অগ্রণী ব্যাংকের বন্ধ আউটলেটে লেনদেন, গ্রাহকদের কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রতারণার শিকার গ্রাহকরা নান্দাইলের শিয়ালধরা বাজারে জড়ো হয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। ছবি: রাজনীতি ডটকম
প্রতারণার শিকার গ্রাহকরা নান্দাইলের শিয়ালধরা বাজারে জড়ো হয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। ছবি: রাজনীতি ডটকম

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরইল ইউনিয়নের শিয়ালধরা বাজারে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির একটি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ২০২৫ সালের জুনে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে গ্রাহকদের বিষয়টি না জানিয়ে ওই আউটলেটের মাধ্যমে লেনদেন অব্যাহত রাখার অভিযোগ উঠেছে। এতে গ্রাহকদের কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অগ্রণী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের বাণিজ্যিক নাম অগ্রণী দুয়ার ব্যাংকিং। শিয়ালধরা বাজারে আউটলেটটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০২০ সালে। অগ্রণী ব্যাংকের মূল শাখা ২০২৫ সালের জুনে আউটলেটটি বন্ধ করে দিলেও সঞ্চয়পত্র বিক্রির নামে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। অথচ সঞ্চয়পত্র বিক্রির দাপ্তরিক কোনো অনুমতি আউটলেটটির ছিল না।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে শিয়ালধরা বাজারে আউটলেটটির গ্রাহকরা জড়ো হন। সেখানে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রতারণার শিকার গ্রাহকরা আত্মসাৎ করা আমানতের টাকা ফেরত পাওয়াসহ দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির দাবি করেন। এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় শতাধিক গ্রাহক উপস্থিত ছিলেন। তাদের বেশিরভাগই প্রবাসী পরিবারের সদস্য। আউটলেটে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের টাকা আমানত রাখা ও তা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনা হয়েছিল। অথচ আউটলেট থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রির দাপ্তরিক কোনো অনুমতি ছিল না। সঞ্চয়পত্র বিক্রির নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা জমা নিয়ে আউটলেট থেকে ভুয়া রশিদ দেওয়া হয়েছে।

গ্রাহক মোছা. শামসুন্নাহার জানান, তার স্বামী সুজন মিয়া প্রবাসী ছিলেন। তিনি প্রবাস থেকে টাকা পাঠাতেন। সেই টাকা দিয়ে তিনি অগ্রণী এজেন্ট ব্যাংক থেকে ২৪ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন। এখন জানতে পারেন, এজেন্ট ব্যাংকটি (আউটলেট) বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রাহকদের আর্থিক স্বার্থ না দেখে তাদের অজ্ঞাতে কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করে এজেন্ট ব্যাংকটি বন্ধ দেয়। এখন গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ কে দেবে, প্রশ্ন তোলেন ওই নারী।

শামসুন্নাহারের স্বামী সুজন মিয়া জানান, বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা ফেরত চাইতে গেলে এজেন্ট ব্যাংকের পরিচালক মাজহারুল ইসলাম ওরফে মিজান তার বিরুদ্ধে উলটো মামলা করেছেন।

জাহাঙ্গীর আলম নামে স্থানীয় একজন বাসিন্দা জানান, তিনি অগ্রণী এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে ১৪ লাখ টাকা স্থায়ী আমানত রেখেছিলেন, এখন অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না। জাহাঙ্গীর আরও জানান, তার প্রতিবেশী তিনটি পরিবার আউটলেটে জমা রাখা অর্থ দিয়ে ৪৪ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। আশপাশের গ্রামের প্রায় হাজারো বাসিন্দা অগ্রণী এজেন্ট ব্যাংকে টাকা জমা (আমানত) রেখেছিলেন। তারা কেউ টাকা ফেরত পাননি।

সোহেল মিয়া নামে এক গ্রাহক কয়েকটি রসিদ দেখিয়ে বলেন, তিনি এখান থেকে নয় লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। তাকে বলা হয়েছিল চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে লভ্যাংশসহ আসল টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু অবস্থা যা দেখছি তাতে পুরো টাকাই গচ্চা যাবার শংকা দেখা দিয়েছে। তিনি গ্রাহকদের টাকা উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশে ব্যাংক কর্তপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

