শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্ত বেআইনি: হাইকোর্ট

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩: ০৫
সুপ্রিম কোর্ট ভবন। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির পূর্বানুমোদন ছাড়া কেবল গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত করা বেআইনি বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে গভর্নিং বডির সভাপতির কেবল মৌখিক বা টেলিফোনিক নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করাও সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা রিট আবেদন খারিজ করে গত ৯ জুলাই এ রায় দেন বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ। গত রোববার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে।

আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী কামরুজ্জামান এবং শিক্ষকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী জহিরুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আনিসুর রহমান খান ও সুলতান মাহমুদ বান্না।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর গচিহাটা পল্লী একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগমের বাড়িতে গিয়ে তার ছোট মেয়ের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠে সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ নভেম্বর কলেজের অধ্যক্ষ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। তার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ২৯ নভেম্বর দ্বিতীয়বার নোটিশ দেওয়া হয়। ৬ ডিসেম্বর দেওয়া জবাবেও শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এরপর গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামানের মৌখিক বা টেলিফোনিক নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভর্নিং বডির সভায় শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তা কার্যকর দেখানো হয়।

পরে অনুমোদনের জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারি বিষয়টি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটিতে পাঠানো হয়। ২০ এপ্রিলের সভায় কমিটি বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নামঞ্জুর করে ওই শিক্ষককে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়।

বোর্ডের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোনো আইনি সুযোগ না থাকায় ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট মামলা করেন গভর্নিং বডির সভাপতি আখতারুজ্জামান। চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত রুল ও স্থগিতাদেশ—উভয়ই খারিজ করে দেন।

‘বরখাস্তের আগে সাত দিনের সুযোগ’

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, স্বীকৃত বেসরকারি কলেজের কোনো শিক্ষককে বরখাস্তের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে লিখিত নোটিশ দিয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তাঁকে কমপক্ষে সাত দিন সময় দিতে হবে।

নোটিশে প্রস্তাবিত শাস্তির বিষয়টিও উল্লেখ থাকতে হবে। পাশাপাশি ওই শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে শুনানির সুযোগ চান কি না, তা জানতে হবে। তিনি ব্যক্তিগত শুনানি চাইলে তাঁর বিরুদ্ধে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

‘টেলিফোনে তদন্ত কমিটি গঠন বেআইনি’

আদালত রায়ে বলেছেন, তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে যথাযথভাবে ডাকা গভর্নিং বডির সভায় আনুষ্ঠানিক রেজুলেশনের মাধ্যমে। গভর্নিং বডির সভাপতি বা অন্য কারও মৌখিক কিংবা টেলিফোনিক নির্দেশ কোনো আনুষ্ঠানিক রেজুলেশনের বিকল্প হতে পারে না। টেলিফোনে তদন্ত কমিটি গঠনকে আইনি প্রক্রিয়ার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার নথিপত্রে অভিযোগের ঘটনার তারিখ নিয়েও বড় ধরনের অসঙ্গতি পেয়েছেন আদালত। মূল অভিযোগে ঘটনার তারিখ ৯ নভেম্বর উল্লেখ করা হলেও প্রথম নোটিশে ৭ নভেম্বর এবং তদন্ত প্রতিবেদনে ৫ ডিসেম্বর উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া তদন্ত কমিটির সামনে শিক্ষককে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে সাত দিনের পরিবর্তে ছয় দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কমিয়ে দেওয়ায় এতে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন আদালত।

রায়ে বলা হয়েছে, গভর্নিং বডি কোনো শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্ত করতে পারে না; তারা কেবল বরখাস্তের প্রস্তাব দিতে পারে।

বরখাস্ত কার্যকরের আগেই আপিল ও সালিশ কমিটির মাধ্যমে শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এ মামলায় ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বরখাস্ত কার্যকর করা হলেও অনুমোদনের জন্য বিষয়টি বোর্ডে পাঠানো হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি।

আদালত বলেন, গভর্নিং বডি বোর্ডের বাধ্যতামূলক অনুমোদনকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না।

শিক্ষক বরখাস্তে বোর্ডের সিদ্ধান্তই আইনসম্মত

গচিহাটা কলেজের গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত বাতিল করে শিক্ষককে স্বপদে পুনর্বহাল এবং তাঁর বকেয়া পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিলের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ যথাযথ ও আইনসম্মত বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

অবসরের কারণে পুনর্বহালের সুযোগ নেই

মামলাটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় শিক্ষক আবুল মনসুর অবসরের বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় তাকে আগের পদে পুনর্বহালের সুযোগ নেই বলেও রায়ে বলা হয়েছে।

তবে তিনি যে তারিখে অবসরের বয়সে পৌঁছেছেন, সে তারিখ পর্যন্ত তার বকেয়া বেতন, চাকরিসংক্রান্ত অন্যান্য সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

Ad
Ad
ad
ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

নতুন পে-স্কেলের গেজেট এ সপ্তাহেই, বাস্তবায়ন হবে ৩ ধাপে

মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি। তিন ধাপে এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথম ধাপে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে মূল বেতন কার্যকর হবে। এরপর ছয় মাস পর দ্বিতীয় ধাপ ও পরে শেষ ধাপটি কার্যকর হবে। সব ভাতা একযোগে চালু হবে ২০২৮ সালের জানুয়ার

১৫ ঘণ্টা আগে

ছিনতাইয়ের কবলে শিক্ষিকার মৃত্যু: ৩ আসামি ৫ দিনের রিমান্ডে

রিমান্ডে যাওয়া আসামিরা হলেন— মো. পনি ওরফে প্যারা পনি ওরফে পনি গাজী, সেড্রিক জুলিয়ান ও রাকিব হোসেন। এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই শাহিন আসামিদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।

১৮ ঘণ্টা আগে

হাদি হত্যা: ভারতে আটক ফয়সালের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

দুর্নীতির অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলায় সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. শাহজাহান কবির এ আদেশ দেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম।

১৯ ঘণ্টা আগে

ভবন বানিয়ে কিছু শিক্ষক নিয়োগ দিলেই বিশ্ববিদ্যালয় হয় না: অধ্যাপক কামরুল

তিনি আরও লেখেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাথমিক শর্ত হলো শিক্ষকদের মান। সক্রেটিস কিংবা প্লেটোর মতো শিক্ষকরা তো গাছতলায়, মাঠে ও বাড়িতে পড়িয়েই একটি সভ্যতা নির্মাণ করে ফেলেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় মানের সত্যিকারের ভালো শিক্ষক তারাই, যারা স্বাধীনভাবে গবেষণা করার সক্ষমতা রাখে।’

১৯ ঘণ্টা আগে
Advertisement