‘চাপের মধ্যে নেই’, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার প্রত্যয় দুদক চেয়ারম্যানের

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
দুদকের প্রথম কার্যদিবসে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নতুন চেয়ারম্যান এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং দুই কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম খান ও সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। ছবি: সংগৃহীত

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নতুন কমিশনের যাত্রা শুরু হয়েছে। নতুন চেয়ারম্যান এ কে এম আসাদুজ্জামান বলেছেন, তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করবেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, নতুন কমিশন কাজ শুরু করলেও কোনো ‘চাপের মধ্যে নেই’।

বুধবার (১৯ আগস্ট) ১৬৬ দিন নেতৃত্বশূন্য থাকার পর আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এই বিচারপতির নেতৃত্বে নতুন কমিশনের যাত্রা শুরু হয়। চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান এবং দুই কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম খান ও সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া সকালে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে যান।

সকাল ১০টা থেকে তারা দুদকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দুদকের নতুন চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘আপনাদেরকে অনেক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আজকে আমাদের প্রথম কার্যদিবস ছিল দুদকে। আমরা কাজ শুরু করেছি। আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’

আসাদুজ্জামান আরও বলেন, ‘আমরা যেন মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করে, প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের জন্য কাজ করতে পারি। দুদকের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে পারি। দেশ থেকে দুর্নীতি মুক্ত করার যথোপযুক্ত চেষ্টা করতে পারি। আমাদের জন্য আপনারা দোয়া করবেন। আমরা কাজ করা শুরু করে দিয়েছি, ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে ভালো ফলাফল আমরা নিয়ে আসতে পারব বলে আমাদের প্রত্যাশা আছে। থ্যাংক ইউ সো মাচ।’

রাজনৈতিক সরকারের সময়ে দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি বলে সমালোচনা রয়েছে। নতুন কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমরা কোনো চাপের মধ্যে নেই। আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করছি।’

নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে তার নিয়োগ নিয়ে যে বিতর্ক ও প্রশ্ন রয়েছে, সে বিষয়েও সাংবাদিকরা জানতে চান। জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, তদবির বা বিশেষ যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি দুদকের চেয়ারম্যান হননি। নিয়োগ নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলেছেন, তাদেরও ব্যর্থতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আগের কমিশনের শুরু করা অনুসন্ধান ও মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন চেয়ারম্যানকে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকে জমা পড়া অভিযোগের বিষয়ে নতুন কমিশনের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়।

জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, “আমাদের সামনে এখনো ওইরকম কোনো ফাইল আসে নাই। আমরা বসছি কেবল। আসুক, আমরা যা করব আপনারা নিজেরাই দেখতে পাবেন। এসব নিয়ে ‘ইন অ্যাডভান্স’ আমরা কথা বলতে চাই না। আমরা এক কথা বললাম, কাজ করতে পারলাম না, পরবর্তীতে আপনারাই তো প্রশ্ন তুলবেন।”

তবে দায়িত্বের শুরুতেই দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করতে যথোপযুক্ত চেষ্টা করার কথা বলেন দুদকের নতুন চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘অতএব, দয়া করে আমাদের সুযোগ করে দিন। আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করছি। আমাদের সামনে কোনো সমস্যা আসুক, আমরা সমাধান অত্যন্ত সুন্দরভাবে করতে পারব।’

শেখ হাসিনাসহ আগের সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান, মামলা এবং অভিযোগপত্র দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা মামলাগুলো নিয়েও নতুন কমিশনকে প্রশ্ন করা হয়। দুদকের মামলার যেসব আসামি দেশের বাইরে আছেন, তাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নতুন কমিশন কী করবে, তাও জানতে চান সাংবাদিকরা।

জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমার সামনে এখন পর্যন্ত কোনো ফাইল এখনো আসে নাই। আমরা বসছি। বসলে কী হচ্ছে আপনারা আমাদের প্রেস উইং থেকে সমস্ত তথ্যই জানতে পারবেন।’ অর্থ পাচার ঠেকানো এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কমিশনের পরিকল্পনা জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্ল্যান নিয়ে তো কাজ করতে হবে। পাচারকারী নিয়ে আমরা তো বসি নাই এখনো। আমরা বসি, আমরা জানাব।’

