ঋণে ডুবেই স্ত্রী-সন্তানদের হত্যার পর আত্মহত্যা, চল্লিশায় আবারও ধারদেনা!

রাজশাহীর পবা উপজেলার বামনশিকড় গ্রাম। বাড়ির সামনে–পেছনে দুটো প্যান্ডেল। আত্মীয়স্বজন আর আশপাশের গ্রামবাসী ভ্যান-রিকশায় চেপে এসেছেন। দুপুরে একসঙ্গে খাওয়া হচ্ছে ভাত, ডাল আর মাছ দিয়ে মুড়িঘণ্ট। আবহটা উৎসবের মতো হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক হৃদয়বিদারক কাহিনি।
মাত্র এক মাস আগে, গত ১৪ আগস্ট রাতে এই বাড়িতেই ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। ঋণের বোঝা আর অভাবে জর্জরিত হয়ে মিনারুল ইসলাম (৩৫) তাঁর স্ত্রী মনিরা খাতুন (৩০), ছেলে মাহিম (১৪) ও মেয়ে মিথিলাকে (৩) হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর আগে তিনি চিরকুটে লিখে যান, “আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে।”
গত শনিবার মিনারুল ও তাঁর পরিবারের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল চল্লিশা বা ফয়তার অনুষ্ঠান। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী মৃত্যুর চল্লিশতম দিনে আত্মীয়স্বজন ও সমাজের মানুষকে খাওয়ানো হয়। প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ খেয়েছেন ভাত-ডালের সেই আয়োজন। খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা—সবই ধারদেনা করে।
মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী বলেন, “সমাজের নিয়ম আছে। চারজন মরার কারণে বাড়িটা ভারী লাগছিল। ছোট ছেলেপিলেরা ভয় পাচ্ছিল। অনুষ্ঠান করলে ভয় কেটে যাবে—এই ভেবে করেছি। আমি গরিব মানুষ, মাংস করতে পারিনি। মাছ দিয়ে মুড়িঘণ্ট আর ডাল করেছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার তো জমানো টাকা নাই। তাই সবই ধারদেনা করে করিছি। তবে জমি আছে ১৫-১৬ কাঠা। এক কাঠা বেচে শোধ করব।”
ঋণের কারণে প্রাণ হারানো পরিবারের নতুন করে ধারদেনায় জড়ানোতে এলাকাজুড়ে আলোচনা চলছে। এক স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এটা মেনে নেওয়ার মতো নয়। ধারদেনার চাপে যিনি মারা গেলেন, তাঁর পরিবারের জন্য আবারও একই বোঝা চাপানো অমানবিক।”
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মুর্শেদ বলেন, “ইসলামে এ রকম কোনো বিধান নেই। কিন্তু এলাকাবাসী এটা রেওয়াজ মনে করে। তাই পরিবারকে চাপ থাকে।”
রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ মাকছুদুল্লাহ বলেন, “এটা ইসলামের নামে সম্পূর্ণ অপসংস্কৃতি। মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করার কথা ইসলামে আছে, কিন্তু চল্লিশা পালন, খাওয়ানোর আয়োজন বা ঋণ করে অনুষ্ঠান করার কোনো অনুমোদন নেই। সমাজের কিছু মানুষ এটাকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।”













