বাগেরহাটে বিএনপির ভরাডুবি: নেপথ্যে কোন্দল, বিদ্রোহীর চাপ ও ‘ভুল’ প্রার্থী

বাগেরহাট প্রতিনিধি
নির্বাচনে বাগেরহাট-১, ২ ও ৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী (বাঁ থেকে) কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল, মোহাম্মদ জাকির হোসেন ও সোম নাথ দে। ছবি: সংগৃহীত

অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিদ্রোহী প্রার্থীর চাপ, চাঁদাবাজি-দখলের অভিযোগ এবং প্রার্থী নির্বাচনে কৌশলগত ভুল— এই চার কারণেই বাগেরহাট জেলার চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটিতে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে বিএনপি। দলীয় তৃণমূল নেতাকর্মী ও স্থানীয় বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

বাগেরহাট-১: বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্রের চাপে অল্প ব্যবধানে হার

গোপালগঞ্জ সীমান্তবর্তী চিতলমারী, মোল্লাহাট ও ফকিরহাট উপজেলা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-১ আসন দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অতীতে এ আসনে একাধিকবার নির্বাচন করেছেন শেখ হাসিনা। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগবিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বল্প ব্যবধানে জয় পেয়েছে জামায়াত।

এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দেয় মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলকে। তিনি একই সঙ্গে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব ও বাংলাদেশ অশ্বিনী সেবা আশ্রমের সভাপতি। বিএনপির রাজনীতিতে নতুন মুখ হওয়ায় শুরু থেকেই তৃণমূলের একটি অংশের আপত্তি ছিল।

স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা জানান, দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের পাশ কাটিয়ে সদ্য আওয়ামী লীগ থেকে আসা একজনকে মনোনয়ন দেওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। হিন্দু ভোট ও আওয়ামী ভোট টানতে কৌশল হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।

এ আসনে মোট ভোট পড়ে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৫২২টি। জামায়াতের প্রার্থী মো. মশিউর রহমান খান পান ১ লাখ ১৭ হাজার ৫২৭ ভোট। বিএনপির কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল পান ১ লাখ ১৪ হাজার ৩২৩ ভোট। ব্যবধান মাত্র ৩ হাজার ২০৪। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম ও মো. মাসুদ রানা পান যথাক্রমে ৫ হাজার ২৮৩ ও ৬ হাজার ৪৬৭ ভোট। দলীয় নেতারা বলছেন, এ ১১ হাজার ৭৫০ ভোট ধানের শীষে এলে ফল ভিন্ন হতে পারত।

বাগেরহাট-২: বিভক্ত বিএনপি, সংগঠিত জামায়াত

সদর ও কচুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-২ আসনে জামায়াতের শেখ মনজুরুল হকের কাছে ৫১ হাজার ৩০০ ভোটের বড় ব্যবধানে পরাজিত হন বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ জাকির হোসেন। তিনি পান ৬৬ হাজার ৪০৯ ভোট। আর বিদ্রোহী প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৯৬৫ ভোট।

এ আসনে দলীয় কোন্দল দীর্ঘদিনের। নির্বাচন সামনে রেখে দলের প্রার্থী আর স্বতন্ত্রে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল বিএনপি। এই বিভেদের পাশাপশি ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা নৈরাজ্যে দলটির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততাও সাধারণ ভোটারদের মাঝে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তৃণমূলের কয়েকজন নেতা জানান, ভোটের এক সপ্তাহ আগেও বাজার-স্ট্যান্ড থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগ ছিল কিছু নেতার বিরুদ্ধে।

একদিকে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীই দলের প্রার্থীকে মেনে নিতে পরেননি। অন্যদিকে বিএনপির বিভক্তিতে প্রচারণাসহ সবখানে এগিয়ে গেছে সুসংগঠিত জামায়াত। সাধারণ ভোটার এমনকি বিএনপির অনেক কর্মীও বলছেন, তারা এখান থেকে দলীয় প্রার্থী হওয়া জাকির হোসেনকে আগে সেভাবে চিনতেন না।

কচুয়া উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন ইউনিয়য়ের চার নেতা বলেন, খুলনায় জনসভা করলেও নির্বাচনের আগে বাগেরহাটে আসননি দলের প্রধান তারেক রহমান। যাতে প্রার্থীর বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা ও প্রচারণা বেড়েছিল। তাছাড়া গত ২ ফেব্রুয়ারি ওই সভার দিনেও এখানকার অনেক নেতা খুলনায় যাননি। তারা সেদিন এলাকার হাটবাজার ইজারার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর উপজেলা বিএনপির দুই নেতা বলেন, আমাদের প্রার্থী জনসভায় ‘চাঁদাবাজ-দখলদারমুক্ত বাগেরহাট’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও অভিযুক্তদের তার পাশেই বসে থাকতে দেখা গেছে। এতে ভোটারদের কাছে ভুল বার্তা গেছে।

তবে হারের কারণ হিসেবে বিএনপির প্রার্থী জাকির হোসেন আঙ্গুল তুলছেন বিদ্রোহী প্রার্থী সেলিমের ছোট ভাই জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ সালামের বিরুদ্ধে। হারের পর বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলছেন, ‘আমাদের এক নেতা এখানে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমি এম এ সালামের কথা বলছি। তিনি রাতের আঁধারে বিভিন্ন গোষ্ঠির সাথে মিটিং করেছেন, দলের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন। যার ফলে এত বড় বিপর্যয়।’

নির্বাচনের বাগেরহাট-২ আসনে থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে এম এ সালাম মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে দলীয় প্রার্থীর অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দলের প্রতি সম্মান রেখে আমি মনোনয়ন প্রত্যাহার করি। ধানের শীষের জন্য ভোট চেয়েছি। তিনি মিথ্যা ও বানোয়াট কথা বলছেন।’

বাগেরহাট-৪: নতুন মুখ, বড় ব্যবধানে হার

নতুন মুখকে মনোনয়ন দেওয়ায় শুরুতে নেতাকর্মীরা কাজ না করলেও শেষ দিকে সবাই স্বক্রিয় হন। তবে বিদ্রোহী হিসেব মাঠে ছিল জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কাজী খায়রুজ্জামান শিপন। গ্রুপিংয়ের কারণে বিএনপির কিছু নেতাকর্মী তলে তলে জামায়াতের পক্ষে কাজ করেছে বলেও অভিযোগ স্থানীয় কয়েকজনের।

মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-৪ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দেয় মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সভাপতি সোম নাথ দে’কে। তিনি আগে জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের শেষ সময়ে দলটিতে যোগ দিয়েছিলেন। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে বিএনপিতে আসেন।

নতুন মুখ হওয়ায় শুরুতে নেতাকর্মীদের অনীহা থাকলেও শেষদিকে প্রচারণা জোরদার হয়। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে ছিলেন কাজী খায়রুজ্জামান শিপন। অভিযোগ রয়েছে, গ্রুপিংয়ের কারণে বিএনপির একটি অংশ নীরবে জামায়াতের পক্ষে কাজ করেছে।

আসনটিতে জামায়াতে ইসলামী ১৯৯১ সালে এককভাবে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির জোটে থেকে বিজয়ী হয়। এবার এ আসনে জামায়াতের আব্দুল আলীম ১৭ হাজার ৭৪১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। তিনি পান ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭ ভোট। আর বিএনপির সোম নাথ দে পান ৯৮ হাজার ৩২৬ ভোট।

বাগেরহাট-৩: একমাত্র সান্ত্বনা

জেলার চারটি সংসদীয় আসনের মাঝে একমাত্র বাগেরহাট-৩ আসনে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি। জামায়াতের মো. আব্দুল ওয়াদুদকে ১৯ হাজার ১১১ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয়ী হন শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি পান ১ লাখ ২ হাজার ৬৬১ ভোট। দলীয় নেতারা মনে করছেন, এ আসনে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত প্রার্থী দেওয়াই সাফল্যের মূল কারণ।

বিএনপির তৃণমূল নেতাদের মতে, জাতীয় নির্বাচনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সমীকরণও প্রভাব ফেলেছে। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেম্বার বা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভবিষ্যৎ সমর্থন পাওয়ার হিসাব-নিকাশে অনেকেই দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় হননি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বাগেরহাটের সম্পাদক এস কে হাসিব বলেন, সাধারণ মানুষ ভয়হীন একটা পরিবেশ, শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা চায়। ভোটাররা এখন শুধু দল নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, আচরণ, কর্মকাণ্ড ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে আওয়ামী সমর্থকদের ভোটও এবার বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে।

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

চট্টগ্রামে ১৯ বছর আগের শিক্ষার্থী হত্যা মামলায় ৫ জনের ফাঁসি

মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০০৭ সালের ২৪ জুলাই বিকালে শাওন নগরীর জিইসি মোড়ে ‘সাফ’ নামের সিএ কোচিং সেন্টারে যাবার জন্য বাসা থেকে বের হয়। ওইদিন রাতে নগরীর বাদশা মিয়া সড়কে তার গামছা পেঁচানো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

২ দিন আগে

বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ১৫

পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যা ৬টার দিকে কোনাবাড়ী এলাকায় একটি দ্রুতগামী যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিপরীতমুখী একটি মালবাহী ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে রাস্তার পাশে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি।

২ দিন আগে

রাজশাহীতে ভুয়া পরিচয়ে জ্বালানি তেল নেওয়ার চেষ্টা, যুবকের জরিমানা-কারাদণ্ড

রাজশাহীতে একটি পেট্রোল পাম্পে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে জ্বালানি তেল নেওয়ার চেষ্টা করার অপরাধে তৌহিদুর রহমান (২৯) নামে এক যুবককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জরিমানা অনাদায়ে তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।

২ দিন আগে

গেটে তালা দেওয়াতেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় কদমতলীর লাইটার কারখানা

এ অগ্নিকাণ্ড ছাপিয়ে সামনে এসেছে কারখানা কর্তৃপক্ষের নিষ্ঠুরতার অভিযোগ। প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে ফেরা শ্রমিকদের দাবি, আগুন লাগার পর তাদের বাইরে বের হতে না দিয়ে মূল ফটক তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আর সে কারণেই তারা কারখানা থেকে বের হতে পারেননি, দগ্ধ হয়ে তাদের পাড়ি জমাতে হয়েছে না ফেরার দেশে।

২ দিন আগে