্ট্রের নৈতিক মানদণ্ডের প্রতিফলন।

দেশনেত্রী খালেদা জিয়া রাজনৈতিক পরিবারে জন্মাননি। কোনো রাজবংশের উত্তরাধিকারী হিসেবেও তার আবির্ভাব ঘটেনি। তিনি উঠে এসেছিলেন গৃহস্থালির নীরবতা থেকে— সংসারের দায়িত্ব, ব্যক্তিগত শোক ও সীমাবদ্ধ জীবন অতিক্রম করে। স্বামীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আকস্মিকভাবে তার কাঁধে এসে পড়েছিল, কিন্তু তিনি তা দায়িত্বে রূপান্তর করেছিলেন। যে নারী একদিন ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন, সময়ের নির্মম বাস্তবতায় তিনিই হয়ে উঠেছিলেন রাষ্ট্রের বিবেকের কণ্ঠস্বর।

রাজনীতি তার কাছে পেশা ছিল না, ছিল আত্মত্যাগের পথ। তিনি দেখিয়েছেন— নারীর শক্তি স্লোগানে নয়, সংকটে প্রকাশ পায়। ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, বরং প্রতিকূলতাই তাকে গড়ে তুলেছে একজন দেশনেত্রী হিসেবে। তাকে বলা হয় গণতন্ত্রের মা— ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়ে আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রচিন্তার বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়ার কারণে।

দীর্ঘ কারাবরণ, ব্যক্তিগত শোক ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি কখনো স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে সমঝোতায় যাননি। এই অনড় অবস্থানই তাকে একজন রাজনীতিকের সীমা ছাড়িয়ে গণতন্ত্রের নৈতিক অভিভাবক হিসেবে পরিচিত করেছে।

ইতিহাস সবসময় ন্যায়বান হয় না, কিন্তু ইতিহাস কিছুই ভুলে যায় না। সময়ের প্রবাহে অনেক কণ্ঠ হারিয়ে যায়, অনেক সত্য চাপা পড়ে। তবু ইতিহাস একদিন প্রশ্ন তোলে— আমরা কাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম, আর কাদের নীরবতায় ছেড়ে দিয়েছিলাম?

বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্থান সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

তিনি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মাথা নত না করা একটি রাজনৈতিক অবস্থান। যে সময়ে আপস হয়ে উঠেছিল নিরাপদ, সে সময়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ঝুঁকি। যে সময়ে নীরবতা সুবিধাজনক হয়ে উঠেছিল, সে সময়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অস্বস্তিকর সত্যের উচ্চারণ।

ব্যক্তিগত জীবনের গভীর ট্র্যাজেডি— স্বামী হারানোর বেদনা, দীর্ঘ কারাবরণ, শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক চাপ— কোনোটিই তাকে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য করতে পারেনি।

রাজনীতি তার কাছে ক্ষমতায় থাকার কৌশল ছিল না, ছিল আদর্শ ও অবস্থানের প্রশ্ন। যখন গণতন্ত্র ক্রমে একটি আনুষ্ঠানিক শব্দে পরিণত হচ্ছিল, যখন ভোটাধিকার কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছিল, যখন রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত আনুগত্যে রূপ নিচ্ছিল, তখন তিনি উচ্চারণ করেছিলেন একটি মৌলিক সত্য— ‘এই দেশ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।’

কারাগার তাকে দমাতে পারেনি। অসুস্থতা তাকে ভাঙতে পারেনি। রাষ্ট্রযন্ত্রের বহুমাত্রিক চাপও তাকে নত করতে পারেনি। কারণ তিনি জানতেন— ইতিহাস ক্ষমতাবানকে নয়, অবিচল মানুষকেই স্মরণ করে। তিনি রাজনীতি করেছেন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নয়, বরং একটি অবস্থান ধরে রাখার জন্য। সেই অবস্থান ছিল গণতন্ত্রের, সার্বভৌমত্বের এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের পক্ষে।

আজ তার মৃত্যু নিছক ব্যক্তিগত শোক নয়, এটি একটি রাজনৈতিক শূন্যতার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে— এই আপসহীন কণ্ঠ কে বহন করবে? এই দৃঢ়তা কে ধারণ করবে? এই সাহস কে উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করবে? খালেদা জিয়া চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন একটি অস্বস্তিকর সত্য— ক্ষমতায় যাওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব, কিন্তু ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সবার পক্ষে নয়।

আজ তার স্মরণ মানে কেবল চোখের জল নয়, বরং মাথা উঁচু করে প্রশ্ন তোলা। তার জীবন আমাদের শিখিয়েছে— রাজনীতি যদি প্রতিবাদ না হয়, তবে তা কেবল ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ইতিহাস শুধু জালিমকে নয়, জালিমের নীরব সহযোগীদেরও চিহ্নিত করে। এই সত্য সবচেয়ে নির্মমভাবে সামনে আসে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে।