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের করণীয় কী এবং তাদের সম্পৃক্ত করতে কমিশন কোনো উদ্যোগ নেবে কি না, এমন প্রশ্নও করা হয় দুদক চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামানকে। জবাবে তিনি বলেন, “জনগণের করণীয় কিচ্ছু না, জনগণের ‘ওয়েট’ করা। আমরা কী করছি তা দেখা। ইনশাআল্লাহ জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে, হতাশ হবে না।”

দুই কমিশনার যা বললেন

চেয়ারম্যানের পর দুই কমিশনারও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, “আমি চেয়ারম্যান স্যারের বক্তব্যকে সমর্থন করে এক বাক্যে বলব, আপনারা দেখবেন ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়’।”

কমিশনার সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার কাছে অর্থ পাচার ও আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে কমিশনের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন যে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, চেয়ারম্যান সাহেবের নেতৃত্বে প্রতিটি বিষয় আমরা নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নেব। আপনারা দেখতে পাবেন।’

১৬৬ দিন নেতৃত্বশূন্য ছিল দুদক

দুদকের আগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদ গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করেন। সে দিনই রাষ্ট্রপতি তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। এরপর ৪ মার্চ থেকে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদ শূন্য ছিল।

দীর্ঘ সময় কমিশন না থাকায় নতুন অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত, মামলা দায়ের, তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্র অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আটকে ছিল। সম্পদ জব্দ এবং বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো সিদ্ধান্তও কমিশনের অনুমোদন ছাড়া এগোয়নি।

নতুন কমিশন গঠনের জন্য গত ২২ জুন পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করে সরকার। আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বে ওই কমিটি চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদের জন্য নাম সুপারিশ করে।

এরপর আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে চেয়ারম্যান এবং সাবেক সচিব জাহাঙ্গীর আলম খান ও ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগ দেন। বুধবার দুদকে প্রথম কার্যদিবস শুরু করেন। দুদক আইন অনুযায়ী, যোগ দেওয়ার দিন থেকে চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করবেন।

নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পরিচয়

আসাদুজ্জামান ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ থেকে অবসরে যান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর ১৯৮৩ সালে জেলা আদালতে আইন পেশা শুরু করেন তিনি।

১৯৮৫ সালে হাইকোর্টে এবং ২০০১ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট তিনি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হন। ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন আসাদুজ্জামান।

কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম খান বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮৫ ব্যাচের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

১৯৬৩ সালের ৬ জুলাই মানিকগঞ্জে তার জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন তিনি। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে পিএইচডি করেন।

১৯৮৮ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন জাহাঙ্গীর আলম খান। কর্মজীবনে ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকরির পাশাপাশি ২০১০ সাল থেকে দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন তিনি।

দুদকে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে আইনের অধ্যাপক ছিলেন। আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রকল্পে আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবেও কাজ করেছেন।

অপর কমিশনার মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য। তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন।

১৯৬৩ সালের ১৫ অক্টোবর কুমিল্লায় তার জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্সে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান তিনি।

কর্মজীবনের শুরুতে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ ও এবি ব্যাংকে কাজ করেন সাজ্জাদ হোসেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে প্রভাষক ছিলেন তিনি।

পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগ এবং আইবিএতে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। ফিন্যান্স, বাণিজ্য, একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ, সম্পদ ও দায় মূল্যায়ন, অর্থ পাচার, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

স্মার্টফোন, নকল ও আপত্তিকর লেখা: ৭ বিসিএস প্রার্থীর শাস্তি

বুধবার (১৯ আগস্ট) পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) মাসুমা আফরীনের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

২ ঘণ্টা আগে

স্বামীর শেষকৃত্যে অংশ নিতে প্যারোলে মুক্তি পাচ্ছেন দীপু মনি

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তাকে প্যারোলে মুক্তির অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রেজাউল করিম।

৪ ঘণ্টা আগে

কলকাতায় আগুনে নিহত ৫ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

ভারতের কলকাতায় একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত করেছে স্থানীয় পুলিশ। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে চারজন একই পরিবারের সদস্য।

৫ ঘণ্টা আগে

চট্টগ্রামের ৭ জেলায় বন্যা-ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত ১৩ লাখ মানুষ

মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) প্রকাশিত ইউএনএফপিএর পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বন্যার ভয়াবহতার এই চিত্র উঠে এসেছে।

৫ ঘণ্টা আগে