সৌদিতে ‘৩ বছর কারাগারে’, না জানিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ক্ষোভ নজরুলের পরিবারের

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৯: ০৫
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা পরিবারকে কিছুই জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন নজরুলের বাবা-মা। (ইনসেটে) নজরুল ইসলাম। ছবি: রাজনীতি ডটকম
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা পরিবারকে কিছুই জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন নজরুলের বাবা-মা। (ইনসেটে) নজরুল ইসলাম। ছবি: রাজনীতি ডটকম

সৌদি আরবে ‘তিন বছরের বেশি সময়’ কারাগারে আটক রাখার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ নজরুল ইসলামের। গত ১৪ অক্টোবর মক্কায় তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারে নজরুলের পরিবার। দণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি বলে অভিযোগ স্বজনদের।

নজরুল ইসলাম আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিল কি না এবং বাংলাদেশ কনস্যুলেট তার খোঁজ নিয়েছিল কি না— এসব প্রশ্ন তুলেছে পরিবারের সদস্যরা। তার মৃত্যুর খবর মেনে নিতে পারছেন না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিরামপুর গ্রামে বসবাস করা বাবা-মা, পরিবারে চলছে শোকের মাতম। শোকে মারা গেছেন হৃদরোগে আক্রান্ত ফুফু আবেদা বেগমও।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড সম্প্রতি কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)। নজরুল ইসলামের সঙ্গে অন্য যে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তার নাম সুইটি আখতার। তার বিস্তারিত পরিচয় এখনো জানা যায়নি।

এদিকে নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বাংলাদেশ সরকার। ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে কেন জানানো হয়নি, তা জানতে চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, সৌদি আদালতের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ ঠিক করা হবে।

তিন বছরের বেশি সময় কারাগারে, শেষ ফোন রোববার

নজরুল ইসলাম ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের আবদুল বাছির ও রেহেনা বেগম দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে সবার বড়। এসএসসি পাসের পর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে ২০২২ সালে সৌদি আরবে যান তিনি। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন তার বাবা।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সৌদি আরবের মক্কায় পবিত্র হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ পেয়েছিলেন নজরুল। সেখানে যাওয়ার সাত-আট মাস পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাচ্ছিল না পরিবার। পরে একদিন সৌদি আরবের কারাগার থেকে ফোন করে নজরুল জানান, তিনি বন্দি রয়েছেন। তবে কী কারণে তাকে আটক করা হয়েছে, তা তিনি পরিবারকে জানাননি।

নজরুলের বাবা আবদুল বাছির রাজনীতি ডটকমকে বলেন, আটকের প্রায় দেড় মাস পর ছেলের ফোন পেয়েছিলেন তিনি। এরপর প্রায় তিন বছর তিন মাস ধরে কারাগারে ছিলেন নজরুল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কয়েক দিন আগেও ছেলের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল।

আবদুল বাছির বলেন, “প্রায় তিন বছর তিনমাস ধরে সে কারাগারে ছিল। গত রোববার সে আমাকে ফোন দেয়। সে জানায় সে সমস্যার মধ্যে রয়েছে। এটাই তার সাথে আমার শেষ কথা। গত বুধবার শুনলাম নজরুলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমি এই বিষয়ে আর কিছু বলতে পারি না।”

পরিবারের অভিযোগ, গত ১৪ অক্টোবর নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলেও এ বিষয়ে আগে থেকে তাদের কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর তারা বিষয়টি জানতে পারেন।

শোকে ফুফুর মৃত্যু, ঋণের বোঝায় পরিবার

সরেজমিনে নজরুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের মৃত্যুর খবরের পর থেকে শোকে স্তব্ধ তার বাবা-মা। একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারানোর বেদনা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তারা। স্বজন ও এলাকাবাসী তাদের সান্ত্বনা দিতে বাড়িতে ভিড় করছেন।

নজরুলের মৃত্যুর খবর শুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সেদিনই মারা যান তার ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। একসঙ্গে ছেলে ও বোনকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন আবদুল বাছির। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে নেওয়া ঋণও এখন তার পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে আছে।

আবদুল বাছির রাজনীতি ডটকমকে বলেন, “বাড়িতে এখন কান্নার রোল। আমার বোন আবেদা বেগম বাড়িতে এসে নজরুলের মৃত্যুর খবর শুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। আমার ছেলেও গেলো, বোনও গেলো সব হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। আমি ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েছি। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।”

তিনি আরও বলেন, কারাগারে থাকার সময় ছেলের (নজরুল) কাছে জানতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কি না। কিন্তু কেউ যোগাযোগ করেনি বলে জানিয়েছিলেন নজরুল। ক্ষোভ প্রকাশ করে আবদুল বাছির বলেন, “প্রতিটি দেশের কনস্যুলেট জেলে থাকা তাদের নাগরিকদের খোঁজ খবর নেয়। অথচ আমাদের দেশের কনুস্যুলেট থেকে তার কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি। আমরা কি দেশে বাস করছি।”

তিনি আরও বলেন, “আমার ছেলেকে যেই অভিযোগে নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য কোনো আইনজীবী পেয়েছিলন কি না অথবা কনস্যুলেটের সাথে যোগাযোগের সুযোগ হয়েছে কি না তাও এখন বড় প্রশ্ন। আমার ছেলের মতো আর কেউ যেন এভাবে মরতে না হয়। সেদেশে (সৌদি আরব) যারা আছেন, তাদের যেন আমাদের দেশের সরকারের পক্ষ থেকে খোঁজখবর নেওয়া হয়।”

নজরুলের বাবা-মায়ের দাবি, তাদের ছেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। নজরুল অবিবাহিত ছিলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে এখন তার মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনরা।