যখন তিনি জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছিলেন, গুরুতর অসুস্থ শরীর নিয়ে একাকী লড়াই করছিলেন, তখন একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্যত রাষ্ট্রীয় উদাসীনতায় ঠিকানাহীন হয়ে পড়েছিলেন। সেই দৃশ্য ছিল শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, তা ছিল মানবিকতার প্রকাশ্য অবমাননা। কারাগারের দেয়ালে দেয়ালে একজন নারীর অসহায় দীর্ঘশ্বাস আটকে যাচ্ছিল।

আর তখন প্রশ্ন জাগে— আমরা কী করেছি? আমরা কি রাজপথ কাঁপাতে পেরেছি? আমরা কি বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পেরেছি? নাকি নীরব থেকেছি, আর সেই নীরবতাই হয়ে উঠেছে নিপীড়নের সবচেয়ে শক্তিশালী সহচর?

আজ প্রশ্নটা তাকে নিয়ে নয়, প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের নিয়ে। আমরা কি তার আদর্শ ধারণ করতে পারিনি, নাকি করতে চাইনি? আমরা কি ভয় পেয়েছিলাম, নাকি সুবিধাকে বেছে নিয়েছিলাম? ইতিহাস বলে— সবাই নির্যাতন করে না, কিন্তু অনেকেই তা ঘটতে দেয়।

বেগম খালেদা জিয়া একা লড়েছেন, কিন্তু একা হারেননি। তিনি হারেননি, কারণ তিনি মাথা নত করেননি। তিনি প্রমাণ করে গেছেন— একজন মানুষ বন্দি হতে পারেন, কিন্তু আদর্শ কখনো বন্দি করা যায় না। আজ তার চলে যাওয়া আমাদের চোখ ভিজিয়ে দেয়, কিন্তু তার জীবন আমাদের বিবেক জাগিয়ে তোলে।

এই স্মরণ যদি কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আমরা আবারও ব্যর্থ হব। আর যদি এই স্মরণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে, তবে হয়তো তার সংগ্রাম বৃথা যাবে না।

আমরা কি এবার পারব—ভয় নয়, আদর্শ বেছে নিতে?

নীরবতা নয়, অবস্থান নিতে?

আপস নয়, প্রতিবাদ করতে?

একটি মহাকাব্যের পরিসমাপ্তি হয়েছে, কিন্তু তার লড়াই এখনো অসমাপ্ত।

লেখক: ব‍্যবসায়ী

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

লক্ষাধিক কর্মীর কাঠামো, বিপুল অর্থের নির্বাচন

এভাবেই লাখ লাখ ভোটারকে একত্রিত করতে সক্ষম একটি নির্বাচন দলীয় কর্মী বাহিনীর একত্রিতকরণের একটি অপারেশনে পরিণত হয়। ফলে শুধু ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনাতেই কয়েক লাখ সংগঠিত কর্মী মাঠে নামাতে হয়। এই মানুষগুলো স্বেচ্ছাসেবী নন, তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয় অর্থ, প্রভাব ও সুবিধার আশ্বাস দিয়ে।

৬ দিন আগে

বিকৃত ইতিহাস, অনুর্বর জাতি, অসুস্থ মস্তিষ্ক

বিপরীতভাবে, ইতিহাস যখন বিকৃত হয়— ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা অবহেলার কারণে— তখন একটি জাতি ধীরে ধীরে তার শেকড় হারাতে শুরু করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস বিকৃতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই একটি গভীর ও বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে বিদ্যমান।

৭ দিন আগে

অমর একুশের বইমেলা: সত্যিই কি প্রাণের কথা বলে?

অর্থাৎ এ পর্যন্ত তিনবার ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে; এবারেরটি হবে চতুর্থ। তবে নির্বাচনের কারণে বইমেলা কখনো বন্ধ থাকেনি। ১৯৭৯ সালে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলা চলেছে। ১৯৯১ সালেও মেলা চলেছে পুরো ফেব্রুয়ারি জুড়ে। ১৯৯৬ সালেও একই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। ১৯৭৯ সালের মেলাটি কিছুটা ব্যতিক

৮ দিন আগে

আমরা সবাই গাধা…

যতদিন শাসনব্যবস্থা মানুষকে রাজকীয় যন্ত্রের বিনিময়যোগ্য যন্ত্রাংশ হিসেবে গণ্য করবে, ততদিন এ দেশ বহু রাজার, শোষিত প্রজার দেশ হয়েই থাকবে— আর নাগরিকরা চিরকালই গলা মিলিয়ে গান গাইতে বাধ্য হবে— আমরা সবাই গাধা…

১০ দিন আগে