পারুল বেগম নামে এক নারী জানান, তার স্বামী কালাম মিয়া এই আউটলেটে হিসাব খুলে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন। সেখান থেকে টাকা পাঠাতেন। স্বামী অজান্তে ওই হিসাব (নং ০২০০০১৮৭৯০৭১১) থেকে ১৭ লাখ টাকা তুলে আত্মসাৎ করেছেন আউটলেট কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে তার স্বামী অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির উপ-মহাব্যবস্থাপক বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন। পরে ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল অভিযোগটি তদন্ত করে সত্যতা পেলেও টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীরা আরও অভিযোগ করেন, এলাকার অনেক বাসিন্দা ওই আউটলেটে বিদ্যুৎ বিল জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু বিলের টাকা বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের হিসাবে জমা হয়নি। ফলে দ্বিতীয়বার বিল জমা দিয়ে সংযোগ চালু রাখতে হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আউটলেটটির পরিচালক মাজহারুল ইসলাম ওরফে মিজান শিয়ালধরা বাজারের পাশে অবস্থিত উদং গ্রামের বাসিন্দা। তার বাড়িতে গেলে তিনি দাবি করেন, আউটলেটের ব্যবস্থাপক মাজহারুল ইসলাম সোহেল কিছু অনিয়ম করেছেন বলে জানতে পেরেছেন। এ কারণে তিনি তার (সোহেল) বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।

মাজহারুল ইসলাম (মিজান) আরও জানান, তার ওই আউটলেটটিতে দুই হাজার ৮০০ গ্রাহক ছিলেন। তিনি কারও অর্থ আত্মসাৎ করেননি দাবি করে বলেন, ‘অর্থ আত্মসাৎ করলে তারা আমার বিরুদ্ধে মামলা করতেন। কিন্তু কোনো মামলা না করে আমাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’

বন্ধ হয়ে যাওয়া আউটলেটের ব্যবস্থাপক মাজহারুল ইসলাম সোহেলকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তিনি সৌদি আরবে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। গ্রামের লোকজন বলছেন, আউটলেটের পরিচালক মাজহারুল ইসলাম (মিজান) নিজের অপকর্ম ঢাকার জন্য ব্যবস্থাপক সোহেলকে সৌদি আরবে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে সোহেলের স্ত্রী জেসমিন আক্তার বলেন, তার স্বামী এজেন্ট ব্যাংকে চাকরি করতেন ঠিক। কিন্তু আউটলেট বন্ধ হওয়ার পর জীবিকার তাগিদে তিনি সৌদি আরবে চলে গেছেন। তিনি দেশে থাকা অবস্থায় গ্রাহকরা টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেননি। তিনি বিষয়টি জানতেনও না।

নান্দাইলের অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির কালীগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপক মো. হাফিজুর রহমানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শিয়ালধরা বাজারের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটি ২০২৫ সালের জুন মাসে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ওই আউটলেটের কিছু গ্রাহকের ৪০-৪৫ লাখ টাকার এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট) অগ্রণী ব্যাংকের মূল শাখায় জমা রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। বিদ্যুৎ গ্রাহকদের বিল গ্রহণ করার অনুমতি আউটলেট কর্তৃপক্ষের ছিল না বলে জানান তিনি।

অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুন মাসে অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃক এজেন্ট ব্যাংক আউটলেটটি বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হলেও কার্যালয়ের সাইনবোর্ডটি চলতি বছরের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত লাগানো ছিল বলে জানিয়েছেন শিয়ালধরা বাজারের ব্যবসায়ীরা। তাই গ্রাহকরা নির্দ্বিধায় ব্যাংকিং লেনদেন চালিয়ে গেছেন। এর দায় কার, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন গ্রাহকরা।

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে তিনি অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির স্থানীয় শাখার ব্যবস্থাপককে ডেকেছিলেন। তিনি দায়সারা উত্তর দিয়েছেন। তবে বিষয়টি খুবই জনগুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে যারা আউটলেট তদারকির দায়িত্বে ছিলেন, তাদের এসে গ্রাহকদের প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement