নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জিং বাজেট

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পূর্ব সরকারের শেষের দিকে দেশের অর্থনীতি বেশ নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। ব্যাংক খাতে লুটপাট, খেলাপি ঋণের আধিক্য, অর্থ পাচার, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, টাকার অবমূল্যায়ন, বিনিয়োগ স্থবিরতা ইত্যাদির সাথে যুক্ত হয় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাভাব। উপরন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের গণআন্দোলনকালীন স্থবিরতা ও ক্ষয়ক্ষতি দেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনারে দাঁড় করায়। মূল্যস্ফীতি প্রায় ১১ শতাংশে উঠে যায়।

এ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করে। ওই সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর দেশের অর্থনীতিকে সঠিক পথে পরিচালনা করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন, যা নিম্নগামী হয়ে ৮-৯ শতাংশে স্থির থাকে। ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধানে কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তবে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আমদানি-রপ্তানির গতি বৃদ্ধি না হওয়ায় পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। অর্থনীতির গতি পরিবর্তনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের ঐকান্তিক চেষ্টা সত্ত্বেও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি তথা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্রমোর্ধ্বগতি ছাড়া আর কোনো সূচকে বিশেষ উন্নতি হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া এবং আস্থার সংকট না কাটার ফলে বিনিয়োগ পরিস্থিতির অবনতি হয়, বহু সংখ্যক কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ে।

এ পরিস্থিতিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি। ২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এ সরকারের বয়স হয়েছে মাত্র ৩ মাস। স্বল্প সময়ের কার্যকালের মধ্যেই বার্ষিক বাজেট প্রস্তুতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করতে হচ্ছে। তবে বাজেট প্রস্তুতের জন্য অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছে।

বাজেটের মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য, অর্থনৈতিক নীতিকাঠামো এবং অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়। এবার এমন এক সময়ে বাজেট প্রণীত হচ্ছে, যখন মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে, রাজস্ব সংগ্রহ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে, এ পর্যন্ত রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। সরকারের অভ্যন্তরীণ এবং বহিঃস্থ উভয় ঋণ লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে; অর্থাৎ বলতে গেলে সরকার চলছেই ঋণের ওপর।

বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি সংকুচিত, অনেকগুলো শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ায় অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়েছে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থায় দুরবস্থা, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বৈশ্বিক অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা, বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ও রপ্তানিতে নিম্নগতি এবং সর্বোপরি দেশে ক্রমাগত দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি। দারিদ্র্যের হার ২০২৪-এ ছিল শতকরা ২০ ভাগ, যা বর্তমানে প্রায় ৩০ ভাগ। এ পরিস্থিতিতে সবদিক সামাল দিয়ে বাজেট প্রণয়ন খুবই চ্যালেঞ্জিং। সরকারি অর্থের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সরকার সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রণয়নের দিকেই এগোচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এবারের বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে বিগত বছরের বাজেটের তুলনায় এটি প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়বে। এডিপির আকার হতে পারে ৩ লাখ কোটি টাকার ওপর, যা বিগত বছরের তুলনায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি হবে। তবে এডিপিতে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ থাকবে। বাজেটের আরেকটি অগ্রাধিকার খাত হবে সামাজিক সুরক্ষা বা সোশ্যাল সেফটিনেট খাত। এ খাতে অর্থবৃদ্ধির কারণ হলো— চালু সুরক্ষা সুবিধার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন ‘কার্ড’ বিতরণ। বিগত বছরগুলোতেও শিক্ষা-স্বাস্থ্য, পরিবহন ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দের প্রাধান্য দেখা গিয়েছে।

শিক্ষা খাতের বরাদ্দের একটি বিরাট অংশ চলে যায় বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন ও পেনশন প্রদানে এবং উন্নয়ন বরাদ্দ অবকাঠামো নির্মাণে। শিক্ষা খাতের বরাদ্দ দিয়ে যদি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন সম্ভব না হয়, তবে বরাদ্দ বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। সেজন্য শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন, নিয়মানুবর্তিতা ও কারিকুলাম যুগোপযোগীকরণের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় আগ্রহ সৃষ্টি এবং ঝরে পড়া রোধকল্পে যা যা করণীয় তা-ই করতে হবে।

স্বাস্থ্যখাতের বাজেট থেকে অতীতে বিভিন্ন হাসপাতালে মেশিনারি ক্রয় করা হলেও অনেক মেশিন ব্যবহারোপযোগীই হয়নি। তাছাড়া সরকারি হাসপাতালে রোগীদের জন্য খাবার ও ওষুধ সরবরাহের অর্থ অপচয়ের কথাও শোনা যায়। এডিপির বড় বাজেট যদি দক্ষতার সাথে ব্যয় করা যায় তাহলে জনমানুষের উপকার হবে, কর্মসংস্থান হবে, রাজস্ব বাড়বে। তবে বিগত কয়েক বছর এডিপির বাস্তবায়ন সুখকর ছিল না। চলতি বছরের ৯ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন মাত্র ৩৬.১৯ শতাংশ। সেজন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দই বড় কথা নয়, দক্ষতার সাথে সঠিকভাবে ব্যয় করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

বাজেট প্রণয়নে অর্থায়নের বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এবারের (২০২৬-২৭) বাজেটে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ ধরা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরকে সংগ্রহ করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত টার্গেট ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৮৪৮ কোটি। অর্থবছর শেষে আদায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার মতো হতে পারে। এনবিআরের বর্তমান নীতি-পদ্ধতি, সামর্থ্য, নেতৃত্ব ইত্যাদির মাধ্যমে ২০২৬-২৭ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। এ লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতে সরকারের উচ্চাভিলাষী বাজেট শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ অতিমাত্রায় বৃদ্ধি করবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক হবে না। আমাদের দেশে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ শতাংশ সহনীয়। অনুমান করা যাচ্ছে যে ২০২৬-২৭ সালে বাজেটে ঘাটতি ৫ শতাংশ অতিক্রম করতে পারে।

এ আলোচনার উদ্দেশ্য এই নয় যে, সরকার আরও সংকোচনমূলক বাজেট প্রণয়ন করুক। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ কীভাবে বাড়ানো যায় সেদিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এনবিআরের জনবল বৃদ্ধির পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের, যা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। জেলা পর্যায়ে রাজস্ব অফিস স্থাপন এখন সময়ের দাবি। এনবিআরের সবচেয়ে অগ্রাধিকার কাজ হবে করজাল বৃদ্ধি করা। জনবল ও অফিস সংখ্যা বৃদ্ধি করে নিবিড় জরিপের মাধ্যমে করদাতা সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। বর্তমানে টিআইএনধারী লোকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের মতো হলেও আয়কর রিটার্ন জমা পড়ে ৫০ লাখের নিচে। দেশে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত সকল ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের করের আওতায় আনতে হবে।

করের আওতা বৃদ্ধি, আদায় নিশ্চিতকরণ ও কর ফাঁকি রোধে কর কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব ও সততা অতীব প্রয়োজনীয়। এক্ষেত্রে এনবিআরের দুর্বলতা রয়েছে। বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যথাযথ আয়কর ও ভ্যাট প্রদান করে না। এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের এদের সাথে যোগসাজশ রয়েছে। ভ্যাট অটোমেশন প্রক্রিয়া চালু হলেও এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য বারবার হোঁচট খাচ্ছে। বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর খরচ ও বিক্রয় শতভাগ অটোমেশনের আওতায় আনা নিশ্চিত করতে হবে, যা প্রশিক্ষিত জনবলের মাধ্যমে এনবিআর তদারক করবে।

অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের বেশকিছু চেইন সুপার মার্কেট, রেস্টুরেন্ট ও বেকারিতে যথানিয়মে স্বয়ংক্রিয় ক্যাশমেমো প্রদান করা হয়, যাতে ভ্যাট কর্তনের পরিমাণ উল্লেখ থাকে। কিন্তু বহু খুচরা ও পাইকারি দোকান, মিষ্টির দোকান, রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি নগদ বেচাকেনায় ক্যাশমেমো প্রদান করে না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের টার্নওভারের ওপর আদায়কৃত ভ্যাট কখনো সঠিকভাবে আদায় করতে দেখা যায় না। আবার যারা নিয়মিত আয়কর ও ভ্যাট দিয়ে যাচ্ছেন, তাদেরকেই আরও বেশি ট্যাক্স প্রদানের জন্য হয়রানির অভিযোগ শোনা যায়। এনবিআরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের পাহাড়সম অভিযোগ, যার সবগুলো সঠিক না হলেও অনেক অভিযোগই সঠিক। এমতাবস্থায় এনবিআরের নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের কৌশলী, পেশাদার, সৎ এবং মানবসম্পদ পরিচালনায় দক্ষ হতে হবে। একদিকে অধীনস্থদের যেমন কঠোর শাসনে রাখতে হবে, অন্যদিকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মানবিক গুণসম্পন্ন হতে হবে।