এদিকে নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ। তিনি রাজনীতি ডটকমকে বলেন, “মরদেহ দেশে ফিরলে ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা করা হবে।”

মৃত্যুদণ্ডের তথ্য চেয়েছে সরকার

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে সরকারের সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদালতের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের আলোচনাও হয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

শামা ওবায়েদ জানান, সৌদি কর্তৃপক্ষ দেশটির কারাগারে আটক ও গ্রেপ্তার বাংলাদেশি নাগরিকদের নাম-পরিচয়ের তালিকা নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই ব্যক্তির নাম সরকারি তালিকায় রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আরও তথ্য চাওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সৌদি আরবের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আদালতের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পরই পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ চূড়ান্ত করা হবে।

কেন আগে জানানো হয়নি, সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে প্রশ্ন ঢাকার

সৌদিতে নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে কেন জানানো হয়নি, তা জানতে গতকাল রোববার ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ দিন দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ারের সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) মো. নজরুল ইসলাম।

বেলা সাড়ে তিনটায় শুরু হওয়া বৈঠকটি চলে প্রায় আধা ঘণ্টা। দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বৈঠকের বিষয়টি রোববার সন্ধ্যায় নিশ্চিত করেন মো. নজরুল ইসলাম। তবে আলোচনার বিস্তারিত জানাতে চাননি তিনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৈঠকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির বিষয়ে জানতে সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে একটি কূটনৈতিক পত্র দেওয়া হয়েছে। এর আগে এ বিষয়ে সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সচিবের যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় এ আলোচনা হয়।

কর্মকর্তারা জানান, বৈঠক শেষে সৌদি রাষ্ট্রদূত বলেছেন, তিনি রিয়াদে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য জানবেন। এরপর বাংলাদেশকে বিষয়টি অবহিত করবেন।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, বিদেশে কোনো দেশের নাগরিকের বিচার ও শাস্তি কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট দেশকে জানানোর যে রীতি রয়েছে, এ ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানিয়েছিল কি না, সে বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

জেদ্দায়ও কূটনৈতিক তৎপরতা

ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি জেদ্দায়ও যোগাযোগ চালাচ্ছে বাংলাদেশের কনস্যুলেট। গত বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনসাল জেনারেলের দপ্তর থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় দপ্তরে একই বিষয়ে কূটনৈতিক পত্র পাঠানো হয়। রোববার সকালে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় এক কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধও জানানো হয়েছে।

জেদ্দায় বাংলাদেশ কনসাল জেনারেলের দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, দু-এক দিনের মধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে কনসাল জেনারেলের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গণমাধ্যম গত বুধবার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পবিত্র মক্কার একটি মসজিদ এলাকায় ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। খবর প্রকাশের পর ঢাকায় সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা ‘বড় শিক্ষা’, বললেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে এর আগে বাংলাদেশের জন্য ‘বড় শিক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের যে দেশেই থাকুন না কেন, সেই দেশের আইন মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পায়নি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

সেদিন শামা ওবায়েদ বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশনের শ্রম উইং থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে ‘ব্যভিচারে’ লিপ্ত থাকার অভিযোগ ছিল ওই দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে। সৌদি আইনে এ ধরনের কাজ গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় দেশটির আদালত ব্যবস্থা নিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পায়নি।

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সৌদি আরবের একটি নিজস্ব আইনি কাঠামো আছে। সেই আইনি কাঠামো অনুযায়ী কেউ যদি গর্হিত অন্যায় কাজ করে, তখন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সেই আইন অনুযায়ী সাজা হয়।’ সৌদি কর্তৃপক্ষের চিঠির জবাব পাওয়ার পর দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে বলেও জানিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী।

কী অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড

সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) গত বুধবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। তারা হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে আদালতে পাঠানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শরিয়াহ আইনের ‘তাআজির’ বিধানের আওতায় আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন। মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করা এবং অপরাধের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ সাজা দেওয়া হয়। পরে উচ্চতর বিচারিক কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখলে রাজকীয় আদেশে দণ্ড কার্যকর করা হয়।

সৌদি আরবের বেসরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, জেদ্দার আদালতে কয়েক মাস ধরে তাদের বিচারপ্রক্রিয়া চলেছিল। এ সময় বাংলাদেশের দুজন বিশিষ্ট নাগরিক দোভাষী হিসেবে সহযোগিতা করেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদালতের রায়ের অনুলিপি ও বিস্তারিত তথ্য এখনো চাওয়া হচ্ছে। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া, অভিযোগের বিস্তারিত এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছিল কি না— এসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

কনস্যুলার সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন

বিদেশে কোনো দেশের নাগরিক গ্রেপ্তার হলে কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বন্দীর অনুরোধে আটককারী দেশকে তার দেশের কনস্যুলেটকে অবিলম্বে জানানোর এবং কনস্যুলার যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে।

তবে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার কনস্যুলেটকে জানানোর অনুরোধ করেছিলেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। শুক্রবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের একটি সূত্র জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি তাদের নজরে আসে। পরে জেদ্দার কনস্যুলেট থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ দুই বাংলাদেশিকে আটক করার পর এত দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে, এমনটি হওয়ার কথা নয়। আটক অবস্থায় ওই দুজনের পক্ষে কেউ বাংলাদেশ মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি কেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে নজরুল ইসলামের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া সুইটি আখতারের বিস্তারিত পরিচয় এখনো জানা যায়নি। নজরুলের পরিবারও জানিয়েছে, সুইটি সম্পর্কে তাদের কোনো তথ্য জানা নেই। পরিবার এখন নজরুলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছে।

একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুল আইনি সহায়তা ও বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য চায় তারা। বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের খোঁজখবর রাখা এবং তাদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকারও দাবি জানিয়েছে পরিবার।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement