ভূরাজনীতি

যুক্তরাষ্ট্র সবসময় কেন ইসরায়েলের পক্ষ নেয়

অরুণাভ বিশ্বাস
আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৫, ১৮: ৫১

আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এক বিতর্কিত এবং বহুমাত্রিক বিষয়। অনেকের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় অন্ধভাবে ইসরায়েলের পক্ষ নেয়। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস এবং বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সম্পর্ক অনেক জটিল, কখনো উষ্ণ আবার কখনো শীতল। মাঝে মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে এমন কিছু দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে যা ইসরায়েলের স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। এই ফিচারে আমরা সহজ-সরল ভাষায় বুঝে নেব কেন যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ইসরায়েলের পক্ষ নেয় না এবং কীভাবে গড়ে উঠেছিল এই দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৪৮ সালে। এর আগে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি ও আরবদের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল দীর্ঘদিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর হাতে লাখ লাখ ইহুদির মৃত্যুর পর বিশ্বব্যাপী এক ধরনের সহানুভূতির ঢেউ তৈরি হয় ইহুদি জনগণের জন্য। সেই প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনকে ভাগ করে ইসরায়েল নামে একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র তখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর একটি, এবং প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান সেই প্রথম বিশ্বনেতা যিনি ১৯৪৮ সালের ১৪ মে’র মধ্যরাতে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেন।

প্রথমদিকে যদিও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে, তবে তখনো যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামরিক সাহায্য দিত না। বরং ১৯৫৬ সালে যখন ইসরায়েল মিশরের সুয়েজ ক্যানাল দখলের চেষ্টা করে, তখন যুক্তরাষ্ট্র তার বিরোধিতা করেছিল। প্রেসিডেন্ট ডাওাইট আইজেনহাওয়ার তখন ইসরায়েল, ব্রিটেন এবং ফ্রান্সকে চাপ দিয়ে সেই আগ্রাসন বন্ধ করতে বাধ্য করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষক ড. মাইকেল ওরেন বলেন—“তাঁর মতে, শুরুর দিকে এই সম্পর্ক ছিল নৈতিক সমর্থন এবং গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে, সামরিক নয়।”

তবে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের পর থেকে এই সম্পর্কের মোড় ঘুরে যায়। সেই যুদ্ধে ইসরায়েল মিশর, জর্ডান ও সিরিয়ার জোটবদ্ধ বাহিনীকে পরাজিত করে এবং পশ্চিম তীর, গাজা, গোলান মালভূমি ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। এই বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে ইসরায়েল হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র।

তবে এর মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ইসরায়েলের পক্ষে থাকে। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের মধ্যে মতবিরোধও হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮১ সালে ইসরায়েল যখন ইরাকের ওসিরাক পারমাণবিক চুল্লিতে বিমান হামলা চালায়, তখন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান এই হামলার নিন্দা জানান এবং ইসরায়েলের ওপর সাময়িক সামরিক নিষেধাজ্ঞা দেন।

২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলেও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। ওবামা প্রশাসন ফিলিস্তিনের পক্ষে একটি দুই-রাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধানকে সমর্থন করেছিল এবং ইসরায়েলের বসতি নির্মাণকে বারবার সমালোচনা করেছিল। ২০১৬ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি নির্মাণের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেয়নি বরং ভোটদানে বিরত ছিল।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন-এর সিনিয়র ফেলো ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ড. শাদি হামিদবলেন—“যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতি কৌশলগতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও সেটি সবসময় নিঃশর্ত নয়।’’

এরপর যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন আবার সম্পর্ক উষ্ণ হলো। তিনি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন, মার্কিন দূতাবাস সেখানে স্থানান্তর করলেন এবং গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে মেনে নিলেন। এ সময়ের নীতিগুলো ফিলিস্তিনের জন্য ছিল বড় ধাক্কা।

এরপর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আবার একটি ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। যদিও তিনি প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে গাজায় বেসামরিক হত্যাকাণ্ড বেড়ে গেলে তাঁর প্রশাসন ইসরায়েলের কিছু সামরিক সহায়তা আটকে দিয়েছে, আবার জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির পক্ষে ভোটও দিয়েছে।

কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস*-এর গবেষক ড. অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন—“কখনো কখনো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের চাপ হোয়াইট হাউসকে ইসরায়েলের কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দেয়।’’

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কেন যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই ইসরায়েলের পাশে থাকে না? এর উত্তর খুঁজতে হলে দেখতে হবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির বাস্তবতা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাহিদা এবং বৈশ্বিক মানবাধিকার ভাবমূর্তির দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের বহু নাগরিক, বিশেষ করে প্রগতিশীলরা, ইসরায়েলের ফিলিস্তিন নীতির বিরোধিতা করে আসছেন। কংগ্রেসেও এখন অনেক প্রভাবশালী প্রতিনিধি ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান নিয়েছেন।

এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরব দেশগুলোর সঙ্গেও কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষা করতে চায়। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রচুক্তি, তেলনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের প্রতি অতিরিক্ত সমর্থন দিলে ওই আরব মিত্রদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত হানতে পারে।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখনো মজবুত। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর ইসরায়েলকে ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেয়, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। এই সম্পর্ক এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে একে অনেক সময় “special relationship” বলেও অভিহিত করা হয়।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—বিশ্ব রাজনীতি স্থায়ী বন্ধুত্বে বিশ্বাস করে না, করে স্বার্থে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কও তার ব্যতিক্রম নয়। একে অন্যের কৌশলগত সহযোগী হলেও, নানা সময়ে তাদের নীতিতে ভিন্নতা আসতেই পারে। কখনো ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন ভাঙলে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে নিরব থাকে, আবার কখনো অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাপের মুখে ইসরায়েল থেকে কিছুটা দূরত্বও বজায় রাখে।

সবশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন অনেক সময়ই কৌশলগত, তবে সেটি সবসময় নিঃশর্ত নয়। বিশ্ব রাজনীতিতে অবস্থান বদলায়, শত্রু-মিত্র পাল্টায়, আর সেই পাল্টে যাওয়া অবস্থার ভেতর দিয়েই সম্পর্কের সত্যতা নির্ধারিত হয়। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক তার বড় প্রমাণ।

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

অব্যাহতি প্রত্যাহার, ছাত্রদলে ফিরলেন হামিম

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাবি শাখার অধীন কবি জসীম উদ্দীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক শেখ তানভীর বারী হামিমের সাংগঠনিক পদের অব্যাহতি প্রত্যাহার করা হলো। এর ফলে তার সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় আর কোনো বিধিনিষেধ রইল না।

৪ দিন আগে

ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের ডাক মির্জা ফখরুলের

এমন পরিস্থিতিতেই এসেছে মির্জা ফখরুলের ফেসবুক পোস্ট। ধর্ষণকে নৈতিক অবক্ষয় ও মানবিক মূল্যবোধের পতনের প্রতিফলন উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বহু বছর ধরে চলতে থাকা নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক দায়িত্বহীনতা ও মানবিক মূল্যবোধের দ্রুত পতনের ভয়াবহ প্রত

৪ দিন আগে

দেশে যত অপকর্ম হচ্ছে সব জামায়াত করছে: দুদু

শামসুজ্জামান দুদু বলেন, একটি মহল আছে, যারা মিথ্যা ছাড়া অন্য কোনো ভালো জিনিস চিন্তা করতে পারে না। কখনোই তারা মানুষের আস্থা-বিশ্বাসের সঙ্গে থাকতে পারে নাই বলে সরকারে যাওয়া দূরে থাক উল্লেখযোগ্য কোনো মানুষের সমর্থনও নেই। এরা ইসলামকে ব্যবহার করে ইসলামের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করে। রাজনীতিতে এরা এমনই একটি অ

৪ দিন আগে

‘অপরাধের বিরুদ্ধে প্রয়োজন শক্তিশালী জাতীয় সামাজিক আন্দোলন’

বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সাম্প্রতিক ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বহু বছর ধরে চলতে থাকা নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক দায়িত্বহীনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের দ্রুত পতনের ভয়াবহ প্রতিফলন।

৪ দিন আগে