এডিপি বরাদ্দের ক্ষেত্রে পূর্বের চালু প্রকল্পে বরাদ্দ প্রদান জরুরি। অর্ধসমাপ্ত প্রকল্প ফেলে রাখলে একদিকে যেমন সম্পদের অপচয় হয়, অন্যদিকে প্রকল্প সমাপ্ত হলে দেশ ও জনগণ যে সুবিধা পেত তা থেকে বঞ্চিত হয়। উন্নয়ন প্রকল্প ঠিকমতো চালু থাকলে কর্মসংস্থান, রাজস্ব ও জিডিপি বৃদ্ধি পায়।

বাজেট প্রণয়নে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নজর দিতে হবে, যা হলো বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এডিপিতে বরাদ্দ বাড়িয়ে এবং তা যথাযথ ব্যয় করে পাবলিক সেক্টরে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায়। বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য সরকারকে পরিবেশ তৈরি করতে হবে, নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে, ব্যাংক ঋণ সহজ করতে হবে, সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে, প্রয়োজনে ব্যবসায়ীদের আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করতে হবে, শিল্পায়ন বৃদ্ধির জন্য কোনো কোনো সেক্টরে আমদানি শুল্ক রেয়াত বা কর কমিয়ে দিতে হবে। ব্যবসা ভালো হলে, বিনিয়োগ বাড়লে রাজস্ব আপনা আপনিই বাড়বে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ মোট জিডিপির ২২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বেসরকারি বিনিয়োগ গতিশীল না হলে প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ শতাংশ হতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ কমপক্ষে জিডিপির ২৮-২৯ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক কারণে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হলে বা শিল্পকারখানা বন্ধ থাকলে বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়, বহু কর্মী বেকার হয়ে পড়ে।

ব্যাংক ব্যবস্থার দুর্বলতাও বেসরকারি বিনিয়োগ কম হওয়ার অন্যতম কারণ। বর্তমানে ব্যাংক ব্যবস্থার খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার উপরে। এত বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে বেশ কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট রয়েছে। আবার অনেক ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীর নতুন ঋণ না পাওয়ায় ব্যবসা চালাতে পারছেন না। বড় বাজেট করে সরকার ব্যাংক থেকে বেশি বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ পাবেন না।

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অনেকটা উচ্চাভিলাষী হবে বলে মনে হচ্ছে। বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশ অতিক্রম করতে পারে। এ বিশাল ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস হতে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ আশানুরূপ না হলে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়বে। প্রস্তাবিত বাজেটে ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সরকারের সংগৃহীত অর্থের একটি বিশাল অংশ চলে যাবে ঋণের দায় মেটাতে।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সরকার বিদেশি বহুজাতিক সংস্থা ও দেশ থেকে সহজ শর্তে যে ঋণের প্রত্যাশা করে, তা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। চলতি অর্থবছরে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বিদেশি ঋণ সহায়তা আশানুরূপ না পাওয়া গেলে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাবে। এমতাবস্থায় দেশের মুদ্রা সরবরাহে চাপ পড়বে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এ আলোচনা সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার ৫ লাখ কর্মসংস্থান, ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে চায়। দুর্নীতি ও অপচয় পরিহার, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও এনবিআরের সম্পদ সংগ্রহে গতি সঞ্চারের মাধ্যমে বাজেটের লক্ষ্য অর্জিত হলে অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। জনমানুষের এটিই প্রত্যাশা।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

বাংলাদেশ-ভারতের স্বার্থে ফারাক্কা ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন

ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৫২ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতীয় রাজনীতিবিদরা যখন এটি ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন, তখন ফারাক্কা বাঁধ যে কতটা ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারও বাকি থাকার কথা নয়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের এই দাবির প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধের অপ্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

৫ দিন আগে

ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ায় জলসম্পদের ভূরাজনীতি

এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ বাংলাদেশ। কারণ দেশের ৮০ শতাংশের বেশি নদীপ্রবাহ আন্তঃরাষ্ট্রীয় উৎস থেকে আসে। কৃষি উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে মৌসুমি পানির ওপর নির্ভরশীল। নদীভাঙন ও লবণাক্ততা এরই মধ্যে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রবাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

৬ দিন আগে

ভিক্ষাবৃত্তির বিস্তার ও আমাদের দায়

ঘটনাটি শুনতে কঠোর, এমনকি কিছুটা অমানবিকও মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভেতরে একটি গভীর সামাজিক বার্তা রয়েছে— অনেক উন্নত সমাজে ভিক্ষাবৃত্তিকে শুধু দারিদ্র্যের বিষয় হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি কর্মসংস্কৃতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করা হয়।

৭ দিন আগে

ডিসি সম্মেলন: রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে চাই পেশাদারত্ব

বর্তমান বাস্তবতায় জনপ্রশাসনকে আরও গণমুখী করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে ক্ষমতায়িত করার আলোচনা বহুদিনের। এখনো অনেক ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তির শিকার হন।

৮ দিন আগে