৫ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ সরকারের

দেশের প্রান্তিক মানুষের কাছে ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিতে নেটওয়ার্ক উন্নয়নের পাশাপাশি সাশ্রয়ী স্মার্টফোনের ব্যবস্থা করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে দেশে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা।
রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হওয়া ‘বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬’ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। হুয়াওয়ের অংশীদারত্বে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনে বাংলাদেশের সংযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্ম সচিব সাইদা আফরোজ।
অনুষ্ঠানে বক্তব্যে আইসিটি সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, “বিসিজির (বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ) এক গবেষণা বা জরিপ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হবে। তাই আমরা কী করছি?”
তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে বাংলাদেশে একটি ফিচার ফোনের সর্বনিম্ন দাম প্রায় ৯৯৯ টাকা এবং একটি স্মার্টফোনের সর্বনিম্ন দাম প্রায় ১০,০০০ টাকার কাছাকাছি। তাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগসহ সামগ্রিকভাবে সরকার দেশে স্বল্পমূল্যের স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে, যার দাম হবে আনুমানিক ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে।”
আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে এআই নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার কথা জানান মামুনুর রশীদ ভূঞা।
ডিজিটাল রূপান্তরে তিন অগ্রাধিকার
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ডিজিটাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তিনটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “সেবা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আওতায় আনতে নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও উচ্চমানের ব্রডব্যান্ড এবং টেলিকম অবকাঠামো গড়ে তোলা, কেবল সংযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে শিল্পখাতের দক্ষতা, সাপ্লাই চেইন, গ্রাহক সেবা ও নাগরিক সেবার মান বাড়াতে বাস্তবমুখী ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োগ করতে হবে।”
এআইয়ের সুফল কাজে লাগাতে পর্যাপ্ত কম্পিউটিং ও ডেটা সক্ষমতা তৈরি, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং গবেষণার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে অর্থনৈতিক সক্ষমতা সরাসরি প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। উচ্চমানের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, তরুণ প্রজন্মকে ক্ষমতায়ন এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রযুক্তিকে উন্নয়নের প্রধান অনুঘটক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।”
ডিজিটাল রূপান্তরে ৪ মূলনীতি
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল সক্ষমতায় বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় ১০ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে। ইন্টারনেটের আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং এর কার্যকর ব্যবহারের মধ্যকার ব্যবধান চলতি দশকের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিজিটাল রূপান্তরে সরকারের পরিকল্পনার চারটি মূলনীতি তুলে ধরে তিনি বলেন, এককভাবে সরকারের পক্ষে এ রূপান্তর সম্ভব নয়। সরকারের দায়িত্ব পূর্বাভাসযোগ্য নীতিমালা, স্বচ্ছ অনুমোদনব্যবস্থা ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, শিল্পখাতের দায়িত্ব উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে মানসম্মত সেবা পৌঁছে দেওয়া।
প্রথম মূলনীতি হলো, সংযোগ হতে হবে অর্থবহ। শুধু নেটওয়ার্কের সংকেত থাকলেই হবে না; নাগরিকদের জন্য সাশ্রয়ী ডিভাইস ও ব্যবহার উপযোগী ডেটা প্যাকেজ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় চাহিদা ও বাংলা ভাষার উপযোগী সেবাও পৌঁছে দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নেটওয়ার্ক হতে হবে নির্ভরযোগ্য। এ জন্য আরও বেশি টাওয়ারকে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের আওতায় আনা, ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত সক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং বরাদ্দ করা স্পেকট্রামের দক্ষ ব্যবহার প্রয়োজন। ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই রাউটার, নিরবচ্ছিন্ন ব্যাকআপ বিদ্যুৎ এবং দ্রুত সেবা পুনরুদ্ধারে সক্ষম প্রশিক্ষিত জরুরি দল রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তৃতীয় মূলনীতি হলো, প্রযুক্তিতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ। স্ট্যান্ডঅ্যালোন ফাইভজি, নতুন ক্যাপাসিটি ব্যান্ড কিংবা ভবিষ্যতের সিক্সজি—প্রতিটি প্রযুক্তি চালুর সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাস্তব চাহিদা, নীতিমালা ও ব্যাকহল সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে। মানুষের প্রয়োজন মেটাতে যৌক্তিক ব্যয়ে যে প্রযুক্তি কার্যকর হবে, সেটিই গ্রহণ করা উচিত বলে জানান সচিব।
চতুর্থত, প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে আস্থার ভিত্তিতে। সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং এআইয়ের জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত না হলে উন্নত ডিজিটাল সেবাও মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে হুয়াওয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট জেসন উ বলেন, “বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে হুয়াওয়ে সরকার এবং শিল্পখাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংযোগব্যবস্থা, ক্লাউড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিতে আমাদের সক্ষমতার মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়াতে, নতুন সেবা উদ্ভাবনে এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী ডিজিটাল প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে আমরা কাজ করতে চাই।”

-7c8745.jpg)













