
নাজমুল ইসলাম হৃদয়

বেনাপোল-ঢাকা মহাসড়কে ট্রাক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন চালক রইসুল ইসলাম। তার হিসাব, বেনাপোল থেকে ঢাকা গিয়ে আবার বেনাপোলে ফিরতে গাড়িতে লাগে ১৫০ লিটার তেল। তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় এখন এক ট্রিপেই তার বাড়তি খরচ তিন হাজার টাকা!
রইসুল বলেন, এক ট্রিপের খরচ এক ধাক্কায় তিন হাজার টাকা বাড়লেও এখন ঢাকা থেকে ফেরার পথে সহজে ভাড়া মিলছে না। এ কারণে তাকে প্রতি ট্রিপেই এখন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি চাইতে হচ্ছে। তার ওপর ফেরির ভাড়া, সেতুর টোল আর পথে পথে চাঁদা— সব মিলিয়ে হিসাব মেলানোই কঠিন হয়ে পড়ছে তার মতো চালকদের জন্য।
একই প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে রাসায়নিক দ্রব্য নিয়ে ভালুকার পথে থাকা ট্রাকচালক সাদ্দাম হোসেনের কাছ থেকেও। তিনি বলেন, আগের চেয়ে চার হাজার টাকা বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। তেল-সংকটের সময় একবার ভাড়া বেড়েছিল, এবার তেলের দাম বাড়ায় আবার বাড়ল।
ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রথম দিনেই রইসুল ও সাদ্দামের মতো চালকদের কাছ থেকে এসেছে এমন প্রতিক্রিয়া। দূরপাল্লার সব রুটেই ট্রাকের ভাড়া এক লাফে কয়েক হাজার টাকা বেড়ে যাওয়ায় বড় প্রভাব পড়েছে সরবরাহব্যবস্থায়।
কেবল ট্রাক নয়, বাসের চালক ও সহকারীরাও বলছেন একই কথা। জ্বালানির বাড়তি দাম বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এরই মধ্যে ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবহারকারীদের বাড়তি খরচের কথা তো বলাই বাহুল্য। এর বাইরেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব প্রায় সব খাতেই পড়ে বলে জনজীবনে ভোগান্তি বাড়তে থাকার আশঙ্কার কথাই বলছেন সবাই।
সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও ফ্রেইট খরচ বেড়ে যাওয়া, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ক্রমবর্ধমান লোকসান এবং জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কারণে এই মূল্য সমন্বয় অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। এমনকি নতুন দামেও ডিজেলে বিপিসির লোকসান থাকছে বলে স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, ভোক্তা অধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক দলগুলো এ সিদ্ধান্তে উদ্বেগ ও আপত্তি জানিয়েছে। সরকারের ‘বেকায়দা’ পরিস্থিতি আমলে নিয়েও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসাইন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘দেশের চাহিদা মেটানোর সামর্থ্য এখন সীমিত হওয়ায় সবকিছুর মতো জ্বালানিরও সঠিক মূল্য নির্ধারণ জরুরি।’
অন্যদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের বর্তমান প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন রেখেছেন। আগের মতো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনে চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়।
নতুন দামে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা ও প্রতি লিটার পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। শতাংশের হিসাবে ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ, কেরোসিনে পৌনে ১৫ শতাংশ, পেট্রোলে সাড়ে ১৪ শতাংশ ও অকটেনে সাড়ে ১৩ শতাংশ।
মন্ত্রণালয় বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজীকরণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারের দেওয়া তুলনায় বাংলাদেশে নতুন দাম এখনো কয়েকটি প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশের তুলনায় কম।
মূল্যবৃদ্ধির তাৎক্ষণিক প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে পণ্য পরিবহনে। বেনাপোল-ঢাকা রুটে আগে একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ২০ থেকে ২১ হাজার টাকা। এখন তা ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম রুটে ২৭-২৮ হাজার টাকা থেকে ভাড়া বেড়ে ৩৫-৩৬ হাজার টাকা হয়েছে। গাজীপুর, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জ রুটে ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৬-২৭ হাজার টাকা।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজী বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধি, ফেরি ভাড়া ও টোল বেড়ে যাওয়া এবং ঢাকা থেকে ফেরার পথে পর্যাপ্ত পণ্য না পাওয়ার কারণে ট্রাক মালিকেরা ভাড়া বাড়িয়েছেন। এতে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের সংকট তৈরি হয়ে স্বাভাবিক পণ্য পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের শ্রমিক প্রতিনিধিদের তথ্য বলছে, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৬০০ ট্রাক পণ্য ওঠানামা করলেও ভাড়া বৃদ্ধি ও ট্রাক-সংকটে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলা ও দেশের বাইরে পাঠাতে সমস্যা হচ্ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়বে।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের যুগ্ম সম্পাদক এজাজ উদ্দিন টিপুও বলেন, তেলের দাম বাড়ায় ট্রাক ভাড়া বেড়েছে। ফলে সব জিনিসের দাম বাড়বে। এর প্রভাব ভোক্তার ওপর পড়বে বলে মনে করেন তিনিও।
পণ্য পরিবহন শুধু নয়, জ্বালানির নতুন দামের প্রভাব পড়েছে যাত্রী পরিবহনেও। সোমবার সন্ধ্যায় বিআরটিএর বৈঠকে ডিজেলচালিত বাসের পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। সিএনজিচালিত বাসের ভাড়া অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এস এম আহমেদ খোকন বলেন, এই সমন্বয়ে শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিজনিত অংশটুকু বিবেচনা করা হয়েছে, পরিবহন খাতের অন্যান্য ব্যয় এখনো নতুন করে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা না করে জ্বালানি তেলের মূল্য ১৫ শতাংশের বেশি বাড়ানোয় দেশের সব খাতে বাড়তি চাপ তৈরি হবে। চলমান মূল্যস্ফীতি ও শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করবে।
আনোয়ার-উল আলম চৌধুরীর আশঙ্কা, ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যয় বাড়লে অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে, যার প্রভাব ব্যাংক খাতেও পড়তে পারে এবং খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যও ব্যাহত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ব্যবসা-বাণিজ্যের এই প্রভাব গিয়ে দেশের অর্থনীতিতেও পড়বে বলে মনে করেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও সার্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার খরচ বাড়িয়ে বাজারে মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি করবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, এই মূল্য সমন্বয় সরকারের ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ ও সীমিত নীতিগত বিকল্পের প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর এই দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমিয়ে দেবে এবং পরিবহন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যয়ের বোঝা বাড়াবে।
সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বাধ্য হয়েই সরকারকে মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত দাম সমন্বয় না করতে পারায় বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিলেই লোকসান হয়েছে প্রায় সাত হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুনে প্রায় ছয় হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরেও লোকসান পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিপিসির হিসাব, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত সপ্তাহের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জানানো হয়, জ্বালানি আমদানির জন্য বিপিসির হাতে প্রায় ১৫ দিনের অর্থ অবশিষ্ট ছিল। বিপিসি এরই মধ্যে ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলেছে, ব্যাংক হিসাবে আছে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। অথচ আগামী দুই মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতেই প্রয়োজন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুন দামেও আন্তর্জাতিক বাজারদরে ডিজেলে বিপিসির দৈনিক প্রায় ১০৯ কোটি টাকা লোকসান থাকবে। তবে মূল্য সমন্বয়ের ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে।
পাশাপাশি জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশেই জ্বালানির দাম সবচেয়ে কম। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে কেনা জ্বালানি প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ ও ইপিআই টিকাদানের মতো কর্মসূচিতেও প্রভাব পড়ত বলে তিনি জানান।
তবে নতুন দামেও ভর্তুকির প্রয়োজন থাকছে বলে স্বীকার করেন প্রতিমন্ত্রী। মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে বিবেচনায় নিয়ে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশেও তা সমন্বয় করার আশ্বাস দেন।
সরকারের সামনে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর উপায় ছিল না— এ কথা মেনে নিচ্ছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসাইন। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘তেলের দামের ব্যাপারে আমরা অনেক আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাড়বে, কমলে কমবে। সরকার সেভাবেই চলছে। তবে এখন পরিস্থিতি এতখানি বেড়ে গেছে যে সরকার প্রথমে না বাড়ানোর চেষ্টা করলেও বিপিসির হাতে একদম কোনো টাকা না থাকায় এবং ঋণ করে বা ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে দেশে অরাজকতা তৈরির আশঙ্কা থাকায় দাম আর না বাড়িয়ে থাকা সম্ভব হয়নি সরকারের পক্ষে।’
সরকারের ‘অসহায়ত্ব’ মেনে নিয়েও এ খাতে পরিকল্পনামাফিক ব্যবহার ও চাহিদাভিত্তিক দাম নির্ধারণে জোর দিয়েছেন ড. ইজাজ। তিনি বলেন, ‘জ্বালানির মতো পণ্যে ভর্তুকি দিয়ে রাখলে শেষ পর্যন্ত এমন এক বিন্দুতে পৌঁছাতে হয় যেখানে আর ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হয় না। তখন সবাইকে চরম কষ্ট পোহাতে হয়। দেশের চাহিদা মেটানোর সামর্থ্য এখন সীমিত হওয়ায় সঠিক মূল্য নির্ধারণ জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার ২০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করেও চাহিদা সামলানো সম্ভব।’
অন্যদিকে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘সরকার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করা দরকার মনে করে একপাক্ষিকভাবে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি এক ধরনের মনগড়া ও অন্যায় সিদ্ধান্ত। এটা করে সরকার জনগণকে জ্বালানির সুবিচার থেকে বঞ্চিত করেছে।’
জ্বালানির দাম বাড়াতে হলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) মাধ্যমে তা বাড়ানোর পক্ষে এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, জ্বালানির দাম নির্ধারণ একটি নিয়ন্ত্রিত বাজার-প্রক্রিয়া হওয়া উচিত, যেখানে সরকার কেবল প্রস্তাবক হিসেবে থাকবে এবং বিইআরসি গণশুনানির মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ায় তা যাচাই করে চূড়ান্ত করবে।’
অধ্যাপক শামসুল ‘জ্বালানির মতো পণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সবকিছুর ব্যয়ের ওপর পড়ে। এটা এক ধরনের বাটারফ্লাই ইফেক্ট তৈরি করতে পারে, যার বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে গোটা দেশের অর্থনীতিতেই। কারণ জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা উলটো কমেছে।’ জ্বালানির দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির হাতে ছেড়ে দেওয়াই এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার পথ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে নানা মহল থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া এলেও ক্ষমতাসীন বিএনপি একে অস্বাভাবিক মনে করছে না। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে তেলের দাম এখনো অনেক কম।
তবে অন্য দলগুলোর পক্ষ থেকে এসেছে কড়া প্রতিক্রিয়া। সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিৃবতিতে বলেন, সরকারের উচিত ছিল জনগণের ক্রয়ক্ষমতা, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার দায় সরাসরি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। একই দিন পল্টন মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার দিনে (সোমবার) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বরং কমেছে। ব্রেন্ট ক্রুড ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১৫ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ৯৮ দশমিক ৪৬ ডলারে নেমেছে।
তবে সরকারের ব্যাখ্যা, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও ফ্রেইট ব্যয় এবং বিপিসির সঞ্চিত লোকসানের ওপর ভিত্তি করে। ফলে এক দিনের আন্তর্জাতিক বাজারদর সরাসরি মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি নয়। তারপরও দেশের বাজারে দাম বাড়ানোর দিনেই আন্তর্জাতিক দরে বিপরীতমুখী প্রবণতা দেখা দেওয়ায় সিদ্ধান্তের সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বেনাপোল-ঢাকা মহাসড়কে ট্রাক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন চালক রইসুল ইসলাম। তার হিসাব, বেনাপোল থেকে ঢাকা গিয়ে আবার বেনাপোলে ফিরতে গাড়িতে লাগে ১৫০ লিটার তেল। তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় এখন এক ট্রিপেই তার বাড়তি খরচ তিন হাজার টাকা!
রইসুল বলেন, এক ট্রিপের খরচ এক ধাক্কায় তিন হাজার টাকা বাড়লেও এখন ঢাকা থেকে ফেরার পথে সহজে ভাড়া মিলছে না। এ কারণে তাকে প্রতি ট্রিপেই এখন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি চাইতে হচ্ছে। তার ওপর ফেরির ভাড়া, সেতুর টোল আর পথে পথে চাঁদা— সব মিলিয়ে হিসাব মেলানোই কঠিন হয়ে পড়ছে তার মতো চালকদের জন্য।
একই প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে রাসায়নিক দ্রব্য নিয়ে ভালুকার পথে থাকা ট্রাকচালক সাদ্দাম হোসেনের কাছ থেকেও। তিনি বলেন, আগের চেয়ে চার হাজার টাকা বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। তেল-সংকটের সময় একবার ভাড়া বেড়েছিল, এবার তেলের দাম বাড়ায় আবার বাড়ল।
ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রথম দিনেই রইসুল ও সাদ্দামের মতো চালকদের কাছ থেকে এসেছে এমন প্রতিক্রিয়া। দূরপাল্লার সব রুটেই ট্রাকের ভাড়া এক লাফে কয়েক হাজার টাকা বেড়ে যাওয়ায় বড় প্রভাব পড়েছে সরবরাহব্যবস্থায়।
কেবল ট্রাক নয়, বাসের চালক ও সহকারীরাও বলছেন একই কথা। জ্বালানির বাড়তি দাম বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এরই মধ্যে ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবহারকারীদের বাড়তি খরচের কথা তো বলাই বাহুল্য। এর বাইরেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব প্রায় সব খাতেই পড়ে বলে জনজীবনে ভোগান্তি বাড়তে থাকার আশঙ্কার কথাই বলছেন সবাই।
সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও ফ্রেইট খরচ বেড়ে যাওয়া, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ক্রমবর্ধমান লোকসান এবং জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কারণে এই মূল্য সমন্বয় অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। এমনকি নতুন দামেও ডিজেলে বিপিসির লোকসান থাকছে বলে স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, ভোক্তা অধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক দলগুলো এ সিদ্ধান্তে উদ্বেগ ও আপত্তি জানিয়েছে। সরকারের ‘বেকায়দা’ পরিস্থিতি আমলে নিয়েও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসাইন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘দেশের চাহিদা মেটানোর সামর্থ্য এখন সীমিত হওয়ায় সবকিছুর মতো জ্বালানিরও সঠিক মূল্য নির্ধারণ জরুরি।’
অন্যদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের বর্তমান প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন রেখেছেন। আগের মতো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনে চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়।
নতুন দামে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা ও প্রতি লিটার পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। শতাংশের হিসাবে ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ, কেরোসিনে পৌনে ১৫ শতাংশ, পেট্রোলে সাড়ে ১৪ শতাংশ ও অকটেনে সাড়ে ১৩ শতাংশ।
মন্ত্রণালয় বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজীকরণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারের দেওয়া তুলনায় বাংলাদেশে নতুন দাম এখনো কয়েকটি প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশের তুলনায় কম।
মূল্যবৃদ্ধির তাৎক্ষণিক প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে পণ্য পরিবহনে। বেনাপোল-ঢাকা রুটে আগে একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ২০ থেকে ২১ হাজার টাকা। এখন তা ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম রুটে ২৭-২৮ হাজার টাকা থেকে ভাড়া বেড়ে ৩৫-৩৬ হাজার টাকা হয়েছে। গাজীপুর, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জ রুটে ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৬-২৭ হাজার টাকা।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজী বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধি, ফেরি ভাড়া ও টোল বেড়ে যাওয়া এবং ঢাকা থেকে ফেরার পথে পর্যাপ্ত পণ্য না পাওয়ার কারণে ট্রাক মালিকেরা ভাড়া বাড়িয়েছেন। এতে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের সংকট তৈরি হয়ে স্বাভাবিক পণ্য পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের শ্রমিক প্রতিনিধিদের তথ্য বলছে, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৬০০ ট্রাক পণ্য ওঠানামা করলেও ভাড়া বৃদ্ধি ও ট্রাক-সংকটে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলা ও দেশের বাইরে পাঠাতে সমস্যা হচ্ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়বে।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের যুগ্ম সম্পাদক এজাজ উদ্দিন টিপুও বলেন, তেলের দাম বাড়ায় ট্রাক ভাড়া বেড়েছে। ফলে সব জিনিসের দাম বাড়বে। এর প্রভাব ভোক্তার ওপর পড়বে বলে মনে করেন তিনিও।
পণ্য পরিবহন শুধু নয়, জ্বালানির নতুন দামের প্রভাব পড়েছে যাত্রী পরিবহনেও। সোমবার সন্ধ্যায় বিআরটিএর বৈঠকে ডিজেলচালিত বাসের পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। সিএনজিচালিত বাসের ভাড়া অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এস এম আহমেদ খোকন বলেন, এই সমন্বয়ে শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিজনিত অংশটুকু বিবেচনা করা হয়েছে, পরিবহন খাতের অন্যান্য ব্যয় এখনো নতুন করে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা না করে জ্বালানি তেলের মূল্য ১৫ শতাংশের বেশি বাড়ানোয় দেশের সব খাতে বাড়তি চাপ তৈরি হবে। চলমান মূল্যস্ফীতি ও শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করবে।
আনোয়ার-উল আলম চৌধুরীর আশঙ্কা, ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যয় বাড়লে অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে, যার প্রভাব ব্যাংক খাতেও পড়তে পারে এবং খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যও ব্যাহত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ব্যবসা-বাণিজ্যের এই প্রভাব গিয়ে দেশের অর্থনীতিতেও পড়বে বলে মনে করেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও সার্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার খরচ বাড়িয়ে বাজারে মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি করবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, এই মূল্য সমন্বয় সরকারের ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ ও সীমিত নীতিগত বিকল্পের প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর এই দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমিয়ে দেবে এবং পরিবহন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যয়ের বোঝা বাড়াবে।
সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বাধ্য হয়েই সরকারকে মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত দাম সমন্বয় না করতে পারায় বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিলেই লোকসান হয়েছে প্রায় সাত হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুনে প্রায় ছয় হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরেও লোকসান পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিপিসির হিসাব, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত সপ্তাহের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জানানো হয়, জ্বালানি আমদানির জন্য বিপিসির হাতে প্রায় ১৫ দিনের অর্থ অবশিষ্ট ছিল। বিপিসি এরই মধ্যে ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলেছে, ব্যাংক হিসাবে আছে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। অথচ আগামী দুই মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতেই প্রয়োজন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুন দামেও আন্তর্জাতিক বাজারদরে ডিজেলে বিপিসির দৈনিক প্রায় ১০৯ কোটি টাকা লোকসান থাকবে। তবে মূল্য সমন্বয়ের ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে।
পাশাপাশি জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশেই জ্বালানির দাম সবচেয়ে কম। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে কেনা জ্বালানি প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ ও ইপিআই টিকাদানের মতো কর্মসূচিতেও প্রভাব পড়ত বলে তিনি জানান।
তবে নতুন দামেও ভর্তুকির প্রয়োজন থাকছে বলে স্বীকার করেন প্রতিমন্ত্রী। মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে বিবেচনায় নিয়ে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশেও তা সমন্বয় করার আশ্বাস দেন।
সরকারের সামনে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর উপায় ছিল না— এ কথা মেনে নিচ্ছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসাইন। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘তেলের দামের ব্যাপারে আমরা অনেক আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাড়বে, কমলে কমবে। সরকার সেভাবেই চলছে। তবে এখন পরিস্থিতি এতখানি বেড়ে গেছে যে সরকার প্রথমে না বাড়ানোর চেষ্টা করলেও বিপিসির হাতে একদম কোনো টাকা না থাকায় এবং ঋণ করে বা ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে দেশে অরাজকতা তৈরির আশঙ্কা থাকায় দাম আর না বাড়িয়ে থাকা সম্ভব হয়নি সরকারের পক্ষে।’
সরকারের ‘অসহায়ত্ব’ মেনে নিয়েও এ খাতে পরিকল্পনামাফিক ব্যবহার ও চাহিদাভিত্তিক দাম নির্ধারণে জোর দিয়েছেন ড. ইজাজ। তিনি বলেন, ‘জ্বালানির মতো পণ্যে ভর্তুকি দিয়ে রাখলে শেষ পর্যন্ত এমন এক বিন্দুতে পৌঁছাতে হয় যেখানে আর ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হয় না। তখন সবাইকে চরম কষ্ট পোহাতে হয়। দেশের চাহিদা মেটানোর সামর্থ্য এখন সীমিত হওয়ায় সঠিক মূল্য নির্ধারণ জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার ২০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করেও চাহিদা সামলানো সম্ভব।’
অন্যদিকে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘সরকার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করা দরকার মনে করে একপাক্ষিকভাবে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি এক ধরনের মনগড়া ও অন্যায় সিদ্ধান্ত। এটা করে সরকার জনগণকে জ্বালানির সুবিচার থেকে বঞ্চিত করেছে।’
জ্বালানির দাম বাড়াতে হলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) মাধ্যমে তা বাড়ানোর পক্ষে এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, জ্বালানির দাম নির্ধারণ একটি নিয়ন্ত্রিত বাজার-প্রক্রিয়া হওয়া উচিত, যেখানে সরকার কেবল প্রস্তাবক হিসেবে থাকবে এবং বিইআরসি গণশুনানির মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ায় তা যাচাই করে চূড়ান্ত করবে।’
অধ্যাপক শামসুল ‘জ্বালানির মতো পণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সবকিছুর ব্যয়ের ওপর পড়ে। এটা এক ধরনের বাটারফ্লাই ইফেক্ট তৈরি করতে পারে, যার বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে গোটা দেশের অর্থনীতিতেই। কারণ জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা উলটো কমেছে।’ জ্বালানির দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির হাতে ছেড়ে দেওয়াই এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার পথ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে নানা মহল থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া এলেও ক্ষমতাসীন বিএনপি একে অস্বাভাবিক মনে করছে না। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে তেলের দাম এখনো অনেক কম।
তবে অন্য দলগুলোর পক্ষ থেকে এসেছে কড়া প্রতিক্রিয়া। সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিৃবতিতে বলেন, সরকারের উচিত ছিল জনগণের ক্রয়ক্ষমতা, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার দায় সরাসরি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। একই দিন পল্টন মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার দিনে (সোমবার) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বরং কমেছে। ব্রেন্ট ক্রুড ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১৫ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ৯৮ দশমিক ৪৬ ডলারে নেমেছে।
তবে সরকারের ব্যাখ্যা, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও ফ্রেইট ব্যয় এবং বিপিসির সঞ্চিত লোকসানের ওপর ভিত্তি করে। ফলে এক দিনের আন্তর্জাতিক বাজারদর সরাসরি মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি নয়। তারপরও দেশের বাজারে দাম বাড়ানোর দিনেই আন্তর্জাতিক দরে বিপরীতমুখী প্রবণতা দেখা দেওয়ায় সিদ্ধান্তের সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কয়েক মাসের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর দেশে মূল্যচাপ কমার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। টানা তৃতীয় মাসে কমে আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
৩ দিন আগে
এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন যেসব কোম্পানিতে কর্মীদের জন্য আলাদা পেনশন ব্যবস্থা নেই, সেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রগতি’ স্কিমের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এতে যুক্ত হবেন এবং কী প্রক্রিয়ায় তা বাস্তবায়ন করা হবে, তা পরে নির্ধারণ করা হবে।
৪ দিন আগে
বাজার বিশ্লেষক কেলভিন ওং জানান, বর্তমানে তেলের দামের গতিপ্রকৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেলের দরপতন বজায় থাকলে মধ্যমেয়াদে তা সোনার দাম বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। অন্যথায় এটি একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই ওঠানামা করবে। ফেডের কঠোর নীতির প্রভাব ইতোমধ্যেই বাজারদরে অনেকটা প্রতিফলিত হওয়ায় কারিগরি কারণেও সোনার
৪ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ মজুদ বাড়লেও বৈশ্বিক বাজারে মূল সরবরাহ ঘাটতি পুরোপুরি কাটে নাই। লোহিত সাগরের বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব প্রতিদিন যে ৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পথ পরিবর্তন করে পাঠাত, পাইপলাইন বন্ধ থাকায় তা বর্তমানে ব্যাহত হচ্ছে। মার্কিন প্রশাসন আগামী দু-এক দিনের মধ্যে সরবরাহ চালুর আশা করলেও পাইপলাইনের
৫ দিন আগে