কড়া নিরাপত্তায় রূপপুরে পৌঁছাল ইউরেনিয়ামের নতুন চালান

পাবনা প্রতিনিধি
আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪: ৩২
ইউরেনিয়ামবাহী গাড়ি যাচ্ছে রূপপুরে। বুধবার সকালে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া মোড় থেকে তোলা। ছবি: রাজনীতি ডটকম
ইউরেনিয়ামবাহী গাড়ি যাচ্ছে রূপপুরে। বুধবার সকালে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া মোড় থেকে তোলা। ছবি: রাজনীতি ডটকম

কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছেছে দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়ামের নতুন চালান। আজ বুধবার সকাল ১০টার পর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহরটি কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তারা কেউ নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

এর আগে বুধবার ভোর ৫টার দিকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহরটি রূপপুরের উদ্দেশে রওনা হয়। পুরো পথে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল সেনাবাহিনী, পুলিশ, এসআরবি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

এর আগে মঙ্গলবার রাতে বিশেষ কার্গো বিমানে ইউরেনিয়ামের চালানটি শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছায়। এ সময় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা চালানটি গ্রহণ করেন।

এ নিয়ে চলতি বছর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়ামের তিনটি চালান পৌঁছাল। এর আগে গত ৩ ও ১১ অক্টোবর কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়ামের দুটি চালান আসে। আজ বুধবার পৌঁছাল দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি।

রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় পাবনার রূপপুরে নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এতে রুশ ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তিতে নির্মিত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে। দুই ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

প্রকল্পটির নির্মাণব্যয় প্রথমে ধরা হয়েছিল ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ব্যয় আরও ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। এতে প্রকল্পের মোট অনুমোদিত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থের প্রায় ৯০ শতাংশ আসছে রাশিয়ার ঋণ থেকে, বাকি অর্থ দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

২০১৩ সালে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। মূল নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর। এরপর অন্তত চার দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু

গত ৮ অক্টোবর প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া বা ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ শুরুর অনুমতি দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)। এরপর রোববার বিকেল সাড়ে ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে চুল্লিতে ফিশন বা পারমাণবিক বিভাজন বিক্রিয়া শুরু হয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, সময়মতো সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।

প্রথম ইউনিট থেকে চলতি অক্টোবরেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর পরিকল্পনা ছিল। সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও চলছিল। তবে চুল্লির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থার ভালভে জটিলতা দেখা দেওয়ায় কাজ পিছিয়ে যায়। এতে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন পাওয়ার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়। পরে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল এনে ভালভের সমস্যার সমাধান করা হয়। এরপর চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমতি মেলে।

ধাপে ধাপে বাড়বে উৎপাদন

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে প্রাথমিক পর্যায়ে খুব কম শক্তিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া চালানো হবে। এ সময় চুল্লির বিভিন্ন ব্যবস্থা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে।

এই পরীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শেষ করতে ৩০ থেকে ৪০ দিন লাগতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে চুল্লির শক্তি বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। পরবর্তী পর্যায়ে টারবাইন চালু করে জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। তখন পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।

শুরুতে কেন্দ্রটি পূর্ণ ক্ষমতার ৩ শতাংশে চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরে ধীরে ধীরে উৎপাদন ২০ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। সব পরীক্ষা সন্তোষজনক হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।

গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর পরও সাত থেকে আট মাস কেন্দ্রটি পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হতে পারে। সব পরীক্ষা শেষ হলে প্রথম ইউনিট পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যাবে। তখন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হবে বাংলাদেশ।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad