কিশোরগঞ্জ

হাড়কাঁপানো শীতেও হাওরে বোরো আবাদের কর্মযজ্ঞ

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
শীত উপেক্ষা করেই হাওরে চলছে বোরো আবাদের কর্মযজ্ঞ। ছবি: রাজনীতি ডটকম

শীত আর হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করে বোরো ধান আবাদ ও রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা। ভোরের আলো ফোটার আগেই তারা নেমে পড়ছেন খেতে। বিস্তীর্ণ হাওরের মাঠজুড়ে চলছে বোরো চাষের কর্মযজ্ঞ। কুয়াশায় ঢাকা শীতের সকালে বীজতলায় ধানের চারা পরিচর্যা থেকে শুরু করে জমি চাষ— সব কাজই চলছে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

কৃষকদের এই নিরলস পরিশ্রমেই হাওরে ফলে সোনালি ফসল। তবে ফসল ফলানোর এই প্রচেষ্টার মাঝেও হতাশা তাদের পিছু ছাড়ছে না। প্রতিবছর আগাম বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন হাওরের কৃষকেরা। তখন মহাজনের দেনা শোধ করতে গিয়ে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েন।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজেল, সার ও বীজসহ কৃষি উপকরণের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। এতে বোরো চাষের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে বলে জানান তারা। তবুও পরিবার-পরিজনের আহার জোগাতে, জীবিকার খরচ মেটাতে তাদের এই ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা।

হাওরের কৃষি শ্রমিকদের বড় অংশই নারী, বোরো আবাদেও রয়েছে তাদের সরব উপস্থিতি। ছবি: রাজনীতি ডটকম
হাওরের কৃষি শ্রমিকদের বড় অংশই নারী, বোরো আবাদেও রয়েছে তাদের সরব উপস্থিতি। ছবি: রাজনীতি ডটকম

এখন হাওরাঞ্চলে বোরো ধান রোপণের ভরা মৌসুম। এই সময়ে চাষাবাদে পিছিয়ে পড়লে আসন্ন বৈশাখে খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সারা বছরের খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করতেই শীত যত বাড়ছে, কৃষকদের ব্যস্ততাও তত বাড়ছে। প্রতিকূলতা জয় করে মাঠে নামাই হাওরের কৃষকদের চিরায়ত স্বভাব। ঘন কুয়াশা কিংবা পৌষ-মাঘের হাড়কাঁপানো শীত— কোনোটিই তাদের নিবৃত্ত করতে পারেনি। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বোরো উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেশি বলে জানান কৃষকেরা।

তাদের অভিযোগ, সার কিনতে গেলে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সংকটের কথা বলছেন। তবে বেশি দাম দিলে সার মিলছে। অনেক ডিলার দোকানে মূল্যতালিকা টাঙালেও সরকার নির্ধারিত দামে সার বিক্রি করছেন না। কোথাও আবার তালিকায় সারের মূল্যই উল্লেখ নেই। এ ছাড়া সরকার নির্ধারিত দামের রসিদ দিলেও বাড়তি দাম রসিদে লেখা হয় না বলে অভিযোগ তাদের। প্রতিবাদ করলে সার বিক্রি না করার হুমকিও দেওয়া হয়। অন্যদিকে সার ব্যবসায়ীদের দাবি, গুদাম থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় তারা বিপাকে পড়ছেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

কৃষকরা বলছেন, স্থানীয় জাত, উফশী ও হাইব্রিড— সব ধরনের ধানই চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে এবার উফশী ধানের আবাদ তুলনামূলক বেশি। ছবি: রাজনীতি ডটকম
কৃষকরা বলছেন, স্থানীয় জাত, উফশী ও হাইব্রিড— সব ধরনের ধানই চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে এবার উফশী ধানের আবাদ তুলনামূলক বেশি। ছবি: রাজনীতি ডটকম

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের জমিতে স্থানীয় জাত, উফশী ও হাইব্রিড— সব ধরনের ধান চাষ হচ্ছে। তবে এবার উফশী ধানের আবাদ তুলনামূলক বেশি। এক ফসলি এই হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র ভরসাই বোরো ধান। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এখানকার উৎপাদিত ধান জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা ঋণ ও দাদনে চাষ করে অধিকাংশ ফসল দেনা পরিশোধেই হারান। ফলে ফসল তোলার কয়েক মাসের মধ্যেই তাদের গোলা ফাঁকা হয়ে যায়।

সরেজমিনে হাওর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে নেমে পড়েছেন কৃষকেরা। কোথাও বীজতলায় চারা পরিচর্যা, কোথাও ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ, আবার কোথাও শ্যালো মেশিনে পানি সেচ— সবকিছুই চলছে একসঙ্গে। কোথাও কচি চারার সবুজ গালিচা, কোথাও চারা তোলা ও রোপণের ব্যস্ততা। শীত যেন তাদের স্পর্শই করতে পারছে না।

ইটনা উপজেলার ধনপুর গ্রামের কৃষক হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘জমি প্রস্তুতের জন্য নন-ইউরিয়া সার দরকার। সময়মতো সার না পেলে চাষ করা যায় না। কৃষি অফিস জানলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না। ডিলারদের কারসাজি ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে তদারকি নেই।’

মিঠামইন উপজেলার চারিগ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম রতন জানান, চারা আর সারের দামেই তাদের নাভিশ্বাস উঠছে। এর ওপর সেচ দিতে গেলে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না।

অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নের লাউড়া গ্রামের কৃষক মোস্তফা বলেন, ‘ঘন কুয়াশা আর প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও কাদাপানিতে কাজ করতে হয়। বোরোই আমাদের একমাত্র ফসল। এবার ছয় একর জমিতে চারা রোপণ করছি। খরচ অনেক বেড়েছে। বেশি দাম না দিলে সার পাওয়া যায় না।’

এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরের তিন উপজেলা— ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামে চাষ হবে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি উৎপাদন হবে। জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কেউ বাড়তি দামে সার বিক্রি করলে প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

নওগাঁয় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রের দুই সদস্যসহ আটক ৯

নওগাঁয় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের দুই সদস্যসহ মোট নয়জনকে আটক করেছে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) ও পুলিশ। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) সকালে শহরের নীলসাগর হোটেল ও পোরশা রেস্ট হাউজে যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

১ দিন আগে

আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ নারীর মৃত্যু

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. কানিজ ফাতেমা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গত ৪ জানুয়ারি গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় হাজেরা বেগমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শরীরের প্রায় ৪৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। পাঁচ দিন ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার ভোরে তিনি মারা যান।

১ দিন আগে

রাতে চট্টগ্রাম-কুমিল্লায় ২ দুর্ঘটনায় ৫ প্রাণহানি

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাঠভর্তি এক ট্রাকের পেছনে যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় নৌ বাহিনীর সদস্যসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। একই মহাসড়কে কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জের তুরনিপাড়া এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাস উলটে গেলে দুজন নিহত হয়েছেন।

২ দিন আগে

জোনায়েদ সাকির আসনে সরে দাঁড়াচ্ছেন বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী

স্থানীয়রা বলছিলেন, আবদুল খালেক ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে থেকে গেলে জোনায়েদ সাকির জন্য নির্বাচন কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। সবশেষ তথ্য বলছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর ভোট থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন আবদুল খালেক।

২ দিন আগে